চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর

গত পর্বের পর

কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না

 

আহাম্মকের রাত-প্রহরগুলি এক ধরনের আত্মধিক্কারের সঙ্গে নৈকট্যের সুত্রেই যেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কর্নেলের প্রতীক্ষার প্রহরগুলির সঙ্গে একাকার হয়ে যায়।

 

কলম্বিয়ার গৃহযুদ্ধ বা হাজারদিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হিসেবে অবসরের সময় কর্নেল প্রতিশ্রুত ছিলেন যে, তিনি পেনশন পাবেন।

সেই কারণে কর্নেল প্রত্যেক শুক্রবারের ডাকে পেনশনের চিঠির প্রতীক্ষা করেন।

পনেরো বছর কেটেছে কিন্তু পেনশন তিনি পাননি।

মাত্র ন-মাস আগে অগাস্টিন মারা গেছে— কর্নেলের একমাত্র পুত্র।

মৃত্যুর কারণটা ছিল রাজনৈতিক। বিদ্রোহের গোপন ইস্তাহার বিলি করার সময় পুলিশ তাকে গুলি করে মারে। পুত্রের রোজগারই ছিল এই সংসারের আয়ের একমাত্র অবলম্বন।

 

যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কর্নেলের নামে কোনো চিঠিই আসে না। বিপন্নতা ঘিরে থাকে পরিবারটিকে।

অনন্ত প্রতীক্ষা।

তিনি প্রতি শুক্রবার বন্দরে যান।— যদি চিঠি আসে,  এই আশায়।

সেইদিনই সাপ্তাহিক ডাকবাহী লঞ্চ আসে বন্দরে। লঞ্চটা জেটিতে ভেড়ে সবার শেষে। কর্নেল কাতর দৃষ্টিতে লঞ্চটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। পোস্টমাস্টার চিঠিপত্রভরা ডাকের থলিটা কাঁধে তুলে নেওয়া থেকে কর্নেল পোস্টমাস্টারকে নজরে নজরে রাখেন। ‘পনেরো বছরের অপেক্ষা তাঁর স্বজ্ঞাকে ধারালো করে দিয়েছে।’

তারপর পোস্টমাস্টারকে পোস্ট অফিস পর্যন্ত অনুসরণ করেন কর্নেল।

পোস্টমাস্টার যখন ডাকে আসা চিঠিগুলি বন্টনের জন্য এলাকানুযায়ী ভাগ করেন তখন কর্নেল ছলনাভরে অপলকে সেইদিকে চেয়ে থাকেন।

বন্টন শেষে পোস্টমাস্টার বলেন— ‘না, কর্নেলের জন্য কিছুই নেই।’

এই নিত্য প্রত্যাশার কাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ অথচ ব্যর্থ প্রতীক্ষার জন্য কর্নেল লজ্জিত বোধ করেন।

সেই কাঙ্ক্ষার ব্যর্থতাকে আড়াল করবার জন্য কর্নেল মিথ্যা করে বলেন— ‘না, না, আমি কিছুই প্রত্যাশা করিনি।’ তারপর  সেই সময় পোস্টঅফিসে খবরের কাগজ ও নিজের সামগ্রী নিতে আসা ডাক্তারের দিকে নিতান্ত শিশুসুলভ দৃষ্টিপাত করে বলেন— ‘আমাকে কেউ লেখে না।’

ডাক্তারের খবরের কাগজ আসে ডাকে। ডাক্তার ডাক্তারি-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনগুলি সরিয়ে রাখেন। খবরের কাগজের মোড়ক খুলে কাগজের হেডলাইনগুলিতে চোখ বোলান।

কর্নেলকে নিয়ে নিজের ডাক্তারখানায় পৌঁছবার পর ডাক্তার কয়েকটি কাগজ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পড়বার জন্য কর্নেলকে দিয়ে দেন। কাগজে পড়ার বা জানার কিছু নেই, কেননা এসব জায়গায় শুধুমাত্র সেই খবরই ছাপা হয় যা সামরিক-কর্তৃপক্ষের সেন্সরের কাঁচি এড়াতে পারে।

 

খবরের কাগজের মতোই সিনেমার দশা। সাতটার পর মিনারের ঘন্টা বাজে। চার্চের ফাদার এই ঘন্টাটা বাজিয়ে চার্চের ফাদার জানিয়ে দেন সেদিনের সেন্সারগ্রস্ত ছায়াচিত্রটি কোন শ্রেণির। ঢং ঢং করে বারোবার ঘন্টা বাজে। অর্থাৎ সিনেমাটা কারোরই দেখার যোগ্য নয়। গত এক বছর ধরে কোনো ছবিই দেখার যোগ্য হচ্ছে না।

 

কর্নেল বিছানায় ঢুকে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।

এগারোটায় বেজে ওঠা তুরীর শব্দে রাত্রিকালীন কার্ফু ঘোষিত হলো।

খবরের কাগজে প্রাক্তন সৈনিকদের কোনো কথা নেই। পাঁচ বছর আগেও নতুন পেন্সন প্রাপকদের নামের তালিকা কাগজে প্রকাশিত হতো— সেসবও বন্ধ হয়ে গেছে।

 

পরদিন সকালে ডাক্তার এলেন কর্নেলের স্ত্রীকে দেখতে। ডাক্তার কর্নেলের হাতে তুলে দিলেন মিমিওগ্রাফ বা স্টেনসিল করে ছাপা কাগজ ভর্তি সেই গোপন খবরের লেফাফা— গতকালের কাগজ যেগুলো ছাপতে পারেনি। তাতে আছে দেশের অভ্যন্তরে সামরিক প্রতিরোধের নিষিদ্ধ খবর। কর্নেল খবরগুলো পড়ে লেফাফাটা ডাক্তারকে ফিরিয়ে দিতে চাইলেন। ডাক্তার সেটি না নিয়ে অন্য কাউকে দেওয়ার কথা বললেন।

কর্নেলের স্ত্রীকে ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন লিখে, নিজের ব্যাগ থেকে ফ্রি স্যাম্পেল বের করে দিয়ে ডাক্তার কর্নেলের সঙ্গেই রাস্তায় বের হলেন।

কর্নেল লেফাফার সেন্সারবিহীন গোপন সংবাদবাহী লেফাফাটা অগাস্টিনের কম্পানিয়োরেদের বা কমরেডদের দেওয়ার জন্য দর্জির দোকানে গেলেন। এই প্রতিরোধের বার্তা দেওয়ার মতো তাঁর নিজের আর কেউ নেই! তাঁর সহযোদ্ধারা বিগত যুদ্ধে হয় মারা গেছেন বা এই শহর থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এখন নিহত পুত্রের সহযোদ্ধা কমরেডরাই এ-শহরে তাঁর শেষ আশ্রয়।

 

সহসা বুকের ভেতরটা শিরশির করে ওঠে আহাম্মকের।

সেই সামরিকশাসিত প্রান্তিক শহরের সংকীর্ণ পথে পথে-চলা পুত্রহারা কর্নেল নন— যেন সেই কোনো কালে কার্ফু-কবলিত এক শীত-সন্ধ্যায় তাদের পাড়ার রূপুদা, ন্যালাখ্যাপা রূপুদা। একটা তুলট চাদর গায়ে জড়িয়ে তার অননুকরণীয় দু-পায়ের ছন্দে হাঁচকি তুলে তুলে অদ্ভুত হাঁটার ভঙ্গিতে এ গলি, সে গলি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার হাতদুটোও অদ্ভুত, তার গড়ন স্বাভাবিক কিন্তু তা সহজে ওঠানামা করে না— এক হাত তুলতে গেলে অন্য হাতটার সাহাষ্য দরকার হয। ডান হাত হলে বাঁ-হাত দিয়ে ডান হাতের কনুইটা ঠেলতে হয়—বাঁ-হাত তুলতে গেলে ডান হাত!

যত কার্ফুই হোক, সবাই জানে শুঁড়ি-মাতাল, পাগল-ছাগল, ভবঘুরে বেওয়ারিশদের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম কাজে লাগে না। তাদের পুরোটাই ছাড়, উপরি পাওনা বেল্টের পিতলের ঝলকানি আর বুটের শব্দের সঙ্গে উর্দিধারীদের দু-চারটে লাঠির গুঁতো।

এই শহর তখন সন্ত্রস্ত। মাঝে মাঝেই পুরো শহরে, নতুবা বিশেষ বিশেষ এলাকায় কার্ফু জারি করা হয়— উইচ হান্টিংয়ের মতো রাজনৈতিক বিদ্রোহীদের খোঁজে তল্লাশি চলে বাড়ি বাড়ি। যেন বিদ্রোহ আর বিপ্লব ছেলের হাতে মোয়া!

সেই সাংঘাতিক কৈশোর, যখন পুলিশের সঙ্গে ‘সংঘর্ষে’ অথবা ছুরিতে, নাম না-জানা, ইতিহাস বিগর্হিত পাইপগানের থেকে ছোঁড়া গুলিতে হামেশাই দু-দশজনের প্রাণ যায়।— একদা বন্ধু নাম পায় শ্রেণীশত্রু! কী যে ঘটছে মানুষ বুঝতেও পারে না, শুধু শীত পেরিয়ে তাজা বসন্তেও ঝরে যায় পাতারা।

সেই সন্ত্রস্ত সময়ে এ-শহরে একমাত্র অকুতোভয় আমাদের রূপুদা।

রাষ্ট্রীয় বা রাজনীতি— উভয়পক্ষই রূপুদাকে সমঝে চলে। তাদের চোর-পুলিশ খেলার মাঝখান দিয়ে রূপুদা পায়ে হাঁচকি তুলে ঘুরে বেড়াতে পারে।

একদিন এই ছোটো শহরের উপ-থানায় নতুন আসা এক ছোকরা সাব-ইন্সপেক্টর কার্ফুকালে ভুল করে রূপুদাকে পেছন থেকে ‘হ্যান্ডস আপ’ বলে আওয়াজ দিয়েছিল।

রুপুদা ফিরে দাঁড়িয়ে ওই শীতের সন্ধ্যায় গা থেকে তুলট চাদরটা ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল— ‘কে রে বলল কথাটা! এখেনে এসে তাকেই হাতদুটোকে তুলে দিয়ে যেতে হবে।’

প্রায় নিষ্প্রদীপ সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছোটো দারোগা দেখলেন রূপুদার দেহের তুলনায় লম্বা ঘাড়ের ওপর অসম্ভব বড়ো একটা সমুন্নত মাথা এবং তারও চেয়ে অসম্ভব কৃশ দুটি হাত!

কার্ফুর রাতে এটা কোন ধরনের মানুষ!

কাছাকাছি থাকা এক কনেস্টবল এসে দারোগাকে ঐ অদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছিল।

পরে তাঁকেই এগিয়ে এসে শীতে কম্পমান রূপুদার পায়ের পেছন দিক দিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে থাকা চাদরটা গলা পর্যন্ত তুলে দিতে হয়েছিল।

জন্মকাল থেকেই রূপুদা অসম্ভব রোগা, কঙ্কালসার। তাই মোটা দেখাবার জন্য শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা জামার ওপর জামা, তার ওপর জামা পরে থাকত। আর পাজামার ওপর লুজ প্যান্ট!

ওই চেহারা এবং পোশাকের জন্যই রূপুদাকে ন্যালাখ্যাপা বলে মনে করত সকলে।

কিন্তু আহাম্মক জানত রূপূদা আদৌ ন্যালাখ্যাপা নয়। ঐ হাত নিয়েই তো রূপুদা দীঘলমারি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেছিল।

রূপুদার বাবা চাকরি করতেন রেলে। কর্মরত অবস্থায় তিনি মারা যান। তখন রূপুদা বড়ো ছেলে হিসেবে ডাই ইন হারনেস বা কম্প্যাশনেট গ্রাউন্ডে তার প্রাপ্য চাকরিটি আজীবন ভাত-কাপড়ের শর্তে ভাইকে দিয়ে দেয়।

তার পর থেকেই রূপুদা খায় দায়, ভাইয়ের কাছ থেকে পকেটমানি পায় আর ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ায়।

সে আহাম্মক বলেই তার সঙ্গে ন্যালাখ্যাপা রূপুদার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠতে পেরেছিল।

রূপুদাই এক ঘুঘু-ডাকা দুপুরে আমাদের বাড়ির পগারের বাগানের টিনের ঘরে বসে বলেছিল— ‘দেখ, আমি চাকরি করে কী করতাম। ঘর-সংসার তো আমার জন্য নয়, ইস্কুল-কলেজেই নুলো, খোঁড়া— এসব শুনতে শুনতে কান পচে গেছে, চাকরির জায়গায় কী বলত বুঝতেই পারছিস ! কী দরকার ভাই ওসব ঝুট ঝামেলায় যাওয়ার। আমার তো দুটো ভাত-কাপড়েই চলে যাবে। মা যতদিন আছে ততদিন আমার একটা দায় আছে। ছোটোবেলা থেকে আমার মতো একটা নুলো ছেলেকে নিয়ে মা খুব ভুগেছে— লোকের কথা, আত্মীয়স্বজনের খোঁটা, বংশের দোষের কথা শুনেছে। শুধু মায়ের জোরেই কলেজ পর্যন্ত যেতে পেরিছি। আমার দিক থেকে সংসারের কোনো সুরাহা হবে না বুঝতে পেরে ভাই এই বাজারে চাকরি চাকরি করে হন্যে হয়ে উঠেছিল— বাবার চাকরিটা ওকে দিয়ে দিলাম। আমার ভাত-কাপড়, মায়ের দেখাশোনা, ভাইয়ের সংসার, বংশরক্ষা— সব দিক বজায় থাকল। তাছাড়া আমাকে নিয়ে ভাইয়ের আবাল্য দুশ্চিন্তারও অবসান হলো।’

সুতরাং আহাম্মক জানত রূপুদা আদৌ ন্যালাখ্যাপা নয়।

কার্ফুর মধ্যে সেদিন ইন্সপেক্টরের সামনে যে পিঠ থেকে চাদরটা ফেলে দিয়েছিল তার গভীরতর কারণ এই যে, তা না-হলে দারোগা নিজেই বা কনেস্টবলকে দিয়ে তার চাদর খুলিয়ে তল্লাশি করত।

আসলে অন্যদিনের মতো সেদিনও রূপুদার সবচেয়ে নিচের জামাটার তলায় গায়ে লেপটে, প্যান্টের তলাকার পাজামাটার দড়ির সঙ্গে গোঁজা ছিল সেদিনের প্রতিযুগ ও জনশক্তি পত্রিকা। পিঠের দিকে গোঁজা ছিল এক গোছা সে-সময়ের নিষিদ্ধ ইশতেহার!

প্রায় প্রতিদিনই রূপুদা সন্ধের সময় হাঁচকে হাঁচকে স্টেশনে যেত। বসে বসে লোকজন দেখত, তারপর পাঁচটা চল্লিশ বা ছটা পঁয়ত্রিশের লোকালে মাল-আনা ডেলি প্যাসেঞ্জার নির্মলবাবুর পাশাপাশি বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে কোনো নির্জন প্রায়ন্ধকার রাত্রিকালীন রহস্যমেদুর বৃক্ষচ্ছায়ায় কাগজের গোছার হাতবদল হতো।

প্রতিযুগ ও জনশক্তি কাগজগুলোকে রূপুদা এই জনপদের একমাত্র ইস্কুলের অঙ্কের খ্যাপাটে মাস্টারমশাই মাখনবাবু, মুদি দোকানদার বীরেন মজুমদার, দক্ষিণপাড়ার প্রবীণ হোমিওপ্যাথি ডাক্তার সুবিমল গুহমজুমদার, বাজারের একেবারে পুব-সীমানায় বড়ো বড়ো দোকানের মাঝে প্রায় লুকোনো অথচ জমজমাট দীপু ঘোষের চা-র দোকান— এমন অনেক জায়গার সকলের অ-লক্ষে বিলি করে দিত। পরে বাকি কাগজ, ইশতেহার, চিঠি বা ঐ-ধরনের সবকিছু সে পোঁছে দিত  পার্টি অফিসের অদূরে  যে বারোয়ারি বাড়িতে সাত ঘর ভাড়াটের মধ্যে রূপুদার ইস্কুলকালের একমাত্র বন্ধু বিপুল দাসের পাশের ঘরে ভাড়া থাকা পার্টি কর্মী বুলু গুহর কাছে।

কেউ কখনও রূপুদাকে সন্দেহ করেনি।

তার প্রথম কারণ রূপুদার মতো ন্যালাখ্যাপা কোনো বিরুদ্ধপক্ষের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে এটা ছিল সকলের কল্পনার অতীত।

দ্বিতীয় কারণ সকলেই জানে সে পাঁড় চা-খোর। পাড়া আর বেপাড়ার বহু বাড়িতেই রূপুদা সকাল-সন্ধে চা খেতে যায়। আসলে যেখানেই চা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেখানেই রূপুদা হাজির হয়।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply