সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। শেষ পর্ব। বরুণদেব
ইউরোপে তখন যে যাঁর সার্কাসের মধ্যেই ট্রেনিং দিতেন। এমিলিও ক্রিস্তিয়ানি,পেশায় কামার, ইটালির মোডেনা শহরে ১৮৬০ সালে চালু করেছিলেন ব্যায়ামচর্চার এক প্রতিষ্ঠান। এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্যই ক্রিস্তিয়ানির পুরো পরিবার সার্কাস-শিল্পী হতে পেরেছিলেন। রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের পর ১১৯ টি সার্কাস কোম্পানিকে জাতীয়করণ করে মস্কোয় ১৯২৭ সালে তৈরী হয় স্কুল ফর সার্কাস এন্ড ভ্যারাইটি আর্টস। শয়ে শ’য়ে ছেলেমেয়ে সেই স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়। প্রশিক্ষণের সময় থেকেই বেতন দেওয়া শুরু হয়, কুড়ি বছর কাজ করার পর পেনসন। ঝুঁকিপূর্ণ খেলাগুলিতে সেফটি বেল্ট বাধ্যতামূলক,দুর্ঘটনায় পঙ্গু অথবা মৃত্যু হলে পারিবারিক পেনসনের ব্যবস্থা। সার্কাস শুধুমাত্র বিনোদন নয়, শরীরচর্চার এক সংস্কৃতি হয়ে ওঠে। রাশিয়ার সার্কাস সংস্কৃতি অতি প্রাচীন। কিয়েভের সেন্ট সোফিয়া ক্যাথিড্রালে ন’শো বছরের পুরোনো এক টাইটরোপ ওয়াকারের ফ্রেস্কো সেই ইঙ্গিত দেয়। রাশিয়ায় ১৮৭৩ সালে নিকিথিন ভাইরা ক্রিসমাস উৎসবের মেলায় প্রথম আধুনিক সার্কাস খোলেন। সেখান থেকে অনেক অনেক পথ পেরিয়ে প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে রাশিয়ান সার্কাস বিশ্বের বিস্ময় হয়ে ওঠে। অক্টোবর বিপ্লবের পর ১৯১৭র ১লা মে জাগলার, ক্লাউন, অ্যাক্রোব্যাট, রেস্টলার, বন্যজন্তুর প্রশিক্ষকরা ট্রামের ওপর প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে গোটা মস্কো শহর জুড়ে ঘুরে ঘুরে খেলা দেখিয়ে মে দিবস উদযাপন করেন। ১৯১৯ এর ২২শে সেপ্টেম্বর বিশ্বের প্রথম জাতীয় সার্কাস শুরু মস্কোতে।
ভারতীয় সার্কাসের সূচনালগ্নে কীলেরির ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় যে সার্কাস ট্রেনিং ইন্সটিটিউট খোলা হয়, সেই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিল ভারতীয় সার্কাসশিল্পের আঁতুরঘড়। যেখানে মস্কোর সার্কাসস্কুলের প্রয়োজনীয় সব সাহায্য ছিল রাষ্ট্রের, সেখানে কীলেরির স্কুলের জন্য ছিল নৈতিক সমর্থন। ব্যক্তিমানুষের সাফল্য সেই অর্থে ঐতিহাসিক।
১৯৫৯ সালে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে এলো একটা সার্কাসের দল। ততদিনে চেকোস্লোভাকিয়ায় সার্কাসের জাতীয়করণ হয়ে গিয়েছে। ১৯৩০ সালে সেদেশে পনেরোটা সার্কাস ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টিকে ছিল মাত্র তিনটি সার্কাস। ১৯৪৭ সাল। ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি আর চেকোস্লোভাকিয়ান সার্কাসের জাতীয়করণ একই সময়ে। সে দেশে ‘চেক সার্কাস এন্ড ভ্যারাইটি শোজ’ চেক প্রজাতন্ত্রের এক পৃথক দপ্তর। জাতীয়করনের সময় তারা বিভিন্ন সার্কাস থেকে পাঁচশো শিল্পীকে নিয়ে পাঁচটা গ্রুপে ভাগ করে। মার্চ মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তারা ট্যুর করে বেড়াত। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি- বিভিন্ন ক্লাব, হোটেল বা অন্য কোনো জায়গায় তারা কাজ করতে পারত। সেই আয়ের একটা অংশ জমা পড়ত সরকারি তহবিলে। সমস্ত সার্কাসকর্মীরা নিয়মিত বেতন পেত সরকারের কাছে থেকে। চেক প্রজাতন্ত্র থেকে এমনই একটি দল আসে কলকাতায়। সে দলের শিল্পীদের মধ্যে পনেরো জন বালক-বালিকা ও তাদের একজন প্রশিক্ষক, ষোলোটি বন্য জন্তু, দশটি কুকুর, পঁচিশটি ঘোড়া এবং একজন পশুচিকিৎসক। কলকাতার ব্যবসায়ী এ এলো চোপড়ার ব্যবস্থাপনায় ইডেন উদ্যানে পড়ল তাঁবু। দশ হাজার দর্শকাসন। বিদ্যুতের জন্য বসানো হলো দু’লাখ ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন। প্রচারের জন্য খরচ হলো দু’লাখ টাকা। তিনটে রিঙে দেখানো হলো খেলা। লাইভ খেলা দেখানো জন্য তাঁবুর ভেতরে বসল দু’টো বড়ো স্ক্রিন। এক এলাহী ব্যবস্থা। এইসব প্রদর্শনী দর্শকের উৎসাহ ও আবেগ বাড়িয়ে দিলো ঠিকই তবে ভারতীয় সার্কাসের সংগঠনে সরকারি উদাসীনতা সার্কাসশিল্পকে কবরের মাটি খুঁড়তে বাধ্য করেছে।
১৯৪৯ সালে মালাবার জেলার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি জনগণের কাছে আবেদন জানালেন প্রফেসর কীলেরির নামে থালাসেরিতে একটি সার্কাস ইন্সটিটিউট খোলার জন্য। জনগণ সে আবেদনে সাড়া দেয় নি। ভারতে সার্কাস নিছকই এক বিনোদন। সে বিনোদন বেসরকারি মালিকানায়। সিনেমা, নাটক বা লোকশিল্পে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকার নানা সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও সার্কাসের দিকে কখনো ফিরে তাকায় নি। রাশিয়ায় যখন এক হাজারের বেশি আইটেম পাঁচ হাজার রাশিয়ান শিল্পী দেখাত, তখন ভারতে দু’হাজার শিল্পী একশোরও কম আইটেম দেখাতে পারত। পরিসংখ্যানটা গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের। তফাৎটা সরকারি প্রচেষ্টা ও সরকারি উদাসীনতার। অথচ পঞ্চান্ন-ঊর্ধ্ব ভারতীয় শিল্পী কেশভনের ডাবল সমারসল্ট বা কোনানের ট্যুইস্ট সমারসল্ট বিস্মিত করেছিল রাশিয়ার শিল্পীদেরও। ১৯৫৮-য় পঞ্চাশ জন পুরুষ ও মহিলা সার্কাস-শিল্পীর একটি রাশিয়ান প্রতিনিধি দল দিল্লী বোম্বে, মাদ্রাজ ও কলকাতায় ঘোরে। কলকাতায় যখন এই প্রতিনিধি দলটি আসে তখন হাওড়া ময়দানে গ্রেট রেমন ও পার্ক সার্কাস ময়দানে জেমিনি সার্কাসের তাঁবু পড়েছিল। রাশিয়ান প্রতিনিধিরা এই দুই তাঁবুতেই যায়, সার্কাসের অভিজ্ঞতার আদানপ্রদান হয় দুই দেশের মধ্যে। সে দলের প্রধান, মস্কোর স্কুল অফ সার্কাস এন্ড ভ্যারাইটি আর্টসের ডিরেক্টর, আলেকজান্ডার ভোলোসচিয়েন জানিয়েছিলেন, রাশিয়ায় বসেই তাঁরা জানতে পেরেছেন যে, ভারতীয় শিল্পীদের বেশিরভাগই মালাবারের আর তার কারণ থালাসেরির কিলেরি কুন্নিহিক্কান্নানের সার্কাস প্রশিক্ষণ স্কুল।
১৯৬৩-তে জেমিনি সার্কাসের শঙ্করনের নেতৃত্বে ভারতের সার্কাসশিল্পীদের একটি দল সোভিয়েতে গেল। দিল্লী বিমান বন্দরে তাঁদের সি অফ করতে এলেন প্রধানমন্ত্রী নেহেরু, রাষ্ট্রপতি ডঃ জাকির হুসেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভি কে কৃষ্ণ মেনন। মস্কোয় ইন্টারন্যাশনাল সার্কাস ফেস্টিভালে অংশগ্রহণ করলেন ভারতীয় প্রতিনিধিরা। তিন মাস ধরে রাশিয়ার সার্কাস থিয়েটারগুলিতে, তাঁবুগুলিতে তাঁদের খেলা দেখালেন, প্রশিক্ষণ দেখলেন, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলেন। ভারতে ফিরে শঙ্করন সার্কাস শিল্পের উন্নতিসাধনের বিষয়ে নেহেরুর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করলেন, পরিকল্পনার রূপরেখা পেশ করলেন। সরকারি অফিসারদের ঔদাসিন্যে তা ফাইলবন্দীই রয়ে গেল।
১৯৫৬ সালে কয়েকজন সার্কাসশিল্পী থালাসেরিতে একটা সার্কাস সংগঠন তৈরীর চেষ্টা করেছিলেন। কমিটি তৈরী করে অফিস খোলা হলো। পরের দিন সেই সংগঠনের সাইনবোর্ডটাই উধাও হয়ে গেল। কমলা সার্কাসের অটোমোবাইল মেকানিক ভি পি নানু সার্কাসশিল্পী ও কর্মীদের একটি অরাজনৈতিক ছাতার তলায় আনতে চাইলেন। যোগাযোগ করলেন তিরুচিরাপল্লীর সাংসদ ও রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নেতা কে আনন্দন নাম্বিয়ারের সঙ্গে। ১৯৬৩ সালে দিল্লীতে তৈরী হলো অখিল ভারত সার্কাস কর্মচারী সংঘ, কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার নেতা পি কৃষ্ণান হলেন সেক্রেটারি। বিভিন্ন সার্কাস থেকে শ’য়ে শ’য়ে সার্কাসশিল্পী ও কর্মীরা যোগ দিল। পরের বছর এলো কোঅপারেটিভ সোসাইটি। চল্লিশ জন সদস্য হলেন শেয়ারহোল্ডার। শেয়ারের দাম হলো আড়াই হাজার টাকা। সেখান থেকে উঠে এলো এক লাখ টাকা। তৈরী হলো অখিল ভারতীয় সার্কাস। ৩০ ডিসেম্বর, ১৯৬৪তে জাস্টিস ভি আর কৃষ্ণ আইয়ার থালাসেরিতে উদ্বোধন করলেন সে সার্কাসের। অখিল ভারত সার্কাসে কোনো বন্য বা গৃহপালিত পশু পাখি ছিল না। ইউনিয়ন প্রত্যেককে ভালো বেতন দিত, ভালো খাবার দিত। থালাসেরির ক্যাম্প সফল হলো। পরের ক্যাম্প মানাতোডিতে। manantody. একটি বড়ো পোল তোলার সময় সেটি পড়ল এক কর্মীর ওপর। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। তবুও নির্ঘণ্ট অনুযায়ী প্রদর্শনী চলল কুড়ি দিন ধরে। সে ক্যাম্প থেকে আয় বিশেষ হলো না। সেখান থেকে দল গেল কোঝিকোড়। কিছু বড়ো সার্কাসের মালিক, পার্টনাররা এলো খেলা দেখতে। সকলে এই প্রচেষ্টার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পনের দিনের মধ্যে ঘটে গেল এমন এক ঘটনা যেখান থেকে শেষের শুরু হলো। শুরু হলো সার্কাসের মেস থেকে। অভিযোগ, দুপুরের খাবার সুস্বাদু নয়। সংগঠনের কর্তাব্যক্তিরা যখন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এলেন, ইউনিয়নের নেতা ভি পি নানুকে আক্রমণ করল একজন। মাথায় চোট পেলেও, নানু কিন্তু হাসপাতালেও গেলেন না, পুলিশেও না। কিছু শিল্পী সেদিন স্ট্রাইক ঘোষণা করল। শো বন্ধ হয়ে গেল। ১৭ দিন ধরে চলল স্ট্রাইক। পরবর্তী ক্যাম্পে যেতেও বাধা দিল তারা। শো না হওয়াতে টাকা এলো না। সার্কাসের সবাই উপোসী হয়ে রইল। শেষে কিছু স্থানীয় লোক আন্দোলনকারী ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে এলো। ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নিল, যে সতেরো জন শিল্পী স্ট্রাইক ডেকেছে তাদের বেতন দিয়ে দেওয়া হবে এই শর্তে যে তারা তৎক্ষণাৎ তাঁবু ছেড়ে চলে যাবে। মধ্যস্থতায় অংশগ্রহণকারী একজন, সাবান ফ্যাক্টারির মালিক, সার্কাসের মালপত্র পরবর্তী ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর ট্রাক দিলেন, ভাড়া নিলেন না। কিন্তু যে অসুখ শুরু হয়েছিল তা আর সারল না, তামিলনাড়ুর নগরকোভিলে ১৯৬৬-র শেষে যবনিকাপাত।
কীলেরির শিষ্য, সার্কাসের বিখ্যাত বারপ্লেয়ার এম কে রমন পরশুরাম সার্কাস, ছত্রের গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের মতো বিভিন্ন সার্কাস দলে খেলা দেখিয়ে নিজের সার্কাসদল ‘স্টার অফ ইন্ডিয়া’ খোলেন। ১৯২৯-এর দিকে সার্কাসের তাঁবুকে বিদায় জানিয়ে ফিরে আসেন থালাসেরিতে, গুরু কিলেরির বাড়ির কাছেই বাড়ি করেন। কীলেরির মৃত্যুর পর তাঁর সার্কাস ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে । ১৯৫৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্র বিশ্বনাথন সে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে নামকরণ করেন- কীলেরি কুনহিকানান টিচার এন্ড এম কে রমন মেমোরিয়াল সার্কাস এন্ড জিমন্যাস্টিকস ট্রেনিং সেন্টার। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে বন্ধ হয়ে গেল সেই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান, পরিণত হলো এক ইট কাঠ পাথরের কঙ্কালে।
বিভিন্ন সার্কাসে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করা জে এফ স্টিফেনের উদ্যোগে ১৯৭৭য় সার্কাস কর্মীদের নিয়ে আই এন টি ইউ সি থালাসেরিতে একটি ইউনিয়ন গঠন করল – ইণ্ডিয়ান সার্কাস এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন। কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা কে ভি রাঘবন হলেন প্রেসিডেন্ট, স্টিফেন জেনারেল সেক্রেটারি। প্রকাশিত হতে থাকল পত্রিকা- সার্কাস ওয়ার্কার। বিভিন্ন সার্কাসের খবরাখবর, রিপোর্ট, ছবি প্রকাশিত হতে লাগল সে পত্রিকায়। এই পত্রিকা হয়ে উঠল বিভিন্ন দলের সার্কাসশিল্পী, কর্মী, পার্টনারদের যোগাযোগের, মত প্রকাশের মাধ্যম। কয়েক বছর পরে ইউনিয়নে ভাঙন দেখা দিল, দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল ইউনিয়ন। পত্রিকাও বন্ধ হয়ে গেল।
সার্কাসের জন্য রেল পরিবহনে যে ছাড় চালু ছিল, ১৯৭০ এর দিকে সে সুবিধাও কাটছাঁট হলো। অনেক বড়ো সার্কাসও বিপদে পড়ে গেল । মহারাষ্ট্রে শুরু হয়ে কেরালায় বিস্তার লাভ করে সারা ভারতে ছড়িয়ে যাওয়া ভারতীয় সার্কাসশিল্পে কেরালার আধিপত্য ছিল চিরকাল। সার্কাসের শুরুর দিকের শিল্পীরা বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকের দিকে নিজেরাই নতুন নতুন দল খোলেন। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাহান্নটি সার্কাসের মধ্যে বিয়াল্লিশটি সার্কাসই ছিল মালোয়ালি পরিচালকদের দখলে। সার্কাসের পঁচানব্বই শতাংশ শিল্পীই কেরালার, থালাসেরি কান্নুর ও উত্তর মালাবারের সন্নিহিত গ্রামাঞ্চলের। সেটা ছিল ভারতীয় সার্কাসের সুবর্ণ যুগ। সে যুগ শেষ হতে বেশি সময় লাগল না। সার্কাস নিয়ে এক সেন্সাস রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ১৯৬০এর শুরুর দিকে বাহান্নটা প্রথম সারির ভারতীয় সার্কাসদল ছিল, দশ বছরের মধ্যে তার সংখ্যাটা হয়ে গেল বাইশ। সেন্সাস রিপোর্ট থেকে উঠে এলো, প্রায় ১০০টি দ্বিতীয় স্তরের সার্কাস কোম্পনি বিভিন্ন রাজ্যে খেলা দেখিয়ে বেরায়, প্রায় তিনশোটি তৃতীয় শ্রেণীর সার্কাস পঞ্চাশ থেকে একশো কর্মী, অল্প কিছু বন্যপ্রাণী নিয়ে দু’পোলের সার্কাস নিয়ে ঘোরে, আর চতুর্থরা হলো পথসার্কাস, মাদারি কা খেল, যাদের না আছে তাঁবু, না আছে বন্যপ্রাণী। সব মিলিয়ে আটচল্লিশ হাজার সার্কাসকর্মী সার্কাসের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে।
১৯৮০-র দিকে কেরালা সরকার কেরালিয়ান শিল্পীদের জন্য পেনশন চালু করে। যে সমস্ত শিল্পী অন্তত পনেরো বছর সার্কাসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের জন্য মাসে এক হাজার টাকা করে পেনসন চালু করা হয়। কিন্তু সে পডক্ষেপে সার্কাসকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেওয়া যায় নি। ১৯৯২ সালে যখন ভারতীয় সার্কাস মৃত্যুর দিকে চলেছে, থালাসেরিতে স্পোর্টস অথরিটি অফ ইণ্ডিয়ার ছাতার তলায় এক প্রজেক্ট হাতে নেয় সরকার। সে প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ে, ২০০০ সালের দিকে তা বন্ধ করে দিতে হয়। থালাসেরির চিরাকুন্নি গ্রামে রাজকমল টকিজ নামে এক বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমাহলে সার্কাস অ্যাকাডেমি খোলা হয়। সরকারের তরফে ন্যূনতম সাজসরঞ্জাম দেওয়া হয় নি। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকাসনের জায়গাটি খালি করে দিয়ে সেখানে শতরঞ্জি পেতে অনুশীলন, সে শতরঞ্জিও ভাড়া করে আনতেন প্রশিক্ষকেরা, নিজেদের উদ্যোগে। মূলতঃ আক্রোবাটিক শিক্ষা দেওয়া হত। তিনজন প্রশিক্ষক ও দুজন মহিলা কর্মী , স্থানীয় বাসিন্দা, যাঁরা দীর্ঘদিন সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, প্রাণপণে লড়াই করছিলেন টিকিয়ে রাখার জন্য। শিক্ষার্থীদের দিনের বেলায় স্থানীয় স্কুলে পড়াশুনা, সকাল ও বিকেলে অনুশীলন। ন’জন শিক্ষার্থী জুটেছিল- ছ’জন ছাত্র, তিন জন ছাত্রী। শুরু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে প্রশিক্ষকদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। কেরালা সরকার সিনেমাহলের ভাড়া ও ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ও খাদ্য সংস্থানের দায়িত্ব নেয়। ২০১১-১২ অ্যাকাডেমিক বছরে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তির জন্য প্রথম সারির সংবাদপ্ত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। একটিও আবেদন পত্র জমা পড়ে নি। সার্কাস-মালিকরা উত্তর ভারত থেকে বারো জনকে নিয়ে এসেছিলেন নিজেদের উদ্যোগে। এই আকাদেমিতে সার্কাসের ট্রেনিং নেওয়ার পাশাপাশি তাদের স্থানীয় স্কুলে প্রথাগত পড়াশোনা র ব্যবস্থা করা হয়। ২০১৫ সালে ঝাঁপ বন্ধ করে দিতে হলো। সার্কাস প্রশিক্ষণের স্কুল খোলার চেষ্টা হয়েছীল কলকাতাতেও। অলিম্পিক সার্কাসের মালিক সুবোধ ব্যানার্জি দক্ষিণেশ্বরে একটি সার্কাস ট্রেনিং স্কুল খুলেছিলেন। সদস্যের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সার্কাসের ভারত্তোলক শ্রীরামপুরের শান্তি দত্তও প্রশিক্ষণ স্কুল খুলে চেষ্টা করেছিলেন। সেটিও বন্ধ করে দিতে হয়।
১৯৬৯ সাল নাগাদ এল আই সি একশো কুড়িটি সার্কাসের কুড়ি হাজার শিল্পীদের বীমার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিলেও, শিল্পী ছাড়া সার্কাসের যে বিপুল কর্মী তারা রয়ে গেল বীমার বাইরে। আবার ১৯৮১ সালে ব্যাঙ্গালোরে ভেনাস সার্কাস আগুনে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বীমার সুবিধা মেলে নি। পরবর্তীকালে ইন্সুরেন্সের প্রিমিয়াম এতটাই বেড়ে যায় যা সার্কাসের শিল্পীদের বহন করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। বিপজ্জনক কাজের জন্য ক্ষতিপূরণের সাহায্যটুকুও সার্কাস শিল্পে মেলে না। আর্থিক সঙ্কটে ব্যঙ্কগুলির কাছে ঋণ গ্রহণের কোনো ব্যবস্থা সরকারিভাবে প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হয় নি। সার্কাস কোম্পানিগুলি ভারত সরকারের জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী বাঘ সিংহ সহ সমস্ত পশু বনদপ্তরের হাতে তুলে দিয়েছে। এর ক্ষতিপূরণস্বরূপ কোম্পানিগুলিকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। একটিও বৈঠক হয় নি সে কমিটির।
১৯৮২-র এশিয়াড গেমসের আগে সার্কাসকে মিনিস্ট্রি অফ কালচার থেকে বের করে মিনিস্ট্রি অফ স্পোর্টসে স্থানান্তরিত করা হলো। এই স্থানান্তরের ফলে এতদিনের পাওয়া ছাড় ও ভর্তুকি থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল সার্কাস শিল্প। সরকারি সংস্কৃতির ধারাপাতে বাদ গেল শরীর-সংস্কৃতি, প্রান্তজনের শিল্পকলা। ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গিয়েছে সার্কাসশিল্পীরা। ১৯৬৯ এর দিকে যে সার্কাসশিল্পে দু লাখ শিল্পী ছিল, আটের দশকের শেষে সংখ্যাটা হয়ে গেল কুড়িহাজার।
পাঁচ ছয়ের দশকে বাঙ্গালার ব্যায়ামবীরদের আদলে মহিষাসুরের মূর্তি গড়তেন কুমোরটুলির শিল্পীরা। উত্তর কলকাতার সিমলা ব্যায়াম সমিতি প্রবলভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে বাঙালির শরীরচর্চায়। বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায় কলকাতা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি ছাত্রদের জন্য গড়ে তোলেন ব্যায়ামাগার। মেডিকেল কলেজগুলির ছাত্রদের জন্য। প্রতি বছর আয়োজন করা হত ব্যায়াম প্রতিযোগিতা। নয়ের দশক থেকে বদলে যায় ব্যায়ামের প্রথাগত, চিরাচিত ধারণা। বিশ্বায়ন, উদার অর্থনীতির হাত ধরে জন্ম নেয় মাল্টি জিমের ধারণা। একে একে বন্ধ হয়ে যায় কলকাতার আখড়াগুলি। হারিয়ে যায় বাংলার প্রাচীন ব্যায়াম চর্চা। পাঁচ ছয়ের দশকে বাংলার যে আখড়াগুলি, মহারাষ্ট্রের অশ্বারোহণ শিক্ষার কেন্দ্রগুলি বা কেরালার মাস্টার আর্ট কালেরি প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠানগুলি একসময় সার্কাসে শিল্পীদের যোগান দিত, সেগুলি বন্ধ হবার ফলে শিল্পীদের ঘাটতি দেখা দিল। সার্কাসের তাঁবুতে যে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা ওস্তাদদের কাছে ভবিষ্যতের শিল্পী হওয়ার প্রশিক্ষণ পেত, শিশুশিল্পীদের সার্কাসের পেশায় প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে সে রাস্তাও বন্ধ হলো।
সার্কাসশিল্পের প্রতি বৈমাতৃসুলভ আচরণ সকল স্তরে। রাজ্য পরিবেশ দপ্তর ও স্থানীয় অধিবাসীদের আপত্তিতে কলকাতার পার্ক সার্কাস বা টালাপার্কে ২০১২ সালে কোনো সার্কাস প্রদর্শনী করা যায় নি। সার্কাসের পর মাঠের অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে, সার্কাসদলগুলির কাছে প্রাপ্ত রাজস্ব আদায়ে, মাঠের অবস্থার পুন্রুদ্ধার ও সবুজায়ন করতে পারে না, অভিযোগ কলকাতা কর্পোরেশনের। এছাড়াও রয়েছে বিপুল অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল। ২০১২ সালে মাঠ ভাড়া দেওয়ার জন্য কলকাতা পৌরসভার ডাকা টেণ্ডারে সার্কাসদলগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ দর ওঠে পাঁচ লক্ষ টাকা। প্রতিবছর কলকাতার বিভিন্ন পার্কে, মাঠে, মেলা ও খেলায় , দুর্গাপুজোর উৎসবে সরকারি ব্যয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তবে আশার কথা, ২০১৪ সাল থেকে সার্কাসের জন্য বন্ধ থাকা পার্ক সার্কাসে এগারো বছর পর আবার তাঁবু পড়ার কথা ২০২৫ এর ডিসেম্বরে। সেই টেণ্ডারে অংশগ্রহণ করে মাত্র তিনটি সার্কাসদল- কোহিনুর, প্রভাত ও অজন্তা। সর্বোচ্চ দর দেয় অজন্তা সার্কাস- ৩০,০২,৭৮৬ টাকা। অজন্তা সার্কাসের সিনিয়র ম্যানেজার রবিউল হকের কাছে তা ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা’।
————————————————————-
১৯২০-র দিকে যে সব সার্কাসদল তৈরী হয়, স্বাধীনতার পর তাদের মধ্যে কিছু দল টিকে থাকে। ১৯২০ সালে কীলেরি কুনহিকান্নানের ছাত্র গোপালন গ্রেট রেমন সার্কাস তৈরী করেন। এরপর ন্যাশনাল সার্কাস, ভারত সার্কাসও তাঁর উদ্যোগে তৈরী হয়। তাঁর শেষ উদ্যোগ অমর সার্কাস ২০১০ সালে তাঁবু গোটায়। গোপালনের সাফল্যের মূলে ছিল স্বাধীন ভারত সরকারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল গোপালনের রেমন সার্কাস। মধ্য প্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে গ্রেট রেমন সার্কাসদলকে সাহায্য করে সরকার, তাতে সরকারের বিশেষ আর্থিক খরচ ছিল না। ঐ দেশগুলির উৎসবের সময়টাকে গ্রেট রেমন সার্কাসের সফরসূচীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকারি তরফ থেকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল ট্যুর প্ল্যানে- পাকিস্তানে দু’মাসের সফর শেষে অগস্টে আফগানিস্তান, সেখানে তখন ‘জসন’ উৎসব। সেখান থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ইরান। ইরান ও ইরাকে শীতের সময়টা কাটিয়ে ইজিপ্ট, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল। তারপর টার্কি। টার্কি ও তার সন্নিহিত দেশগুলিতে গ্রীস্মের সময়টা কাটানো। সেই ট্যুর প্ল্যানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ১৯৫৬-র সেপ্টেম্বর অক্টোবরে সিরিয়ার বার্ষিক দামাস্কাস মেলায় যায় রেমন সার্কাস। সেখান থেকে লেবানন। ১৯৫০এর বছরগুলিতে ভারতীয় সার্কাস এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হয়ে ওঠে বিশ্বসার্কাসের মানচিত্রে। স্বাধীনতার পর প্রথম যে বড়ো সার্কাসদল তৈরী হলো সেটি হলো জেমিনি সার্কাস, ১৫ই অগস্ট,১৯৫১ সালে, গুজরাটের বিল্লিমোরিয়ায় billimoria, সার্কাস ব্যবসায়ী ও অ্যাক্রোব্যাট এম ভি শঙ্করণের উদ্যোগে। ১৯৬৪ সালে শঙ্করণ রাশিয়ায় আন্তর্জাতিক সার্কাস উৎসবে ভারতীয় সার্কাস দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
সার্কাসের এই জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ভারতীয় সার্কাসের সূচনা লগ্ন থেকে রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিত করেছিল সার্কাসতাঁবুতে। তাতে সার্কাস ভারতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠার মান্যতা পেল ঠিকই কিন্তু উত্তর-স্বাধীনতা যুগে রাষ্ট্র সরাসরি হাত বাড়ালো না এই সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে, সেখানে উদাসীনতাই প্রকট, ছত্রচ্ছায়া নেই। মাঝে মাঝে সার্কাস-মালিক বা শিল্পীদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার জুটলেও, ২০০৪ সালের ২৪নভেম্বর দিল্লীর তালকোটরা স্টেডিয়ামে ঘটা করে ভারতীয় সার্কাসের ১২৫ বছর উদযাপন হলেও, সার্কাসশিল্প রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বলয় বা পৃষ্ঠপোষকতা পেল না, যে পৃষ্ঠপোষকতা স্বাধীনতার আগে দেশীয় রাজা মহারাজা, ধনী ও সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের কাছ থেকে এসেছিল। বাজারের হাতে সার্কাস শিল্পকে সম্প্রদান করেই রাষ্ট্র তার দায়িত্ব শেষ করল। যদিও কূটনৈতিক সম্পর্কের আদান প্রদানে, রাশিয়ার সাথে সাংস্কৃতিক আদান প্রাদানে,সার্কাস ব্যবহৃত হলো কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ভারতীয় সার্কাসর পরিকাঠামোগত উন্নয়নের খসড়া পেশ রাষ্ট্রের কাছে ফাইলবন্দীই রয়ে গেল। ১৯৫২ সাল থেকে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির মাধ্যমে সরকার পাশে দাঁড়িয়েছিল শিল্পীদের, শিল্পী হিসেবে মর্যাদা দিয়েছিল, সার্কাস নিয়ে এমন কিছু হয় নি, সবটাই ছিল পিঠ চাপড়ানি। সার্কাস নামক প্রান্তিক শিল্পের প্রান্তজনেরা উৎসাহ ছাড়া বিশেষ কিছু পায় নি রাষ্টের কাছে।
১৯৫০-এর ঠাণ্ডা যুদ্ধের বিশ্বে রাশিয়ার সাথে সাংস্কৃতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ভারতীয় ও রাশিয়ার সার্কাসের প্রতিনিধিদের আদানপ্রদান, মিলিত প্রদর্শনী জনমানসে হিল্লোল তুললেও ভারতীয় সার্কাসের কোনো সুবিধা হয় নি। ১৯৬২ সালে ভারতীয় পার্লামেণ্টে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী হুমায়ুন কবীর ঘোষণা করেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সার্কাস সংস্কৃতির আদানপ্রদান হবে। সোভিয়েত থেকে একজন প্রশিক্ষক আসবেন যিনি ভারতীয় শিল্পীদের একদিকে রাশিয়ার সার্কাসশিল্পের কলাকৌশল শেখাবেন অপরদিকে তিনিও ভারতীয় শিল্পীদের কাছ থেকে ভারতীয় কলাকৌশল শিখবেন। একজন ভারতীয় যাদুকর এবং কয়েকজন সার্কাসশিল্পী রাশিয়ায় তাঁদের কলাকৌশলের প্রদর্শনী করবেন। জেমিনি সার্কাস মনোনীত হলো তিন মাসের রাশিয়া সফরের জন্য। ১৯৬৩ সালে তিন মাসের জন্য রাশিয়ান শিল্পীদের একটা দল এলো ভারতে তাদের প্রদর্শনী নিয়ে।এর ফলে সার্কাস-মালিকরা ১৯৮০ পর্যন্ত সার্কাস থেকে ভালো আর্থিক লাভ পেয়েছিল টিকই, কিন্তু এই জনপ্রিয় শিল্পকে শুধুমাত্র বক্স অফিসের কালেকশনের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছিল।স্বাধীনোত্তর ভারতের সার্কাসদলগুলিতে সোভিয়েত শিল্পীদের যোগদান ভারতীয় সার্কাসকে জনপ্রিয় করেছিল, লভ্যাংশ দিয়েছিল। এক সময়ের ঔপনিবেশিক ভারতে সার্কাসদলগুলিতে ইউরোপীয় শিল্পীদের জায়গা নিয়েছিল রাশিয়ানরা। সার্কাসীয় খেলাধুলার কলা কৌশলের কথা বাদ দিলে ভারতীয় সার্কাসে সোভিয়েতের প্রভাব ঐটুকুই। সার্কাস যৌথ খামারের এক কল্পলোক হয়েই রয়ে গিয়েছে, ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতিতে তাকে লালন পালনের কোনো আগ্রহ দেখায় নি রাষ্ট্র। ফলে বাজারের নিয়ম মেনে সার্কাসের মুষ্টিমেয় কিছু শিল্পী যথেষ্ঠ উপার্জন করলেও, সংখ্যগুরু সার্কাসকর্মী, যারা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে একদিন উঠে এসেছিল সার্কাসের এরিনায়, প্রতিদিন চরম ঝুঁকির জীবন ও যাপন কাটাতে কাটাতে তারা নিম্নবিত্তই রয়ে গেল, সার্কাসের তারকা শিল্পীও সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে হয়ে গেল নিছকই একজন দীনহীন শ্রমিক। ভারতীয় সার্কাসের প্রবাদপ্রতিম হর্স রাইডার মিস সারদাম্মা ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান। প্রায় কপদর্কহীন অবস্থায় মারা যান ভারতীয় সার্কাসের প্রথম মোটরকার জাম্পার সুকুমার বোস। সরকারি স্তরে কখনোসখনো কোনো অনুদান, পেনশন বা পুরস্কার সার্কাসশিল্পীর কাছে নিছক কৌতুক হয়ে দাঁড়ায়।
আইনী ভাষায় ‘বিপজ্জনক শিল্প’-র তকমা পাওয়া ভারতীয় সার্কাসের তাঁবুতে যেমন শিশুশিল্পীর অনুপস্থিতি ভবিষ্যৎ শিল্পীর উঠে আসায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল তেমনি বন্যপ্রাণী নিষিদ্ধকরণে সার্কাস হারাল তার জৌলুস, মনোরঞ্জনী আকর্ষণ শক্তি। ভারতীয় সার্কাসের প্রবাহ ফল্গু ধারায় পরিণত হবার পথে তারা অনুঘটকের কাজ করল। ডিমনিটাইজেশন আর এক অনুঘটক, অসংগঠিত ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতায় প্রান্তিক শিল্প হয়ে ওঠা সার্কাসশিল্পের ১৪০ বছরের নড়বড়ে তাঁবুগুলির কানাত ছিঁড়েখুঁড়ে দিল। বিদেশী শিল্পীরা অনেকে ভারতের দিকে মুখ ফিরিয়ে মধ্য প্রাচ্যের দিকে চলে গেল।
সার্কাসদলগুলি একে একে বন্ধ হয়ে যাবার ফলে শিল্পীদের এক সার্কাস থেকে অন্য সার্কাসে যাবার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ল। সার্কাসের পেশা থেকে অন্যান্য কাজকে পেশা হিসেবে নেওয়ার দিকে আগ্রহ বাড়ল, তা দেশেই হোক বা মধ্য প্রাচ্যের শ্রমবাজারেই হোক, সেই অন্যান্য পেশাকে তারা সার্কাসের থেকে বেশি সম্মানযোগ্য ও সুরক্ষিত ভাবল। এমন কি ১৯৭০-এর দিকে দক্ষ মালোয়ালি শিল্পীদের একাংশ ভ্রাম্যমান সার্কাস জগতকে বিদায় জানিয়ে প্রায় অর্ধেক রোজগারে বিড়িশিল্পেও কাজ নিয়েছে পরিবারের সাথে থাকার জন্য এবং একটা সুস্থির জীবনযাপন ও নিয়মিত রোজগারের তাগিদে। নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা দুবাই, কাতার পাড়ি দিল শ্রমিকের কাজে। ২০২৫ সালের রায়ান সার্কাসের ম্যানেজার রাজেশবাবুর অভিজ্ঞতা, উত্তরবঙ্গের অনেক সার্কাসশিল্পীই শিলিগুড়ির শপিং মলে, দোকানে কাজ নিয়েছে এবং তারা সার্কাসতাঁবু ছেড়ে খুশিমনেই কাজ করছে।
বিষনুপন্থ ছত্রে, কীলেরি কুনহিকিনান বা প্রিয়নাথ বসুর মতো নেতাদের হাতে ভারতীয় সার্কাসশিল্পের সূচনা ও প্রসার হলেও ভারতীয় সার্কাস মধ্য বা উচ্চবিত্ত আশা আকাঙ্খার বা নান্দনিকতার অংশ হয়ে ওঠে নি, নিম্নবিত্তের টিকে থাকার তাঁবু হয়ে গিয়েছে। মেয়েদের পাচার হয়ে যাওয়ার রক্ষাকবচের কাজ করেছে যে সার্কাসের তাঁবু, ক্যানিং গোসাবার যে সমস্ত অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মেয়েরা সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে সার্কাসে যোগ দিয়েছে, মণিপুর বা নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক দুর্বৃত্তায়নে যে তাঁবু একটু আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার আশ্রয় দিয়েছে, সেই তাঁবুই পূর্বাশ্রমের ঘড়বাড়ি গাঁ গঞ্জ পরিচয়কে পিছনে ফেলে এসে স্বীকৃতিহীন এক শিল্পীজীবনকে সঙ্গী করে ধুঁকতে ধুঁকতে জীবন কাটাতে বাধ্য করছে। সমাজও এই শিল্পকে সস্তার শিল্প হিসেবে দেখেছে। মেয়েরা ‘সার্কাসের মেয়ে’ হয়ে গিয়ে সামাজিক সম্মানীয় প্রত্যাবর্তনের পথ হারিয়ে ফেলেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিল্পকলার প্রদর্শনীতে ঝলমলে পোশাকের নারীশরীরের শৈল্পিক কসরতে, ৪টে ৭টার তাঁবুর দর্শকের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে অনেক সময়ই। তাঁবুর বাতাসে নিষিদ্ধ গন্ধ। কোনো শৈল্পিক চেতনা বা তাগিদ নয়, সাধারণ আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের থেকে অনেক গুণ বেশি দৈহিক দক্ষতা ও মানসিক স্থিরতা নিয়ে সার্কাসের ছেলেমেয়েরা তাঁবুকে আশ্রয় করে আর্থসামাজিক দূরবস্থার কারণে। পেটের তাগিদে। রুজির খোঁজে। পরিবারকে টিকেয়ে রাখার দায়ে। গ্ল্যামার, শিল্পনৈপুণ্য, সম্মান একদিন ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক উদাসীনতায় পর্যবসিত হয়। সার্কাস ছেড়ে অন্য কোনো কাজে যোগ দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের আর থাকে না। সার্কাসের তাঁবুতে অনেকগুলো বছর মানে পেশা বদলের রাস্তা বন্ধ। স্বাধীনতা-পূর্ব বা উত্তর যুগের কিছু উদাহরণকে বাদ দিলে, ভারতীয় সমাজের সম্ভ্রান্ত বা অর্থনৈতিক বা শিক্ষাগতভাবে শক্তসামর্থ্য শ্রেণী সার্কাসকে পেশা করার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি, ভাবে না, সার্কাসের এই মৃতপ্রায় অবস্থায় তো নয়ই। রাষ্ট্র বা সমাজ চিরকাল প্রান্তিক করে রেখেছে এইসব শিল্পীদের, সার্কাসের উজ্জ্বল অধ্যায় বা মৃতপ্রায় অধ্যায়, সব যুগেই।
টেকনোলজি, বদলে যাওয়া সময় ধীরে ধীরে সার্কাসের প্রবাহকে ফল্গুধারার ভবিতব্য দিয়েছে। স্টিরিওর মতো অডিও সিস্টেমের ব্যবহার বা ডিস্কো মিউজিক সার্কাসের ধ্রুপদী ব্যান্ডকে বিদায় জানিয়েছে। সিনেমা টিভির বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা জনসাধারণ সার্কাসের মধ্যে পারিবারিক বিনোদনে খুঁজে পায় না আর। ক্ষণিকের অতিথি পেজার হয়ে মোবাইল, ইন্টারনেটের জগতে বিনোদনের উপকরণ ও ধরনটা পাল্টে গেল। মেট্রো শহরের মাঠগুলির ভাড়া আকাশছোঁয়া হয়ে গেল। খোলা মাঠগুলি যেখানে এককালে সার্কাসের আসর বসত, উন্নয়নের পথ ধরে হয়ে গেল মল, স্টেডিয়াম, মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং কমপ্লেক্স। ফাণ্ডের অভাবে সার্কাসের কার্পেট, তাঁবু শতচ্ছিন্ন হলো, হারাল দর্শকের আগ্রহ, উৎসাহ। সার্কাসের মূল আকর্ষণগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে সার্কাসদলগুলি চালানো কঠিন । বিদেশী সার্কাসশিল্পী দিয়ে কোনোরকমে সার্কাসীয় দিনগুজরান করে দলগুলি, মালাবার ও মণিপুরী শিল্পীরা টিকিয়ে রাখে ভারতীয়ত্ব। বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে প্রথম বা দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় থাকা সার্কাসের বিজ্ঞাপন ধীরে ধীরে ভেতরের পাতায় ছোটো হতে হতে বিলীন হয়ে যায় কালের প্রবাহে।
————————————————————–
সে বিলুপ্তির পথে কোভিডের ঢেউ আসে। ১৯৫১ সালের জেমিনি সার্কাস কোভিড পর্বের লক ডাউনের সময় কেরালা সরকারের কাছে আবেদন করে সাহায্যের, যাতে তাদের ব্যবসা বন্ধ না হয়ে যায়। জাম্বো সার্কাসের কিছু কর্মী ঘরে ফিরে গেলেও কাশ্মীর, নেপাল, রাশিয়ার শিল্পী ও কর্মীরা তাঁবুতে থাকতে বাধ্য হন। লক ডাউনের সময় র্যাম্বো সার্কাস বন্ধ হয়ে গেলে কর্মীদের খাবার জোটাতে তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শো শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গে চন্দ্রনাথ ব্যানার্জী অলিম্পিক সার্কাসের তাঁবু গোটাতে বাধ্য হলেন। শতাব্দী প্রাচীন গ্রেট বম্বে সার্কাস আর্থিক দৈন্যদশায় পড়ল। ৫০ বছরের পুরোনো অজন্তা সার্কাসের অনেক শিল্পীরা চলে গেল রাজমিস্ত্রির কাজে। অনেকে গ্রামে ফিরে গিয়ে চাষের কাজে লাগল। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৫০ শতাংশ দর্শক নিয়ে সার্কাস চালু করার অনুমতি দিলে কোনো লাভ ছাড়াই অজন্তা সার্কাস আবার চালু হলো, দু বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ এ। বন্যপ্রাণী নিষিদ্ধকরণের পর বিদেশী শিল্পী নিয়ে বেঁচে থাকা সার্কাসে কোভিডের সময় বিদেশী শিল্পীদের পাওয়া গেল না। ১৫০-২০০ সার্কাস কোভিডের কারণে বন্ধ হয়ে গেল। সার্কাস কর্মীদের মোবাইল ফোন রিচার্জের টাকা জোটানোও মুশকিল হয়ে গেল। যারা তাঁবুতে রয়ে গেল ডেলি লেবার হিসেবে এখানে ওখানে কাজ করে তাঁবুতে আসত রাত কাটাতে। ২০২৫ এর কৃষ্ণনগর বারোদোলের মেলায় রায়ান সার্কাসের তাঁবুতে বসে সার্কাসের তাঁবুতে জন্ম নেওয়া, সার্কাসেই বড় হয়ে ওঠা বারপ্লেয়ার জন,ম্যানেজার রাজেশবাবু বা পুরো জীবন সার্কাসে কাটিয়ে দেওয়া সত্তর ছুঁইছুঁই অন্ধ্রপ্রদেশের সার্কাসকর্মী, চব্বিশ ঘণ্টার ঘোষনায় ডাকা দো গজ দূরীর সরকারি সুভাষিতের লক ডাউন ও তার পরবর্তী দুঃসময়ের কথা ভুলে যেতে চান, শিউরে ওঠেন সে প্রসঙ্গে। কোভিড পরবর্তী সময়ে গুটিয়ে রাখা একের পর এক সার্কাসের তাঁবুগুলি, ছোটো বা বড়ো, আর পড়ল না গ্রাম গঞ্জ মফস্বল নগরের টিকে থাক মাঠগুলিতে, মেলায় বা উৎসবে।
টারজান সার্কাসের আর এক শাখা রায়ান সার্কাসের ম্যানেজার রাজেশবাবু। আটের দশকে এসেছিলেন এ জগতে। মুর্শিদাবাদের মোড়গ্রাম থানার এক গ্রাম থেকে। সে গ্রামের এক কিশোর সাহেব ঘোষ বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে সার্কাসে যোগ দিয়ে একদিন ঘোড়ায় চেপে এসে ঢুকলেন গ্রামে, ততদিনে তিনি যুবক। তাঁর হাত ধরে গ্রামের প্রায় পঁচিশ জন ছেলে সার্কাসে জীবিকা খুঁজে নিয়েছিল। আটের দশকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে দ্বারকা নদীর ধারের যুবকদের আড্ডা থেকে সার্কাসে ঢুকে পড়েছিলেন রাজেশবাবুও। ২০২৫ এর কৃষ্ণনগরের বারোদোলের মেলায় বসে বলে দিলেন একের পর এক প্রথম সারি, দ্বিতীয় সারির সার্কাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর। ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আর স্বপ্ন দেখেন না সার্কাসের ম্যানেজার থেকে শিল্পী। বাঙালি শিল্পীদের নিয়ে এখন আর সার্কাস চালানো যায় না। তাঁর দলের চল্লিশ জন শিল্পী ও কর্মীর মধ্যে বাঙালি আটজন, বাকিরা আসাম, নেপাল, অন্ধ্রপ্রদেশ বা মণিপুরের। মণিপুরি শিল্পীরাই বাঁচিয়ে রেখেছে সার্কাসকে। কলকাতার সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে প্রথমবারের জন্য শো করতে আসা র্যাম্বো সার্কাসেও মণিপুরী শিল্পীদের প্রাধান্য।
রায়ান সার্কাসের ম্যানেজারবাবু জানান, যেখানে ক্যাম্প বসে, তার পাঁচ সাত কিলোমিটারের মধ্যে প্রচার সেরে আশায় থাকেন, টিকে থাকার লড়াইয়ে থাকেন। নয় নয় করে এখনও কুড়ি পঁচিশটা সার্কাসদল পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে সে লড়াই জারি রেখেছে। মানুষ আর সার্কাস দেখতে চায় না, সময় নেই, আগ্রহও নেই। প্রতি বছর টিকিট বিক্রি কমছে। সার্কাসের টিকিট কাউন্টারের সামনে আর কচিকাচাদের সেই ভিড় দেখা যায় না। তারাও এখন আর বিনোদন পায় না সার্কাস থেকে। যখন এসব কথা হচ্ছিল তার কিছুদিনের মধ্যে কলকাতার সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে দ্বিতীয়বারের জন্য আসে র্যাম্বো সার্কাস দিন দুয়েকের প্রদর্শনীতে। এক প্রিয়জনকে সে খবর দিয়ে বলেছিলাম তার সাত আট বছরের বাচ্ছাকে দেখিয়ে আনতে। পরদিন সে এসে বলল, ইউটিউব ঘাঁটাঘাঁটি করে তাকে দেখানো হয়েছিল সার্কাসে কি ধরণের খেলা দেখানো হয়, বিশেষ উৎসাহ পায় নি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছোটো শহরের সেই পড়ুয়া। বদলে যাওয়া সময়ের প্রজন্মের কাছে সার্কাস আর বিনোদন নয়।
সার্কাসের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গিয়েছে অনেক আগেই। এখন শুধু অপেক্ষা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের। সার্কাসশিল্পীরাও জানেন ও মানেন তা। বারোদোলের মেলায় সার্কাসশিল্পী জনের সঙ্গে চায়ের দোকানে গল্পগুজবের ফাঁকে বেঞ্চিতে এসে বসলেন এক লটারি টিকিট বিক্রেতা প্রৌঢ । সেদিকে তাকিয়ে জন বলে উঠলেন, একটা টিকিট যদি লেগে যেত! প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলাম- লটারিতে কোটি টাকা পেলে কি নিজের সার্কাসদল খুলতেন? চোখ বড়ো বড়ো করে জন বলে উঠলেন- মাথা খারাপ, সার্কাসের জগতে কি আর আলো আছে! শুধুই অন্ধকার। তার আতঙ্কগ্রস্ত চোখমুখ বলে দিচ্ছিল এ শিল্পের ভবিষ্যৎ।
সে প্রান্তিক শিল্পের তাঁবুতে প্রান্তজনের পাওয়া করতালি মৃদু হয়ে গিয়েছে কবেই।
হাজারো ওয়াটের আলোর ঝলকানির মাঝে এখনও টিকে থাকা ভারতীয় সার্কাসের তাঁবুর ইতিকথা আসলে প্রান্তিক মানুষের শৈল্পিক লড়াইয়ের ইতিকথা, প্রান্তজনের করতালি।
