চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর। পর্ব ৫। দুর্লভ সূত্রধর

গত পর্বের পর

লোকটি ছিল সাবাস।

[এটি মানুষটির নাম, নাকি তাঁর নেতিবাচক গুণাবলীর একটি ব্যঙ্গাত্মক সাধারণ পরিচয় তা বলা যায় না। কেননা এই রচনায় মার্কেজ কর্নেল ও তাঁর স্ত্রী ব্যতিরেকে সাধারণভাবে চরিত্রগুলির বৈশেষিক নাম ব্যবহার করে ছিলেন বলে মনে হয়। স্প্যানিশ ‘সাবাস শব্দের অর্থ ‘(আপনি) জানেন’ বা ‘জানতেন’। স্প্যানিশ ‘সাবিয়াস’ শব্দের অর্থ জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান, বিদ্বান, বুদ্ধিমন্ত, ঋষিপ্রতিম ইত্যাদি। কিন্তু কতটা শ্লেষার্থে মার্কেজ এই রচনায় শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা আহাম্মকের পক্ষে বলা কঠিন। কেননা, ‘ডন সাবাসের মতো ন্যায়নীতিহীন বিবেকবর্জিত’, ‘যে ডন সাবাস রাজনৈতিক সহকর্মীদের কথা পুলিশকে জানিয়ে তার বিনিময়ে অন্যায় ও অসাধুভাবে বড়োলোক হয়েছে’ (সৌভিক ঘোষাল : গার্সিয়া মার্কেসের যুগ্ম উপন্যাস : ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ ও ‘অশুভ লগ্ন’, অন্য স্বর, ফেব্রুয়ারি ২০২৩) তার নামেও শ্লেষই প্রাপ্য]— এই লোকটিই ছিল কর্নেলের শহীদ পুত্র অগাস্টিনের একদা ধর্মবাপ! অগাস্টিনদের দলের এক জীবিত নেতা, যিনি রাজনৈতিক নিপীড়ন এড়িয়ে এখন এই শহরেই বড়োলোকের ঢঙে বাস করবার সুযোগ পেয়েছেন।

লোকটা প্রথম এই শহরে এসেছিল জড়িবুটি আর টোটকা বেচতে। গলায় জড়ানো ছিল একটা সাপ। আর আজ সরীসৃপের চলনের মতোই  মতোই সাবাসের কাজকর্ম। আজ দোতালা একটা বাড়িতেও সে তার সব টাকা আঁটাতে পারে না!

তবু কর্নেল সহায়তার জন্য ছাতার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানালেন।

তাঁদের একমাত্র রোজগেরে ছেলের মৃত্যু হয়েছে, সরকারের প্রতিশ্রুত পেনশনও পাননি, হাতের জমানো অর্থও শেষ…সংসারের এটা ওটা বেচে দিন চলছে।

তবু এই রচনায় নিরাশা ও আত্মসমর্পণের পরিবর্তে প্রতিরোধী স্পর্ধাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।

রাষ্ট্রীয় হিংসায় কর্নেলের নিহত পুত্র অগাস্টিনের উত্তরাধিকারস্বরূপ কর্নেলের ঘরে আছে ছেলের পোষা একটি লড়ুয়ে মোরগ।

কর্নেল সর্বতোপ্রযত্নে দারিদ্র্যের গ্রাস থেকে, লোভের দংষ্ট্রা থেকে, পত্নীর বিচলিত মন্ত্রণা ও জেদ থেকে মোরগটিকে রক্ষা করেন। নিজেরা খেতে না পেলেও  মোরগটির জন্য শস্যকণা, ভুট্টার দানা সংগ্রহ করেন।

মোরগটির ভুট্টাদানা ফুরিয়ে গেলে স্ত্রীর কাছে কর্নেল অর্থ চান। একদা অগাস্টিনের সেলাই মেশিনটা বেচে যে অর্থ পেয়েছিলেন, তার থেকে মাত্র পঞ্চাশ সেন্ট বেঁচে আছে। অগাস্টিনের নিষ্ক্রমণের পর গত নয় মাস সেই মেশিন বিক্রির পয়সাটুকু পেনি পেনি করে বা টিপে টিপে খরচ করে এই দম্পতি বেঁচে আছেন। আজ সকালেও ঘরে একবিন্দু কফি বা একটুকরো চিজ় পর্যন্ত নেই— মোরগটির জন্য ভুট্টাদানা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্ত্রী কর্নেলকে সেকথা মনে করিয়ে দেন।

অন্যান্য লোকেদের মতো কর্নেলের স্ত্রীও ক্ষুধার রাজ্যে গদ্যময় পরিপার্শ্বের দস্তুর মেনে নিয়ে মোরগটিকে বিক্রি করে দেবার জন্য কর্নেলকে বলেন। কর্নেল নিজেও জানেন এমন একটি লড়াকু মোরগের দাম এখন অনেক— কলম্বিয়ান কারেন্সিতে অন্ততপক্ষে পঞ্চাশ পেসো হবে। সেই অর্থে তাঁরা স্বামী-স্ত্রীর অনেকদিনের খরচ চলে যাবে। আর মাত্র তিন মাস— জানুয়ারিতেই মোরগ-লড়াই  অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বাচ্চারাও সেজন্য এখন থেকেই পয়সা জমাচ্ছে। তাঁদের মোরগটি যদি জেতে তো তার এতটাই দাম হবে যে, বাকি জীবনে হয়তো তাঁদের খাওয়াপরার কষ্ট হবে না।

কিন্তু কর্নেল কিছুতেই মোরগটিকে বেচতে পারেন না। এমন-কী মোরগটি বিক্রি করার জন্য স্ত্রীর আগ্রহের চাপে কর্নেল একবার মোরগটি বিক্রির বরাত বা অগ্রিম অর্থ নিয়েও তা ফিরিয়ে দেন।  মোরগটিকে তিনি প্রতিপালন করেন, লড়াইয়ের শিক্ষা দেন। মোরগটির মধ্যে দিয়ে যেন দারিদ্র্য, সরকারের প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, বা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে কর্নেলের প্রতিরোধ মূর্ত হয়ে ওঠে। এই প্রতিরোধে কর্নেল একা নন।— নিহত অগাস্টিনের দর্জির দোকানের সহকর্মীরা তো বটেই, শহর থেকে আসা পেশাসফল সদাশয় ডাক্তারবাবুটিও এই প্রতিরোধী প্রতিস্পর্ধায় কর্নেলকে সঙ্গ দেন। এই সহযোগিতা ও সহমর্মিতার জোরেই যেন কপর্দকশূন্য নিরন্ন কর্নেল আত্মবিক্রিত ডন সাবাসের কাছ থেকে মোরগটি বেচে দেবার জন্য বড়ো মাপের আর্থিক প্রস্তাব পেয়েও শেষপর্যন্ত তা ফিরিয়ে দিতে পারেন।

আর্থিকভাবে তো বটেই একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে কর্নেল ও তাঁর স্ত্রী সবদিক থেকেই নিঃস্ব, অকিঞ্চন হয়েছিলেন, কিন্তু তবু সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থানগত পরিসরে তিনি শূন্যতার বোধে আক্রান্ত ছিলেন না। এই ছোটো শহরের পরিচিত মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তার প্রমাণ আমরা পদে পদে পেয়েছি। সেই সঙ্গে কর্নেলের ছিল প্রখর আত্মসম্মানবোধ। ঘরে খাবার বা রান্নার মতো শস্য না থাকলে কর্নেলের স্ত্রী প্রতিবেশীদের ফাঁকি দিতে কোনো কোনো দিন শুধু পাথরই জ্বাল দিতেন, যাতে তাঁদের রান্নাঘরের চুলার ধোঁয়া দেখা যায়। নিজেদের কঠোর দারিদ্র্য ও অনাহারকে তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টায় প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখেন। কারও অযাচিত সাহায্য গ্রহণ করে নিজের দীনতাকে প্রকাশের ব্যাপারে কর্নেলের আত্মসংযম ছিল প্রবল।

ফলে অনার্ত সংক্ষোভে কর্নেলকে সমগ্র সম্বিৎ সমর্পণের মতো যন্ত্রণাক্লেশিত বিহ্বলতায় একালের কবির মতো— ‘গ্রাহ্য করো মানুষসমাজে’ (মজনু মোস্তাফা) বলে সংক্ষোভে দীর্ণ হতে হয় না।

চালাক, কৌশলী বা ধূর্ত লোকের কাছে এই ‘অনর্থক’ জেদের জন্য কর্নেল আহাম্মকদেরই মতো।

সমগ্র রচনায় গাব্রিয়েল মার্কেজ কর্নেলকে মর্যাদা ও সামাজিক আভিজাত্যের পরিসর দিয়েছেন। আমরা যাকে ‘অ্যাক্টসেপ্টেব্্ল ইনার অ্যারিস্টোক্র্যাসি’ বা ‘প্রতিগ্রাহ্য মনের বনেদিয়ানা’ বলতে পারি।

আহাম্মককে কিন্তু কেউ ডাকে না, কেউ আর পরিচিতের মতো হাসি বিনিময় করে না। কেউ বৃষ্টিতে ছাতা ধার দিতে চায় না, কেউ তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে না, রোদে বা বৃষ্টিতে কেউ তাকে ঘরের পৈঠায় দু-দন্ড দাঁড়িয়ে বা বসে বিশ্রাম করতে বলে না!

তার ফোনের পর্দায় অতীত যুগের, কিংবা প্রাগৈতিহাসিক কালের পরিচিত কারও বার্তালিপি ফুটে ওঠে না।

নিজের ফোনের রিংটোন ভুলে গেছে আহাম্মক।

দিনের পরে দিন চলে যায়, মেঘের পরে মেঘ জমে। বাতাসের বেগে মেঘগুলো উড়ে যায় বা ইচ্ছেমতো বৃষ্টি ঝরিয়ে দিয়ে যায় পিচ্ছিল শহরের পথে।

তার আর কুহুর বোনা কদম গাছটার অপরিণত কচি ডালে একটা বসন্তবৌরি দোল খাবার চেষ্টা করে। রাস্তার ওপারে বুনো ঝোপগুলোর মধ্যে বড়োজাতের কয়েকটা বক সকাল আর বিকেলের নরম রোদে চরে বেড়ায়। কারখানার পেছনের জমি পেরিয়ে বসতি ও পুরোনো কারখানার পরিত্যক্ত শেড পেরোলে হাইওয়ে, হাইওয়ের ওপারে দিগ্্মারির বিল। সেখান থেকেই সম্ভবত বিলভর্তি জল ফেলে পানকৌড়ি-দম্পতি বেড়াতে আসে রাস্তার পাশে জমে থাকা জলের সন্ধানে। ছাতারে আর দেশি ঘুঘুগুলো নিরন্তর খাবার খোঁজার মতলবে বাগানে ছড়িয়ে দেওয়া শস্যকণা ঠুকরে খেতে থাকে আর নিজেদের মধ্যে কাঁই-কিচির করতে থাকে।

সামনের রাস্তা দিয়ে কর্কশ শব্দ তুলে বস্তা বোঝাই এফ সি আইয়ের দশ চাকা বা ষোলো চাকার লরিগুলো সার বেঁধে নিয়ন্ত্রিত গতিতে চলে যায় গন্তব্যের দিকে।

লরিগুলো চলে যেতেই রাস্তায় রাস্তায় সম্ভাব্য শস্যদানার খোঁজে ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা ঝাপটে এসে যায় রাজ্যের গোলা পায়রা, শালিক, ছাতারে, ঘুঘু, কালোকুলো ফিঙের দল।

সামনের কারখানার পাঁচিল ঘেঁষে আপনজ্বালা দেশি পেঁপে গাছে একটা টিয়া এ-ডাল থেকে ও-ডালে উড়ে উড়ে পাকা পেঁপের অনুসন্ধান করে।

পেছনের বাড়ির আধবুড়ো খ্যাপা লোকটা প্রতিদিনের মতো একটা খবরের কাগজ হাতে করে প্রায় ছুটে চলে যায় পুবের বাজারের দিকে।

লাতিন আমেরিকায় বৃহত্তম তথাকথিত গণতান্ত্রিক গুন্ডামি চলতে থাকে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে, সোসাল মিডিয়ার পাতায় পাতায়  প্রতিদিন ছুটে আসতে থাকে আড়খ্যামটা মিথ্যাভাষণ।

প্যালেস্টাইনে শিশুহত্যা, নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণ, পররাজ্য ও সম্পদ গ্রাস করার নির্লজ্জ ও প্রকাশ্য চেষ্টা, রাজনীতিকদের ক্রমান্বয়ী গোপন কার্যক্রম আদৌ নিন্দিত হয় না কোথাও। বরং কখনও কখনও আশ্চর্য প্রচার-বিভ্রান্ত অজ্ঞতা, আত্মরতির নীরবতা বা স্বার্থদষ্ট সমর্থনে বৈধতা পেতে থাকে।

গাজ়া ভূখণ্ড, প্যালেস্টাইনসহ কত দেশ বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত হতে থাকে।

ল্যান্ডমাইনে উড়ে যান শত্রুদেশের রাষ্ট্রপ্রধান।

মাদক পাচারের মিথ্যে অভিযোগে আন্তর্জাতিক আইনের ও ভদ্রতার মাথায় জুতো মেরে অন্যদেশের রাষ্ট্রপতি ও আর তাঁর স্ত্রীকে তুলে আনা হয়।

মাটির কাছাকাছি পাক খেয়ে ড্রোন উড়ে যায় বিশ্বব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে।

রাষ্ট্রসংঘ বা জাতিসংঘ নির্বিষ সাপের মতো খোলস ছেড়ে শীতঘুম ভেঙে প্রস্তাব গ্রহণ করে।

আসামের জ়ুবিন গর্গ আর বাংলার রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় একইভাবে মারা যান।

জ়ুবিনের মৃত্যুতে ফড়ে আর দালালেরা কর্পোরেট প্রভুদের স্পনসর করা ধর্মধ্বনি দিয়ে ওঠে।

ডিটেনশন ক্যাম্পগুলির অদূরে তেকোণা গেরুয়া পতাকা উড়তে থাকে।

আর মন্ত্রী-সান্ত্রীরা কুমিরের কান্নায় জুবিনের অন্ত্যেষ্টি উজাড় করে দেয়।

মৃত্যুতেও ক্ষমতার দালালদের গদগদ ও বাষ্পাচ্ছন্ন গ্লিসারিন মাখা অশ্রুধারা চলকে ওঠে।

দেশ জুড়ে নেতা-মন্ত্রীদের বেচাকেনা চলতেই থাকে— ফুঁকে যায় কোটি কোটি টাকা। মূল্যবৃদ্ধির তুলকালামের মধ্যেও একটি জিনিসের দাম অদ্ভুত গণতান্ত্রিক ঐক্যের জন্ম দেয়— একটি ভোটের মূল্য ‘এক’-ই থেকে যায়— জ্ঞানী, পাপী, সাধু-সন্ত, বাবা-মহারাজ, মাতাল-দাঁতাল, মিহি অধ্যাপক, রঙ-মিলান্তি কবি-লেখক আর আমাদের পাড়ার পেঁচো মাতাল— সবার ভোটের দামই এক— কিন্তু ভোটবাজারে সকলের দাম এক আর থাকে। ঘন্টায় ঘন্টায় স্টক এক্সচেঞ্জের মতো তার চেহারা বদলে যেতে থাকে।

শহরের আনাচে-কানাচে লক্ষ টাকার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বেতালা খোল-করতাল-পাখোয়াজের আওয়াজ। প্রহরের পর প্রহর কঁকিয়ে কঁকিয়ে চলে অদীক্ষিতের শীৎকার।

ইস্কুলের মধ্যাহ্নাহারের আলু-সয়াবিনের তরকারির গন্ধ চাপা দিয়ে খিচুড়ির ভক্তিপূর্ণ সুবাস ফুৎকিয়ে ওঠে জনবসতির গোপন, প্রকাশ্য ও নিষিদ্ধ এলাকায় এলাকায়।

পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি ছোটে মোড়ে মোড়ে। চায়ের দোকানে ছেড়ে দেওয়া দালালেরা সকাল-বিকেল গুরুধ্বনি দিতে থাকে! আগুন জ্বলে ওঠে কাঁচাপাকা আলগা, অরক্ষিত পল্লির ঘরে ঘরে।

অন্ধকার নেমে এলে গামছায় মুখ ঢেকে কারা যেন বাড়ি বাড়ি সুনির্দিষ্ট নৈঃশব্দ্যের নির্দেশনা দিয়ে যায়।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply