কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৩৮। শোভন সরকার
গত পর্বে: বিসমিল্লাহ খানের সানাই-এর সুরের রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই পৌঁছে গেলাম পঞ্চগঙ্গা ঘাটে।
রাজা দিবোদাসের সময় মহাদেব বাধ্য হয়েছিলেন কাশী ছেড়ে মন্দার পর্বতে গিয়ে আশ্রয় নিতে। পরে মহাদেবেরই আদেশে বিষ্ণু কাশীতে এলেন তাঁর কাশীতে ফেরার ব্যবস্থা করতে। এসেই প্রথমে গেলেন আদি কেশব ঘাটে। সেখানে স্নান সেরে যখন উঠলেন, দেখলেন নদীর তীরে এক অতি কৃশকায় ঋষি বিষ্ণুরই ধ্যানে মগ্ন। নিজের আরাধ্য দেবতা বিষ্ণু তথা মাধবকে সম্মুখে দেখে আপ্লুত ও আভূমিনত হয়ে তাঁর স্তব শুরু করলেন অগ্নিবিন্দু নামের ওই ঋষি। তপস্যায় খুশি হয়ে মাধব বর দিতে চাইলেন। অগ্নিবিন্দু বললেন,
‘আপনি যদি সত্যিই তুষ্ট হয়ে থাকেন তো পঞ্চগঙ্গায় আপনি থেকে গিয়ে ভক্তদের কৃপা করুন।’
‘তথাস্তু! আরও বর চাও।’
‘আমি চাই যে পঞ্চগঙ্গা ঘাটে আপনি আমার নামে অবস্থান করুন।’
ঋষি অগ্নিবিন্দুর প্রার্থনা মেনে শ্রীমাধব তখন থেকেই পঞ্চগঙ্গা ঘাটে ঋষি অগ্নিবিন্দুর নামে ‘বিন্দুমাধব’ হিসেবে পরিচিত হলেন।
না, ইতিহাস নয়, এ হল কাশীতে বিন্দুমাধবের অধিষ্ঠানের পৌরাণিক আখ্যান। আনুমানিক অষ্টম শতাব্দীতে রচিত স্কন্দপুরাণের একটি অংশ হল ‘কাশীখণ্ড’। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী বা তারও পূর্বে কাশীখণ্ড লেখা হয়। এতে একটি আলাদা অধ্যায়ে বিন্দুমাধবের আবির্ভাবের এই আখ্যান শোনানো হয়েছে দেবসেনা কার্তিকের মুখে। কাশীখণ্ডের মত প্রাচীন সাহিত্য থেকে বিন্দুমাধবের অস্তিত্ব যে কতটা প্রাচীন তার একটা ধারণা পাওয়া যায়।
কাশীর ইতিহাসে বিন্দুমাধব মন্দিরের প্রথম উল্লেখ পাই সপ্তদশ শতকে। মন্দিরটি ঠিক কার তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয় তা নিয়ে মতান্তর আছে — বেশিরভাগ ঐতিহাসিকদের মতে অম্বরের রাজা মান সিংহ বেণীমাধব মন্দিরটি নির্মাণ করলেন। আবার কেউ কেউ রাজা জয় সিংহকে এর কৃতিত্ব দেন। তবে যেই নির্মাণ করিয়ে থাকুক না কেন, একটা বিষয়ে সকলেই একমত — এই মন্দিরটি সৌন্দর্য ও স্থাপত্যকলায় তৎকালীন সময় শীর্ষস্থানীয় ছিল। তেভার্নিয়ের যথাযথই এর তুলনা পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সাথে করেছিলেন। এই মন্দির যখন তার আয়ুষ্কালের শ্রেষ্ঠ সময়ের মধ্যে দিয়ে চলছিল, ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ গোস্বামী তুলসীদাস তাঁর প্রভুর শরণ নিয়েছিলেন। পঞ্চগঙ্গা ঘাটের কোণে কোণে আজও তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে। এখানে বসে তুলসীদাস তাঁর ‘বিনয়পত্রিকা’য় বিন্দুমাধবের স্তুতি গাইতে গিয়ে বলে উঠলেন,
“বসত বিবুধাপগা নিকট তট সদানওর, নয়ন নিরখঁতি নর তেহতি ধন্যা।”
বাংলায় এর তর্জমা করলে কতকটা এরকম দাঁড়ায় —
‘সুরধুনী-তীরে রাজো ভব্য সে মন্দিরে।
ধন্য সেই জন যেবা দরশন করে ॥’
কিন্তু ইতিহাস বড়োই নিষ্ঠুর। সপ্তদশ শতাব্দীর ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক রাজনীতির নাগপাশে আক্রান্ত হল এই ভব্য মন্দির। ঐতিহাসিকদের অধিকাংশ মনে করেন, তৎকালীন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হল বেনারসের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থ বিন্দুমাধব মন্দিরকে। একই স্থানে সেই মন্দিরের মালমশলা দিয়েই দাঁড় করানো হল বেনারসের প্রেক্ষাপটের আরও একটি বিতর্কিত স্থাপত্যের নিদর্শনকে — ধরহরা মসজিদ। বেণীমাধব, পঞ্চগঙ্গা, বা আওরঙ্গজেব, আলমগীর — ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত বিশাল মসজিদটি অবস্থান করছে একেবারে গঙ্গার কিনারে, কাশীর অন্যতম উচ্চ ভূমিতে।

১৬৬৬ সালে আওরঙ্গজেব শিবাজীকে আগ্রায় ডেকে এনে অপমান এবং এক রকম বন্দী বানিয়ে ফেলেন। কিন্তু সুকৌশলে শিবাজী বাদশাহের কবল থেকে পালিয়ে যান। শোনা যায়, এই সময়ে বেশ কিছুকাল বেনারসে এসে পঞ্চগঙ্গা ঘাটের কাছে তিনি ছদ্মবেশে ছিলেন। ঘটনাক্রমে আওরঙ্গজেব সে কথা জানতে পারেন এবং এরই কয়েক বছরের মধ্যে ১৬৬৯ সালে বেণীমাধবের মন্দিরটি ধ্বংস করে ফেলা হয়। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, অন্যান্য নানা কারণ ছাড়াও শিবাজীকে আশ্রয় দেওয়ার পুঞ্জীভূত রাগ আছড়ে পড়ে বেণীমাধবের মন্দিরের উপর।
একটা সময় অবধি এই মসজিদের দু’টি সুউচ্চ মিনার এর পরিচয়চিহ্ন ছিল — যেন দুই হাত আকাশে তুলে ইবাদতে মশগুল। বহু দূর থেকে গঙ্গার ধারে এই মিনার দু’টি চোখে পড়ত। সেই মিনারে উৎসাহীরা চড়তেও পারত। মিনার থেকে সমস্ত কাশীর দৃশ্য বহু পর্যটককে মুগ্ধ করেছে। শেরিং এই মসজিদ ও মিনারের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখছেন,

‘মসজিদটির নিজস্ব চেহারায় তেমন কোনো চোখ ধাঁধানো বৈশিষ্ট্য নেই, এমনকি একে সুন্দর আখ্যা দেওয়াও বেশ কঠিন। এটি অত্যন্ত সাদামাটা এবং সাধারণ মানের; উপরের দিকে সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়ানো মিনার দুটি যদি না থাকত, তবে বেনারসের বুকে একে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো কোনো বস্তু বলে গণ্যই করা হতো না। অথচ, মিনার দুটির নিজস্ব এক লাবণ্য রয়েছে — এর বর্ণনা ভাষায় ফুটিয়ে তোলা একেবারেই অসম্ভব; আমার তোলা ছবিও সেই বাস্তব রূপের নিখুঁত ও চমৎকার চেহারাকে হুবহু প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মিনারগুলির সঠিক উচ্চতা এই মুহূর্তে আমার স্মরণে নেই, তবে মসজিদের মেঝে থেকে পরিমাপ করলে তা কোনোভাবেই একশো পঞ্চাশ ফুটের কম হবে না।’
বেনারসে থাকার সময় এই পঞ্চগঙ্গা ঘাটের অতীতে একবার ঘুরে আসতে মন চাইল। আবারও একাই বেরিয়ে পড়লাম। গুগল ম্যাপে খুঁজলে বিন্দুমাধব মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু অতীতের সে মন্দির বর্তমানে কোথা থেকে এল? সেখানে তো ধরহরা মসজিদ দাঁড়িয়ে থাকার কথা। একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে জানতে পারলাম, বিন্দুমাধব মন্দিরের আদিস্থানে অর্থাৎ যেখানে বর্তমানে আওরঙ্গজেবের মসজিদ রয়েছে, তার ঠিক পাশেই একটি সাধারণ দেখতে বাড়ির ভিতরে বিন্দুমাধব অধিষ্ঠিত। একটি সূত্র বলছে যে বর্তমানের এই বেণীমাধব মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে সাতারার (মহারাষ্ট্র) আওধের রাজা ভাবন রাও নির্মাণ করান।
যাই হোক, সেদিন আমি ঘাট থেকে মসজিদের সামনে দিয়ে উঠে এলাম উপরে। সামনে একটা অশ্বত্থ গাছের সাথে সাইনবোর্ডে মন্দিরের দিকনির্দেশ করা রয়েছে। সেদিকে এগিয়ে গিয়ে কোনো বড়সড় মন্দিরের তোরণদ্বার, কিংবা নিদানপক্ষে ছোট কুলুঙ্গি বা গাছতলার মন্দিরের মতো সাধারণ কোনো কাঠামোও চোখে পড়ল না। ভুল জায়গায় চলে এলাম কি? ফলকের নির্দেশ মানলে একটা বাড়িতে ঢুকে যেতে হয়, কিন্তু যদি বিভ্রান্ত হয়ে খোলা দরজা পেয়ে কোনো পরিবারের একেবারে উঠোনে কিংবা কোনো দপ্তরখানায় গিয়ে পড়ি তো ভীষণ লজ্জার ব্যাপার হয়। সামনে একটি দরজা আছে দেখলাম, ঢুকতেই সেখানে কয়েক ধাপ সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। দরজার একদিকে হনুমান, অন্যদিকে গরুড়ের মূর্তি দেখলাম। মনে হচ্ছে এইটিই। তবুও নিঃসন্দেহ হতে পথ খুঁজে পাওয়ার অতি প্রাচীন পন্থা অনুসরণ করলাম — সামনেই চাতালে বসে থাকা দু’জন প্রাচীনাকে জিজ্ঞেস করলাম। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা একটুও না থামিয়ে সেই হনুমান ও গরুড় আঁকা দরজার দিকে ইশারা করলেন। অতএব নির্দ্বিধায় এবার সিঁড়ির সামনে অন্যান্য সবার মতোই জুতো খুলে উপরে উঠে গেলাম। সেখানে সিঁড়ির বাঁ দিকে এক লম্বা হলঘর। সুদৃশ্য সেই ঘরের দেয়ালে কৃষ্ণলীলার নানা রকমের ছবি, মন্দিরের পরিচালন সমিতির সেবকবৃন্দ ও তাঁদের কাজের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি ফ্রেমে বাঁধানো রয়েছে। রয়েছে কিছু আয়নাও। হলঘর পেরিয়ে এক প্রান্তে গর্ভমন্দিরে খুঁজে পেলাম কালো পাথরের বেণীমাধবকে — স্মিতহাস্যে বড় বড় চোখ মেলে চেয়ে রয়েছেন। দু’ ফুট মতো উঁচু বিগ্রহটি নানা বস্ত্রালঙ্কারে শোভিত। কথিত আছে, এই বিগ্রহটি অত্যন্ত প্রাচীন, আদি বিন্দুমাধব মন্দিরের সময়ের। যখন মন্দির ধ্বংস করা হচ্ছে তখন নাকি তড়িঘড়ি বিগ্রহটি সরিয়ে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে রাখা হয়। অনেক পরে যখন বর্তমান বাড়িটি তৈরি হয় তখন বিগ্রহটি গঙ্গা থেকে তুলে আবার প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে তেভার্নিয়ের বর্ণনা যদি সত্যি ধরে নেই, বর্তমান বিগ্রহের উচ্চতার সঙ্গে আদি বিগ্রহের উচ্চতার তফাৎ আমার মনে প্রশ্ন রেখে যায়।
বিন্দুমাধব মন্দির থেকে বেরিয়ে সামনে আওরঙ্গজেবের মসজিদ। কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা তোরণদ্বার পেরিয়ে বিশাল মসজিদের উঠোনে এসে পড়লাম। এক পাশে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের স্মারকচিহ্ন — তারাই এখন এই মসজিদের দেখভালের দায়িত্বে। উঠোনের মাঝখানে একটি ছোট জলাশয় ও ফোয়ারা। মসজিদের ভেতরে ঢুকলে নামাজ পড়ার জায়গা দেখা যায়। উপরের দিকে তাকালে চোখে পড়ে বেশ পুরোনো কিছু ঝারবাতি; গম্বুজের অভ্যন্তর ও তাতে করা বিচিত্র মুঘল আমলের নকশা। মসজিদটির নানা অংশে এখন বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে — অন্ধকারে আলোর মালায় সেজে উঠলে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। অনুমতিসাপেক্ষে মসজিদের ছাদে উঠলে দেখা যায় সামনে গঙ্গার অপূর্ব দৃশ্য, দূরের মালবীয় রেল সেতু। ছাদে উঠলে বা দূর থেকে মসজিদের দিকে তাকালে দু’টি ছোট মিনার এখনও চোখে পড়ে। তবে আগের সুউচ্চ মিনারদ্বয় আর নেই। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে একটি মিনার ভেঙে পড়ে। তাতে চাপা পড়ে বহু মানুষ হতাহত হয়। এরপর সকলের নিরাপত্তার কথা ভেবেই সরকারী উদ্যোগে দ্বিতীয় মিনারটিও ভেঙে ফেলা হয়।
এই মিনার দু’টির প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে জেমস প্রিন্সেপ কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একটি আশ্চর্য ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি না।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
