কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৪০। শোভন সরকার
গত পর্বে: ঘাটে ঘাটে গঙ্গা কত গল্প বলল — রামানন্দ, কবীর, ত্রৈলঙ্গ স্বামী, আর গঙ্গালহরীর স্রষ্টা কবি জগন্নাথের কথা। এসে পৌঁছলাম রাজঘাটে।
তৃতীয় অধ্যায়
ফিরে দেখতে যাওয়া
তখন আমি বিএইচইউ-তে পড়ছি। শেক্সপিয়ার-এর মৃত্যুর চারশো বছর পূর্ণ হচ্ছে বলে তাঁকে নিয়ে বছরভর নানা ধরনের কর্মশালা, সেমিনার ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম বর্ষে থাকার সময় আমাদের মেইন ক্যাম্পাসের ইংরেজি বিভাগের আয়োজনে শেক্সপিয়ারের ‘কিং লিয়ার’ অবলম্বনে একটা কর্মশালা ও নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। আমার সিনিয়র পুষ্পেন্দুর কাছে সে খবর পেয়ে আমিও তাতে অংশ নিই। জুনিয়রদের মধ্যে আমি একাই ছিলাম সেই দলে। ভাগ্যিস ছিলাম, অনেক কিছু শিখেছিলাম সেই কর্মশালার প্রথম দিন থেকে শুরু করে নাটকের মঞ্চায়ন অবধি। বিশাল বড় মঞ্চে বহু দর্শকের সামনে অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের — সেই ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল সেবার প্রথম। তবে তার চেয়েও বড় প্রাপ্তি ছিল পুষ্পেন্দু, আশীর্বাদ, প্রতীতি, অঙ্কিতা, দীপ্তরূপ, সাগ্নিক, দিব্যা, অনুরাগ, প্রতিশ্রুতি, অনিন্দিতা, রাকেশদের মতো আমার কিছু সিনিয়রদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
শেক্সপিয়ারকে নিয়ে যখন সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে তখন আমি দ্বিতীয় বর্ষে। এরই অংশ হিসেবে রাজঘাটের বসন্ত মহিলা মহাবিদ্যালয়ে আয়োজন করা হল এক নাট্য প্রতিযোগিতা, বিষয় — শেক্সপিয়ারের নাটক। বিএইচইউ-এর অধীনস্থ সমস্ত কলেজের ইংরেজি বিভাগের মধ্যে হবে এই প্রতিযোগিতা। খবর পেয়ে তো আমার উৎসাহের শেষ নেই। অডিশন হল। সুযোগও পেলাম। সিনিয়রদের মধ্যে ছিলাম কেবল সঙ্গীতা, অরিন্দম আর আমি। বাকি সবাই জুনিয়র — অর্পিতা, অরুণিমা, সাক্ষী, শ্রেয়সী, অরুণ, দীপক আর পদ্মনাভ।
শেক্সপিয়ারের বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে প্রেম কীভাবে এক যোগসূত্র হয়ে ওঠে তা নিয়েই আমরা নিজেরাই আমাদের নাটকের স্ক্রিপ্ট তৈরি করলাম। আমরাই আবার নির্দেশনা থেকে শুরু করে পোশাক, ধ্বনি ও প্রপ্সের ব্যবহার ইত্যাদি সমস্ত ব্যবস্থা করে নাটকটা দাঁড় করিয়েছিলাম। আমাদের ইংরেজি বিভাগের কাছ থেকে কোনোরকম আর্থিক সহায়তা পাইনি, তবুও বেশ যত্ন নিয়ে আমরা কাজটা করেছিলাম। সত্যি বলতে কি, সম্পূর্ণ নিজেদের দলগত চেষ্টায় পুরস্কার জিতে যে তৃপ্তির আস্বাদ সেবার হয়েছিল তার তুলনা মেলা ভার। যাই হোক, নাটকের সূত্রেই প্রতিযোগিতার ক’দিন আগে আমাদের প্রফেসর অনিতা ম্যাম আমাদের নিয়ে গেলেন বসন্ত কলেজ, রাজঘাটে। প্রতিযোগিতাটা হবে তাদের এক অসাধারণ সুন্দর উন্মুক্ত অ্যাম্ফিথিয়েটারে। মূলত সেটিই দেখতে এসেছি যাতে আমাদের নাটকের পরিকল্পনায় সুবিধা হয়। এটা তো কাজের কথা, কিন্তু কাজের শেষে যা অভিজ্ঞতা হল, সেটাই আমার এই দীর্ঘ ভণিতার মূল উদ্দেশ্য।
অনিতা ম্যাম আমাদের ঘুরে ঘুরে এদিক ওদিক দেখাতে দেখাতে শেষে নিয়ে গেলেন এক বালি-কাদামাটির চরে। সামনেই গঙ্গা-বরুণা সঙ্গম। দেখে বিশেষ কিছু অনুভূতি জাগল না। কিন্তু ম্যামের কাছে জানলাম আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি, এটি কোনো মামুলি জায়গা নয়, হাজার বছর আগে ঠিক এখানে প্রাচীন বেনারস গমগম করত! বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্ভবত এখানেই বেনারসের প্রাচীনতম বসতি গড়ে উঠেছিল।
এবার বুঝি পায়ের তলায় শিরশির করে উঠল। সেই মুহূর্তের বিস্ময়ের অনুভূতি আজও আমার স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। যে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে বা জাদুঘরে গেলে আমার মনে কল্পনার ঝড় ওঠে — সে ঝড়ে নিমেষে পৌঁছে যাই সেই সময়ের মানুষের মধ্যে, হাটে-বাজারে, কাজের ব্যস্ততায়, গৃহকোণের নিরালায়। চোখের সামনে তারা হাসে-কাঁদে, সন্ধে বেলায় খেতে বসে সারা দিনের গল্প করে, কিংবা বয়স্যরা নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে। কোনো বিশেষ মুহূর্ত নয়, বরং দৈনন্দিন রোজনামচার দৃশ্য, একজন মানুষের সাধারণত্বের মধ্যে বিশেষত্বটা। সেদিন রাজঘাটে দাঁড়িয়ে কত কী দেখলাম!
রাজঘাট থেকে হোস্টেলে ফিরে গিয়ে বেশ ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম রাজঘাটের খননকাজ নিয়ে। আমার মনে হল, রাজঘাটের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কারের পূর্বে বেনারসের ইতিহাসের ভিত্তি বা প্রাচীনতার তত্ত্ব কেবল পুরাণ, প্রচলিত আখ্যান বা কিংবদন্তির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা থেকে যায় — এক, এখানে বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখা ধূসর। অনেক সময়েই বাস্তবের রূঢ়তাকে ঢাকতে গিয়ে রূপকের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে সমস্যা হল যে রূপকের অর্থ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হওয়াটা স্বাভাবিক। কাজেই, এই ধরনের সাহিত্যকর্মের উপর নির্ভর করে ইতিহাস বিচার করতে গেলে অধিকাংশ সময়েই বিভ্রান্ত হতে হয়।
দুই, অনেক ক্ষেত্রেই এই সমস্ত সাহিত্য একটা সময় অবধি শ্রুতিনির্ভর ছিল, তার লিখিত রূপ আসে অনেক পরে। তাই দেখা যায়, কালক্রমে একই সাহিত্যকর্মের ভিন্ন ভিন্ন রূপ তৈরি হয়ে গেছে। আবার, এও বলা যায় যে, শুনে শুনে প্রজন্মান্তরে সঞ্চালিত হত বলে স্বাভাবিকভাবেই তাতে বিভিন্ন শ্রোতার নিজস্ব ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস-বোধের মেদ জমতে থেকেছে। সে কারণে মূল ইতিহাস অনেকাংশেই ঢাকা পড়ে গেলে আমাদের অবাক হওয়ার কিছু নেই।
প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার প্রসঙ্গে শেরিং লিখছেন, ‘হিন্দু লেখকেরা সময়কালের হিসেব লিখে রাখার ক্ষেত্রে চরমতম অবহেলা দেখিয়েছেন। সহজ ও ধারাবাহিকভাবে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো লিখে রাখার ক্ষেত্রেও ছিল তাঁদের অনীহা। ফলস্বরূপ, বেনারসের গৌরবের ইতিহাসের হয়তো অনেকাংশই আজ আমাদের জ্ঞানের সীমার বাইরে চলে গেছে।’

রাজঘাটে গঙ্গার পূর্ব ও পশ্চিম পাড়কে জুড়ে দিচ্ছে মালবীয় সেতু। পশ্চিমের ঘাটে কাশী স্টেশন। যে সময়ের কথা বলছি তা বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ। এই স্টেশনের সম্প্রসারণ ও সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে সবে। মাটি খুঁড়তে গিয়ে একের পর এক পুরোনো জিনিস বেরিয়ে আসতে শুরু করল। রেলের তরফ থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগকে জানানো হলে ১৯৪০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে এখানে পরীক্ষামূলকভাবে প্রাথমিক খননকার্য চালানো হল। নেতৃত্বে ছিলেন প্রত্ন বিশেষজ্ঞ কৃষ্ণ দেব। এই খননে তিনি সাত মিটার গভীরতায় পাঁচটি ভিন্ন স্তর লক্ষ্য করেন। স্তরগুলি পাঁচটি আলাদা যুগের প্রমাণ — শুঙ্গ যুগ, কুষাণ যুগ ও আদি গুপ্ত যুগ, মূল গুপ্ত যুগ, অন্ত গুপ্ত যুগ এবং গহড়ওয়াল যুগ। প্রাচীন বারাণসীর বেশ কিছু শিলমোহর চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। পাওয়া যায় রাজঘাটের কেল্লার অবশেষ। এখানে বেশ অনেকটা সময় জুড়ে যে শহুরে সভ্যতার বসবাস ছিল তা অনুমান করা যায় ।
এই আবিষ্কারগুলির মাধ্যমে বারাণসীর ইতিহাসের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে এক প্রামাণ্য দিশা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। পরবর্তীতে ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ এর মধ্যে রাজঘাটের তিনটি ঢিপিতে ধাপে ধাপে বিএইচইউ-এর প্রফেসর এ.কে. নারাইন এবং তাঁর সহকর্মীরা এখানে সুপরিকল্পিতভাবে খননকার্য সম্পন্ন করে প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী উদ্ধার করেন। তাঁদের অনুসন্ধান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এক সময় রাজঘাটের গঙ্গা ও বরুণার সঙ্গমেই ছিল প্রাচীন কাশীর রাজধানী বারাণসী। এখানে মাটির বাড়ি ও দেওয়ালের নিদর্শন পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব দু’শো বছর আগের নির্মাণকার্যে পোড়া ইটের ব্যবহারের ব্যাপকতা চোখে পড়ে, দেখা যায় বাড়িগুলি নির্মাণের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা।
পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে প্রফেসর বিদুলা জয়সয়াল পুনরায় বেনারসের প্রাচীনত্ব নির্ধারণের জন্য উৎখনন ও গবেষণা শুরু করেন। তাঁর কাজের বিস্তার বারাণসী ও তার আশেপাশের বিভিন্ন ছোট ছোট এলাকার মধ্যে ছড়িয়ে ছিল, যেমন — পাহাড়িয়া মাণ্ডির কাছে আখ্তা, রাজাপুর নালার কাছে কোটোয়া, আশাপুর, তিলমাপুর, শূলটঙ্কেশ্বর প্রভৃতি। প্রফেসর জয়সয়াল মনে করেন, বারাণসীতে উৎখননকার্যে যত সামগ্রী পাওয়া গেছে তার মধ্যে আখ্তাই প্রাচীনতম — কার্বন-ডেটিং পদ্ধতিতে প্রমাণ হয় এখানে প্রায় ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বেও মানুষের বসতি ছিল। তিনি প্রমাণ করেন যে এখানে মূলত বৈদিক পরম্পরায় বিশ্বাসী সম্প্রদায় বসবাস করত। অন্যদিকে, রামনগরের কাছে খনন করে পাওয়া সামগ্রী আনুমানিক একই সময়ের হলেও তাদের ভিন্ন সম্প্রদায় বলে মনে হয়। এই সমস্ত আবিষ্কার থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয় — রাজঘাট বারাণসীর সবচেয়ে পুরোনো শহর হলেও তারও প্রায় এক হাজার বছর আগে আখ্তা ও রামনগরে মানুষের বসবাস শুরু হয়ে যায়।
যাই হোক, পরবর্তীতে বারাণসীর অধিবাসীরা ধীরে ধীরে রাজঘাট থেকে দক্ষিণের দিকে সরে আসে। সম্ভবত জনসংখ্যার অধিক বৃদ্ধিই এর জন্য দায়ী। রাজঘাটের বসতি এই বাড়তি জনসংখ্যার চাপ নিতে সক্ষম ছিল না, একটা সময়ের পর অধিবাসীরা নতুন জায়গা খুঁজে নিতে শুরু করে। ঠিক কবে থেকে এই স্থানান্তর শুরু হয় — এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দশাশ্বমেধ-মণিকর্ণিকার আশেপাশে পাক্কামহলে প্রায় ১৫ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খননকার্য চালানো হয়। সেখানে প্রাপ্ত নমুনাগুলি থেকে জানা যায় যে, এই অঞ্চলে মানুষের বসতি কুষাণযুগের শেষদিক বা আদি গুপ্ত যুগ থেকে শুরু হয়। তারপর থেকে ক্রমাগত শহরের বিস্তার ঘটতে থাকে।
রাজঘাট, রামনগর ও তার আশেপাশের অঞ্চলে কারা বসতি স্থাপন করেছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকরা দ্বিধাবিভক্ত। তবে একটা বিষয়ে তাঁরা একমত যে আর্যজাতির কোনো কোনো শাখা তাদের উত্তর ভারতীয় বসতি ছেড়ে পূর্বের দিকে এগিয়ে আসে এবং গঙ্গা উপত্যকায় বসবাস করতে থাকে। এখন প্রশ্ন হল, গঙ্গা উপত্যকায় আর্যজাতি আসার পূর্বে কি সেখানে কারও বসবাস ছিল না? অবশ্যই ছিল। এই সমস্ত অঞ্চলে প্রচলিত আদি ধর্মীয় বিশ্বাস ও লৌকিক দেব-দেবী, আচার-বিধি এ সব কিছুই তাদের আদিম অস্তিত্বের প্রমাণ।
আর্যদের প্রাচীন বারাণসীতে আগমনের পূর্বে স্থানীয় অধিবাসীরা জলাশয়, গাছপালা প্রভৃতি প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে যক্ষ, রাক্ষস, গণ, মাতৃকা, দেবী, ভৈরব, যক্ষী, যোগিনী, নাগ ইত্যাদির উপাসনা করত। মোতি চন্দ্র একে বলছেন ‘যক্ষধর্ম’। ফুল-ফল, দুধ, গন্ধদ্রব্য দিয়ে এদের পুজো করা হত।
আজও বিভিন্ন যক্ষ, নাগ প্রভৃতিকে দেব-দেবী হিসেবে হিন্দুধর্মে পূজা করা হয়। কিন্তু এরা তো কখনোই আর্য জাতির আরাধ্য ছিল না। কাশীর অধিপতি, জটা-বাঘছালধারী, শ্মশানবাসী, ভূত-প্রেত দিয়ে ঘিরে থাকা শিবও ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে আর্যদের বৈদিক সাহিত্যে শিবের কোনো গুরুত্বই ছিল না। কিন্তু ধূনোর ঘন ধোঁয়া যেমন ধীরে ধীরে বাতাসে মিশে এক সময় অদৃশ্য হলেও তার গন্ধের রেশ থেকে যায়, তেমনি সময়ের সাথে সাথে আর্য জাতি অনার্য জাতিদের সংস্কৃতি, আচারবিধি ধীরে ধীরে নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করে নেয়। ঔপনিবেশিক আধিপত্যের এ বড় আদিম রীতি, এরকম নকশা আমাদের খুব চেনা —উদাহরণ দিয়ে তা মনে করানো এখানে বাহুল্য।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
