চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর। পর্ব ৭। দুর্লভ সূত্রধর
দীর্ঘকালীন গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের এক সামরিকশাসিত শহরে (যেখানে দর্জিশালার দেয়ালে নোটিশ সাঁটানো থাকে— ‘রাজনীতি নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ’) সেখানে তো বটেই, সমগ্র রাষ্ট্রনীতিতে ও সমাজকাঠামোয় সহিংসতার উপস্থিতি লক্ষ করেছেন মার্কেজ। মাঝে মাঝে আহাম্মকের এমন সন্দেহ হয় যে, মানুষসমাজ ঈর্ষা, স্বার্থপরতা, অকারণ অহংকার এবং নিছকই ব্যক্তিতান্ত্রিকতার চাহিদাসমূহের সমাহার। অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় মানুষের যূথ স্বভাব নিছক জৈবিকতার লক্ষণ ছাড়া আর কিছু নয়!
আসলে ঘরে সংসারে পরিবারে হাটে বাজারে ট্রেনে বাসে সামাজিক ও প্রাতিবেশিক পরিসরে সেই সংহিংসতারই এত বিচিত্র রূপ আহাম্মক দেখেছে যে তার থই পাওয়া মুশকিল।
দুর্বহ সময়ের চাপেই যেন রাত শেষ হয়ে আসে।
আলো ফোটার আগেই ডেকে ওঠে পাখির দল। বাগানের পেঁপে গাছটার ঝুলে যাওয়া পাতার ছাপালো ছায়া ঘরের দেয়ালে এসে পড়ে। অস্তগামী চাঁদে এখনও এতটা আলো আছে দেখে আহাম্মকের ধাঁধা লেগে যায়। এ কী চাঁদেরই আলো? না কি আকাশের নিজস্ব কোনো আলো আছে।
চলে যেতে যেতে এটুকু অন্তত আহাম্মক বুঝতে পেরেছে— মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্রের সংসারের মতোই মানুষ চায় অনেক উপগ্রহ নিয়ে নিজে শুধু গ্রহ নয়— বিগ্রহ হয়ে থাকতে। কেউ কারও অক্ষবৃত্ত ছেড়ে বেরোতে পারে না। কাছাকাছি হলেই সংঘর্ষ! অথচ কেউ কাউকে ছেড়ে যেতেও পারে না।
পা আর হাতের ক্র্যাম্পগুলোর জায়গায় আহাম্মক দ্রুত হাত দিয়ে ঘষতে থাকে, আরামে পা মেলে দেয় সামনের দিকে।
ঘরের খোলা জানালা দিয়ে ভোরের শিরশিরে বাতাস ভেসে আসে। বাতাসের সঙ্গে পাশের বাড়ির পগারের বাগান থেকে জংলাগাছের এলোপাথারি গন্ধ।
পরশুদিন একটু বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাগানটা এত এলোমেলো গাছপালায় ভর্তি, তার সঙ্গে লাভের আশায় বোনা বড়ো বড়ো সেগুন গাছ। মাটিতে সহজে রোদ পড়ে না। সেই কারণে পরশুদিনের বৃষ্টিভেজা আগাছার সোঁদা গন্ধ কটু এবং ঝাঁজালো।
সিলিকনের আবরণ দেওয়া ছিদ্রপথে চোখ রাখলে যেমন মোম-ধূসর আলো দেখা যায় তেমন অস্ফুট আলো দেখা দেয় জানালার বাইরে।
জেগে উঠছে চরাচর। হয়তো শিকারি বাজেরা মধ্যদিনে সুদূর আকাশে পাখা মেলবার জন্য এখনও ঝিমোচ্ছে। ভাগাড়-খেকো শকুনেরা মাংসের খোঁজে বেরোবার সময় হলো। প্যাঁচাটা ডাকে ক্ষান্তি দিয়ে গৃহস্থের দালানকোঠার কোঠরে, শস্যাগারের চালের বাতার নিচে, কিংবা পালেদের বাগানের একমাত্র মেহগনি গাছের ঘন পাতার আড়ালে আশ্রয় নিচ্ছে। বাদুড়গুলো বোধহয় হাওরের পশ্চিমপাড়ের মৃত নির্জনতায় সারাদিন দীর্ঘস্বননের মন্ত্র জপতে থাকা মড়িঘাটের পেছনের পাকুড় গাছটার আশ্রয়ে ফিরে গেছে।
শুধু দু-পেয়ে নিশাচরদের নেশা কাটে না।
এই ঘুমন্ত দিনের শুরুতে শহরের আনাচে-কানাচে নানাধরনের ডিল হতে থাকে নিরন্তর।
তবু আলো ফোটে। ভোর হয়।
জেগে ওঠে মানুষী আকাঙ্ক্ষার অপূরণীয় জগতের স্বপ্নকথা।
কুহু বার-দুয়েক নড়াচড়া করে, তারপর বিছানায় সটান উঠে বসে— ‘তুমি কতক্ষণ জেগে বসে আছ? পা ঘষছ কেন? আবার মাসল-ক্র্যাম্প হলো নাকি? অনেকদিন তো হয়নি, আবার হলো কী করে!’
এ কথার কোনো উত্তর হয় না।
— ‘এখন কি একটু কমেছে? আমাকে ডাকোনি কেন? একটু সেঁক দিয়ে দিলেই আরাম পেতে।’
— ‘তুমি ঘুমোচ্ছিলে। সারাদিন ঘুরেছ, পোস্টাপিসের নরক দর্শন করেছ। তোমাকে ডাকতে পারিনি। উঠে পায়চারি করেছি, তারপর থেকে বসে আছি।’
— ‘একা একা হাঁটলে! যদি পড়ে যেতে, গত এক মাসে দু-বার পড়েছ। বরাত ভালো হাড়গোড় ভাঙেনি। এখন তো ডাক্তারবাবু কোনো ব্যথার ওষুধও দিতে পারবেন না! এই সবে চিৎ হয়ে শুতে পারছ!’ কুহু একটু ঝুঁকে এল তার ক্র্যাম্প-ধরা পায়ের দিকে। এখনও বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুলটা একটু বেঁকে আছে।
— ‘তোমাকে ডাকলে তুমি ভয় পেয়ে যেতে। তুমি ফোন করে বসতে কাউকে না কাউকে। এবং সে রাত্রের ফোন ধরত না। কেননা তোমার ফোন মানেই তো রাতের বেলায় উটকো ঝামেলা! অন্যরা ফোন না ধরলে তোমার রাগ হতো, মিথ্যে অভিমান হতো। হয়তো ওপরতলার ছেলে আর বউমাকেই ডেকে বসতে! সাড়ে সাতটার আগে উঠলে তাদের শরীর খারাপ, মুড নষ্ট হতে না! লাভের লাভ কিছু নেই কষ্টের সঙ্গে সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখা সম্মানটুকুও যেত ফক্কা হয়ে! তার থেকে যেটুকু তোমার আমার দ্বারা হয় সেটুকুই হোক। মরণটা কী এমন বড়ো ব্যাপার। তুমি তো জানো, আমি বরাবর বলে এসেছি— কোনোটাই শুধু মেয়েদের বা ছেলেদের সমস্যা নয়— ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সমস্যা সকলেরই এক। ‘স্ত্রীর পত্রে’ মৃণাল যেমন বলেছিল না— জীবন আমাদের কীই-বা যে মরণকে ভয় করতে হবে?’
কুহু কোনো কথা না বলে পা-দুটো পরীক্ষা করতে করতে লাগল— ‘তোমার এমন বোধ যতক্ষণ জারি থাকবে ততক্ষণ কোনো ভয় নেই। আমি বলছি তোমার কিচ্ছু হবে না, অন্তত এই রোগ তোমাকে কাবু করতে পারবে না। আজকে তো ডাক্তারবাবুর কাছে যাওয়ার কথা। মাসল-ক্র্যাম্পের কথাটাও ভালো করে বলতে হবে।’
মোবাইলে সময় দেখে বোঝা গেল দিনের প্রথম ওষুধ খেতে তখনও ঘন্টাখানেক দেরি আছে। সুতরাং আহাম্মককে আবার শুতে বলে কুহু বিছানা ছাড়ল। নিজে বাথরুম ঘুরে এসে দুটো ভাঁজ করা শুকনো গামছাসহ ইলেকট্রিক ইস্ত্রিটা এক্সটেনশন কর্ড দিয়ে বিছানার মধ্য ফিট করে দিয়ে গেল।
ইস্ত্রি আর গামছা গরম হওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করতে করতে আহাম্মক জানালার বাইরে তাকাল। বেশ আলো ফুটেছে। একটি দুটি টোটো যাচ্ছে। বেশিরভাগই তরকারির বোঝা, আনাজের পোঁটলা-পুঁটলি বোঝাই করে একটা দুটো করে মানুষ নিয়ে চলেছে।
বাজারগামী টোটোগুলোকে দেখেই খেয়াল হলো— আজ একবার যেভাবেই হোক বাজার যেতেই হবে।
রোদে ভার্টিগোজনিত মাথা ঘোরে বলে খুব বেশি বাজার যাওয়া হয়ে ওঠে না তাদের। তবু টুপি, ছাতা নিয়ে যেতেই হয় সপ্তাহে অন্তত একটা দিন।
গতকালই তাকে আর কুহুকে বাজারে যেতে হয়েছিল। সেখানেই একশো টাকার পুঁটি মাছ নিয়েছিলেন মোটা ঝানুর কাছ হতে। ঝানুকে দিয়েছিলেন দুশো টাকার একটা নোট। কিন্তু বাড়ি ফিরে পকেট থেকে ফিরতি টাকা বের করে ড্রয়ারে রাখতে গিয়ে দেখা গেল তার মধ্যে দুটো দুশো টাকার নোট আছে। স্পষ্ট মনে আছে তার কাছে একটাই দুশো টাকার নোট ছিল। এবং সেটা ঝানুকেই দেওয়া হয়েছিল। সমস্ত জিনিসের দামের মোটামুটি হিসেব কষেও তিনশো টাকার মতো বাড়তি দেখা গেল। অর্থাৎ ঝানু দুশো টাকার নোটটাকে পাঁচশো টাকার নোট মনে করে চারশো টাকা ফেরৎ দিয়েছে। সেটা খেয়াল না-করেই সে পকেটে রেখে দিয়েছে।
কুহু বলেছিল পরে আর একদিন বাজারে গিয়ে হিসেব মিলিয়ে দিলেই হবে। বলেছিল যে, ঝানু ব্যাটাকে একটা পয়সাও ফেরৎ দেওয়া উচিত নয়। কেননা, তাদের ছেলের বিয়ের সময় মাছের বরাত নিয়ে ঝানু দামে, ওজনে এবং কাটাকুটিতেও তাদের ঠকিয়েছিল।
এটা ঝানুর ভুল, ভুগুক ব্যাটা!
কিন্তু আহাম্মক তো আহাম্মকই। গতকাল সারাদিন ভুল সংশোধনের জন্য সে ছটফট করেছে। দশবার কুহুকে বলেছে। আজকে গিয়ে টাকাটা ঝানুকে ফিরিয়ে দিতেই হবে।
জানালার ভেতর দিয়ে যতটা বোঝা যায় ততটা বুঝবার চেষ্টা করল আহাম্মক। মনে হলো একটু মেঘলা আছে আকাশ। আজ একটু রোদ কম হলে বাঁচা যায়!
সত্যিই কী বাঁচার মতো যায়!
(ক্রমশ)
