চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর

আহাম্মকের স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ

সকলের বর্ণমালা শিক্ষার ধরন একরকম হয় না। মায়ের মুখে মুখে সুরেলা ছন্দে বর্ণক্রম কণ্ঠস্থ করার পরে পাতলা গোলাপি-রঙের প্রচ্ছদযুক্ত বই থেকে সক্কলের বর্ণমালা শিক্ষা স্বরবর্ণ দিয়ে শুরু হলেও রাণুর [দ্রষ্টব্য— বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় : রাণুর প্রথমভাগ গল্পগ্রন্থের নাম-গল্প, রঞ্জন পাবলিশিং হাউস, কলকাতা ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ] ক্ষেত্রে বর্ণমালা শিক্ষার বিফলতার ধরনটি ছিল একেবারেই ভিন্ন প্রকারের। রচনার সূচনাই হয় লেখকের প্রশ্বাসিত একটি বাক্য দিয়ে— ‘আমার ভাইঝি রাণুর প্রথম ভাগের গণ্ডি পার হওয়া আর হইয়া উঠিল না। তার অনেক কারণের মধ্যে দুটি কারণও বিভূতিভূষণ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন— ‘এক, তাহার অকালপক্ক গিন্নিপনা আর অন্যটি তাহার আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা।’ (তদেব)

কিন্তু বিজাগতিক আহাম্মকদের প্রথমভাগ শিক্ষার না-হওয়া ছলাকলা পেরিয়ে, ‘ক’ অক্ষরেই শিক্ষাদীক্ষার সমাপ্তির ব্যাপারটা জীবনব্যাপী চলেছে রাণুর ঠিক বিপরীত চালে। আসলে— এক, আহাম্মকের বালকপনাই কখনও কাটে না। বার বার সে আপাত ভালো অভিনয়ের দ্বারা প্রতারিত হয়, সামান্যতম সুব্যবহারে হয় আপ্লুত। অভিজ্ঞতা তাকে নেতিবাচকতার দিকে ক্রমাগত পরিচালনা করার চেষ্টা করে আর আহাম্মক নেতিবাচকতাকে পরিহার করতে চায়। কোথায় যেন এক দুর্মর শুভবাচক ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ তাকে পদে পদে আশা ও আত্মস্থ আলোয় অভিভূত করে রাখে। আহাম্মকের আর বয়স বাড়ে না!

দুই, আহাম্মকের উচ্চাকাঙ্ক্ষার একান্ত অভাব। আশৈশব আহাম্মক কাজ করে এসেছে। কিন্তু হাত বাড়িয়ে সফলতা কামনা করেনি। সে ফসল ফলায়, যত্ন করে ফসল কাটে, কিন্তু সেই ফসলের কে যে কত ভাগ গাপ করে দেয়, কিংবা অবজ্ঞার অন্ধকারে তাকে চিরতরে বিলুপ্ত করে দেবার আয়োজন চলতে থাকে তার হিসেব আহাম্মক রাখতে পারে না। ততক্ষণে সে নতুন অকাজ বা নিকাজের বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে পড়ে। স্বীকৃতি বা গণ্য হয়ে ওঠার ধারাবাহিক ব্যর্থতা গ্রহণের ছলনাকে আহাম্মক রীতিমতো ভয় পেতে থাকে। সামান্য কৌশলে ধরা দিতে পারে স্তাবকতা, আত্মপ্রসাদ বা মতলববাজদের অবিরোধ বা পিঠ চুলকানি— এমন পরিস্থিতিও আহাম্মককে এড়িয়ে যেতে হয় বারবার। এক অপ্রতিম অবসাদ ও বিষণ্ণতা এক অচিহ্নিত কম্পিত সংকেতের দিকে পুনঃ পুনঃ তাকে ঠেলে দিতে থাকে।

তথাপি তৃতীয় একটি অতিরিক্ত কারণ অনাবশ্যক জন্মদাগের মতো আহাম্মকের এলোপাথারি কুৎসিতদর্শন পোশাকের নিচে, শরীরে, সমগ্র অস্তিত্বে নাছোড় হয়ে লেপটে থাকে। সেটি হলো সংগুপ্ত এক জেদ! আত্মবোধ নামক বেয়াড়া এক বোকামির ফলায় আহাম্মক ফালা ফালা হতে থাকে। অবজ্ঞা, অস্বীকৃতি, উপেক্ষা, প্রত্যাখ্যান, অনাদর, লঘুতা, অপজ্ঞান, পরাকরণ ইত্যাদি সহ্য করেও প্রাপ্যবঞ্চিত আহাম্মক সব ছেড়ে দিতে পারে, কিন্তু নিজেকে ত্যাগ করতে পারে না।

ফলে পৃথিবীর সব আহাম্মকের মতো অননুমোদিত এবং চিরকালের অশ্রুত অথচ সুচিহ্নিত এই আহাম্মকেরও অক্ষর পরিচয়ের আদ্য অক্ষর শুরু হয়েছিল ক-অক্ষরে। সম্ভবত সেটি ব্যঞ্জনবর্ণের শুরুর অক্ষর বলেই জীবনের দিগন্ত স্পর্শের প্রাক্কালেও সে-শিক্ষা তার সহজ হয়নি। তাছাড়া হেলাফেলার এই বেঁচে থাকার আনাচেকানাচে আরও এমন কত যে ‘জজে’ মেনে না নেবার মতো অকারণ কারণ ছিল তার ইয়ত্তা নেই।

 

সম্ভবত ক-অক্ষরের পর-পরই প্রাবচনিক ‘গোমাংস’ শব্দটি লেপটে ছিল বলে ক-অক্ষরেই আহাম্মকের শিক্ষার আদ্য-মধ্য-উপাধি— সবকিছুই চিরকালীন অসমাপ্তির মধ্যে দিয়ে পঞ্চত্ব পেয়েছিল। তার চেয়ে বেশি এগিয়ে বিদ্যাসাগর তো দূরের কথা কাব্যতীর্থ, বৈয়াকরণ, তর্কালঙ্কার, তর্কপঞ্চানন, বিদ্যাবারিধি, বাচষ্পতি, শিরোমণি, শাস্ত্ররত্নাকর, আচার্য, শাস্ত্রী, মহামহোপাধ্যায়, আত্মবিদ্যাভূষণ, ভাষ্যভাবজ্ঞ কিন্তু  কিংবা নিদেনপক্ষে টুলো পণ্ডিত— কোনাটাই হওয়া হয়ে ওঠেনি— যাকে বলে ‘জীবনে শিক্ষা না হওয়া’, তাই— শিক্ষার হদ্দমুদ্দ একেবারে। এমন-কী পণ্ডিত হতে না-চাওয়া রবি ঠাকুরের অমলের মতো রাজার চিঠি বা সুধার আসার প্রতীক্ষাও তার ছিল না। জন্মপোশাকের ন্যালাখ্যাপা আজীবন ভুবন প্রপাতহীন গোপন অশ্রুজলে ফকির।

আসলে ‘গোমাংস’ শব্দটির সঙ্গে যে ধর্মান্ধ অশিক্ষা ও ঘৃণার অনুশীলন থেকে জাত এবং অজ্ঞতা, মূর্খতা, জ্ঞানহীনতা এবং পরিত্যায্যতার এই-ধরনের তুলনা লোকব্যবহারে চাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই আগ্রাসী প্রক্রিয়াটি আহাম্মকের পাতলা চামড়ায় দাঁত বসিয়েছে জ্ঞানাবধি। ক-অক্ষর গোমূত্র বা গো-চোনাও তো বলা যেতো! মানেটা তো একই রকম নেতিবাচক থাকত! কিন্তু জীবনে যত শিক্ষাই আহাম্মক পাক না কেন ঘাতসহ পাতলা চামড়া মোটা করার কোনো লক্ষণই তার জীবনে ফুটে ওঠেনি।

 

স্বরবর্ণ শিক্ষা না-হওয়ায় ব্যঞ্জনবর্ণ তো ব্যর্থ হতে বাধ্য। স্বর ছাড়া ব্যঞ্জনের উচ্চারণ হয় কী প্রকারে?

যার প্রকৃত শিক্ষা নেই, তার লজ্জাও নেই। জীবনটা যে একটা হোটেলের অপরিচ্ছন্ন হেঁশেলে রাঁধা ব্যঞ্জনের মতোই— কেটেকুটে, প্রায় না-ধুয়ে প্রচুর তেল-মশলা দিয়ে নেড়েচেড়ে প্রস্তুত এক খাদ্যদ্রব্য— সেই জাজ্জ্বল্য সত্যটা আহাম্মকের স্বীকার করতে বাধে। ফলে বিস্বাদ প্রাত্যহিকে দৈনন্দিনের হিসেব মেলাবার আগেই বেলা বয়ে যায়। শুষ্ক নদীখাতে একা, পরিত্যক্ত ডোঙাটির মতো আজীবন সরু ও দুর্বল কাছি-বাঁধা আহাম্মক পড়ে থাকে জীবন নামক দৈনন্দিন জলরেখা অপসৃত উপকূলে।

 

কোনোদিন কী বহমান জলরাশির কল্লোলে অনুচ্চ নদীপাড়ের শষ্পেরা হেসে উঠেছিল? কোনোদিন কী নারকেল ডালের বৈঠা বেয়ে সেই জলস্রোতে ভেসেছিল ছিরিছাঁদহীন ডিঙাখানি?

কোনোদিন কী হৈমন্তিক বাতাসের হিমস্পর্শে তীরভূমিতে দোল খেয়েছিল কাশের গুচ্ছ?

 

— ‘চলে যেতে যেতে কিছুই কি মনে পড়ে না আর?’

আহাম্মকটা নিজের সঙ্গেই কথা বলে। তা-ও ফিসফিস করে। কেউ শুনে ফেলল না তো— পরিপার্শ্বের সার্বিক অন্তর্গত দারিদ্র্যের এই সুবিস্তৃত কর্মবিহীন বিজনতা আর ‘দিবানিশি শুধু ব’সে ব’সে শোনা / আপন মর্মবাণী।’

আহাম্মক নিজেকেই বার বার বলে— ‘হে হেমন্ত বাতাস, হে নবীন কাশের গুচ্ছ, হে দুর্বাদলশ্রেণী— তমসার বোধে প্রহৃত আমার জন্য ছায়ামূর্তির মতো অদৃশ্য, অকারণ হাতছানি দিয়ে আর নিমন্ত্রণের কোনো ভূমিকা রচনা কোরো না, আর লোভ দেখিও না, অপরাজেয় স্রোতস্বিনীর নিরাশ্বাসে!’

 

তার কথা শোনার মতো আর কেউ কোথাও অবশিষ্ট নেই জেনেও আহাম্মক বিছানায় উঠে বসে।

 

মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ।

বালিশের পাশে রাখা মোবাইলের আলোয় সময় দেখে।

আজও সেই একই সময়। রাত্রি দুটো ছত্রিশ।

মানুষের শরীরের ভেতরেও একটা ঘড়ি আছে।

এমন-কী আহাম্মকের এই ভাঙাচোরা শরীরের ভেতর, এখনও!

পাশে কুহু ঘুমোচ্ছে। শ্রান্তির ঘুম। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও কুহুর মুখে অস্থিরতার অপ্রশান্তি! এই মধ্য-ষাটেও টানা টানা ভ্রূ-পল্লবে প্রত্ন-প্রতিমার ছোঁয়া। কিন্তু দুই ভ্রূর মাঝখানে জেগে আছে স্তবকের মতো একটি ভ্রূকুটি নির্বাক ও নিরুদ্যত খড়্গের মতো।

 

আহাম্মক মোবাইলের আলোয় কুহুর মুখ দেখে, দেহভঙ্গিতে শয়নের অস্বাচ্ছন্দ্য।

একা হাতে সংসার সামলাতে সামলাতে কুহুর বেতসলতার মতো শরীরেও হাঁটুতে আর কোমরে ব্যথা!

এই মধ্যরাত পেরোনো তৃতীয় যামে পাখিরা প্রথম ডানা ঝাপটায়। মুহূর্তের জন্য একযোগে ডেকে ওঠে। তারপর আবার সব নিশ্চুপ।

শুধু ঘরের মধ্যে, চারপাশে নানাবিধ বিচিত্র রাত্রিকালীন শব্দাবলী।

রাস্তার ওপাড়ে টানা পাঁচিল। পাঁচিল-ঘেরা সুবিস্তৃত কারখানার জমি। কোনো এক কালে এই শহরকে শিল্পনগরী করে গড়ে তোলার প্রয়াসে এই শহরপ্রান্তে বড়ো বড়ো জমি প্রায় এক দশকের স্বাধীনতার উদ্্যাপনে এক টাকার কড়ারে লীজ় দিয়েছিল সরকার। এখন স্বাধীনতার নোনা ধরা প্রাচীর বেষ্টিত অনেক এলোমেলো গাছপালার মধ্যে দেড়খানা টিনের শেড।

পাঁচিলের পাশে কোনো গাছ থেকে প্রতিদিনের মতো পেঁচাটা দ্বিতীয় দফায় কট্ কট্্ কট্ কট্ করে একটানা ডেকে চলেছে।

সন্ধ্যেবেলায় আহাম্মকটা যখন এক-পেট খিদে নিয়ে জানালার পাশে বসে অন্ধকার হয়ে আসা রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকে তখন দিবান্ধ পাখিটা গাছপালার মধ্যে অনেক দূরের ছায়া ছায়া শেডের পাশে যে বহু পুরোনো আমলের পরিত্যক্ত  জলের ট্যাঙ্কি, সেটাকে ছাড়িয়ে যে বড়ো নিমগাছটা তার ডালপালা মেলে দিয়েছে— সেই গাছটার কোনো দুরূহ শাখায় বসে প্রথম দফায় ডাকতে থাকে।

যদিও সেই ডাকে ছন্দহীন কোলাহল।

ঘরের একপাশ ঘেঁষে একটা মৃদু আলোর রেখা।

ইদানিং কুহু বারান্দার আলোটা জ্বালিয়ে রাখে, যাতে আহাম্মকের এই রক্ত-মাংস-ত্বকের কর্কশ ও হৃত-লাবণ্যের ভাঙাচোরা শরীরটা শেষতম সত্য হিসেবে কঙ্কাল-করোটির ক্রমভঙ্গুরতা নিয়ে ঘরের মেঝের সংস্পর্শে এসে যেন কুহুর নিজের সাধ্যাতীত শ্রম-ক্ষমতার শেষসীমা অতিক্রম না করে যায়।

আহাম্মক মোবাইলের শরীর আঁকড়ে ধরে বাটন টিপে টর্চটা অন করে দেয়।

বিছানার পাশে বিবর্ণ হয়ে আসা প্লাস্টিকের চেয়ারে রাখা ঘুমের ট্যাবলেটের স্ট্রিপটার দিকে নজর যায়। বারান্দার আলোয় স্ট্রিপটার পাশে ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাসের প্রলম্বিত ছায়া স্ট্রিপটাকে ছঁুয়ে মশারির গায়ে এসে পড়েছে।

— একটা ট্যাবলেট খেয়ে নেবে নাকি আহাম্মক— প্যাঁচাটার এই একটানা গম্ভীর গলায় ডাকের সঙ্গে ট্যাবলেটের স্ট্রিপটার কোনো প্রখর প্ররোচনা আছে নাকি!

এই সময়েই কুহু নড়েচড়ে ওঠে।

তাড়াতাড়ি টর্চসহ মোবাইলের আলো নিভিয়ে দেয় আহাম্মক।

জানালা দিয়ে বাইরের দূরবর্তী আলোহীন স্ট্রীট ল্যাম্পের অন্ধকারে শেডের দিকে তাকায় আহাম্মক।

বহুদিন হলো কারখানাটা বন্ধ, শুধু বিবর্ণ পোশাকের তিন-চারজন সিকিউরিটি স্টাফ কারখানার পুরোনো-ধুরোনো যন্ত্রপাতি, স্ক্র্যাপগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা নিজেদের বা কারখানাটাকে রক্ষা করতে পারে বলে মনে হয় না— না সুযোগ সন্ধানী দাদা ও সমাজবন্ধুদের হাত থেকে, না কালের হাত থেকে, না ব্যাঙ্কের ঋণদাতা কর্তৃপক্ষ এবং আইনের সঙ্গে এক্কাদোক্কা খেলতে থাকা মালিকের লোভী ও ধুরন্ধর পরিকল্পনার আঁচ থেকে।

 

সম্ভবত লোকগুলো নিয়মিত, পুরো বা স্থায়ীভাবে মাইনেও পায় না।

মাঝ মাঝে নিজেদের মধ্যেই তুমুল ঝগড়া করে। তাদের কলহের শব্দে নির্জন কারখানা চত্বরের পাখপাখালিগুলো অসময়ে উড়াল দেয়।

পেটে খিদে থাকলে নাকি কলহ উচ্চকিত হয়। আর খেতে খেতে খাবারের প্রাচুর্যে উদরাময়ের লক্ষণ দেখা দিলে গোপন ও কুশলী অন্তর্ঘাত!

শেডদুটো কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে। সেখানে হাঁ অন্ধকার।

পাঁচিলের গায়ে বাইরের নিকাশি নালার জলসিঞ্চনে বেড়ে ওঠা নাম না-জানা লতার দল, পাঁচিলের মাথায় তেকোণা ঢালের গায়ে শ্যাওলার ও গুল্মের রাজত্ব, ঈষৎ কাত হয়ে থাকা পুরোনো চিমনিটার গায়ের বহুদিনের ফাটা-চটাগুলো এই অন্ধকারে নজরে আসে না। চিমনির মাঝে মাঝে লোহার বাইণ্ডিংগুলোর লৌহমলও অন্ধকারে ঢাকা থাকে।

আহাম্মক নিজের রোগাভোগা হাতদুটোর দিকে তাকায়। ঘরের আধো-অন্ধকারে হাতের শিরাগুলোকে পরখ করতে চায়। গত চারমাসে তার ওজন কমেছে তেরো কেজি। ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত কারখানাটাকে তার শরীরের মতোই মনে হয়।

এই কাব্যিক তুলনায় আহাম্মকের হাসি পায়।

এখনও কাব্যি! এখনও দার্শনিকতার ফাঁকা বোকামি! রাতচরা পাখিদের ডাকে এখনও উদ্বেলিত অথচ সুরহীন গানের আয়োজন!

বালিশের পাশে মোবাইলটা রেখে ঘরের আধো-অন্ধকারে সেটার দিকে চেয়ে থাকে সে।

মোবাইলটা এখন শুধু রাত্রে সংগোপনে সময় দেখার জন্য ব্যবহৃত হয়। আর আহাম্মকের রাত্রিকালীন নিগূঢ়, অনামিত, অসনাক্ত এক আলো হিসেবে।

সেই আলো, যে আলো কখনও নেভে না, সেই আলো যা চিরকাল অপ্রকট, অনুদ্ঘাটিত, অকথিত, অননূদিত থেকে যায় আহাম্মকদের কাছে।

এই মোবাইলটায় সারাদিন শুধু জানা না-জানা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানিক বার্তা এবং সিস্টেম জেনারেটেড ধাতব কণ্ঠ ভাসতে থাকে। কিন্তু কোনো চেনা কণ্ঠ তাকে বা কুহুকে ডাকে না।

শুধু পাখিরা শূন্য আকাশে, নাম-না-জানা গাছের পাতার আড়ালে বসে সারাদিন নিজনতা বাড়িয়ে ডেকে যায়।

কোনো ফোন আসে না।

হায়! কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না।

কর্নেলকে কেউ একটি শব্দও লেখে না।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply