চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর। পর্ব ১০। দুর্লভ সূত্রধর
শুধু সময়জনিত শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে আহাম্মকদের কথা আলাদা। কেননা এই কারণে সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবদের কাছে হাসির খোরাক হতে হয়েছে। এবং নিজেকে চলতি হাওয়ার পন্থী না করতে পারার মাশুল দিতে হয়েছে নিয়মিত।
মাঝে মাঝে ‘ধুত্তেরি’ বলে কতবার চেষ্টা করেছি অন্যরকম হওয়ার, মানে নিজের মতো না হয়ে সকলের মতো হওয়ার।—পাঁচটায় মিটিং, চারটের সময় সেকশন অফিসারের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছি। সারাদিন চেয়ারে বসা শরীরটাকে ছেড়ে দিয়েছি বিছানায়। কিন্তু যতই পাঁচটার দিকে ঘড়ির কাঁটা এগিয়েছে তত নিজের ভিতরে অস্থিরতা, বিনষ্টির বোধ দানা পাকিয়ে গলদঘর্ম অবস্থা। অবশেষে পৌনে পাঁচটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে তড়িঘড়ি ইউনিয়নরুমে পৌঁছতে গলদঘর্ম অবস্থা।
নিজেকে স্বীকৃত আহাম্মক জেনে স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা ছেড়ে দেওয়াটাকেই সঙ্গত বলে মনে হয়েছে।
ফলত চাকরিজীবনের শেষদিন পর্যন্ত অফিস ও সংগঠনের কাজে সময়ানুবর্তিতার একতরফা খ্যাপামির অবসান হয়নি।
মানব-মহাজনেদের সামগ্রিক প্রজ্ঞালব্ধ উচ্চারণই আসলে প্রবচন বা প্রবাদ। এমনই এক প্রবচন ‘আপনি আচরি ধর্ম শিখাও অপরে’— মূল্যবোধের বহু-পরিবর্তনের মধ্যেও যা তার অস্তিত্বের টিকি-দাড়িটুকু রক্ষা করে এসেছে— কিন্তু আহাম্মককে কেউ অনুসরণ করেনি, সংশোধন তো দূরের কথা হয়নি— সময় কতটাই অন্যনিরপেক্ষ হিসেব চুকিয়ে দেয় সেই মূল্যমানও বোঝানো যায়নি কাউকে।
বস্তুত কাউকে কখনও কিছু শেখাতে যাওয়াটা বিড়ম্বনা মাত্র।
কারও নামে কখনও নালিশও করা নয়, নিজের ভালোত্বের বড়াইও নয়। শুধু বরাবর তীব্র ও সার্বিক ভাঙনের মধ্যে নিজে ঠিক রাখতে চাওয়া। সেটাই যেন এক বড়ো লড়াই! ব্যাপারটা ঘটে এক প্রবল অভ্যন্তরীণ অস্বস্তি থেকে।
নিজের লাভের জন্য সামাজিক মান্যতাকে ক্ষুণ্ণ করা ছিল সাধ্যাতীত। দু-একবার চেষ্টা করে দেখা গেছে— সে ভারি কষ্টের ব্যাপার— সারাদিন গা ম্যাজম্যাজ আর চোঁয়া ঢেকুর!
কিন্তু মানুষ তো স্বয়ম্ভূ নয়— তাকে চারপাশের কতকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। তার সরাসরি একটাই নাম হতে পারে আপোষ— মানানসই হয়ে থাকা। তার মধ্যে কত কিছু প্রশ্রয় পায়। বেঁচে থাকবার জন্য কত কিছুই না করতে হয়। সইতে হয়। এর থেকে কারও রেহাই নেই।
কত স্বেচ্ছাচারী ভ্রূকুটি ঘিরে থাকে অস্তিত্বকে। ক্রমেই বোঝা যায়— স্পেনীয় তথা আর্জেন্টনীয় মুক্তি আন্দোলন থেকে কিউবান বিপ্লব ছঁুয়ে বিশ্ববিপ্লবের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত চে গুয়েভারা কিংবা ‘ইস্পাত’ উপন্যাসের অনাপোষ বিপ্লবী পাভেল করচাগিন ‘হয়ে ওঠা’ আমাদের মতো ধূসর চরিত্রের আহাম্মকের পক্ষে অসম্ভব।
আবার একেবারে ঘরের কাছের মানুষ বুলু গুহের মতো সর্বংসহ কৌতুকের সঙ্গে জীবনকে গ্রহণ করার স্থিতিও আহাম্মকেরা অর্ঝন করতে পারে না।
চে গুয়েভারা তো দূরের কথা আমাদের অফিস কম্পাউণ্ডের মধ্যেকার মানুষের মতো মানুষ যাঁরা ছিলেন তাঁদের মতো মতো হওয়াও আমার পক্ষে একেবারেই সম্ভব ছিল না।
নিজে পারিনি, কিন্তু পারার মতো মানুষ তো হাতের কাছেই ছিলেন। অফিস-কম্পাউণ্ডের মধ্যেই বিমল ঘোষ বা গুরুপদ দে-র জীবন রোমহর্ষক উপন্যাসের থেকে কম কিছু ছিল না।
ক্রমেই নিজেকে ‘সাহস নেই তাই ভালো ছেলে’ বলে চিনতে পেরেও প্রতিটি অন্যায়, প্রতিটি আপোষ, প্রতিটি মিথ্যার একাকী অনুক্রম স্বস্তি দেয়নি কখনও। বুকের গভীরে বিঁধে থেকেছে কাঁটার মতো।
সম্ভবত এই প্রশ্নবিদ্ধ স্বস্তিহীনতাই প্রতিটি আত্মপরাজয়, প্রতিিট বঞ্চনাপ্রাপ্তি, প্রতিটি অস্বীকৃতি, ঘরে-বাইরে প্রতিটি আত্মগ্রাস, প্রতিটি দুর্ব্যবহার, সামূহিক পরিত্যাজ্যতার প্রতিটি নির্বাসনকে প্রাপ্য বলেই গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। শুধুমাত্র হীনতার গড্ডল-বন্যার মাঝে নিজেকে ঠিক রাখার আপ্রাণ ও অসম্ভব প্রয়াসে কেটেছে জীবনের প্রহরগুলি।
এই প্রয়াসের ফলাফল ছিল অদ্ভুত— যাকে শুধুমাত্র বিশ্বখ্যাত লাতিন প্রবাদপ্রতিম বাক্য ‘এক্স নিহিল নিহিল ফিট’ বা ‘শূন্য থেকে শূন্যই উদ্ভূত হয়’ বা ‘শূন্য থেকে কিছুই উদ্ভূত হয় না’-এর সঙ্গেই তুলনা করা যায়!
মুশকিলটা ছিল এই যে, আহাম্মকেরা চাকরিকে চাকরি বলে গ্রহণ করে না। চাকরিও তাদের কাছে অধিক কিছু— এক যুদ্ধকালীন মিশনের ব্যাপার— জীবন-মরণ সমস্যার মতো। প্রতিটি কাজ ও দায়িত্বই সৌকর্ষ ও সুনিপুণতার দিক দিয়ে সম্পন্নতা করার প্রশ্নটা তাদের কাছে এক লড়াই। আমাদের সমাজে— প্রায় প্রতিটি অফিসে, দপ্তরে মানুষের প্রত্যেকটি কাজের পেছনে যেমন নানাবিধ, নানা মাপের, নানা রঙের ফন্দিবাজির অদৃশ্য ছায়াবাজি আছে, তেমনি যেখানে সেখানেই ব্যক্তিগত লাভের অঙ্ক থেকে কাজগুলোকে বাঁচাবার আপ্রাণ প্রচেষ্টাও আছে। যার অনিবার্য ফল সকারণ উদ্বেগ, ষড়যন্ত্রমূলক বিরোধিতার সঙ্গে সহবাস, নির্ঘুম রাত্রিযাপন, প্রতিটি কাজে দক্ষতা ও নৈপুণ্য অর্জনের জন্য প্রাণান্তকর প্রয়াস, দমবন্ধ-করা সতর্কতা— যেন পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে বা কানপট্টিতে সর্বদা শীতল নলের স্পর্শানুভূতি!
কেউ বলেনি, কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি।
কেউ প্রশংসা করেনি, স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করেনি।
নিতান্ত উদাসীন সমাজ তা লক্ষ্যও করেনি।
পুরস্কার বা তিরস্কার— দুই পক্ষেই আহাম্মক পেয়েছে লবডঙ্কা!
সঙ্গে প্রাপ্তি— উপশমহীন উদ্বেগ! রাত্রে বিছানায় বসে থাকা। সুবিধাজনকতার অবিচল লক্ষে সমগ্র প্রতিবেশের নীরবতার অভূতপূর্ব ঐক্যের সামনে প্রতিদিন নতুন নতুনভাবে অভিভূত হতে হতে উদ্বেগজনিত রোগাবলী, বিলকুল ফ্রি।
বিমল ঘোষ বা বিমলদা সর্বজনপরিচিত হলেও সর্বজনপ্রিয় ছিলেন না। বরং বলা যায় বিমলদাকে সকলেই অপছন্দ না করলেও পছন্দও করত না। বিমল ঘোষ অফিসে থাকা মানেই অতিরিক্ত দেরি করে ওঁদের সেকশনের কেউ অফিসে ঢুকলে বিমলদার তুলকালাম। কোনো পারচেজ নোটিশে কোনোরকম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফাঁক-ফোঁকর থাকলে বিমল ঘোষ সেটা নিয়ে যে নোট দিতেন যে, তাতে হায়ার অফিসাররা— যাঁদের মধ্যে সবসময়েই শৈথিল্যের সাধারণ অন্ধত্ব কাজ করত— তারা পর্যন্ত কেঁপে যেতেন।
অফিসে বিমলদাই সম্ভবত একমাত্র লোক ছিলেন, যিনি কোনো ইউনিয়ন বা সংগঠনের সদস্য ছিলেন না।— কোনো গোষ্ঠীরও ধার ধারতেন না।
জীবনে বহুবার মেরে ফেলার মতো হুমকি, ফোনে ধমক দিেয়ও বিমল ঘোষকে ভয় খাওয়ানো যায়নি।
আমার মতো অনারোগ্য উদ্বেগ, অস্থিসন্ধির ক্ষয় আর তার থেকে জাত নিঃশব্দ-ঘাতক কালান্তক সব রোগ— কোনোটাই বাঁধাননি বিমলদা।
সন্ধের পর বাড়ি ফিরবার সময় বার-দুয়েক হামলা, দু-চারজন বন্ধুবান্ধবের বারণ, বউদির চোখের জল কোনোকিছুই বিমলদাকে বদলাতে পারেনি।
কেন জানি না, কোন কারণে আহাম্মকের সঙ্গে বিমলদার হিসেব-বহির্ভূত সখ্য গড়ে উঠেছিল। সম্ভবত বিমলদা আহাম্মকের সংশোধনের অযোগ্য আহাম্মকত্ব টের পেয়েছিলেন।
অফিসের নিয়ম-কানুন, সরকারি আইন, সংবিধান থেকে দেওয়ানি বিধি ও অফিস কোড সবই বিমলদার মুখস্থ ছিল। বয়স, চাকরির মেয়াদ ও পড়াশোনা— সবদিক থেকেই বিমলদার বহুদিন আগেই প্রোমোশন পেয়ে ডিপার্টমেন্টাল অফিসার হয়ে যাওয়ার কথা।
কিন্তু বিমল ঘোষ ছিলেন সব হিসেবের বাইরে। তিনি ইউডি ক্লার্ক হয়েছিলেন চাকরির পাঁচ বছরের মধ্যে। তারপর চাকরিজীবনের শেষদিন পর্যন্ত আর তিনি প্রমোশনের জন্য আবেদনই জানাননি। এই ধরনের অধিগৃহীত বা আধাসরকারি নিগমে কেউ না চাইলে তাকে নিজে নিজে প্রমোশন দেওয়ার কোনো আইন বা রীতি নেই। তাছাড়া অজস্র লোকের জনপিণ্ডে তৈরি এই সমাজে কে কার গোয়ালে ধোঁয়া দেয়!
সহকর্মীরা কেউ কখনও বিমলদার কর্মদক্ষতার প্রশংসা করেনি— সকলেরই ভয়— এই বুঝি কেউ তার যোগ্যতা স্বীকৃতি পেয়ে যাবে! অফিসারেররা বরং নিজেদের ক্ষতি ঠেকাবার জন্য বিমলদার পদোন্নতি চাইতেন। কিন্তু বিমল ঘোষ কতটা খতরনাক লোক— সেই প্রচারেও তাদের অরুচি ছিল না।
বার কয়েক বিমলদাকে জিজ্ঞেস করেছি কেন তিনি প্রমোশন নিচ্ছেন না।
বিমলদা যে উত্তর দিয়েছিলেন তার অর্থ উদ্ধার করা ছিল কঠিন। তিনি বলেছিলেন— ‘আমি স্থির করেছি জীবনে আর কারও কাছে কিছু চাইব না। বরং উঞ্ছবৃত্তিসঞ্চিত জীবনের এই ভিক্ষাঝুলি ত্যাগ করে একদিন চলে যাব। সুতরাং প্রমোশনের জন্য আবেদন-নিবেদনও করতে যাব না।’
সেদিন শিবুর গাড়ির দোকানে বাড়িয়ে রাখা ঝাঁপের মাথা ছুঁয়ে বিকেলবেলার শেষ রোদ িফরে যাচ্ছিল পশ্চিমের আমবাগানের দিকে। দশটা বিভাগ সমন্বিত আমাদের বিরাট অফিস ক্যাম্পাস ক্রমেই জনবিরল হয়ে এসেছে।
(ক্রমশ)
