রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ৩৩। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

তোমাদের দুই ধরণের চাষের সঙ্গে পরিচয় করয়ে দিলাম। এবার আমি বলব কী উপায়ে চাষ হয়। এরও দুই প্রকার রয়েছে। সবার আগে, জমি। জমি যত উর্বর হবে, চাষ তত ভালো হবে। আর জমিতে ভালো নিকাশী ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে কোনওরকম জল না জমে। জমি যখন অনুকূল থাকবে, তখন তিন থেকে চার বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে তাতে নীল বোনা যেতে পারে, কখনও কখনও তার থেকেও বেশী। যদিও সময় থাকতে থাকতে ফসল বদলে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ফসল পালটে পালটে চাষই সর্বদা সবজায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা কোনও জমিতে একই ফসল বছরের পর বছর চাষ করার ফলে সেই জমি অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে এটা খুব একটা আশ্চর্য নয়, কিন্তু এই বাংলায় যেটা আশ্চর্য সেটা হল এক জমিতে এক ফসল যতবার চাষ করা হবে চাষের খরচ তত বেড়ে বেড়ে যাবে। কী করে যেন প্রতিবার জমিতে আগাছার পরিমান বেড়ে বেড়ে যাবে। এক জমিতে এক ফসল যত ঘনঘন চাষ হবে, সেই জমিতে বন্য গাছপালার প্রাচুর্য তত বেড়ে যাবে। দেখে মনে হবে, পৃথিবী প্রাণের বীজে ভরপুর, শুধু একটু মুক্ত বাতাসে খুলে ধরা দরকার, তাহলেই একেবারে চারদিক প্রাণপ্রাচুর্যে ভরিয়ে দেবে। আর যদি সাধারণত চাষ করতে যতটা খঁড়াখুঁড়ি করতে হয়, তার চেয়ে একটু গভীর করে মাটি খোঁড়া হয়ে যায়, তাহলে আর দেখতে হবে না, চারিদিক এত তাজা জঙ্গলে ভরে যাবে, যেমনটা মানুষ আগে কখনও দেখেনি! অন্যদিকে জঙ্গল কেটে প্রথমবার আবাদ করা নতুন জমি, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী জমি উলটে পালটে দেখা হয়নি, যে জমি শক্তিতে ভরপুর, এবং ভালো শাকসব্জি চাষ করার মত বীজে ভরা; যে জমি দেখে প্রথমেই মনে হবে এখানে ফসল দাঁড়াতেই পারবে না, একবার আগাছা জন্মাতে শুরু করলে ফসলকে দম বন্ধ করে মেরে দেবে, সেখানে কিন্তু খুব আশ্চর্যজনকভাবে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো হয়। এই ধরনের মাটিতে পরে খুব কম ঝোঁপজঙ্গল হয়, আর আগাছা নিড়োনোর প্রয়োজন প্রায় পড়েই না। এই বিষয়টা বাংলায় বিভিন্ন অংশের আর আসামের মানুষরা এত ভালো করে জানে আর এই সমস্ত এলাকায় জনবসতির ঘনত্ব এত কম যে বেশ কিছু ফসলের ক্ষেত্রে দেখা যায় এক জমি একবছর বা দুবছরের বেশি চাষই করা হয় না। এই যে জমিতে আগাছার জঙ্গল গজিয়ে ওঠার কথা বললাম, জমিতে বিভিন্ন ফসল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাষ করলে তার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। আমার মনে হয় এভাবে চাষ করলে জমির এমন কিছু গুনাবলী বেরিয়ে আসে যেগুলো অন্যথায় আগাছাদের পুষ্টি যোগাত।

চাষের যে সমস্ত নিয়মের কথা এতক্ষণ বললাম, তার মধ্যে এক জমিতে চক্রাকারে বিভিন্ন ফসল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাষ করার ব্যাপারে তোমরা সম্ভবত অবগত আছো। ব্যাপারটার সূত্রপাত এইভাবে, বারবার লক্ষ্য করে দেখা গেছে একই জমিতে একই ফসল বছরের পর বছর চাষ করলে সেই জমি ক্লান্ত হয়ে পড়ে আর সেই ফসল হতে চায় না। অন্য দিকে যদি সেই জমিতে বুদ্ধি করে অন্য ফসল লাগানো যায়, যে ফসলের জন্য অন্য রকমের পুষ্টি দরকার, তাহলে সেই একই জমি থেকে লাভ তোলা যায়। চাষীদের মতে কিছু ফসল আছে, যেমন বিভিন্ন ধরণের ভুট্টা ও দানাশষ্য, যেগুলো জমির পুষ্টিগুণ শুষে নিয়ে জমিকে ক্লান্ত করে ফেলে। তারা এগুলোকে ‘সাদা ফসল’ বলে। আর বাকী ফসলদের বলে ‘সবুজ ফসল’, কেননা এগুলো জমির মান উন্নত করে থাকে। এই যে চক্রাকারে বিভিন্ন ফসল চাষ করা, এ বিষয়ে দেশী চাষীরাও আজকাল অবগত হয়ে গেছে, তারা কিন্তু জমির প্রকৃতি দেখে মোটেও ফসল বোনে না। তারা জানে যে নির্দিষ্ট ধরনের মাটিতে নির্দিষ্ট ফসলের চাষ ভালো হয়। আর কিছু গাছের পরে কিছু গাছ ভালো হয়— যেমন কোনও জমিতে নীল বা লঙ্কা চাষ করার পরে সেই জমিতে ধান ভালো হয়। কিন্তু তারা এর বেশী কিছু জানে না। আর একথাও বলা যেতে পারে যে এইভাবে নিয়ম করে পরপর একটা ফসলের পর আর একটা ফসল চাষ করাটা তারা ইউরোপীয়দের থেকে শিখেছে। সুতরাং, নীল চাষের ফাঁকে ফাঁকে জমিতে অন্য ফসল, যেমন বিভিন্ন ডাল বা তৈলবীজ ইত্যাদি বুনে বড় করে কেটে নেওয়া হয় যাতে এপ্রিল মাসের নীলচাষে সেগুলো অসুবিধে সৃষ্টি না করে। বড় বড় যে সমস্ত কারখানাগুলো উঁচু জমিতে আছে, তাদের প্ল্যান্টারদের জমির কিছুটা অংশেও খোঁজ নিলে দেখা যাবে তৈলবীজ চাষ করা আছে। সাধারণত তৈলবীজ হিসেবে সরষের চাষ করা হয় ও সেখান থেকে বিপুল পরিমান সরষের তেল উৎপাদন করা হয়। সমগ্র বাংলা জুড়ে সরষের তেলের বিপুল চাহিদা রয়েছে। এদেশে রান্না থেকে স্নান, সবেতেই সরষের তেল ব্যবহার করা হয়। সাধারণতঃ দেখা যায়, নিজ বা ব্যাক্তিগত চাষের ক্ষেত্রে এই মধ্যবর্তী ফসলগুলোর চাষ করা হয় না। কিন্তু রায়ত দিয়ে চাষ করালে, যেখানে জমি পরিবর্তনের কোনও সম্ভাননা নেই, অগাস্ট মাস পড়ে নীলের ফসল কাটতে না কাটতে চাষিরা হাল-বলদ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে বিভিন্ন রকম তৈলবীজ চাষ করার জন্য, বিশেষ করে সরষে। অন্ততঃ একটি ক্ষেত্রে এই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চাষ করার আর একটি সুবিধে পাওয়া গেছে, সেটা হল তামাক চাষের ক্ষেত্রে। তামাক চাষ করতে গেলে জমিকে খুব যত্ন করে তৈরি করতে হয়। আর এই যত্ন করে তৈরি করা জমি নীল চাষের ক্ষেত্রে খুব কাজে লাগে। কিন্তু এ পর্যন্ত পালা করে চাষের ক্ষেত্রে যে দুটি ফসলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী লাভ পাওয়া গেছে তারা হল নীল আর ধান। এই বিষয়ে আমি আমার আগের চিঠিতে লিখেছি।

অক্টোবর মাসের দিকে এদেশের চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত লোকেরা এমন একটা জিনিস করে থাকে যেটা লেভিটিকাল ল-এর (১) বিরোধী হলেও এদেশে ভালোই চলে আর কেউ আপত্তিরও কিছু দেখে না— সেটা হল মিশ্র ফসলের চাষ। রায়তরা করে কী, হামেশাই নীলের সাথে সাথে অন্যান্য ফসলও চাষ করে থাকে, অবশ্যই আলাদা করে। তারা এমন সব ফসল চাষ করে যেগুলো বড় হলেও নীলের জায়গা দখল করে নেবে না বা কচি নীলের গাছগুলোকে দমবন্ধ করে মেরে দেবে না। যেমন সরষে, গম, তিল, কলাই ও আরও নানারকম ডাল। ঠিক যেমন করে ইংল্যান্ডে গমের সাথে রাই ঘাসও বোনা হয়। এরপর যখন গম কেটে নেওয়া হয়, ঠিক তার পরেই গ্রীস্মকাল এলেই মাঠ ভরপুর পশুখাদ্য শষ্যদানায় ভরে ওঠে।

আমি ইতিমধ্যেই বলেছি চাষ দুই রকমের হয়। প্রথম রকম, যাকে আমরা সাধারণ চাষ বলতে পারি, যেখানে সাধারণ হালবলদ দিয়ে চাষ করা হয়, সে সম্পর্কে প্রাথমিকভাবেও কিছুই বলার নেই।  কিন্তু দ্বিতীয় ধরণের চাষ, যাকে ছিটানি (বা ছড়ানো) চাষ বলে, সেটা একটু অদ্ভুত ধরণের। আমার বিশ্বাস, এই ধরণের চাষ শুধুমাত্র ভারতে আর নীল নদীর ধারে হয়ে থাকে। তুমি সম্ভবতঃ ইতিমধ্যেই জানো যে ভারতের নদীগুলোতে মিশরের নদীগুলির মতই প্রবল বন্যা হয়। সে বন্যা এতই প্রবল হয় যে নদীর দুই পাশের বিস্তীর্ণ এলাকার চাষজমি সম্পুর্ণ জলে ডুবে যায়। এই বন্যা মোটামুটি তিনমাস ধরে চলে। তারপরে যখন জল নেমে যায়, দেখা যায় নদীর স্রোতের টানে যে বিপুল পরিমান মাটি নেমে আসে, তা বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নরম বালি বালি কাদা মাটি জমা করে যায়। একে চুর বলা হয়। এই কাদামাটি এক এক জায়গায় এক এক রকম পুরু হয়ে পড়ে, কোথাও সেটা ইঞ্চি চারেক তো কোথাও সেটা তিন চার ফুট। এবার আমরা একটা সুন্দরভাবে সাজানো বীজতলা পেয়ে গেলাম। কোনও হাল চালানো, কোনও খোঁড়াখুঁড়ি, কোনও প্রস্তুতি কিচ্ছুর প্রয়োজন নেই। জল সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটি মানুষ দাঁড়ানোর মত শক্ত হওয়ার আগে মাটির ওপরে ওপরে বীজ পুঁতে দেওয়া হয়। আর সেই বলে না ‘জলের ওপর রুটি ফেলে দাও আর বহুদিন পর ফিরে এসো’ (২), সেরকমই বীজগুলোকে অঙ্কুরিত হওয়ার জন্য ফেলে রেখে দেওয়া হয়। এই ধরণের জমিতে শুধু যে নীলই চাষ করা হয় তা নয়, বিভিন্ন রকমের ডাল আর দানাশষ্য, এমনকি সবজিও চাষ করা যায়, যেমন মটর, খেসারি, সরষে, কলাই, মুসুরি, চিনার দানা ইত্যাদি। মোটামুটি দুমাস পরে এই ফসলগুলো তৈরি হয়ে গেলে এদেশের মানুষদের খাদ্য হিসেবে চলে যায়, বিশেষ করে যখন চালের অভাব চলে।

কোনও কোনও কারখানার অধীনে যত জমি আছে তার এক তৃতীয়াংশই ছিটানি জমি হয়, কখনও কখনও অর্ধেক বা তারও বেশী হয়। এই ধরণের চাষের ক্ষেত্রে এক মরশুমের চাষের খরচও অনেক কম। কিন্তু এই ধরণের নীচু জমিতে চাষের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা একটা বড় ফ্যাক্টর। হয়ত দেখা গেল বন্যা আবার ফিরে এল। ব্যাস, চাষী এবং প্ল্যান্টার, উভয়েরই আশাভরসা সব একেবারে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।

নীল চাষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, নীল বোনার দুটি মরশুম রয়েছে, কিন্তু ফসল কাটার মরশুম একটাই। আসলে একবার ফসল কাটার আর পরের ফসল বোনার মধ্যে সময়ের ফারাক এতটাই কম যে মাঝে মাঝে তাদের আলাদাই করা যায় না। আর এই ব্যাপারটা বুঝতে গেলে এখানকার ঋতুচক্র সম্পর্কে দু এক কথা জেনে রাখতে হবে। শীতকাল এখানে শুরু হয় নভেম্বরে, শেষ হয় ফেব্রুয়ারীতে। গ্রীষ্মকাল এরপরেই আসে আর তারপর জুন জুলাই মাসে আসে বর্ষাকাল। বর্ষাকাল মোটামুটি অক্টোবর পর্যন্ত থাকে। এই যে ঋতুটার কথা শেষে বলা হল, এই বর্ষাকাল। এর আসার কোনও ঠিক নেই। কখনও জুন মাসের শুরুতে চলে আসে, কখনও আসতে আসতে জুলাই পার করে দেয়। বর্ষার এই পরিবর্তনশীল চরিত্রের জন্যই প্ল্যান্টারদের আর চাষীদের নীলচাষ করা নিয়ে যতরকমের অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকি আর অশান্তি।

যে সমস্ত কারখানা উঁচু জায়গায় অবস্থিত, তাদের জমিতে বসন্তকালে বীজ বোনা হয়। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারীর পর যে কোনও সময় যখন যথেষ্ট উষ্ণতা থাকবে আর হালকা বৃষ্টি হয়ে বাতাসে আর্দ্রতাও থাকবে (এই আর্দ্রতার ব্যাপারটা কিছুটা খ্রীস্টমাসের সময়েও পাওয়া যায়) যাতে করে মাটি বীজ বপন করার মত নরম থাকে। তবে সাধারণত এইসব চাষাবাদের কাজকর্ম এপ্রিলের আগে আগে হয়। কেননা বিভিন্ন অন্যান্য ফসল, যেমন গম, বার্লি, ওট, তামাক, সরষে, তিসি, লঙ্কা ইত্যাদি আরও অন্যান্য ফসলকে আগে সরিয়ে নিয়ে হয় আর জমিকে পুনরায় চাষের যোগ্য করে তুলতে হয়।

 

টীকা

১। লেভিটিকাল লঃ ওল্ড টেস্টামেন্টের তৃতীয় বই, যেটা বুক অফ মোজেস নামেও পরিচিত। প্রাচীন ইসরায়েলবাসীদের জন্য ঈশ্বর কিছু নিয়মকানুন বানিয়েছিলেন। সেখানে কীভাবে সৎ ভাবে জীবনযাপন করতে হয়,  কীভাবে উৎসব পালন করতে হয়, চাষাবাদ করতে হয়— এক কথায় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া আছে। এই বুক অফ লেভিটিকাস-এ লিখিত নিয়মগুলির উদ্দেশ্য ইসরায়েলবাসীকে ঈশ্বরের পবিত্রতা সম্পর্কে জানানো আর তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে ধর্মপথে চালনা করা।

২। বাইবেলের প্রবাদ। একলেসিয়াসটিস ১১ঃ১ এ বলছে, জলের ওপর রুটি ফেলে রেখে দিয়ে চলে যাও, বহুদিন পরে ফিরে এসে তুমি সেই রুটি খুঁজে পেয়ে যাবে। অর্থাৎ, ভালো কাজ আপাতভাবে সকলের নজরের আড়ালে থেকে যায় বটে কিন্তু সঠিক সময়ে কোনও না কোনও অপ্রত্যাশিত উপায়ে তা আমাদের পুরস্কৃত করে। মূলতঃ ভাল কাজ করে সঙ্গে সঙ্গে ফলের আশা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এই প্রবাদে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply