রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ৩৬। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

ষষ্ঠ চিঠি

 

মূলনাথ গ্রামের প্রবেশপথ

 

মূলনাথ, এপ্রিল ১৫

 

আমার আগের চিঠিতে এখানে কীভাবে চাষের কাজ হয় সেকথা বলতে গিয়ে আমরা বীজ পোঁতার জন্য মাঠ প্রস্তুত কীভাবে করে সেই পর্যন্ত বলেছিলাম। এই কাজটা সাধারণতঃ ফেব্রুয়ারী মাসের দিকে হয়ে থাকে। যদি দেখা যায় আগে যথেষ্ট বৃষ্টি হয়ে গেছে আর বসন্তকালীন ফসল বোনার কাজ মার্চ মাস নাগাদ শুরু করা যাচ্ছে, তাহলে প্ল্যান্টার নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে। এই সময় বীজ বপন করাই সবচেয়ে ভালো। এতে করে গাছটা আগে আগে মাটিতে লেগে যায় আর গ্রীষ্মকালের ভয়ানক গরম সহ্য করার জন্য যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করে নিতে পারে। এত গরম কচি গাছ সহ্য করতে পারে না। কিন্তু সাধারণভাবে দেখা গেছে নানা সমস্যায় মাঠে মাঠে ব্যাপকভাবে বীজ বপনের কাজ কিছুতেই এপ্রিলের আগে শুরু করা যায় না। এতদিনে সেই সময় এসে গেছে আর বেশ কয়েকদিন হল মূলনাথের আশেপাশে মাঠগুলোতে বীজবপনের কাজ ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে গেছে। এই সমস্ত কাজকর্মের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার আর প্রয়োজন নেই। বীজ পোঁতার কাজটা হাতে করেই করা হয়। বড়জোর তার আগে মাটির ঢেলা ইত্যাদি ভাঙার জন্য একবার মই চালিয়ে নেওয়া হয়। ব্যাস, কাজ হয়ে গেল।

নীল এবং ধান ছাড়া আরও বিভিন্ন অন্যান্য জিনিসের বীজ এই মাসে জমিতে বপন করা হয়, যেমন গোলমরিচ, হলুদ, মানকচু, গুরুকচু, বিভিন্ন ধরণের মান, মিষ্টি আলু, আদা, আখ অত্যাদি। আখ অবশ্য খুব বেশী চাষ করে না লোকে, কেননা প্রথমতঃ আখ চাষ করা মেলা ঝামেলার কাজ আর দ্বিতীয়ত এই জেলায় বা আশেপাশে কেউ চাষীদের আখ উৎপাদনে উৎসাহও দেয় না।

যেমনটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, এই মরশুমে খুবই অল্প বৃষ্টি হয়েছে। ফলে গোটা দেশের জমির উপরিভাগে একটা ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এদেশের উর্বর জমিতে প্রকৃতি এত দ্রুত তার খেলা দেখায় যে হয়ত দেখা গেল আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে নীল গাছের বীজ থেকে অঙ্কুর বেরিয়ে মাটির ওপরে মাথা বের করে দিল। আর ছয় সাত দিনের মধ্যে দেখা গেল আধ ইঞ্চি উঁচু চারাগাছে গোটা মাঠ ছেয়ে গেছে।  কিছুদিন আগেই যে চারপাশকে দেখে মনে হচ্ছিল ঊষর জ্বলে যাওয়া মাটি, এখন সেটা বদলে গিয়ে সবুজ শষ্যে ছাওয়া মাঠ হয়ে গেছে। নীল গাছের কালো রঙের মাঝে মাঝেই হালকা সবুজ ধানের ক্ষেত চোখকে আরাম দেয়। সত্যিই সমস্ত এলাকাটা সবুজে আর জীবনে ঝলমল করে। আর সুর্যের তেজ ক্রমাগত বাড়তে থাকা সত্ত্বেও  প্রতিদিন সবকিছুর আরও আকর্ষণীয় দিক খুলে যায়। এত কিছুর মধ্যে মূলনাথ গ্রামটাকে ভুলে গেলে চলবে না কিন্তু। এই গ্রামের কথা আমি এখনও পর্যন্ত একবারও বলিনি। গ্রামখানা মানুষজনের চোখের আড়ালে জঙ্গল গাছপালা আর ভয়ানক ঘন ঝোঁপঝাড়ে ঢাকাও বটে। এখানে কারখানার দরিদ্র কর্মচারীদের বাড়ি। এই বাড়িগুলি সম্পর্কে আমি এটুকুই বলতে পারি, এদেশের আর সব বাড়িগুলির মতই এই বাড়িগুলিও বানানোর সময় এগুলোকে ছবির মত সুন্দর করার দিকে যতটা নজর দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে যারা বাস করবে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যর প্রতি ততটা নজর দেওয়া হয়নি। মূলত কাদামাটি দিয়ে তৈরি। বাঁশের কাঠামোর ওপর কাদামাটি লেপে লেপে এর দেওয়াল বানানো। সেখানে একটামাত্র সংকীর্ণ দরজা আর আর জানলা বলতে দেওয়ালে একটা এক বর্গফুটের মত ছোট গর্ত। মাটির মেঝে। এই বাড়ির মধ্যে কতটুকুই বা আরামের ব্যবস্থা থাকতে পারে!

তোমরা জিজ্ঞেস করবে, কোনও আসবাব নেই? বিশ্বাস করো, আমি যখন বলছি নেই, তখন আমি সত্যির থেকে খুব একটা দূরে নেই। কেননা আমার বিশ্বাস একশোর মধ্যে নিরানব্বইটা দরিদ্র বাঙালীর সাধারণ ঘরে যদি উঁকি মেরে কী জিনিস আছে খোঁজ করে দেখা যায় তাহলে নিম্নলিখিত জিনিসগুলোই পাওয়া যাবে। আমি এর মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ঢোকাচ্ছি না অবশ্য—

একখানা চারপাই বা বিছানা, দুখানা কাঠের পিঁড়ি, একটা মাদুর সব কাজে লাগানোর জন্য, দু তিনটে তামার লোটা বা জলপাত্র, খান দুয়েক হাঁড়ি, একটা বড় কাঁসা বা তামার থালা, একটা চেরাগ বা বাতি, ব্যাস। এর সাথে বড়জোর যোগ হতে পারে একখানা চুলা বা উনুন, যাকে বলে একখানা মাটির আগুনের পাত্র, যার মধ্যে ভাত রান্না করা হয়, দুটো বা তিনটে কলসি বা জলপাত্র— এই সবকিছু মিলিয়ে দাম হয়ত হবে মোটামুটি চারটাকা বা আট শিলিং!

বাংলার গরীব মানুষের ভাগ্য খুবই ভালো যে তাদের প্রয়োজনটা খুবই কম আর তাদের খাবার খুবই সস্তা [1]। আর তাই যখন এর উল্টোদিকে ইউরোপের ফ্যাকাশে হাড় হিম করা অভাবের কথা ভাবি, যেখানে একদিকে দারিদ্র আর একদিকে চরম আবহাওয়া (মারাত্মক শীত) এই দুইয়ের আক্রমণ হয়, তখন যে মানুষের কী অবস্থা হয়, তা বর্ণনা করা যায় না। সেসব তো এখানে কিছুই নেই। এখানকার দারিদ্রের কষ্ট কোনওভাবে ওদেশের সাথে সমান হতে পারে না। কিন্তু একথাও সত্যি, রোজগার যাই হোক না কেন, বাঙালী কিন্তু আরাম বা আয়েশে থাকা কাকে বলে জানে না। আর আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, এতদিন ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে থাকা সত্ত্বেও জানে না (বিশেষ করে আমি শহরের লোকেদের কথা বলছি)। এদের সত্যিই নিজেদের আরাম আর সুবিধের জন্য সামান্য কিছু আসবাব আর বাসনপত্র রাখা দরকার। তার জন্য যে পয়সা খরচ করতে হবে এমনও নয়। সামান্য বুদ্ধি খরচ করে, এদিক ওদিকের জিনিসকে কাজে লাগিয়ে আর নিজেদের রুচিকে একটু উন্নত করেই এই পরিবর্তন আনা যায়। একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে পুরোটাই শিক্ষার ব্যাপার আর সবসময় উপদেশ না দিয়ে উদাহরণ দিলেও যে কাজ হয়, তা নয়। এই দুটো জিনিস পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ভারতীয়দের আরামের ধারণা ঘরের বাইরে অবস্থান করে, ঘরের ভেতরে নয়। তাদের একমাত্র চিন্তা কীভাবে জমিজমার পরিমান বাড়ানো যায় বা সেই জমি চাষ করার জন্য গবাদি পশুর সংখ্যা বাড়ানো যায়। আর যখন তাদের বাইরের সম্পত্তি যথেষ্ট পরিমান হয়ে যায় তাদের ঘরের ভেতরে পরিবর্তন বলতে আসে একখানা ঢাউস কাঠের সিন্দুক। যেটুকু সম্পত্তি সে বাড়াতে পেরেছে, তা সেই সিন্দুকের মধ্যে গিয়ে ঢোকে। তার সাথে সেই সিন্দুকের মধ্যে থাকে বাড়ির মেয়েদের গয়না, নানারকম হিসাবের খাতা, কিছু কাঁসা বা তামার বাসনপত্র— এসবকেই এদেশের লোকে মনে লোভ জাগানোর মত সম্পত্তি বলে মনে করে।

গ্রামের লাগোয়া নদীর ধারে একখানা ছোট্ট বাজার মতন এলাকা রয়েছে। প্রতি বুধবার আর শনিবার সেখানে হাট বসে। হাট আসলে নানারকম জিনিসপত্রের বাজার আরকি। আশেপাশের গাঁ-ঘরের গরীব মানুষদের সুবিধের জন্য বসে।

 

বাজার

 

কারখানার যারা উচ্চপদস্থ কর্মচারী, যেমন গোমস্তা, সরকার, রাইটার আরও অন্যান্যরা— তাদের বাড়িতে সাধারণত একপাল আত্মীয় স্বজন আর পুষ্যি সহায়ক ইত্যাদি থাকে। দেখা যায় এই সমস্ত লোকজন নিয়ে তারা খুব সুন্দর সুন্দর বাড়িতে থাকে। এই সমস্ত বাড়িগুলি কারখানার কাছাকাছির মধ্যেই হয়। সুন্দর বাগানের বুক চিরে চওড়া রাস্তা, আর সেই রাস্তার একদিকে বাড়িগুলি। উঁচু উঁচু ফারগাছ, বাবুল গাছ। আর একটা বিরাট ছড়ানো বটগাছ পুরো এলাকাটাকে যেমন সুন্দর করে তলে তেমনি ছায়াও দেয়।

টীকা

[1] ১৮৫৮। এইসব বিদ্রোহ টিদ্রোহের কারনে এই সুন্দর সুখের সময় আর নেই। খাদ্যবস্তুর দাম এখন আগের দামের দ্বিগুন আর শহরে গ্রামে সর্বত্র সাধারণ মানুষের ওপর চাপ মারাত্মক।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply