চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর। পর্ব ৮। দুর্লভ সূত্রধর
কুহুর কথানুযায়ী পাজি ও ঠগি ঝানুর পয়সা ফেরৎ দেওয়ার জন্য এত ব্যস্ত না হলেও চলত।
কিন্তু আহাম্মকদের সে উপায় নেই। তাদের বোকামির মর্মমূলে জন্মাবধি ঔচিত্যের কাঁটা বিঁধে আছে।
আহাম্মককুলে একটামাত্র রসদ হলো এই ‘আমি’। সবেধন একটিমাত্র এই ‘আমি’। আমার সঙ্গ করতে করতে এত কালের মধ্যেও কুহু আহাম্মকিতে এখনও সিজিন্্ড্ বা পাকা হয়ে উঠতে পারেনি। তার মধ্যে তাও কিছু কাণ্ডজ্ঞান এখনও বেঁচে আছে। আর নিজেদের জ্ঞানকাণ্ডের গুমরে মট মট করতে করতে আহাম্মকিতে দড়কচা মেরে গেল প্রকৃত আহাম্মকের দল।
বাজার যাওয়ার আগে বাইরের বেগুনপোড়া রোদের দিকে তাকিয়ে কুহু আক্ষেপ করছিল— ‘এত রোদে না-গেলেও পারতে। পরের দিন বাজার করতে গিয়ে ঝানুকে টাকাটা দিলেই হতো। এত ভালোমানুষিতে কোনো লাভ হয় না। এসব ভালোমানুষিকে আজকাল আর কেউ পাত্তা দেয় না কেউ। মনে নেই ফার্নিচারের দোকানদারের সেই প্রহসনের কথা?’
কয়েক বছর আগেকার কথা।
পঁচিশ বছরের চেষ্টায় ছেলেদের জন্য দুটি ঘর বানানো হলো।
আমাদের অবস্থা হলো বাংলা লোককথার সেই বনবাসী ঋষির মতো। তাঁর গেরুয়া বসন, কৌপিন, উত্তরীয় ইঁদুরে কেটে ছারখার করছিল বলে ইঁদুর তাড়াবার জন্য ঋষি একটা বিড়াল পুষেছিলেন, পরে বিড়ালের দুধের প্রয়োজনে তাঁকে একটা গরু পুষতে হয়। বনের মধ্যে বাঘ বা শক্তিশালী জন্তুদের লোভের থাবা থেকে গোশালা রক্ষার জন্য বিড়ালটিকে তিনি পরিণত করে দিয়েছিলেন একটা বড়োসড়ো বাঘে— মানুষের প্রয়োজনের শেষ নেই— একটার পর আর একটা! বিড়াল বাঘ হয়ে ঋষিকেই খেতে এলো। শেষে ঋষি তাঁর কমণ্ডলু থেকে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে বাঘটিকে পুনরায় বিড়ালে পরিণত করলেন।
নতুন ঘর যখন হলো, ঘরের জন্য লাগবে ফার্নিচার।
কুহুর হিসেবি হাতযশে টাকা জোগাড় হলো। বেশ কয়েকটি ফার্নিচার কেনার শেষে যখন ফাইনাল পেমেন্ট করা হলো তখন বাড়িতে এসে ঘেমো সার্টটা ছেড়ে ফ্যানের তলায় বসেছি। দেখি পকেট থেকে মেঝেয় পড়ে উড়ছে ফাইনাল বিলটা। তুলে নেহাৎই কৌতূহলে চোখ বোলাতে গিয়ে চক্ষু চরকগাছ! দোকানের যুবক মালিক হিসাবের ভুলে ঠিক দশ হাজার টাকা কম নিয়েছে। এবং টাকার অঙ্কের তলায় পেইড ইন-ফুল স্ট্যাম্প।
সুতরাং বিকেলবেলা আবার যেতে হলো দোকানে। বাড়ি থেকে অনেক দূরে দোকান। যেতে আসতে দুশো টাকা টোটো ভাড়া— কিন্তু কী করা!
কুহু বলেছিল— ‘পরের মাসে টাকাটা দিলে সংসার চালানোর একটু সুরাহা হয়।’
কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থির হলো টাকাটা দিয়ে মাসের শেষ কদিন টেনে-টুনে চলে যাবে’খন। কেননা, কুহুর শাশুড়িমাতা, মানে আমার মা কুহুকে বলে গিয়েছিলেন— ‘কখনও ঋণ করবে না বা ঋণ নেবে না। পয়সা না থাকলে ছেলেমেয়ে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে শুয়ে থাকবে কিন্তু কখনও কারও কাছে জ্ঞানত ঋণ রাখবে না।’
মায়ের কথা মান্য করতে গিয়ে আমাদের একটা মাপসই বড়ো খাট বানাতে লাগল পঁচিশ বছর। কেননা, কিস্তিতে জিনিস কেনা মানেও ঋণে জড়ানো নিজেকে।
সেই দিনই বিকেলে আমরা দোকানে গিয়ে বিল, বিলের যোগের ভুল দেখালাম এবং দশ হাজার টাকা দিয়ে এলাম।
রাতে ঐ খাটে শুতে গিয়ে কুহুর নজরে এলো খাটটি বাঁদিকের পাশির একটা স্ক্রু খোলা। একটা স্ক্রু লাগিয়ে দিলেই হয়।
পরদিন দোকান খোলার সময় তাগ করে কুহু দোকানে ফোন করল। অনেকগুলো ফোন।
ফোন ধরছে না কেউ। বিকালে আমরা আবার গেলাম।
দোকানদার যুবকটি হেসে অভ্যর্থনা জানালো। ফোন না-ধরার কারণ হিসেবে শুনতে না-পাওয়া, মিউট হয়ে যাওয়া, বাজারে থাকা, ডাক্তারখানায় যাওয়া ইত্যাদি শতেক কারণ জানিয়ে পরদিন লোক এসে স্ক্রু লাগিয়ে দিয়ে যাবে বলে জানালো সে। কিন্তু এতবার করা ফোন নম্বরে কেন রিং-ব্যাক করা যায়নি তার কোনো সদুত্তর পাওয়া গেল না।
আমরা ফিরে এলাম বাড়িতে।
অনেক কাল চলে গেল, অনেক উত্তরহীন ফোন, অনেক যাওয়া। সেই স্ক্রুহীন ফুটোটি আজাও আমাদের ব্যঙ্গ করে চলেছে, সঙ্গে ভালোমানুষি বাতিকের জন্য কুহুর অবিরল খোঁটা।
এবারও তেমনই হলো। টাকাটা ফেরত পেয়ে ঝানুর মুখভাবে কৃতজ্ঞতাজনিত অভিব্যক্তির কোনো ইতর-বিশেষ দেখা গেল না। টাকাটা নিয়ে সে ক্যাশ-ড্রয়ারে রেখেই তার সামনে এলইডি বাল্বের আলো ঠিকরানো ঘেরো মাছগুলোকে নদীর বাচা মাছ বলে পরিচয় দিয়ে সেগুলো গছানোর চেষ্টা করতে লাগল। আমাদের এই শহর থেকে ছোট্ট ত্রিশলা নদী দশ কিলোমিটার দূরে! কিন্তু হাওরের ধারে বেচন মাঝির ডিঙিতে সময় কাটানো আহাম্মককে বাচা আর ঘেরো মাছের সূক্ষ্ম তফাতের আড়ালে চকমা দেওয়ার জন্য ঝানুর চেষ্টা দেখে গা ঘুলিয়ে উঠল।
মানুষের আচরণের ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন।
ব্যাখ্যা না-পেলেই অস্বস্তি!
এমন সমস্যা আহাম্মকদের ঘরে ঘরে— সদরে-অন্দরে।
কেউ সময় মতো আসবে না জেনেও আহাম্মক চিরকাল অফিসে সময়ের দশ মিনিট আগে পৌঁছছে, যাতে তার মুখেচোখে জল দেওয়া বা একগ্লাস জল খাওয়ার সময়টা অফিস টাইমের মধ্যে ঢুকে না যায় ; অফিসের ইউনিয়নের মিটিং শুরু হবে নির্দিষ্ট সময়ের থেকে অনির্দিষ্টকাল পরে জেনেও তিরিশ বছর ধরে সে অফিসের পরে বাইরের রাস্তার টঙের চায়ের দোকানের এককাপ বিস্বাদ চা ততোধিক রদ্দি বেকারির বিস্কুট দিয়ে গলাধঃকরণ করে পড়িমড়ি করে ইউনিয়ন ঘরের চাটাইয়ের কোণে বসে তবে তাঁর শান্তি! সবাই যে-যার মতো দেরিতে ঢুকে তাঁকে কোণায় আসীন দেখে মুচকি হাসি দিয়ে গল্পে মেতে যায়। কিন্তু আহাম্মক ইউনিয়ন মিটিংয়ে এসে বিশ্রম্ভালাপ করাটাকে কখনও সঙ্গত বলে মনে করেনি। তাঁর সঠিক সময়ে আসার কোনো দায় নেই, কেননা আহাম্মক কোনোকালেই ইউনিয়নের কোনো পদাধিকারী নয়। কমিটি বা সাব কমিটির মেম্বার নয়— মাথার দিকেরও নয়, লেজের দিকেরও কেউ নয়। বাইরে থেকে যাকে বলে মাসে মাসে লেভি-গোণা ‘চার-আনার মেম্বার’, কিন্তু ভিতরের দিক থেকে আহাম্মকই ছাই ফেলবার ভাঙা কুলো।
মূল সাংগঠনিক মিটিং বা পার্টি মিিটংয়েও সেই একই প্রহসন। ঘন্টাখানেক অফিসের পার্টি অফিসের মেঝেতে পাতা তালপাতার চাটাইয়ে বসে থাকার পর একে একে অন্য সকলের আগমন— সবার শেষে দু-আনা চার আনার নেতাদের।
মাঝে মাঝেই জেলা পার্টির দেখাশোনা করার জন্য কলকাতা থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজ্য নেতাদের আগমন ঘটত। তাঁরা কেউ ছিলেন রাজ্য কমিটির সদস্য, কেউ রাজ্য কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, কেউ-বা কেন্দ্রীয় কমিটির হোমরা-চোমরা। কারও টুপিতে বড়ো ট্রেড ইউনিয়ন নেতার পালক, কারও সম্পর্কে কড়া ধাতের শৃঙ্খলাপরায়ণ হিসেবে কমরেড-শ্রুতি, কারও আবার আত্মত্যাগের নানা জনশ্রুতির গৌরব। বেশিরভাগ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাই সাধারণভাবে জেলা কমিটির বা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সভা বা সম্মেলনে উপস্থিত থাকতেন, মাঝে মাঝে কলকাতা থেকে আসতেন এবং প্রয়োজন হলে জেলা অফিসে রাত্রিবাস করতেন।— কিন্তু জেলা পার্টির দৈনন্দিন কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করতেন না।
কিন্তু কখনও কখনও এমন অবজার্ভারও জেলা পেত, যিনি জেলা অফিসেই ঘাঁটি গেড়ে বসতেন।
নিচুতলার পার্টি কমরেডদের প্রতি কারও ছিল সদয় ব্যবহার, কারও ছিল ঔদাসীন্য— দু-একজনের অবজ্ঞা।
একবার খুব ভারি এক নেতা জেলা অফিসে এমন ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলেন। তাঁর গদাইলস্করি চাল কতটা ভারি হতে পারে, তাঁর গমন কতটা গজেন্দ্রকেশরীসুলভ হতে পারে— তা অনুমান করাও কঠিন।
অভ্যন্তরীণ সভা-সমিতিতে সেখানে নানা রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনার বান ডাকল। একমাত্র বক্তা হলেন তিনিই। একেক-দিন একেক-বিষয়ে, একেক গণসংগঠনের নামে সভা।
প্রত্যেকটি সভায় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পার্টি সংগঠনের সর্বস্তরের কর্মী ও নেতারা— যাঁদের মধ্যে শিক্ষক, অধ্যাপক, প্রবীণ ও অভিজ্ঞ আঞ্চলিক পার্টিনেতা, তরুণ ও উজ্জ্বল ছাত্র ও যুব সদস্যরা থাকতেন— এমন-কী বিভিন্ন স্তরের সংস্থার নির্বাচিতরা প্রতিনিধিরাও ছিলেন। সবাইকেই সভার জন্য সদরে যেতে হতো।
সদরের মুষ্টিমেয় পার্টি কমরেড ছাড়া প্রায় সকলেই জেলা অফিসে ট্রেন, বাস, ট্রেকার ঠেঙিয়ে আসতেন। প্রায় প্রত্যেকটি জিবি-তে তাদের নির্ধারিত সময়ের থেকে ঠায় অন্তত ঘন্টাখানেক বসিয়ে রেখে বক্তা নিজে আবির্ভূত হতেন এবং মাইক্রোফোনের সামনে একাই ঘন্টা-দুয়েক বলে যেতেন। এই সব সভায় কোনো প্রশ্নোত্তর, পারস্পরিক আলোচনা-সমালোচনার কোনো সুযোগ ছিল না। সুতরাং কোনো প্রসঙ্গের জটিলতা বা অপূর্ণতা পূরণ হওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না।
কার্ল মার্কসের রচনার ভাগত তর্জমা করলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, তিনি পার্টি সংগঠনকে কোনো বিচ্ছিন্ন ও আমলাতান্ত্রিক সংগঠন বলে মনে করেননি। তাঁর কাছে পার্টি হলো শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক চেতনার মুখ্য ধারক ও বাহক, যা শ্রমিক, কৃষকসহ সমগ্র নিষ্পেষিত শ্রেণীকে একরৈখিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়। এবং এই নেতৃত্বদানের আধারস্বরূপ নেতারা হলেন সংগঠনের সবচেয়ে শ্রেণীসচেতন, তাত্ত্বিকভাবে পোক্ত, বক্তব্য কার্যকলাপের ক্ষেত্রে যৌক্তিক স্পষ্টতার অনুসারী এক অগ্রগামী অংশ।
(ক্রমশ)
