কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৩৯। শোভন সরকার
গত পর্বে: বিন্দুমাধবের খোঁজে এসেছি পঞ্চগঙ্গা ঘাটে। বিন্দুমাধব মন্দির আর তার ঠিক পাশেই আওরঙ্গজেবের মসজিদ।
কোনো একবার এক ফকির আশ্চর্য কেরামতি দেখিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। জেমস প্রিন্সেপ যখন বেনারসে ছিলেন তখন তিনি এই ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেন। ফকিরটি সেই সময়ের দেড়শো ফুট উঁচু মিনার থেকে নীচে ঝাঁপ দেয়। অত উঁচু থেকে ঝাঁপ দিলে কোনো মানুষের পক্ষেই আস্ত থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে তা হল না — যেন একেবারে হলিউড স্টাইলে সেই ফকির ছাদের টাইলস ভেঙে ঘরের ভেতরে সেঁধিয়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ল, সামান্য কিছু আঘাত ছাড়া তার আর কিছুই হল না। লোকজন ছুটে এসে ধরাধরি করে তার সেবা-শুশ্রুষায় লেগে পড়ল। কিন্তু অবাক হওয়ার তখনও বাকি ছিল। ফকিরটি সুস্থ হতেই দেখা গেল সে অন্তর্হিত হয়েছে, সঙ্গে উধাও হয়েছে ঘরের কিছু আসবাব ও সামগ্রী!
এই পঞ্চগঙ্গা ঘাট একদিকে যেমন এরূপ বিচিত্র সব ঘটনার সাক্ষী, তেমনি বিভিন্ন সময়ের অবিস্মরণীয় কিছু মহাপুরুষের স্পর্শধন্যও হয়েছে। শিবাজী মহারাজ ও তুলসীদাসের কথা আগেই বলেছি। জানা যায়, অদ্বৈত বেদান্তের প্রবর্তক শ্রী আদি শঙ্করাচার্য এবং পুষ্টিমার্গের বৈষ্ণব ধারা ও শুদ্ধাদ্বৈত দর্শনের প্রবর্তক বল্লভাচার্য-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও এই পঞ্চগঙ্গা ঘাটে তাঁদের জীবনের কিছু সময় অতিবাহিত করেন। আবার, ভক্তি আন্দোলনের আদিযুগের অন্যতম প্রধান, রামানন্দী সম্প্রদায় বা শ্রী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা রামানন্দের জীবনের বেশিরভাগ সময় বেনারসেই কেটেছে। তিনিও থাকতেন পঞ্চগঙ্গা ঘাটের কাছেই। নিজে ব্রাহ্মণ ছিলেন অথচ তাঁর শিষ্যদের মধ্যে বিভিন্নতা ছিল — অচ্ছুৎ, তাঁতি, নাপিত ছাড়াও সম্ভবত কিছু নারীও ছিলেন। কবীর, রাইদাস বা রবিদাস প্রমুখ তাঁর শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম। কবীরপন্থীদের বিশ্বাস, রামানন্দ বালক কবীরকে ‘নীচু জাতের’ বলে প্রথমে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে চাননি। কবীরও ছিলেন নাছোড়বান্দা। রামানন্দের যাতায়াতের উপর কড়া নজর রাখলেন ক’দিন। তিনি লক্ষ্য করলেন রামানন্দ প্রতিদিন ভোরে উঠে পঞ্চগঙ্গা ঘাটে স্নান করতে যান। এক মতলব এঁটে একদিন ভোরে কবীর ঘাটে গিয়ে এক ধাপের উপর শুয়ে রইলেন। ভোরের অন্ধকারে কবীরকে দেখতে না পেয়ে তাঁর উপর পা ফেলতেই রামানন্দ ‘রাম রাম’ বলে জিভ কাটলেন। কবীর চুপচাপ উঠে সেখান থেকে চলে গেলেন। এরপর তিনি সবাইকে বলে বেড়াতে লাগলেন যে তিনি রামানন্দের শিষ্য হয়েছেন।
এই ঘটনা শুনে রামানন্দ কবীরকে ডেকে পাঠিয়ে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন।
কবীর বললেন, ‘গুরুদেব, আপনি গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে আমায় দীক্ষা দিয়েছেন।’
‘আমি তোমাকে দীক্ষা দিয়েছি? কীভাবে?’
‘হ্যাঁ, গুরুদেব। গঙ্গার ঘাটে আপনি আমার কপালে পদস্পর্শ দিয়ে আশীর্বাদ করেছেন, ‘রাম রাম’ মন্ত্র প্রদান করেছেন। তাতেই আমি গুরুমন্ত্র লাভ করে আপনার শিষ্য হলাম।’
কবীরের যুক্তির কাছে রামানন্দ হেরে গেলেন। সেই থেকে তিনি কবীরকে তাঁর শিষ্য বলে মেনে নিলেন; তাঁর মঠে কবীরের প্রবেশাধিকার মিলল। রামানন্দের প্রাচীন মঠখানি এখনও বিদ্যমান। এই মঠের কাছেই রানি অহল্যাবাইয়ের হাজারা দীপস্তম্ভ রয়েছে — দেব দীপাবলির সঙ্গে এর সংযোগের কথা আগেও উল্লেখ করেছি।
পঞ্চগঙ্গা ঘাটের কাছে আরও একজন কিংবদন্তী যোগী সাধুর বাস ছিল — ত্রৈলঙ্গ স্বামী বা তৈলঙ্গ স্বামী। তেলঙ্গানা থেকে এসেছিলেন, তাই এই নাম। বেনারসে তিনি চলমান শিব নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে যোগ সাধনা, কঠোর তপস্যা ও তীর্থ ভ্রমণের পর আনুমানিক ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে যখন তাঁর বয়স ১৩০ বছর তখন বেনারসে এসে থিতু হন। হ্যাঁ, একশো তিরিশ। শুনে অবাক লাগলেও অঙ্কের হিসেব সেটাই বলছে। মান্য মতে তাঁর জন্ম ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে। বেনারসেই তাঁর মহাসমাধি হয় ১৮৮৭ সালে, অর্থাৎ, দুইশো আশি বছর বয়সে!

যাই হোক, বেনারসে এসে বিভিন্ন জায়গায় থাকার পর অবশেষে তিনি পঞ্চগঙ্গা ঘাটের কাছে থাকতে শুরু করেন। দিনের বেলায় তাঁর বেশিরভাগ সময়ই কাটত পঞ্চগঙ্গা ঘাটে সমাধিরত অবস্থায়। মাঝে মাঝেই দেখা যেত তিনি শিশুর মত এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বা গঙ্গায় সাঁতার কাটছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গঙ্গায় ভেসে রয়েছেন। অনেক সময়েই তিনি মৌনব্রত ধারণ করে থাকতেন। কারও কাছে ভিক্ষা চাইতেন না, তীর্থযাত্রীরা এসে সামান্য যা কিছু নিবেদন করত, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন। তাঁর আশীর্বাদে বহু রুগ্ন ব্যক্তির সুস্থ হয়ে ওঠা, এমনকি মৃত ব্যক্তির জীবিত হয়ে ওঠার কথাও শোনা যায়। তাঁর এরূপ অলৌকিক ক্ষমতার কথা দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। প্রতিদিন প্রচুর ভক্ত তাঁকে দেখতে পঞ্চগঙ্গা ঘাটে এসে ভিড় করত। তিনি সমাধিরত থাকা অবস্থাতে তারা জীবন্ত শিবজ্ঞানে তাঁর মাথায় জল ঢালত। তিনিও ‘অজগরবৃত্তি’ (নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকা) ধারণ করে থাকতেন।
১৮৬৮ সাল নাগাদ শ্রীরামকৃষ্ণ কাশীভ্রমণে এলে এই মহাত্মার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। কেদার ঘাট থেকে নৌকা করে মণিকর্ণিকা ঘাট হয়ে যখন ব্রহ্মা ঘাটে পৌঁছালেন, তিনি লক্ষ্য করলেন যে এক উলঙ্গ সাধু দুপুরের তপ্ত বালির উপর নির্বিকার হয়ে পড়ে রয়েছেন। তিনি ঘাটে নেমে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি সেইদিনের অনুভূতির কথা পরে তাঁর শিষ্যদের সাথে ভাগ করে নেন — ‘উচ্চ জ্ঞানের অবস্থা! শরীরের কোনো হুঁশই নেই; রোদে বালি এমনি তেতেছে যে পা দেয় কার সাধ্য — সেই বালির ওপরেই সুখে শুয়ে আছেন! পায়েস রেঁধে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দিয়েছিলুম। তখন কথা কন না—মৌনী। ইশারায় জিজ্ঞাসা করেছিলুম, ঈশ্বর এক না অনেক? তাতে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন —‘সমাধিস্থ হয়ে দেখ তো এক; নইলে যতক্ষণ আমি, তুমি, জীব, জগৎ ইত্যাদি নানা জ্ঞান রয়েছে, ততক্ষণ অনেক।’ তাঁকে দেখিয়ে হৃদুকে (শ্রীরামকৃষ্ণের ভাগ্নে) বলেছিলুম, ‘একেই ঠিক ঠিক পরমহংস অবস্থা বলে’।’
ঘাটের কাছেই রয়েছে ত্রৈলঙ্গস্বামীর মঠ। এখানেই একটি ঘরে তিনি মাঝে মাঝে এসে থাকতেন। বাড়িটির উঠোনে রয়েছে বিশাল ত্রৈলঙ্গেশ্বর শিবলিঙ্গ। শোনা যায়, ত্রৈলঙ্গস্বামী নিজে এই বৃহদাকার শিবলিঙ্গটি গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে গঙ্গাজলে নিমজ্জিত অবস্থায় পান। তিনি একাই তা তুলে নিয়ে এসে এখানে প্রতিষ্ঠিত করেন। মন্দিরে রয়েছে দক্ষিণাকালীর বিগ্রহ ও শক্তিযন্ত্র। এগুলিও তাঁর প্রতিষ্ঠা করা। এখানে তাঁর এক বিগ্রহ স্থাপন করা হয়েছে। এরই নীচে তাঁর সমাধি আছে বলে জানতে পারি।
পঞ্চগঙ্গা ঘাটের উপর ধরহরা মসজিদের পেছনের দিকে রয়েছে একটি বেশ পুরোনো কয়েক তলা উঁচু বাড়ি। বাড়িটিতে রাজস্থানী শৈলীর কিছু প্রভাব দেখা যায়। এটি হল কঙ্গন ওয়ালি হাভেলি। সতেরশো শতাব্দীতে রাজস্থানের কচ্ছোয়াহা বংশের মির্জা রাজা জয়সিংহ এটি নির্মাণ করান। বংশের রাজপুত্রদের শিক্ষাদীক্ষা দেওয়া হত এখানে — মুঘল রাজসভায় বিভিন্ন পদে যোগদানের জন্য উপযোগী করে তোলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র একরকম। তেভার্নিয়ের লেখায় এই শিক্ষাকেন্দ্রের বিবরণ রয়েছে। আওরঙ্গজেব হাভেলি সংলগ্ন বিন্দু মাধব মন্দিরটি ধ্বংস করলেও এই হাভেলির কোনো ক্ষতি করেননি।
এই হাভেলি তৈরি হওয়ার পেছনে একটি সুন্দর কাহিনি শুনলাম। রাজা জয়সিংহের স্ত্রী এই ঘাটে স্নান করতে গিয়ে তাঁর হাতের কঙ্কনটি জলে হারিয়ে ফেলেন। অনেক খুঁজেও সেটি না পেয়ে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ঘাটেই থাকা এক সাধুকে গিয়ে অনুরোধ করেন কঙ্কনটি খুঁজে দেওয়ার জন্য। সাধু নিজেই জলে ডুব দিয়ে সেই কঙ্কন উদ্ধার করে আনেন। তারপর শোনা যায়, সেই কঙ্কন তিনি বিক্রি করে তার অর্থে এই হাভেলিটি নির্মাণ করে দেন সাধু-সন্ন্যাসীদের বিশ্রামের জন্য। আর কঙ্কন-কাণ্ড থেকে এই হাভেলির প্রতিষ্ঠা বলে পরবর্তীতে এটি কঙ্গন ওয়ালি হাভেলি বলে পরিচিত হয়।
পঞ্চগঙ্গা ঘাটের ইতিহাসে আরও এক কিংবদন্তির নাম জড়িয়ে আছে — পণ্ডিতরাজা জগন্নাথ। সপ্তদশ শতাব্দীর এই কবি সম্রাট শাহজাহান এবং তাঁর পুত্র দারাশিকোর স্নেহধন্য ছিলেন। বলা হয় যে তিনি শাহজাহানের সভার এক মুসলিম কন্যার প্রেমে পড়েন। এই অপরাধে ব্রাহ্মণ সমাজ তাঁকে জাতিচ্যুত করে। অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে তিনি বেনারসে আসেন। কথিত আছে যে তাঁর বিখ্যাত গঙ্গাস্তুতি ‘গঙ্গালহরী’ এই পঞ্চগঙ্গা ঘাটে বসেই লেখা। ঘাটের বাহান্ন ধাপ উপরে বসে তিনি লেখা শুরু করেন — তিনি এক একটি শ্লোক লেখেন আর গঙ্গাও এক ধাপ করে উপরে উঠে আসে। এভাবে বাহান্নটি শ্লোক লেখা সম্পূর্ণ হতেই গঙ্গার জল এসে স্পর্শ করে জগন্নাথকে। এরপর তিনি সেই গঙ্গাতেই আত্মবিসর্জন দেন।
নবরাত্রির দ্বিতীয়াতে পূজিতা মা ব্রহ্মচারিণী দুর্গার মন্দির অদূরেই থাকার কারণে পঞ্চগঙ্গা ঘাটের উত্তরদিকের ঘাটটির নাম দুর্গা ঘাট। তারপর একে একে রয়েছে ব্রহ্মা ঘাট, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্মৃতিবিজড়িত বুন্দির মহারাজা সুর্জন সিং-এর নির্মিত বুন্দিপরকোটা ঘাট, শীতলা ঘাট (দ্বিতীয়), লাল ঘাট বা বিড়লা ঘাট, হনুমানগড়ী ঘাট, গায় ঘাট, বদ্রীনারায়ণ ঘাট (পূর্বে মেহতা ঘাট), ত্রিলোচন ঘাট, গোলা ঘাট, নন্দীশ্বর ঘাট, শুকা বা সক্কা ঘাট, তেলিয়ানালা ঘাট, নয়া (ফুটেশ্বর ঘাট), প্রহ্লাদ ঘাট, নিষাদ ঘাট, রানি ঘাট, সন্ত রবিদাস ঘাট (দ্বিতীয়), কাশীর প্রাচীনতম ঘাট রাজঘাট, নমো ঘাট (পূর্বের খিড়কী ঘাট), এবং সব শেষে আদি কেশব ঘাট।
কাশীর প্রাচীনতম রাজঘাটের কথা বিস্তারিত বলা প্রয়োজন। তবে তার আগে আদি কেশব ঘাটের কথা বলি। বেনারসের সমস্ত ঘাটের মধ্যে পাঁচটি ঘাট তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত মহত্বপূর্ণ। এই পাঁচটি ঘাটকে একসঙ্গে কাশীখণ্ডে ‘পঞ্চতীর্থ’ বলা হচ্ছে। অসি-গঙ্গা সঙ্গমের কাছে অসি ঘাট এই পাঁচটি ঘাটের মধ্যে সবার আগে উল্লেখ করা। তারপরেই রয়েছে দশাশ্বমেধ ঘাট, আদি কেশব ঘাটের পাদোদকতীর্থ, পঞ্চনদের সঙ্গমে পঞ্চগঙ্গা ঘাট। আর সব শেষে রয়েছে মণিকর্ণিকা। যখন কোনো তীর্থযাত্রী এই পঞ্চতীর্থ যাত্রায় যান তাঁরা এই ক্রমই অনুসরণ করেন। অর্থাৎ, তাঁরা অসি ও দশাশ্বমেধ ঘাটের পর সরাসরি এই ঘাটেই এসে উপস্থিত হন।
ঘাটের উপরে আদি কেশব মন্দির থাকায় এর এরূপ নাম। ঘাটের কাছে বরুণা নদী এসে গঙ্গায় মিশেছে। তাই একে অনেকে বরুণাসঙ্গম ঘাটও বলে থাকে। গহড়ওয়াল শাসকেরা এই ঘাটে স্নান ও দান-ধ্যান করতেন। মনে করা হয় তাঁরা বহু পূর্বে ঘাটটি পাকা করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বন্যার জলে তা নষ্ট হয়। পরে নানা সময়ে নাটোরের রানি ভবানী, গোয়ালিয়রের রাজবংশ এই ঘাট বাঁধিয়ে দিলেও তা বার বার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সরকারি উদ্যোগে ঘাটটির মেরামত করা হয়। পুরাণ অনুসারে, কাশীতে আগমনের পর বিষ্ণু তথা কেশব সর্বপ্রথম এই ঘাটেই পা রাখেন এবং নিজের পা গঙ্গাজলে ধুয়ে নেন। এই কারণে একে যথাক্রমে আদি কেশব ও পাদোদক তীর্থও বলা হয়। এই সকল কারণেই বৈষ্ণবদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র।
আমি আমার এই ঘাট যাত্রা অসি ঘাট থেকে শুরু করেছিলাম। অসি ঘাটকে কাশীর প্রথম ঘাট বলা হলেও আরও কিছু ঘাট এর দক্ষিণে রয়েছে, যথা — নাগোয়াঁ ঘাট, সন্ত রবিদাস পার্ক সংলগ্ন রবিদাস ঘাট (প্রথম), গায়ত্রী ঘাট, সামনে ঘাট প্রভৃতি। তুলনামূলকভাবে নতুন এই ঘাটগুলির বেশির ভাগ অংশে প্রচুর হোটেল ও রেস্তোরাঁর দেখা পাওয়া যায়।
বেনারসের সমস্ত ঘাটের দিকে একবার ফিরে তাকালে দেখি এই ঘাটগুলির সঙ্গে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা মুসলিম সমাজের সম্বন্ধ প্রায় নেই বললেই চলে। মূলত হিন্দু ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকেরা এই সমস্ত ঘাট নির্মাণ ও সংস্কার করেছেন। তাঁদের অনেকে এক সময় ঘাটে নির্মিত বড় বড় প্রাসাদে বসবাসও করেছেন। ব্যতিক্রম হিসেবে যে ক’টি ঘাটের নাম উঠে আসে তা হাতে গোনা যায় — জৈন মন্দির সংলগ্ন জৈন ঘাট, অন্যদিকে পঞ্চগঙ্গা ঘাটের মসজিদ ও মীর রুস্তম আলীর স্মৃতিবিজড়িত মীর ঘাট।
ঘাটে প্রাধান্য যারই থাকুক, বেনারসের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিতে গঙ্গা এবং গঙ্গার ঘাট এক অপরিহার্য অংশ, সে কথা বলাই বাহুল্য। প্রকৃতপক্ষে এই ঘাটগুলিই হল বেনারসের পরিচয়। বহু প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজ অবধি এই ঘাটগুলি অনেক ভাঙা-গড়ার মধ্যে দিয়ে গেলেও এর আদি সত্ত্বা কখনোই বদলায়নি।
ঘাটের আদি সত্ত্বার কথা বলতে গিয়ে খেয়াল হল গঙ্গার স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে টুকরো টুকরো গল্পের হাত ধরে কখন যেন চলে এসেছি ভারতবর্ষের আদিতম শহরের একেবারে আদিতম প্রান্তে। অসি ঘাট থেকে আদি কেশব অবধি যা সব ছিল মনের বিশ্বাস আর পুরাণের গাথার মণিমাণিক্য, এই রাজঘাটের মাটিতে এসে দাঁড়াতেই তা বাস্তব হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। গঙ্গায় ভেসে চলা আখ্যানমালার নৌকা থেকে নেমে কঠোর বাস্তবের মাটি-পাথরের স্তূপের কন্দর থেকে এবার আমার সেই সব মণিমাণিক্য খুঁজে আনার পালা।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
