রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ৩৪। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

যে সমস্ত কারখানা নীচু জমিতে অবস্থিত, বা যে সব জায়গায় প্ল্যান্টাররা নীচু জমি অধিকার করে আছে সেখানে প্রথম ফসল বোনা হয় অক্টোবর মাসে। সুতরাং বুঝতেই পারছো, মূলনাথের কিছু কিছু জায়গাতে সে কাজ ইতিমধ্যেই সারা হয়ে গেছে। এই ফসল বোনার কাজটা সাধারণত সেইসব জমিতেই সীমাবদ্ধ থাকে যেখানে একপ্রস্থ বন্যা হয়ে গেছে এবং জল সরে গিয়ে জমিতে এখন এমন পরিমান আর্দ্রতা রয়েছে যে গাছপালা জন্মাতে পারে। এই ধরণের জমিতেই ছিটানি বপন হয়ে থাকে। এখন দ্বিতীয় ধরনের চাষের ক্ষেত্রে জমির প্রকৃতি দেখে যেমন বোঝা যাচ্ছে যে সঙ্গে সঙ্গে চাষ না করলে জমি শুকিয়ে যাবে, প্রথম ধরণের চাষের ক্ষেত্রেও সেরকমই কিছু বাধ্যবাধকতা থেকে যায়। অতএব, যেমন আমি ইতিমধ্যেই বলেছি, বসন্তকালীন বপনের কাজ এপ্রিলের মধ্যেই সারা হয়ে যায় আর বৃষ্টি এবং বন্যা আসে মোটামুটি জুন জুলাই মাসে। সুতরাং নীচু জমিতে এপ্রিল মাসে যে সব বীজ বপন করা হয়েছে, জুলাই মাসে বন্যা আসার আগে সেগুলো কাটার মত পরিপক্ক হবে না। স্বাভাবিকভাবেই ততদিনে বন্যা এসে ঢুকে পড়বে আর সব ফসল ধ্বংস করে দেবে।এই সমস্ত জমিতে অক্টোবর মাসে বীজ বুনে লাভ আছে। যদিও অক্টোবরের পরেই যে শীতকাল আসে তাতে গাছ সেরকম বাড়ে না, কিন্তু সি সময়টাকে গাছ বাড়ার প্রস্তুতির সময় হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি। অন্ততঃ এই সময়টা জুড়ে গাছগুলো জমির ভেতরে শেকড় ছড়িয়ে দিতে পারে এবং ফসল ফলানোর জন্য তৈরি হয়ে যেতে পারে। যাতে করে নীল উৎপাদন শুরু হওয়ার আগে আগে ফসল নিয়ে তৈরি থাকতে পারে। বসন্তে বোনা ফসল তৈরি হওয়ার পাক্কা ছয় সপ্তাহ আগে এই ফসল তৈরি হয়ে যায়। এর ফলে বাংলার বিপুল পরিমান জমির মূল্য অত্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে, অন্যথায় এইসব জমি কবে জুলাই মাসে নদী ফুলে উঠে বন্যা ঘটাবে এই বিপদ মাথায় করে পড়ে থাকত আর লোকের কাজেও আসত না। উঁচু জমিতে যেখানে জমি খারাপ, জমির শুস্কতার কারনে বসন্তকালে বোনা ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, এবং বৃষ্টি আসতে দেরি হয়, সেখানে ফসল চাষের ক্ষেত্রেও অনেকসময় একই উপায় নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে বীজ বোনা হয়, আগে আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে ফলে গাছগুলোর শিকড়বিস্তারেও অসুবিধে হয় না, এবং ভয়ানক গরম সহ্য করার মত যথেষ্ট শক্তপোক্তও হয়ে যায়।

মূলনাথে কিন্তু মাঠে লাঙলের কাজ শুরু হয়ে গেছে। শুধুমাত্র নীলচাষের প্রস্তুতি নয়, ধান রোয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। আমরা জানি, নীলের চাষ আর ধানের চাষ একই সাথে চলতে থাকে। আলাদা ভাবে দেখতে গেলে ধানের বহু রকমের, না শয়ে শয়ে প্রকারভেদ রয়েছে। এত বেশী যে সবগুলোর নাম নেওয়াও সম্ভব নয়। তবে এর মধ্যে মূলতঃ দুই ধরণের ধান যেগুলো বছরের আলাদা আলাদা সময়ে বপন করা হয়। প্রথম ধরনের নাম আউশ ধান। এই ধান এপ্রিল মাসে বপন করা হয়, অগাস্ট মাসে কেটে নেওয়া হয়। অপরটির নাম আমন ধান না কেউ কেউ একে জলের ধানও বলে। এই ধান মে জুন মাসে পোঁতা হয়, নভেম্বরে কাটা হয়। প্রথম চালটা একটু মোটা ধরণের হয়। আমন ধান চাষ করার জন্য মাটি পর্যাপ্ত পরিমানে ভিজে থাকতে হয় আর এই ধানের চাল সবচেয়ে ভালো। মাঝে মাঝে দেখা যায়, কোনও নীচু জমি, যেখানে হঠাৎ করে বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেখানে এই দুই ধরণের ধান একসাথে চাষ করা হয়েছে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে দেখা যায় যে নালা দিয়ে এইসব জমিতে জল যায়, সেগুলোর মুখ বন্ধ রাখা হয়, যতক্ষণ না আউশ ধান পেকে ওঠে। আমন ধান যতদিনে বীজ থেকে চারা হয়ে মুখ বাড়িয়েছে কি বাড়ায়নি, আউশ ধান ততদিনে পেকে কেটে নেওয়া হয়ে গেছে।

ধানগাছ

 

আমন ধানের ব্যাপারে একটা খুব অদ্ভুত আর মজাদার ব্যাপার হল, যদি এই ধানের মাঠে বন্যা হয়ে জল জমে যায় তাহলে বন্যার জল যত বাড়ে এই ধানের গাছও তার সাথে পাল্লা দিয়ে ততটাই বড় হয়ে একেবারে অসীম পর্যন্ত বাড়তে থাকে, যতদিন না বন্যার জল বাড়া বন্ধ হয়ে কমতে না থাকে। একে ঈশ্বরের হাত ছাড়া কী বলা যায়! বন্যার জল যত এর ওপর দিয়ে বইতে থাকে তত এই গাছ নিজের মাথাটাকে জলের ওপর রাখার জন্য বাড়তে থাকে। আবার যখন জমিতে বন্যা নেই, এই গাছ তার নিজের গতিতে বাড়ছে, স্বাভাবিক উচ্চতার, মোটামুটি তিন ফিটের মত বড় হচ্ছে। মিঃ এফ— আমাকে বলেছেন যে ভারী বন্যার সময় তিনি নিজে এই গাছকে সাত থেকে আট ফিট পর্যন্ত লম্বা হতে দেখেছেন; আবার বাখরগঞ্জ জেলায় শোনা যায় নাকি এই গাছ কুড়ি ফিট লম্বা হয়ে গিয়েছিল! কিন্তু এরও পরে, আমার আর এক বন্ধু আছেন, লোকনাথপুরের মিঃ এম—, তিনি একদম হলফ করে বলেন, তিনি এই গাছকে পঁয়ত্রিশ ফিট পর্যন্ত লম্বা হতে দেখেছেন! আচ্ছা, এখানে যখন আমি বলছি ‘লম্বা’ তার মানে কিন্তু এই নয় যে ওই সব জমিতে অত উঁচু জল জমে থাকে। যখনই বহমান জল বা অশান্ত জল ধানগাছের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, ধানগাছের কান্ডটা নুয়ে পড়ে, এবং এই শুয়ে পড়া অবস্থায় মাথাটা জলের ওপর ভাসিয়ে রাখতে হয় বলে জলের উচ্চতা যতটা, তার থেকে অনেকটা বেশী বাড়তে হয় এই ধানগাছগুলোকে। সংক্ষেপে আমি বলতে যাই, যদি জলের স্রোত হঠাৎ করে না আসে বা খুব দ্রুত না হয় তাহলে এই অসাধারণ মূল্যবান ধানগাছের বাড়বৃদ্ধির ক্ষমতার কোনও সীমা নেই।

এই গুরুত্বপূর্ণ চালের শুধু যে দুই ধরনের ভ্যারাইটি আছে তাই নয়, দুই রকম ভাবে প্রস্তুত করা চালও  বাজারে চলে । প্রথম ধরনের চালকে আড়ওয়া চাল (আতপ চাল) বলে। এই ধরনের চাল ধানকে সরাসরি ঢেঁকিতে কুটে বা বলা যায় খোসা ছাড়িয়ে, তার স্বাভাবিক অবস্থায় রেখে বানানো হয়। মানে যেমন তোমরা ইংল্যান্ডে দেখে থাকো, সাদা ছোট ছোট দানা। এখানকার একজন স্থানীয় ডাক্তারের মতে এই ধরনের চাল সবচেয়ে পুষ্টিকর। আর এক ধরনের চালকে বলে ভুঁজোয়া চাল (উষ্ণ চাল বা সেদ্ধ চাল)। এই ধান থেকে চাল বের করার আগে তাকে অল্প সেদ্ধ করে নেওয়া হয়। এর ফলে এই ধানের ভেতরের চাল যে শুধু খানিকটা ফুলে যায় তাই নয় চালের ওপরে একটা কালো পরত পড়ে যায়। যখন ভাত ফোটে, এর থেকে একটা বাজে গন্ধ বেরোয় এবং এর কিছু পুষ্টিগুণও নষ্ট হয়ে যায়। সত্যি বলতে কি, এই ধানের চাল সবচেয়ে কম পুষ্টিকর। আমাদের সেই ডাক্তার এক ঘরোয়া আলোচনায় বলেছিলেন, কোনও একজন নেটিভ লোককে যদি উষ্ণ চালের ভাত খাওয়ানো হয়, আর তাকে আতপ চালের ভাত খাওয়ানো হয়, তাহলে প্রথম ক্ষেত্রে তার আগে ক্ষিধে পেয়ে যাবে। এই ধান আধসেদ্ধ করার আগে তাকে সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখা হয় এবং সকালবেলা সেই জলটা ঝেড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এর ফলে দেখা যায় ধানের ভেতরের চাল ফুলে গেছে আর বাইরের খোসা ফুটিফাটা হয়ে রয়েছে। এরপর এই ধানকে একটা মাটির পাত্রে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় আগুনের ওপর রেখে গরম করা হয়। এরকম করার উদ্দেশ্য হল যখন ধান ঢেঁকিতে কোটা হবে (অর্থাৎ ধানের খোসা থেকে চাল আলাদা করা হবে) তখন যাতে সহজে খোসাটা আলাদা হয়ে পড়ে আর শুকনো অবস্থায় ঢেঁকি চালালে যে চাল ভেঙে যায় বা গুঁড়ো হয়ে যায়, সেটাও যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই ধরণের চাল অনেক বেশী সস্তা হয়। এবং এদেশী গরীব লোকেরা একচেটিয়াভাবে এই চালই খায়। অন্যদিকে আড়ওয়া বা আতপ চাল মূলতঃ ইউরোপীয়রা ব্যবহার করে। আর তাই শহরের দিকে এই চালকে সাধারণভাবে ‘টেবিল রাইস’ বলে। এই চাল সেদ্ধ চালের দ্বিগুন দামে বিক্রি হয়। [1]

টীকা

[1] একজন স্থানীয় বুদ্ধিমান মানুষের কাছে এই বিষয়ের সাথে যুক্ত কিছু প্রশ্ন রাখতে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো বেরিয়ে এল। এখানে সেই তথ্যগুলোকে যথাযথভাবে পেশ করার লোভ সামলাতে না পেরে সেই ভদ্রলোক যেরকম বলেছিলেন, সেরকমই হুবহু তুলে দেওয়া হল, যাকে বলে শব্দ বাই শব্দ অক্ষর বাই অক্ষরঃ—

“ধান থেকে চাল বের করার আগে, তা সে আউশ বা আমন যে ধানই হোক না কেন, দুই রকমের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যায়। প্রথম ক্ষেত্রে ধানকে শুধুমাত্র গরম করা হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এর সাথে ধানকে সেদ্ধও করা হয়। প্রথম ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে ধান তৈরি করা হয় তাকে আড়ওয়া চাল বলে। এই চাল দেখতে অনেক সাদা আর পরিস্কার। অন্যদিকে দ্বিতীয় ধরণের চালকে বলা হয় ভুঁজোয়া চাল। এর রঙ তুলনামূলকভাবে কালো। যদি সমপরিমান ধান থেকে একই পদ্ধতিতে একবার আড়ওয়া আর একবার ভুঁজোয়া চাল তৈরি করা যায় তাহলে আড়ওয়া চালের ওজন ভুঁজোয়া চালের থেকে সবসময়ই কম হবে। কেননা সেদ্ধ করার সময় ধানের ভেতরের যে নোংরা, তা চালের সঙ্গেই লেগে থেকে যায়। ফলে এখানেই দুই ধরণের চালের দামের তফাত হয়ে যায়। ভুঁজোয়া চাল বানানোর উদ্দেশ্য হল যাতে ধান থেকে চাল তৈরি করার সময় চালটা ভেঙে না যায়, গোটা থাকে। এটা করতে গিয়ে চালের সার বাস্পীভূত হয়ে যেতে দেওয়া হয়। ফলে এই চাল হালকা এবং সহজপাচ্য হয়।

অন্যদিকে আড়ওয়া চাল তার স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। শুধু খানিকটা উষ্ণ হয়। এই চাল বাংলায় বেশী ব্যবহার হয় না। শুধুমাত্র যারা দিনে একবার খায়, তারাই এই চাল ব্যবহার করে। ভারতের যারা প্রাচীন নীতি নির্ধারক ছিলেন, তারা এদেশের হতভাগ্য বিধবাদের দিনে মাত্র একবার আহারের বিধান দিয়ে গেছেন। এবং তাদের জন্য এই আড়ওয়া বা আতপ চালের ভাত খাবার কথা বলে গেছেন। শুধু তাই নয়, প্রতি পক্ষের একাদশ দিনে (একাদশী) তাদের জন্য কঠোর উপবাসের নিয়ম রেখেন। এদিন তারা একবিন্দু জলও খেতে পারবে না। সবরকম ধান থেকেই আতপ আর সেদ্ধ দুই ধরণের চালই হয়। তবে আমন ধান থেকে যে আতপ চাল তৈরি হয়, শুদ্ধতার দিক থেকে তা অনেক ওপরে। এদেশের মানুষজনও এই চালকে অনেক ওপরের দিকে রাখে।”

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply