রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ৩৫। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

এতক্ষণে নিশ্চই বুঝতে পারছ, এদেশে চাষবাস সংক্রান্ত কাজকর্ম সেই আদিম পুঁথির যুগের সরলতাতেই পড়ে রয়েছে। এখনও ষাঁড়-বলদেই এখানকার ক্ষেত জোতে। এখানে দেখা যাচ্ছে দুজন মহিলা ঢেঁকিতে করে ধান থেকে চাল বের করার কাজ করছেন। অন্যত্র হলে তাদের এই কাজ কারখানায় করতে দেখা যেত। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই যে ছবিটা আমরা দেখতে পাচ্ছি, একে অনায়াসে তিন হাজার বছরের পুরোনো কোনও ইহুদী পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ছবি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। ঢেঁকি হল সোজা কথায় একটা লম্বা কাঠের গুড়ির মত জিনিস। এর শেষের দিকে একটা ভরকেন্দ্রের ওপর ভর দিয়ে এই যন্ত্রটা কাজ করে। একজন বা দুজন মহিলা এর ভারী দিকটায় পা দিয়ে চাপ দেয় যাতে অপর দিকটা ওই ভরকেন্দ্রে ভর দিয়ে উঠে আসে। যে দিকটা উঠে আসে তার মাথায় একটা ছোট কাঠে খাঁটের মত কাঠ উলম্বভাবে লাগানো থাকে। এই উলম্ব কাঠের নীচে থাকে একটা গর্ত যার মধ্যে শষ্যদানা রাখা হয় এবং ঐ ছোট কাঠের দন্ডটা দিয়ে পেটানো হয়। গোটা ইঁট ভেঙে সুড়কি বানাতেও এই একই যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। সুড়কি হল নুড়ি পাথরের দেশীয় বিকল্প। হামানদিস্তা না পাওয়া গেলে নুড়ি বা বালি বানানোর জন্য এই ঢেঁকিই ব্যবহার করা হয়।

ঢেঁকি বা ধান ছাঁটার যন্ত্র

 

ভারতের চাষাবাদের প্রক্রিয়া, বিশেষ করে জমিতে লাঙল দেওয়ার পদ্ধতি ইউরোপের চাষাবাদের সংস্পর্শে আসা সত্ত্বেও খুব নামান্যই উন্নতি করতে পেরেছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে কোনোই উন্নতি করতে পারেনি। আমার ধারণা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যা অবস্থা ছিল, আজও সেই অবস্থাই রয়ে গেছে। ইউরোপীয় দক্ষতার এককণাও এরা কাজে লাগাতে পারে নি। যেন মনে হয় ভারতীয় কৃষিব্যবস্থার সাথে এদের কোনও পরিচয়ই হয়নি। সেই কোনকালে ওয়ারেন হেস্টিংস সুখসাগরে কফি চাষ নিয়ে কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন, এদেশের কৃষিব্যবস্থা আজই সেই প্রাচীন যুগেই আটকে আছে। বা হয়ত তারও আগের কোনও যুগে। স্কেচে দেখো, এই যে বাঙালী হাল, এর থেকে সরল আর দেহাতি চাষের যন্ত্রের কথা আর কল্পনা করা যায় না। একটা ইংরেজী হালের যে সৌন্দর্য্য, তার জটিল অংশ, খুব হিসেব করে অঙ্ক কষে বানানো এর কোনগুলো আর উপরিতল, এর প্রতিরোধের কেন্দ্র কর্মকেন্দ্র— সব এককথায় এককভাবে নস্যাৎ করে দেয় এই বাংলার লাঙল। এককথায় বলতে গেলে এই লাঙলে কিছুই নেই। একটা চৌকো ছুঁচোলো কাঠের ফাল, তার ওপরে লোহার পাত লাগানো, এর সাথে একটা পঁয়ত্রিশ ডিগ্রিতে লাগানো কাঠের ডান্ডা আর তার শেষে একটা ছোট হাতল, ব্যাস। এই হাতলটা চেপে ধরে চাষী লাঙলটাকে মাটির গভীরে ঠেসে ধরে। এই মোটা কাঠের অংশ, যেখানে লাঙলের ফলা আর লোহার পাত এসে মিশেছে সেখান থেকে একটা সোজা কাঠের গুড়ির মত অংশ বেরিয়ে গেছে। এই কাঠের শেষপ্রান্তে একটা জবরজং মতন জোয়াল লাগানো। জমিতে ব্যবহার করার সময় এই দুটো জিনিসকে লাঙলের ফলার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। বলাই বাহুল্য এই লাঙল টানতে বলদ ব্যবহার করা হয়। দুই বলদে লাঙল টানে আর তার মাঝখানে থেকে চাষী কখনও এক হাত দিয়ে লাঙলের ফলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করে, কখনও লেজ মুচড়ে তার পশুগুলোকে সঠিক পথে চালনা করে। এখানে এই লাঙলের ফলাটা বড়জোর তিন ইঞ্চি চওড়া হয়। ফলে মাটির ঢেলাগুলোর সামান্যই ক্ষতি করতে পারে। আর সত্যি বলতে কি এই যন্ত্রটা যে নিজে নিজে মাটির ভেতর নিজের রাস্তা করে নেবে বা নিজেই একটা পথে টিকে থাকবে, তার জন্য কোনও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এখনও আবিস্কার হয়নি। সুতরাং বলা যায় জমি চাষ করার শ্রমটা বলদ ও চাষী, দুজনের মধ্যে ভাগ হয়। উভয়কেই তাদের শরীরের ওজন আর শক্তি প্রয়োগ করতে হয় যাতে লাঙলটা মাটির মধ্যে গেঁথে থাকে। তবুও মাঝে মাঝেই দেখা যায় কিছু অবাধ্য মাটির ঢেলা গুঁড়ো হতে চায় না। তারা কেবলই পিছলে পিছলে যায়। ঠিক যেমন কিছু কুঁড়ে লোক পরিশ্রমকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, ভাবে সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার থেকে তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াই ভালো। আর হলকর্ষণরেখার কথা যদি ধরা যায়, সেগুলোও স্বাভাবিকভাবেই তিন চার ইঞ্চির বেশী গভীর হয় না। সোজা কথায়, এতে করে পৃথিবীর উপরিভাগে আঁচড়ানোই হয় শুধু। অথচ এই আদীম আর আপাতভাবে অপর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি দিয়ের সমগ্র ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত জমি চাষ হয়ে থাকে। আর ঈশ্বরের অপার করুণা এই দেশের ওপর, তাই এখানকার জমি এত উর্বর। এই সামান্য প্রচেষ্টাতেই সবরকমের ফসল এত প্রচুর পরিমানে জন্মায় যে এখানকার অশিক্ষিত বাসিন্দাদের জন্য যথেষ্ট হয়েও বাড়তি থেকে যায়।

বাংলার হাল

হলকর্ষণ

 

চাষির কাছ থেকেও এদেশের জমি খুব বেশি সাহায্য পায় না। আর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চাষ হলে তো একেবারেই না। কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ ফসল, যেমন তামাক চাষের ক্ষেত্রে আগে থেকে জমিকে যত্ন নিয়ে প্রস্তুত করা হয়। আর কখনও কখনও কারখানার লাগোয়া কোনও ছোট জমিতে নীল চাষ হলে সেই জমির এরকম যত্ন নেওয়া হয়। চাষ করে করে কোনো জমি যদি উর্বরতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে সেই জমিকে স্রেফ ফেলে রাখা হয়। সেখানে গবাদিপশু চরে। কিছুদিন পরে সেখানে বড় বড় ঘাস জন্মায়। তারপর আবার ঘাসটাস কেটে সেই জমিকে সাধারণ ফসল বোনার জন্য তৈরি করা হয়। কখনও এইসব জমি চাষের অভাবেও পড়ে থাকে। এই সব জমির মাঝে মাঝে বাজে মাটির বড় বড় ছোপ বা এলাকা পাওয়া যায়। স্বাভাবিক ভাবেই সেই সব জমিতে সেইসব ফসল হয় যেগুলো জন্মাতে বা বড় হতে সবচেয়ে কম যত্ন বা পুষ্টি লাগে, যেমন তিল বা অরহড় ডাল, এইসব সবুজ শষ্য।

চাষ হয়ে গেছে, জমি এবার পরের কার্যাবলীর জন্য প্রস্তুত। আর এই পর্যন্ত পড়ে যদি তোমাদের মনে হয় এদেশে জমিতে লাঙল দেওয়াটা একটা আনাড়ি ব্যাপার, তাহলে এদেশের জমিতে মই দেবার পদ্ধতিকে কী বলবে? একটা পুরোনো বাঁশের মই, তিন থেকে চারটে বলদে বুকে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর জনা দুই চাষি তার ওপর চেপে দাঁড়িয়ে আছে। টাল সামলাচ্ছে আর ল্যাজ মুচড়ে পশুগুলোর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছে। এর থেকে সরল আর কি হতে পারে? আর যখন সন্ধ্যেবেলা, ‘যখন চাষী ক্লান্তপায়ে বাড়ি ফিরে আসে’ (৩) সে সেই লাঙল আর মই কাঁধে করে ফেরে, মনে হয় যেন সে কাঁধে করে কুড়ুল আর কোদাল নিয়ে ফিরছে।

ক্ষেতে মই দেওয়া

 

যে সমস্ত বলদ হাল চাষ করে সেগুলো সাধারণত গ্রামের বা আশেপাশের চাষ না পড়া জমিতে গজিয়ে ওঠা ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু একটা অভিযোগ চলতেই থাকে যে গবাদি পশু নীলের ক্ষেতে ঢুকে পড়েছে আর নীলগাছের মূল্যবান পাতা খেয়ে সাফ করে দিয়েছে। পশুর মালিকের ওপর জরিমানাও হামেশাই করা হয়। বলদকে এক বাজার থেকে আর এক বাজারে মাল পরিবহনের জন্যও ব্যবহার করা হয়। সেসময় এদেরকে মূলতঃ খোল অথবা কুচোন খড় খাওয়ানো হয়। এগুলো খেতে এরা খুবই ভালোবাসে। এছাড়াও পথে যেতে যেতে যত রকমের ঘাস পায়, ছিঁড়ে খেতে খেতে যেতে থাকে। শহরে থাকাকালীন আমার বারবার মনে হত বলদের বেশি খাটানো ভয়ানক পাপ ও লজ্জা , এখানে এসে আমার মনে হয়েছিল সব দেখেশুনে আমি বুঝি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলব। কিন্তু আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি ওই দগদগে ঘা ওয়ালা লেজের নিষ্ঠুরতা, পিঠের ওপর দলা দলা টিউমারের মত মাংসপিন্ড— এসব শহরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আমি অন্ততঃ এখানকার পশুদের মধ্যে কোনও বিকৃতি দেখিনি যেটা দেখে এদের দিকে তাকিয়ে দুটো কথা ভাবার আনন্দটা বিঘ্নিত হতে পারে। (৪)

একদল যমুনাপারী ছাগল

 

টীকা

৩। মূল লাইন, “The ploughman homeward plods his weary way—”. থমাস গ্রে-র (১৭১৬-১৭৭১) বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা এলেজি রিটেন ইন আ কান্ট্রি চার্চইইয়ার্ড-এর (১৭৫১) প্রথম স্তবকের তৃতীয় লাইন। এলেজি বা বিষাদগাথার একটি উজ্জল উদাহরণ এই কবিতা যেখানে কোনও বিশেষ মানুষ নয়, বিশেষ সময়ের চলে যাওয়াতে শোক প্রকাশ করা হচ্ছে।

৪। গ্রান্ট সাহেবের পশুপ্রেমের কথা সর্বজনবিদিত। কলকাতায় সর্বপ্রথম পশুক্লেশনিবারণী সংস্থা Calcutta Society for the Prevention of Cruelty to animals (CSPCA) ১৮৬১ সালে তাঁর উদ্যোগেই স্থাপিত হয়। এই সংস্থা এখনও রয়েছে।

Author

Leave a Reply