আমাজনের পথে। হেনরি ওয়াল্টার বেটস। পর্ব ১। অনুবাদে সোমরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রথম অধ্যায়

১৮৪৮ সালের ২৬শে এপ্রিল, আমি মি. ওয়ালেসকে সঙ্গে নিয়ে, লিভারপুল থেকে একটি ছোট বাণিজ্যিক জাহাজে যাত্রা শুরু করি। আইরিশ চ্যানেল থেকে নিরক্ষরেখা পর্যন্ত বেশ দ্রুত পার করে আসার পর আমরা ২৬শে মে সালিনাসের উপকূলে এসে পৌঁছাই। পারা-অভিমুখী জাহাজগুলোর জন্য এটিই ছিল পাইলট-স্টেশন এবং আমাজন অববাহিকায় সিক্ত সেই সুবিশাল অঞ্চলের একমাত্র প্রবেশদ্বার। এই ছোট গ্রামে আগে জেসুইটদের একটি মিশনারি বসতি ছিল। এটি পারা নদীর কয়েক মাইল পূর্বদিকে অবস্থিত। তীর থেকে প্রায় ছয় মাইল দূরে উন্মুক্ত সমুদ্রে জাহাজটিকে নোঙর করা হয়। নদীর মোহনার চারপাশে বহু দূর পর্যন্ত জল অগভীর হওয়ায় এর চেয়ে কাছে যাওয়া নিরাপদ ছিল না। অতঃপর একজন পাইলটের জন্য সংকেত ওড়াতে হলো।

আমার সহযাত্রী এবং আমি দুজনেই এই প্রথম কোনো গ্রীষ্মপ্রধান দেশের সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণ করতে চলেছি। আমরা গভীর আগ্রহে সেই ভূখণ্ডের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এখানেই পরবর্তীকালে আমি অন্তত আমার জীবনের সেরা এগারোটি বছর কাটিয়েছি। এই ভূখণ্ডের পূর্বদিকটা আমার বিশেষ উল্লেখযোগ্য মনে হয়নি। ভূমি সামান্য ঢেউখেলানো; কোথাও কোথাও অনাবৃত বালিয়াড়ি, আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু গাছপালা। কিন্তু পশ্চিমদিকে, নদীর মোহনার দিকে এগোনোর সময়, আমরা ক্যাপ্টেনের দূরবীন দিয়ে দেখতে পেলাম জঙ্গলের এক দীর্ঘ রেখা যেন জলরাশির বুক থেকেই উঠে এসেছে। সুউচ্চ বৃক্ষের ঘন সন্নিবিষ্ট এক অরণ্য। প্রথমে গাছের সারি, তারপর বিচ্ছিন্ন বৃক্ষসমষ্টি, যা ক্রমে দূরে মিলিয়ে যেতে যেতে যেন একক বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। এই দিকেই শুরু হয়েছিল সেই সুপ্রাচীন অরণ্যের সীমানা, যা এই অঞ্চলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এর অভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে অগণিত বিস্ময়। এই স্থান থেকে আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মাইল বিস্তৃত সমগ্র ভূভাগকে এই অরণ্য তার সবুজ আবরণে ঢেকে রেখেছে।

পরদিন দিনভর এবং সারা রাত আমরা হালকা বাতাসে, কখনও বা জোয়ারের স্রোতে ভেসে, পারা নদী বেয়ে উজানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। সন্ধ্যার দিকে আমরা ভিজিয়া ও কোলারেস নামক দুটি জেলেদের গ্রাম পেরোই। এই যাত্রাপথে আমরা অনেক দেশীয় ডোঙা দেখতে পাই। সুউচ্চ অন্ধকার অরণ্যের নিচে সেগুলো খেলনা নৌকার মতোই ক্ষুদ্র বলে মনে হচ্ছিল। আর্দ্র বাতাসে ভারী হয়ে ছিল চারপাশ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন; আর সেই সঙ্গে দিগন্তজুড়ে অবিরাম বিদ্যুতের ঝলকানি। নিরক্ষরেখার এত কাছের কোনও দেশের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য প্রকৃতি যেন এভাবেই আমাদের অভিবাদন জানাচ্ছিল! শান্ত সন্ধ্যা। বছরের এই সময়ে বাতাস খুব জোরে বয় না। ফলে আমরা প্রায় নিঃশব্দে ভেসে চলেছিলাম। সম্প্রতি আটলান্টিক মহাসাগরে যে নিরবচ্ছিন্ন তোলপাড়ের মধ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, এই নিস্তরঙ্গ যাত্রা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হচ্ছিল। নদীর বিশালত্ব আমাদের গভীরভাবে বিস্মিত করেছিল। কখনও কখনও পূর্ব তীর থেকে আট-নয় মাইল দূরে নৌকো চললেও নদীর অন্য পাড় একবারের জন্যও আমাদের চোখে পড়েনি। আসলে, পারা নদীর মোহনায় এর প্রস্থ ছত্রিশ মাইল; আর সমুদ্র থেকে প্রায় সত্তর মাইল ভেতরে অবস্থিত পারা শহরের কাছে নদীটির প্রস্থ বিশ মাইল। তবে সেই স্থান থেকেই শুরু হয় একের পর এক দ্বীপের সারি, যার ফলে বন্দরের সামনের দিকের অংশে নদীটিকে খুব ভালো করে দেখা যায় না।

২৮শে মে সকালে আমরা আমাদের গন্তব্যে এসে পৌঁছাই। সূর্যের প্রথম আলোয় শহরটিকে অপূর্ব মনোমুগ্ধকর দেখতে লাগছিল। শহরটি একটি নিম্নভূমির ওপর গড়ে উঠেছে। কেবল দক্ষিণ প্রান্তে একটি ছোট পাথুরে উঁচু অংশ রয়েছে। তাই নদীর দিক থেকে শহরটির কোনও অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো ভিউ পাওয়া যায় না। তবু লাল টালির ছাদে ঢাকা সাদা বাড়িগুলি, গির্জা ও কনভেন্টগুলির অসংখ্য চূড়া ও গম্বুজ, আর ভবনগুলোর মাথার ওপর উঁচু হয়ে ওঠা তালগাছের মুকুট—স্বচ্ছ নীল আকাশের পটভূমিতে এত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল যে এসব দেখে আমাদের মন উৎফুল্ল হয়ে উঠল। স্থলভাগের দিকে শহরটি চারদিক থেকেই চিরসবুজ অরণ্যে ঘেরা। শহরতলির দিকে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে থাকা ছবির মতো বাড়িগুলি ঘন সবুজ পত্রপল্লবের আড়ালে প্রায় অর্ধেক লুকিয়ে ছিল। বন্দরটিতে ছিল দেশীয় ডোঙা এবং ছোট-বড় নানা ধরনের নৌযানের ভিড়। ঘণ্টাধ্বনি এবং রকেট ফাটার শব্দ শুনে মনে হল তারা হয়ত কোনো রোমান ক্যাথলিক উৎসবের সকালকে আহ্বান করছে। স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে যে, এত ভোরেই শহরের জনজীবন জেগে উঠেছে।

যথাসময়ে আমরা তীরে এসে নামলাম। জাহাজের কনসাইনি মি. মিলার আমাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন। উপযুক্ত বাসস্থান না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আমাদের তাঁর বাড়িতেই নিজের বাড়ি মনে করে থাকতে বললেন। তীরে পা রাখতেই মাটি ও চারপাশের দেওয়াল থেকে উঠে আসা উষ্ণ, স্যাঁতসেঁতে ও দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস আমাকে কিউয়ের গ্রীনহাউসগুলোর পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দিল। বিকেলের দিকে প্রবল এক পশলা বৃষ্টি হলো। সন্ধ্যায় বৃষ্টির ফলে আবহাওয়া কিছুটা শীতল হলে, আমাদের হোস্ট এক মার্কিন ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করানোর উদ্দেশ্য শহর থেকে প্রায় এক মাইল দূরে তাঁর বাসভবনের দিকে নিয়ে গেলেন।

সেই প্রথম পায়ে হেঁটে ভ্রমণের অনুভূতি আমার আজীবন মনে থাকবে। বন্দরের কাছাকাছি উঁচু, বিষণ্ণ, কনভেন্টসদৃশ অট্টালিকায় ঘেরা কয়েকটি রাস্তা অতিক্রম করার সময় আমরা এমন এক জগতের মধ্যে এসে পড়লাম, যেখানে মূলত বণিক ও দোকানিদের বসবাস। সেখানে অলস সৈন্যরা জীর্ণ ইউনিফর্ম পরে উদাসীন ভঙ্গিতে কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে; পুরোহিতেরা চলাফেরা করছে; মাথায় লাল রঙের জলভরা কলসি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা; বিষণ্ণ মুখে ইন্ডিয়ান নারীরা কোমরে উলঙ্গ শিশুদের বসিয়ে নিয়ে চলেছে, এই সব মিলিয়ে স্থানীয় জীবনের বিচিত্র এক রূপ চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। এরপর আমরা একটি দীর্ঘ ও সরু রাস্তা ধরে শহরতলির দিকে এগোলাম। কিছুদূর গিয়ে রাস্তা একটি ঘাসে ঢাকা খোলা প্রান্তর অতিক্রম করে এমন এক মনোরম পথের মধ্যে ঢুকে পড়ল, যা সোজা আদিম অরণ্যের দিকে চলে গেছে।

দীর্ঘ সেই রাস্তায় শহরের দরিদ্র মানুষদের বসবাস। বাড়িগুলি একতলা, অগোছালো এবং অত্যন্ত সাধারণ চেহারার। জানালায় কাচ নেই; তার পরিবর্তে বাইরে বেরিয়ে থাকা কাঠের জাফরি দেওয়া পাল্লা। কাঁচা রাস্তায় নরম বালিতে কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত পা ডুবে যায়। ঘরের সামনে অনেক মানুষ বসে সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করছে। ইউরোপীয়, আফ্রিকান ও ইন্ডিয়ান – অধিকাংশই এই তিন জাতিগোষ্ঠীর মিশ্র-বংশধর। তাদের মধ্যে কয়েকজন অত্যন্ত সুন্দরী নারীও ছিলেন। তাদের পোশাক অগোছালো; কেউ খালি পায়ে, কেউ বা ঢিলেঢালা স্যান্ডেল পরে। অথচ তাঁদের কানে ঝুলছিল সুন্দর অলংকৃত দুল, আর গলায় ছিল বড় বড় সোনার পুঁথির মালা। তাঁদের গভীর, অভিব্যক্তিভরা চোখ এবং ঘন চুল বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। হয়তো এ কেবল আমার কল্পনা, কিন্তু এই নারীদের দারিদ্র্য, প্রাচুর্য ও সৌন্দর্যের অদ্ভুত সহাবস্থান যেন চারপাশের সমগ্র দৃশ্যের সঙ্গে গভীর সামঞ্জস্য রচনা করেছিল। প্রকৃতির অফুরন্ত ঐশ্বর্য আর মানুষের দারিদ্র্য—এই দুই বৈশিষ্ট্য যেন একই ফ্রেমে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।

বাড়িগুলির অধিকাংশই ছিল জরাজীর্ণ। সর্বত্র আলস্য ও অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। আগাছায় ভরা বাগান ঘিরে থাকা কাঠের বেড়াগুলো ভেঙে পড়েছে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, আর সেই ফাঁক দিয়ে গলে শূকর, ছাগল আর রুগ্ন মুরগি অবাধে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত বৈসাদৃশ্যকে যেন মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিচ্ছিল চারপাশের সবুজে ছেয়ে থাকা অপরিমেয় সৌন্দর্য। বিশাল, গাঢ় সবুজ আমগাছের ঘন ছায়াময় মুকুট সর্বত্র বাড়িগুলোর মাঝখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। সুগন্ধি কমলা, লেবু এবং আরও নানারকম ট্রপিকাল ফলগাছ এক অনবদ্য সমারোহ সৃষ্টি করেছে। এদিক-সেদিক, গম্বুজাকৃতি ও গাঢ়বর্ণ গাছের ওপর দিয়ে উঠে গেছে তালগাছের মসৃণ স্তম্ভাকৃতি কাণ্ড, যার শীর্ষে সূক্ষ্ম খাঁজকাটা পত্রমুকুট রাজকীয় মহিমায় দুলছে। এদের মধ্যে বিশেষভাবে নজরে পড়ে আসাই গাছ। একসঙ্গে চার-পাঁচটি করে জন্মানো এই গাছের মসৃণ, কোমল বাঁকানো কাণ্ড কুড়ি থেকে ত্রিশ ফুট পর্যন্ত উঁচু; শীর্ষে পালকের মতো হালকা পাতার মুকুট, যার সৌন্দর্য ও সুষমা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

 

(ক্রমশ)

Leave a Reply