কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৪২। শোভন সরকার
গত পর্বে: রাজঘাট, আখতা, রামনগরের মাটির বুকে কান পেতে শোনা গেল বারাণসীর শুরুর দিনগুলির কথা।
বেনারসে পড়াশোনার সময় নানা অজুহাতে বেশ কয়েকবার সারনাথে গিয়েছি — ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ১৬-১৭ কিলোমিটারের রাস্তা, অটোয় করে সহজেই চলে যাওয়া যায়। আমাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে বেনারসের আশেপাশে ঘুরে দেখার মধ্যে কোন কোন জায়গা রয়েছে, আমি সারনাথের নাম অবশ্যই বলি। তবে ইতিহাসে বা বৌদ্ধধর্মে আগ্রহ না থাকলে সারনাথে গিয়ে অনেককেই হরিণের উদ্যান, দেশ বিদেশের নানা রকম পাখির সংগ্রহ এবং স্যুভেনিয়রের দোকানের সামনে গিয়েই কেবল উত্তেজিত হতে দেখেছি — অবশ্য সেটাই বা কম কীসে! তবে আমি আর সেদিকে যাচ্ছি না, বরং কাশীর ইতিহাসের সাথে সাথে সারনাথের গল্প কীভাবে লেখা হয়েছে সেটাও দেখে আসি। তার পূর্বে এই স্থানের নামকরণ নিয়ে কিছু কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন।
‘সারনাথ’ নামটা কিন্তু অপেক্ষাকৃত নতুন। আদি নাম ‘ঋষিপত্তন’ (পরে ‘ঋষিপতন’) বা পালি অপভ্রংশে ‘ইসিপতন’ ও ‘মৃগদাব’ বা অপভ্রংশে ‘মিগদায়’।
‘ঋষিপত্তন’ নামের পেছনে আমি তিন রকম ব্যাখ্যা খুঁজে পাই।
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থাদিতে বলা হয় যে সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে এই স্থানে পাঁচশো জন ‘প্রত্যেক বুদ্ধ’ (পালিতে ‘পচ্চেক বুদ্ধ’) বাস করতেন। কারা এঁরা? বৌদ্ধ ধর্মানুসারে প্রত্যেক বুদ্ধরা ‘সম্যক সংবুদ্ধ’দের (পালিতে ‘সম্মা সম্বুদ্ধ’) অনুপস্থিতিতে পৃথিবীতে ধর্মচর্চাকে জীবিত রাখেন। তাঁরা ধর্মপ্রচারক নন। অন্যদিকে, সম্যক সংবুদ্ধরা বোধি লাভের পর ধর্মপ্রবর্তন করেন। যেমন শাক্যসিংহ সিদ্ধার্থ গৌতম একজন ‘সম্যক বুদ্ধ’ ছিলেন।
যখন ‘বারাণসী হইতে অর্দ্ধযোজন দূরস্থ মহাবনে’ বাস করা পাঁচশো প্রত্যেক বুদ্ধ সিদ্ধার্থের আগমনের খবর পেলেন, তাঁরা নিজেদের কাজ শেষ হয়েছে জেনে নিজেদের দেহকে হালকা করে ভূমি থেকে শূন্যে উত্থিত হলেন। সেই অবস্থায় তাঁরা নির্বাণপ্রাপ্ত হলেন, অর্থাৎ নশ্বর দেহ ত্যাগ করলেন। পরিত্যক্ত দেহগুলি তখন ভূপতিত হল। ঋষিদের দেহ পতিত হয়ে এই স্থানের নাম হল ‘ঋষিপতন’।
অন্য এক সূত্র বলছে যে উচ্চমার্গের ঋষি-যোগীরা ধ্যানযোগে তাঁদের স্থূলদেহ ত্যাগ করে সূক্ষ্মদেহে নানা স্থানে ভ্রমণ করতে পারেন। ঋষিপতনের মহাবনে এরূপ সিদ্ধপুরুষগণ নিজেদের স্থূলদেহ সাময়িকভাবে ত্যাগ করে রেখে যেতেন। তার থেকেই এই স্থানের নাম ‘ঋষিপতন’ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, ফরাসী পণ্ডিত সেনার বা সারনাথ বিশেষজ্ঞ বৃন্দাবনচন্দ্র ভট্টাচার্যের মত কেউ কেউ মনে করেন যে, প্রকৃতপক্ষে নাম ছিল ‘ঋষিপত্তন’। ‘পত্তন’ শব্দের অর্থ ‘নগর’ বা ‘বাসস্থান’। এই স্থানে বহু সংখ্যক ঋষিদের বাস ছিল বলেই এর এরূপ নাম। পরে তা মুখে মুখে বিকৃত হয়ে ‘ঋষিপতন’ হয়ে যায়।
‘মৃগদাব’ (অর্থাৎ হরিণের উদ্যান) নামটির পেছনের কাহিনিও কম চিত্তাকর্ষক নয়। এর উৎস নিগ্রোধমিগ জাতকের কাহিনি। এতে দেখি গৌতম বুদ্ধ তাঁর এক পূর্বজন্মে বোধিসত্ত্ব হিসেবে ন্যগ্রোধ নামে মৃগরাজ ছিলেন। বর্তমানে যেখানে সারনাথ সেখানে তখন ছিল এক মহাবন। এই বনেই রাজা হিসেবে ন্যগ্রোধ এক বিশাল হরিণের দলকে রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। সেই সময় কাশীর ব্রহ্মদত্ত বংশের এক রাজা এই বনে প্রায়ই মৃগয়ায় আসতেন। কিন্তু রাজার শিকারের চেয়ে বহু সংখ্যক হরিণ নিহত হত তাঁর দলবল, সঙ্গীসাথী ও অত্যুৎসাহী গ্রামবাসীদের হাতে। এই অবস্থায় একবার রাজা শিকারে এলে ন্যগ্রোধ বীরদর্পে তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হলেন। এক রাজা হয়ে অন্য রাজার কাছে তিনি এক প্রস্তাব রাখলেন — রাজার আহারের জন্য হরিণের দল থেকে প্রতিদিন একটি করে হরিণ রাজাকে পাঠানো হবে। এতে অযথা প্রয়োজনাতিরিক্ত প্রাণনাশ হবে না। ব্রহ্মদত্তরাজ মৃগরাজকে অভয় দিয়ে ফিরে গেলেন। রাজার কাছে নিয়মিত একটি করে হরিণ পাঠিয়ে ন্যগ্রোধও তাঁর প্রতিজ্ঞা রাখলেন।
সব ব্যবস্থা ঠিকই চলছিল। কিন্তু একদিন এক হরিণীর পালা এল, এবং সে ছিল গর্ভবতী। মৃগরাজকে গিয়ে সে তার অবস্থার কথা জানালে তিনি হরিণীকে অভয় দিয়ে নিজেই কাশীরাজের কাছে নিজেকে সমর্পণ করলেন। রাজা মৃগরাজকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মৃগরাজ, আমি স্বয়ং তোমাকে মৃত্যুভয় থেকে মুক্ত করেছি। তৎসত্ত্বেও তুমি কেন আত্মবলি দিতে চলেছ?’
ন্যগ্রোধ সমস্ত বিষয় খুলে বললে কাশীরাজ তাঁকে বললেন, ‘ভয় নেই, তুমি ফিরে যাও। তোমাদের দু’জনের কাউকেই আমি হত্যা করব না।’
‘মহারাজ, আমরা তো মুক্ত হলাম, কিন্তু বাকি হরিণদের কী হবে?’
‘আমি তাদেরকেও মুক্ত করলাম।’
এভাবে মৃগরাজ ন্যগ্রোধ একে একে মহাবনের পশু-পাখিসহ সমগ্র প্রাণীকুলকে রাজার শিকারভয় থেকে মুক্ত করলেন।
“মৃগাণাং দায়ো দিন্নো মৃগদায়োতি ঋষিপত্তনো।” — মৃগদের দান দেওয়া হয়েছে বলে এই স্থানের নাম হল মৃগদায় ঋষিপত্তন। তবে বৃন্দাবন ভট্টাচার্য মনে করেন যে সংস্কৃত ‘মৃগদাব’ অর্থাৎ ‘মৃগবন’ শব্দটি ক্রমে বিকৃত হয়ে এর নাম হয় ‘মৃগদায়’।
সংস্কৃতে ‘সারঙ্গ’ শব্দের অর্থ হরিণ, ‘সারঙ্গনাথ’ হল ‘মৃগরাজ’। প্রতীকীভাবে ‘মৃগরাজ’ বলতে গৌতম বুদ্ধকেই বোঝায়। এই ‘সারঙ্গনাথ’ শব্দই প্রাকৃত ভাষার ছাঁচে পড়ে ধীরে ধীরে ‘সারনাথ’ হয়েছে। আরও একটি মজার ব্যাপার হল, সারনাথের কিছু দূরেই সারঙ্গনাথ মন্দির রয়েছে — তবে এটি কোনো বৌদ্ধ মন্দির নয়, বরং একটি শিব মন্দির। শিবের আরও এক নাম যে ‘সারঙ্গনাথ’, সেটা ভুললে চলে না। হতে পারে এই মন্দিরের জন্যই স্থানটির নাম ‘সারনাথ’ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেন। একদল মনে করছেন যে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী নাগাদ যখন শঙ্করাচার্যের শিষ্যরা নানা বুদ্ধ ধর্মকেন্দ্রগুলিতে শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করছেন, এই মন্দির সেরকম সময়েই নির্মিত। তবে বেশিরভাগ প্রত্নতত্ত্ববিদ মনে করেন যে আনুমানিক একাদশ-দ্বাদশ শতকে যখন সারনাথ বিহার ধ্বংস হওয়ার পর বৌদ্ধদের প্রভাব প্রায় শূন্য, তখন সেন বংশের শৈব রাজাদের পক্ষ থেকে এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়ে থাকতে পারে।
বিভিন্ন সময়ে সারনাথে আসা পরিব্রাজকদের বর্ণনা, এখানে প্রাপ্ত বিভিন্ন লিপি প্রভৃতির উপর ভিত্তি করে গবেষণায় জানা যায় যে, গৌতম বুদ্ধ গয়াতে বোধিলাভের পর আনুমানিক ৫২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সরাসরি ঋষিপত্তন মৃগদাবে আসেন এবং তাঁর পাঁচজন শিষ্যকে ধর্মোপদেশ প্রদান করেন। এভাবেই মৃগদাবের গাছপালা ঘেরা ছায়াসুশীতল নিবিড় ও ঋষিদের পদস্পর্শে পবিত্র মৃগচারণভূমিতে বৌদ্ধধর্মের ধর্মচক্র প্রবর্তিত হয়। পরে তৎকালীন কাশীর সবচেয়ে ধনবান বণিকের পুত্র যশ ও তাঁর পরিবারের লোকজন সহ মোট পঞ্চান্নজন তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তাঁরা বুদ্ধের বাণী নিয়ে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন। আবার কিছু কিছু বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে সেই সময়ের অন্যতম বিখ্যাত নগরনটী অদ্ধকাশীর প্রব্রজ্যাগ্রহণ ও যথাসময়ে তাঁর ‘অর্হত্ব’ লাভের কথা জানতে পারি।
স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে একটা প্রশ্ন আসে, গৌতম বুদ্ধ জন্মেছেন কপিলাবস্তুতে এবং বোধিলাভ করেছেন গয়াতে। তবে ‘ধম্ম’ প্রবর্তনের জন্য সারনাথে কেন?
এর উত্তর বিভিন্ন ভাবে দেওয়া যায়।
এক, সিদ্ধার্থের সঙ্গীদের অবস্থান। সিদ্ধার্থ গৌতম ও তাঁর পাঁচজন সঙ্গী একসাথে তপস্যার সংকল্প করেন। তপস্যার সময় কঠোর সংযম পালনই চিরাচরিত রীতি। কিন্তু বোধি লাভের পূর্বেই সিদ্ধার্থ চিরাচরিত কৃচ্ছ্রসাধন মার্গ ত্যাগ করে, ভোজন বর্জন না করে তপস্যা করছেন দেখে সেই পাঁচজন সঙ্গী বিরক্ত হয়ে তাঁকে ছেড়ে সারনাথে চলে আসেন। কাঙ্ক্ষিত বোধি লাভের পর তিনি সম্ভবত চেয়েছিলেন যে তাঁর অধীত জ্ঞান পুরোনো সঙ্গীদের সাথেই সর্বপ্রথম ভাগ করে নেবেন। তাঁরা যেহেতু আগেই সারনাথে চলে এসেছিলেন, গৌতম বুদ্ধ সেখানেই চলে আসেন তাঁর প্রথম ধর্মোপদেশের জন্য।
দুই, সমকালীন কাশীর খ্যাতি। গৌতম বুদ্ধের জন্মের আগেই কাশী মহাজনপদ অত্যন্ত সরগরম এক অঞ্চল হয়ে উঠেছিল। রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলা ইত্যাদিসহ প্রমুখ দিকে কাশী সফল হলেও বিশেষ করে জ্ঞানচর্চার দিক দিয়ে কাশীর নাম তখন তক্ষশীলার সঙ্গেই উচ্চারিত হত। সম্ভবত গৌতম বুদ্ধ এ বিষয়ে জ্ঞাত ছিলেন এবং তিনি বুঝেছিলেন যে তাঁর বক্তব্যের গভীরতা কাশীর মত বিদ্যাকেন্দ্রের মানুষেরাই গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। অতএব, কাশীতেই বসে তিনি ধর্মচক্র প্রবর্তন করলেন।
গৌতম বুদ্ধের সময় কাশীর রাজনীতি যে এক টালমাটাল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল তার ইঙ্গিত আমরা আগেই পেয়েছি। মগধের হর্যঙ্ক বংশের রাজা অজাতশত্রুর পর তাঁর বংশধরেরা কাশীকে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এই বংশের শেষ রাজা নাগদাশকের পর তাঁর এক অমাত্য শিশুনাগ মগধের সিংহাসনে বসেন এবং শিশুনাগ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের সরিয়ে নন্দ বংশ এবং তারপর মৌর্য বংশ মগধের সিংহাসন অধিকার করে। মৌর্য বংশের সম্রাট অশোকের সময়ে কাশীতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়।
সারনাথের জাদুঘরে ঢুকতেই যে ভাস্কর্যটি আমাদের দৃষ্টি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধা ও বিস্ময় আকর্ষণ করে তা হল আমাদের জাতীয় প্রতীকের মূল উৎস — অশোক স্তম্ভের সিংহচূড়া। সম্রাট অশোক তাঁর সুবিস্তৃত সাম্রাজ্যব্যাপী বৌদ্ধধর্ম প্রচারের সময় সারনাথে একটি স্তম্ভ স্থাপন করেন। সারনাথের উৎখনন-স্থলে গেলে আজও আমরা সেই স্তম্ভের ভাঙা অংশ অশোকের বেছে নেওয়া স্থানে দেখতে পাই। আদিতে ১৫ মিটার উঁচু এই চুনারের বেলে পাথরের তৈরি মূল স্তম্ভের শীর্ষে চার সিংহের অত্যাশ্চর্য ভাস্কর্যটি স্থাপিত ছিল। বর্তমানে সেই শীর্ষটিকেই আমরা সারনাথের প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহালয়ে দেখি।
সারনাথ এবং আমাদের জাতীয় প্রতীকের যে অলংকরণটি আজ আমরা দেখতে পাই তার সঙ্গে রয়েছে এক ‘বং কানেকশন’। ছোট্ট করে বলি। সংবিধানের অলংকরণের দায়িত্বে যে সমস্ত চিত্রশিল্পীরা ছিলেন তাঁর মধ্যে প্রধান শান্তিনিকেতনের তৎকালীন অধ্যক্ষ নন্দলাল বসু। তাঁর ভীষণ ইচ্ছে ছিল সংবিধানের পাতায় সারনাথে রাখা সিংহের ভাস্কর্যকে রাখতে। তাই তাঁরই নির্দেশনায় শান্তিনিকেতনের ছাত্র দীননাথ ভার্গব সম্রাট অশোকের সিংহচূড়াকে অনুকরণ করে ভারতের জাতীয় প্রতীকটি অঙ্কন করেন।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
তৃতীয় অধ্যায় ‘ফিরে দেখতে যাওয়া’ প্রথম পর্ব
