কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৩৭। শোভন সরকার
গত পর্বে: মণিকর্ণিকা ঘাটের ইতিহাসে কিছু চমক রয়েছে। একটু এগোলেই সিদ্ধযোগীশ্বরপীঠ। এখানে চন্দ্রকূপের জলে প্রতিফলিত হয় ভবিষ্যৎবাণী।
সঙ্কটা ঘাটের একপাশে যম ধর্মেশ্বর নামে এক লাল রঙের মন্দির দেখা যায়। এখানে যমেশ্বর শিবলিঙ্গের অধিষ্ঠান। এক সময় এখানে শ্মশান ঘাট ছিল। গোয়ালিয়রের শেষ মহারাজা জিয়াজি রাও সিন্ধিয়া ১৮৬৪ সালে সঙ্কটা ঘাটের উত্তর অংশ কিনে নিয়ে সেখানে এক প্রকাণ্ড সুরম্য মহল নির্মাণ করেন। এই মহলকেই আজ আমরা গঙ্গামহল এবং ঘাটটিকে গঙ্গামহল ঘাট নামে চিনি। নাম একই হওয়ায় অসি ঘাটের পাশেই অবস্থিত গঙ্গামহল ঘাটের সঙ্গে এই ঘাটকে অনেক সময় গুলিয়ে ফেলা হয়। তাই অনেকেই সঙ্কটা ঘাট সংলগ্ন ঘাটটিকে দ্বিতীয় গঙ্গামহল ঘাট বলে উল্লেখ করেন।
১৭৯৫ সাল নাগাদ নাগপুরের রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত ভোঁসলা ঘাটটি গঙ্গামহল ঘাটের ঠিক পরেই। আগে এর নাম ছিল নাগেশ্বর ঘাট — এখানে কুণ্ডলী পাকানো এক সাপের মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন, এখানে এক সময় নাগ পূজারও প্রচলন ছিল। কাছেই রয়েছে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম নাগেশ্বর শিব মন্দির। এছাড়াও আছে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, রঘুরাজেশ্বর শিব মন্দির। এরপর একে একে পেরিয়ে চলি অগ্নীশ্বর বা যজ্ঞেশ্বর শিব মন্দিরের নামে অগ্নীশ্বর ঘাট — এই ঘাটে দেখি ‘গুলারিয়া কোঠি’ নামে এক মহল যা বর্তমানে একটি বিলাসবহুল হোটেলে পরিণত, ১৮০৭ সালে পুণের অমৃতরাও পেশোয়ার নির্মিত অমৃত বিনায়ক (গণেশ) মন্দিরের নামে গণেশ ঘাট, ১৯৬০ সালে কোলকাতার বল্লভ রাম শালিগ্রাম মেহতার নির্মিত মেহতা ঘাট, জয়পুরের রাজা সোয়াই জয় সিংহের নির্মিত রাম মন্দিরের নামে রাম ঘাট, গোয়ালিয়রের রাজার দেওয়ান বালাজি চিমানজী জটারের জটার ঘাট (এখানেই আছে রঙিন কাচ ও জরির নকশাকাটা অতি সুন্দর লক্ষ্মণবালাজীর জড়োয়া মন্দির), একসময়ের চোর ঘাট (অহরহ চুরির ঘটনা ঘটত বলে) বর্তমানে গোয়ালিয়র ঘাট, পুণের বাজিরাও পেশোয়ার নির্মিত ঘাট ও প্রাসাদ এবং পরে তা ইংরেজদের নিলামে গোয়ালিয়রের মহারাজা জিয়াজি রাও সিন্ধিয়ার কিনে নেওয়া বালাজি ঘাট।
বালাজি ঘাটেই রয়েছে লক্ষ্মণ বালাজি মন্দির। আর কাছেই মঙ্গলাগৌরী মন্দির। অনেকে বলে যে ঘাটের একাংশ পূর্বে মঙ্গলাগৌরী ঘাট হিসেবে পরিচিত ছিল। বালাজি ও মঙ্গলাগৌরী মন্দির ছাড়াও আশেপাশে আরও বেশ কিছু পুরোনো মন্দির, যেমন গভস্তীশ্বর, রাঘবেশ্বর, মঙ্গল বিনায়ক, চর্চিকা দেবী, ময়ূখাদিত্য মন্দিরের জন্য এই ঘাটে তীর্থযাত্রীদের নিয়মিত যাতায়াত আছে।
তবে এই বালাজি ঘাটকে বেনারস আরও অন্য একটি কারণেও বিশেষ ভাবে মনে রেখেছে। বলা হয়, বেনারসে আনন্দের ‘রস’ সর্বদা বানানোই থাকে, ‘বনা হুয়া রস’, তাই এই শহর বেনারস। আর যাঁদের জন্য এই শহরের আনন্দধারা সদা বহমান, তাঁদেরই একজন হলেন শেহনাই নওয়াজ ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। মনে-প্রাণে একজন বানারসী, সঙ্গীতকেই তিনি ঈশ্বরের ইবাদৎ মনে করেন। কিশোর বয়সে এই বালাজি ঘাটই হয়ে ওঠে তাঁর সাধনভূমি। বড় ভাই শামসুদ্দিনের সঙ্গে বিসমিল্লাহ প্রতিদিন গিয়ে ঘাটের নহবৎখানায় বসতেন সানাইয়ের রেওয়াজে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত, হুঁশ থাকত না। এরকমই একদিন বালাজি মন্দির থেকে পুরোহিত বেরিয়ে এসে বললেন, ‘তোমরা তো দেখি রোজই এখানে এসে সানাই বাজাও। তা তোমরা মন্দিরের আরতির সময় সানাই বাজাবে?’
বিসমিল্লাহ বললেন, ‘অবশ্যই বাজাব, মহারাজ। তবে তার জন্য এক টাকা দিতে হবে।’
‘এক টাকা! বড্ড বেশি হয়ে গেল!’
অবশেষে আট আনায় বন্দোবস্ত হল। এরপর থেকে রেওয়াজ করতে গিয়ে মন্দিরের দিকে মুখ করে ঘুরে বসে সানাই বাজাতে লাগলেন বিসমিল্লাহ। নিয়মিত ইনামের সাথে সাথে মন্দিরের পেঁড়াও জুটতে লাগল। তবে বালাজি মন্দিরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই প্রথম নয় — তাঁর মাতামহ এবং প্রপিতামহও তাঁদের সময়ে এই বালাজি মন্দিরে গিয়ে সানাই বাজিয়ে এসেছেন কত বার।
বালাজি মন্দিরের কাছেই রয়েছে একটি বিস্ময়কর মন্দির। বেনারসের এই অংশটি তুলনামূলকভাবে উঁচু হলেও এখানে ভূতল থেকে প্রায় চল্লিশ ফুট গভীরে রয়েছে পাতালেশ্বর মহাদেবের মন্দির। পর পর বেশ অনেক গুলো ধাপ বেয়ে নেমে তবে পৌঁছানো যায় মন্দিরের গর্ভগৃহে। মন্দিরটি দেখতে বিশেষ না হলে, এখানে শিবলিঙ্গটি অন্যান্য শিবলিঙ্গ থেকে আলাদা হয়েছে এর মাথায় শ্রীযন্ত্র খোদিত থাকায়। লিঙ্গের মাথায় শ্রীযন্ত্র থাকার তাৎপর্য এই যে এখানে মহাদেব ও পার্বতী একসাথে বিরাজমান। মন্দিরের পুজারী বললেন যে, এই লিঙ্গটি ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্বামী ভাস্করানন্দের প্রতিষ্ঠা করা।
বালাজি ঘাটের পরেই কাশীর পঞ্চতীর্থের অন্যতম এবং বৈষ্ণবদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাট হল পঞ্চগঙ্গা বা পঞ্চনদ ঘাট। রঘুনাথ ট্যাণ্ডন নামে একজন ১৫৮০ সালে ঘাটটিকে সর্বপ্রথম পাথরে বাঁধিয়ে দেন। সময়ের সাথে সাথে ঘাটটি দুর্বল হয়ে পড়লে আনুমানিক ১৭৩০ সালে শ্রীপৎ রাও নামে এক মারাঠি ঘাটটির জীর্ণোদ্ধার করেন। কিন্তু ঘাটটির নাম ‘পঞ্চগঙ্গা’ কেন? মনে করা হয়, যমুনা, ধূতপাপা, কিরণা ও সরস্বতী — এই চারটি পবিত্র নদী এসে গঙ্গায় এই স্থানে মিলিত হয়েছে বলেই এটি পঞ্চগঙ্গা বা পঞ্চনদের সঙ্গম হিসেবে বিখ্যাত হয়।
কাশীখণ্ডে এই প্রসঙ্গে একটি কাহিনি আছে। কোনো এক সময় ঋষি বেদশিরা ও অপ্সরা শুচির কন্যা ধূতপাপাকে দেখে স্বয়ং ধর্মরাজ মুগ্ধ হন। তাঁকে বিবাহের জন্য জোর করতে থাকেন। ধূতপাপা পিতৃআজ্ঞা ছাড়া এই প্রস্তাবে রাজি হলেন না। এদিকে ধর্মরাজও নাছোড়বান্দা। তাঁর ঔদ্ধত্য দেখে ধূতপাপা শাপ দিলে তিনি ধর্ম নদে পরিণত হলেন। অন্যদিকে ধর্মরাজের শাপে ধূতপাপাও পরিণত হলেন ধূতপাপা নদীতে। বিধাতার এমনই বিচার যে শেষ অবধি ধূতপাপা নদী এই কাশীক্ষেত্রে ধর্ম নদে মিলিত হলেন। এরই মধ্যে, ময়ূখাদিত্য যখন মঙ্গলাগৌরীর ধ্যান করছিলেন, তাঁর কিরণরাজি থেকে ঘামের ধারা কিরণা নদী হিসেবে বইতে লাগল। সেই নদী গিয়ে মিশল ধূতপাপা নদীতে। তারপর ভগীরথ কাশীতে আনলেন গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীকে। এই পাঁচটি নদী এসে এই তীর্থে ধর্ম নদে এসে মিলিত হলে এর নাম হল পঞ্চনদ তীর্থ। কাশীখণ্ডে আরও স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে যে এই সঙ্গম সত্যযুগে ধর্ম তীর্থ, ত্রেতায় ধূতপাপক তীর্থ, দ্বাপরে বিন্দু তীর্থ এবং কলিযুগে পঞ্চনদ নামে খ্যাত হয়েছে।
প্রশ্ন হল, এখনও কি এই পাঁচটি নদীর সঙ্গম দেখা যায় এই পঞ্চগঙ্গা ঘাটে? বইপত্র ঘেঁটে বা এই ঘাটে গিয়ে আমার অনুসন্ধানের ফলাফল নঞর্থকই হল। কেউ কেউ বললেন, গঙ্গা ছাড়া অন্য নদীগুলি এখন অন্তঃসলিলা, অর্থাৎ মাটির নীচে অদৃশ্যভাবে বয়ে চলেছে। আবার অনেকে মনে করছেন এই কাশীতে এক সময় যে অসংখ্য জলাশয় ও নালা ছিল, এই নামগুলি সেই স্মৃতিই বহন করে চলেছে।
পঞ্চগঙ্গা ঘাট ইতিহাসের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী। সপ্তদশ শতাব্দীতে জ্যঁ ব্যতিস্তা তেভার্নিয়ে বেনারসে আসেন। তিনি তাঁর বর্ণনায় গঙ্গার ধারে ভারত-বিখ্যাত এক সুবিধাল ‘প্যাগোডা’র উল্লেখ করেন। তেভার্নিয়ের ভাষায় এটি ‘বেইনমাদৌ’ মন্দির, আজ আমরা যাকে পঞ্চগঙ্গা ঘাটের বেণীমাধব বা বিন্দুমাধব বা মাধোরায়ের মন্দির বলে জানি। তিনি বলেন যে সেই সময় বর্তমানের পঞ্চগঙ্গা ঘাট থেকে রামঘাট পর্যন্ত বিশাল স্থান জুড়ে এই মন্দিরের ব্যাপ্তি ছিল। এই সুরম্য মন্দিরের ব্যাপারে তাঁর বর্ণনা থেকে কিছু অংশের বাংলা অনুবাদ করলে এরকম দাঁড়ায় —
‘… ইমারতটির আকার অনেকটা যোগ-চিহ্নের মতো, … চারটি সমান বাহু। এর মাঝখানে এক সুউচ্চ গম্বুজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে…। প্রতিটি বাহুর প্রান্তে রয়েছে আরও চারটি উঁচু বুরুজ। বাইরে থেকে এগুলিতে চড়াও যায়। চূড়ায় পৌঁছানোর আগে অনেকগুলি অলিন্দ ও কুলুঙ্গি দেখা যায়। বাইরে থেকে সুশীতল বাতাস চলাচলের চমৎকার ব্যবস্থা। প্রতিটি বুরুজের গায়ে জায়গায় জায়গায় এবড়ো-থেবড়ো করে খোদাই করা রয়েছে বিভিন্ন পশুর অবয়ব। প্যাগোডার একেবারে মাঝখানে সবচেয়ে বড় গম্বুজের নীচে রয়েছে প্রায় সাত-আট ফুট লম্বা ও পাঁচ-ছয় ফুট চওড়া একটা বেদী, বেদীর সামনে দুটো ধাপ। এগুলি সুন্দর কারুকাজ করা চাদরে ঢাকা। চাদরগুলি হয় শুধু রেশমের বা রেশম ও সোনার জরির। বেদীটি হয় সোনা বা রূপোর কাজ করা বহুমূল্য চাদর বা রঙিন চিত্র আঁকা বস্ত্রে আচ্ছাদিত। … বেদীর উপরের মূর্তির মধ্যে একটি প্রায় পাঁচ-ছয় ফুট উঁচু, তার মাথা আর গলা বাদে দেহের অন্য কোনো অংশ দৃশ্যমান নয়। সমস্ত শরীর বেদী পর্যন্ত দীর্ঘ পোশাকে আবৃত। মাঝে মাঝে তার গলায় বহুমূল্য রত্নখচিত হার দেখা যায়।’
তেভার্নিয়ের বর্ণনা করা এই বেণীমাধব বা বিন্দুমাধব মন্দিরটি খুঁজতে গেলে উৎসাহী পাঠকেরা হতাশ হবেন — এই রকম চোখ ধাঁধানো সুউচ্চ ও ব্যাপক মন্দিরের অস্তিত্ব এখন আর নেই। হ্যাঁ, বেণীমাধব মন্দির একটি রয়েছে বটে তবে তার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস ও রাজনীতি।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
