সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ৩৩। বরুণদেব
সার্কাসে খুব জনপ্রিয় শব্দবন্ধ- দা শো মাস্ট গো অন। প্রাচীন রোমান স্লোগান। সে রোমান-মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সভ্যতা গেছে। আধুনিক সার্কাসের স্লোগান – আজ রাতে এবং প্রত্যেক রাতে। এখানে সবই বাস্তব, চোখের সামনেই তা ঘটে। জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য সেখানে। এক মুহূর্তের ভুলে, নিজের বা সহযোগীর, ঘটে যেতে পারে ভয়ানক দুর্ঘটনা। ট্রাপিজের দড়ি বা লোহার দণ্ড, ট্রাপিজের ভুল ছন্দ, বারের দুলুনি সীমারেখা টেনে দেয় অখ্যাত অজ্ঞাত গাঁয়ের পুরুষ বা মহিলার প্রতিদিনের জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে। খেলার মধ্যে বাঁচন মরণের ঝুঁকিটুকু রপ্ত করার কৌশলে চলে দিনের পর দিন অনুশীলণ, যে খেলায় যত ঝুঁকি সে খেলায় তত হাততালি। সার্কাসের খেলায় ঝুঁকি আর মনোরঞ্জন সমানুপাতিক সম্পর্কে। ভারতের প্রত্যেকটি সার্কাস তাঁবুতে সংগ্রাম ও বিজয়ের সাথে সাথে দুর্ভোগের কাহিনী আছে। তাঁবুর আলোর রোশনাইয়ের মধ্যে দুর্ভোগের ছায়ার বসবাস।
কখনো কখনো সার্কাসকর্মী ও সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে বন্যপশুর কাছে। মহারাষ্ট্রের নালাসোপরা অঞ্চলে একটি সার্কাসের তাঁবুর কাজ চলার সময় একটি বাঘ হঠাৎই আক্রমণ করে বসে একটি শিশুকে। পশ্চিমবঙ্গে কামারকুণ্ডুর এক প্রদর্শনীতে আগুনের রিং-এর মধ্যে প্রবেশ করতে অনাগ্রহী বাঘ আক্রমণ করে বসে অলিম্পিক সার্কাসের রিংকর্মীকে।
মাত্তানকোট কুনহিরমন প্রফেসর কিলেরির শিষ্য। পরশুরাম লায়ন, , জুবিলি, সাউথ ইণ্ডিয়ান লেডিস, রুগমা বাঈ সার্কাস নানা সার্কাস ঘুরে ১৯৫১ সালে কেরালার কোঝিকোর জেলার ভাদাকারায় শুরু করেন নিজের সার্কাস, পুরোনো এক সার্কাসের নামে- নিউ হোয়াইটওয়ে। নিজের সার্কাসে দেখাতেন বুকের ওপর দিয়ে ট্রাক চলে যাওয়ার খেলা। ১৯৫৫ সালে তামিলনাড়ুর আন্নামালাইয়ে সেই ভয়ঙ্কর খেলা দেখানোর সময় ট্রাক ব্রেক ডাউন হয়ে গেল। সামনের চাকা তখন তাঁর বুকের ওপর। মারাত্মক আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। ইন্টারনাল ইনজুরি। চলে গেলেন চিরকালের মতো সার্কাসকে বিদায় জানিয়ে।
১৯৫০এর শুরুতে গ্রেট রেমন সার্কাসের রাজারাম, বিখ্যাত সাইক্লিস্ট, মহারাষ্ট্রের লোক, খেলা দেখাচ্ছিলেন যখন, আকাশ জুড়ে বিদ্যুৎ চমকানি, ঘন ঘন মেঘ ডাকার শব্দ। মনঃসংযোগ হারিয়ে পড়ে গেলেন। স্পাইনাল কর্ড ভেঙে রিঙয়ের মধ্যে সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু।
এই ঘটনার কুড়ি বছর বাদে ১৯৭০ এর শেষ দিকে নিউ গ্রান্ড সার্কাসে আর এক দুর্ঘটনা। থালাসেরির কাছে মেল্লুর গ্রাম থেকে উঠে আসা সার্কাসশিল্পী ননী সাইকেলে স্টান্ট দেখাতে গিয়ে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু।
রাত্নী, সার্কাসের ক্লাউন চার্লিসাবের মেয়ে। চার্লিসাব ইন্দোনেশিয়ার লোক। ১৯৩০ এর দিকে এক ইন্দোনেশিয়ান পণ্যবাহী জাহাজের নাবিক হয়ে বোম্বে আসেন। বোম্বেতে গ্রেট রেমন সার্কাস দেখতে গিয়ে ক্লাউনের অ্যাক্টে আকৃষ্ট হয়ে গিয়ে সার্কাসে যোগ দিলনে ক্লাউনের ভূমিকায়। নাসিরুদ্দিন থেকে হয়ে গেলে চার্লিসাব। এ দেশেই বিয়ে করে সংসারী হলেন। রত্নী তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর মেয়ে। তাঁবুতেই বেড়ে ওঠা, বাবা-মায়ের কাছে প্রশিক্ষণ, সবার আদরের ফুটফুটে মেয়ে। ১৯৫৭-য় বোম্বের মাট্টুঙ্গার কিং সার্কেল মাঠে গ্রেট রেমনের তাঁবু পড়েছিল। ম্যাটিনি শো। জমজমাট শো, হাউস্ফুল। সিনিয়র শিল্পী পদ্মভাথি পায়ের ওপর ল্যাডার ব্যালেন্সের খেলা দেখানোর জন্য টেবিলে শুয়ে পড়ে দু’পা ওপরে তুলে দিলেন, পায়ের ওপর ল্যাডার চাপানো হল। ব্যালেন্স ঠিকঠাক হলে, রাত্নীকে ঈশারা করলেন ল্যাডারে উঠতে। রাত্নী ল্যাডারের শেষধাপে পৌঁছে সিঙ্গল ট্রাপিজে পৌঁছে গেল, সেখানে সে কিছু খেলা দেখাল, দর্শক করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানাল। ট্রাপিজের খেলা শেষ করে রাত্নী ল্যাডারের শেষ প্রান্তে থাকা এক্সটেনশনের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে ফেরার সময় মুহূর্তের মধ্যে ল্যাডার একদিকে হেলে গেল, রাত্নী ছিটকে পড়ে গেল রিঙের পাশে, ল্যাডার পড়ল তার মাথার ওপর। রিঙের মধ্যে তখন দাঁড়িয়ে ক্লাউনশিল্পীরা, যাদের মধ্যে ছিল রাত্নীর বাবা চার্লিসাবও, তারা সতর্ক থাকে শিল্পী ব্যলেন্স হারিয়ে পড়ে গেলে তাদের ধরে নেওয়ার। আজ তারা পারল না। সার্কাসের রিং বড় নিষ্ঠুর, যা-ই ঘটুক না কেন, দ্য শো মাস্ট গো অন। পরবর্তী আইটেম শুরু হল। রাত্নীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে মৃত বলে ঘোষণা করা হল। পুলিশ পদ্মাভাথির বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর কেস করলে রাত্নীর বাবা চার্লিসাবের স্টেটমেন্টে পদ্মাভাথি কেস থেকে ছাড়া পেলেন। রিঙের মধ্যে এক বাবা তার প্রজাপতির মত ফুটফুটে মেয়েটাকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে যেতে দেখল।
মাট্টুঙ্গার এই কিং সার্কেল মাঠ চার্লিসাবের কাছে এক অভিশপ্ত মাঠ। যে মাঠে নিজের মেয়ে রাত্নীকে হারালেন চার্লিসাব, এই ঘটনার দশ বছর আগে সেই মাঠেই হারিয়েছিলেন নিজের বড় ছেলে কৃষ্ণকে। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর ১৯৪৭-এর অগ্নিগর্ভ সাম্প্রদায়িক হানাহানির ভারত। গ্রেট রেমন তখন মাট্টুঙ্গার এই কিং সার্কেল মাঠে। শহরে জারি হয়েছে কার্ফু। শো বন্ধ। তাঁবুতে না আছে খাবার, না পাণীয় জল। তাঁবুর বাইরে পা বাড়ানো যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে এক বালতি জলের জন্য কৃষ্ণ তাঁবুর বাইরে রাস্তায় বেড়ুল।কাছেই এক জলসত্র। ঠিক সেই সময়ে পুলিশ তাড়া করেছিল এক দাঙ্গাবাজ দলকে। কৃষ্ণর জল ভরা হয়ে গিয়েছে। পুলিশের গুলি এসে লাগল কৃষ্ণর শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। বালতির পানীয় জল আর স্বাধীন দেশের এক নিরীহ সার্কাসবালকের রক্ত মাখামাখি রাস্তা উচ্চারণ করল – জয় হিন্দ!
যে মাসে গ্রেট রেমনের তাঁবুতে রাত্নীর দুর্ঘটনা হয়েছিল, সেই মাসেই সেই শহরেই গ্রেট রয়্যাল সার্কাসে ঘটল আরও একটি দুর্ঘটনা। এবার বোম্বের বান্দ্রায়। ময়ূরের সাজে সজ্জিত ছ’জন মেয়ে ‘পিকক ড্যান্স’ আইটেমটি জমিয়ে দিচ্ছিল। পরের আইটেম সিংহ বাঘদের নিয়ে। রিঙের পিছনদিকে খাঁচাগুলি নিয়ে এসে প্রস্তুতি চলছিল পরের আইটেমের। অসাবধানতাবশত, একটি খাঁচার গ্রিলের দরজা খুলে যায়। একটি সিংহ খাঁচা থেকে বেড়িয়ে এসে দেখল তার সামনে কয়েকটা ময়ূর ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঝাঁপ দিয়ে পিছন থেকে ময়ূরবেশী নৃত্যরত একটি মেয়েকে ঘাড় ধরে টানতে টানতে খাঁচার দিকে এগিয়ে গেল। হইহই করে উঠল দর্শকরা। ভয় পেয়ে মেয়েটিকে ছেড়ে খাঁচায় ফিরে গেল সিংহ। মেয়েটির নাম সরোজিনী, বাবা ট্রুপ লিডার কুনহিক্কান্নান। ভাঙা ঘাড় নিয়ে ভর্তি হল হাসপাতালে, কিছুদিনের মধ্যে চলে গেল কুড়ি বছরের তরতাজা এক সার্কাসশিল্পী।
১৯৫৭ সালে গ্রেট রেমনের তাঁবু পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গের খড়গ্পুরে। তখনকার দিনে দুটো শো হত প্রতিদিন- সন্ধ্যা ছ’টায় আর রাত ন’টায়। এই ক্যাম্পের আগের ক্যাম্প ছিল হাওড়ায়। সেখানে নারায়ণী, শান্থা ও যশোদা, এই তিনজনকে নিয়ে ট্রিপল ট্রাপিজের এক নতুন খেলা শুরু হয়েছিল। সকলেই এই নতুন খেলাটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল। শিল্পীদের নাম ঘোষিত হল। শিল্পীরা রিঙে এসে সার্কাসীয় ভঙ্গিমায় দর্শকদের অভিবাদন করলেন। রোপ ল্যাডার বেয়ে উঠে তিরিশ ফুট উঁচুতে ট্রাপিজের জায়গায় পৌঁছে গেলেন। নারায়ণী, শান্থা ও যশোদা শুরু করলেন ট্রাপিজের খেলা। নিচে কোনো নেট ছিল না, ব্যবস্থা ছিল না সেফটি বেল্টেরও। নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন কয়েকজন শিল্পী, নজর রাখছিলেন মেয়েদের মুভমেন্টের ওপর, ব্যালেন্স হারিয়ে কেউ পড়ে গেলে যাতে ধরে ফেলতে পারেন। হঠাৎ নারায়ণী পড়ে গেলেন, তিরিশ ফুট ওপর থেকে, নিচের দিকে মাথা করে। সেই মুহূর্তে যশোদাও একজন রিঙ-বয়ের ওপর পড়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণী ও যশোদাকে রিঙ থেকে নিয়ে গেলেন কয়েকজন রিঙবয়। অন্যরা পরের আইটেমের জন্য রিঙ গোছাতে লাগল। যা-ই ঘটুক না কেন, রিঙে খেলা চলবেই, সার্কাসের মূল মন্ত্র। হাসপাতালে যাবার পথে নারায়ণীর মৃত্যু হল। যশোদা ভাঙা হাত নিয়ে সার্কাসের বাতিল শিল্পী হয়ে বছরের পর বছর রয়ে গেলেন তাঁবুতে। যতদিন তিনি তাঁবু ছাড়তে না চেয়েছেন, দল তাঁকে ছাড়ে নি।
১৯৬৪-তে এক অগ্নিকাণ্ডে কমলা সার্কাসের তাঁবু ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত হল মাদ্রাজে। তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এম জি রামচন্দ্রন দশ হাজার টাকা সাহায্য করলেন। পরদিন সিঙ্গল ট্রাপিজের খেলা দেখানোর সময় সেই অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া আয়রন রোপ ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয় এক বালিকার।
১৯৮১-তে ভেনাস সার্কাসের তাঁবু ব্যাঙ্গালোরে। স্কুলছাত্রদের জন্য এক স্পেশাল ম্যাটিনি শো। তাদের গড় বয়স চোদ্দোর নিচে। সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভবাক-অভিভাবিকাও। শো শেষের মুখে হঠাৎ আগুন আগুন চিৎকার। তাঁবুর এক কোণে লেগেছে আগুন। প্রাণ বাঁচাতে তাঁবু থেকে বেড়িয়ে পড়ার জন্য ছুটল সবাই। তাঁবুর পিছনেই রেল লাইন, তাঁবু থেকে বেরুনোর একটাই গেট। সেই মেন গেটের দিয়ে হুড়োহুড়ি করে বেরিয়ে যেতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে ও গায়ে আগুন লেগে মৃত্যু হল আশি জন স্কুলছাত্রের। মৃতদের তালিকায় ছিল তিন চার জন পুরুষ মহিলাও। একটি গণ্ডার সহ সার্কাসের কিছু বন্য পশুও পুড়ে মারা গেল। ১৯৪৪ সালে এই একই রকম দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিল আমেরিকার রিংলিং ব্রাদার্স এণ্ড বারনাম এণ্ড ব্রেইলি। দর্শক ও সার্কাস কর্মী মিলিয়ে একশো আশি জনের মৃত্যু হয়। জন্তু জানোয়ার তো ছিলই। আহত হয় কমবেশি পাঁচশো জন। সেই ঘটনায় সার্কাসের পাঁচ কর্মীর এক বছর করে জেল হয়েছিল, সার্কাসকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল কয়েক মিলিয়ন ডলার। আর ভেনাস সার্কাসের অগ্নিকাণ্ডে আশি জন ছাত্রছাত্রীর মৃত্যুর পর আগুন লাগার কারণ খুঁজতে কর্ণাটক সরকার এক কমিশন বসিয়েছিল, যে কমিশনের রিপোর্ট দিনের আলো দেখে নি। ভেনাস সার্কাস মহারাজা সার্কাস নাম নিয়ে অন্য প্রদেশে চলে গিয়েছিল। কয়েক বছর পর সার্কাসের পার্টনার লাল ও মুসার মৃত্যু হলে সার্কাস বন্ধ হয়ে যায়। সার্কাস ট্রাজেডি ও পরিহাসের আর এক নাম ভারতবর্ষীয় আইনিব্যবস্থা!
বাঙালির সার্কাস প্রিয়নাথ বসুর সার্কাসের সুশীলা সুন্দরী শুধু যে বাঘের সঙ্গে খেলা দেখিয়ে সার্কাসের স্টার হয়েছিলেন তা নয়, ট্রাপিজ, অ্যাক্রোব্যাটিক্স, জিমন্যাস্টিক্সের খেলায়ও তিনি ছিলেন অনন্য। সুশীলা সুন্দরী জীবন্ত সমাধির খেলাও দেখাতেন মুন্সিয়ানার সঙ্গে। রিঙের এক পাশে এক গর্তের মধ্যে জীবন্ত সমাধি দেওয়া হতো তাঁকে। এরপর রিঙে দেখানো হতো ঘোড়ার খেলা। সে খেলা শেষ হলে গর্তের মুখ খোলা হতো। উঠে আসতেন সুশীলা সুন্দরী। পশ্চিম ভারতের এক শহরে এই বিপজ্জনক খেলা দেখাতে গিয়ে এক সন্ধ্যার প্রদর্শনীতে জীবনসঙ্কটে পড়েছিলেন সুশীলা। সুশীলাকে জীবন্ত সমাধি দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে উঠল প্রচণ্ড ঝড়। তাঁবুর প্রধান খুঁটির কিছুটা অংশ গেল ভেঙে। তাঁবু ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। দর্শকদের ছোটাছুটি। জন্তুজানোয়ার, আলো, তাঁবু সামলানোর হুটোপাটির মধ্যে, যে যার প্রাণ বাঁচানোর ব্যস্ততার মাঝে সকলে ভুলে গেল সুশীলার কথা। ঝড় থামলে বিস্রস্ত মূল তাঁবু থেকে যে যার নিজের ঘরে ফিরেও গেল। সার্কাসের মহিলারা যখন খেতে বসেছেন, হিন্দুস্তানী পাচক জিজ্ঞাসা করলেন – সুশীলা কোথায়? হ্যারিকেন নিয়ে ছুটল সবাই মূল তাঁবুতে। সে তাঁবু তখন ছিন্নভিন্ন। বাঁশ, তাঁবু, দড়িদড়া, গ্যালারির চেয়ার ভেঙেচুরে, ছিঁড়েখুঁড়ে লণ্ডভণ্ড অবস্থা। যেখানে সেখানে জল জমে। সেসব ডিঙিয়ে জীবন্ত সমাধির জায়াগায় গিয়ে দেখল সবাই, একটি কানাত চাপা অবস্থায় সুশীলা একটি খুঁটির গায়ে ঠেস দিয়ে আধশোয়া, দুটি পা তখনও মাটির ভেতরে, থরথর করে কাঁপছে। গর্তের ভেতর থেকে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে কোনোরকমে উঠে এসেছিলেন, ডাকাডাকি করলেও প্রবল হট্টগোলে সে হাঁক কারও কানে পৌঁছায় নি, কানাত চাপা পড়ায় নজরে পড়ে নি কারও। সে যাত্রা সুশীলা বেঁচে গিয়েছিলেন অপরিসীম দৈহিক ও মানসিক ক্ষমতার জোরে। এরপর থেকে নিয়ম করা হলো, সুশীলার এই জীবন্ত সমাধি খেলাটির সময় একজন সার্কাসকর্মী গর্তের কাছে দাঁড়িয়ে থাকবেন যতক্ষণ না গর্ত থেকে বেড়িয়ে আসেন সুশীলা।
সুশীলা আরও একবার মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছিলেন। এবার পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কাটোয়া শহরে। ১৯১১-১২ সাল নাগাদ প্রিয়নাথ বসু লক্ষ্ণৌর একটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া সার্কাস কিনে নিয়েছিলেন। সেই সার্কাসে ছিল ছিল একটি সুন্দরবনের প্রকাণ্ড বাঘ, নাম ফরচুন, বাঘটি ছোটো থেকে খেলা দেখানোর কোনো প্রশিক্ষণ পায় নি। সেইজন্য প্রিয়নাথের সার্কাসের রিঙে সে বাঘটির ভূমিকা ছিল স্রেফ পশু প্রদর্শনের। প্রিয়নাথের প্রশিক্ষিত বাঘ ডিউক নিয়ে খেলা দেখানো হতো তখন। ডিউকের মৃত্যু হলে ফরচুনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। প্রশিক্ষণের বয়স তখন তার উত্তীর্ণ হলেও চেষ্টাচরিত্র করে তাকে নামানো হয়েছিল রিঙে। রিঙের মধ্যে একটি খুঁটিতে তাকে বেঁধে রাখা হতো। সুশীলা তার গায়ে হাত বুলোতেন, বাঘটির গায়ে ঠেস দিয়ে শুয়ে পড়তেন। প্রিয়নাথ নিজে একটি চাবুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন কাছে। প্রিয়নাথকে খুব ভয় পেত বাঘটি। সেবার কাটোয়াতে তাঁবু পড়ল। সেদিন শহরে মাংস অমিল। বাঘটিকে অর্ধভুক্ত অবস্থায় রিঙের মধ্যে খুঁটিতে বেঁধে রাখা হলো। প্রিয়নাথও সেদিন রিঙে অনুপস্থিত, তাঁর জায়গায় চাবুক হাতে বাঘটির কাছে দাঁড়িয়ে অন্য একজন, নরেন্দ্রনাথ দে। সুশীলা নিয়মমতোই বাঘটির সঙ্গে খেলা দেখাচ্ছেন। বাঘটির গায়ে ঠেস দিয়ে শুলেন যখন, ঝটকা দিয়ে উঠে সুশীলাকে চেপে ধরে মাথায় থাবা বসালো সজোরে। সুশীলা সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে বাঘটিকে ঠেলে উল্টে দিতে পারলেন। কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার আক্রমণ করে সুশীলার কাঁধে থাবা বসালো। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব নরেন্দ্রনাথ চাবুক চালালে বাঘটি সুশীলাকে ছেড়ে নরেন্দ্রনাথের দিকে ঝাঁপিয়ে গেল। কিন্তু খুঁটির সঙ্গে বাঁধা থাকায় পৌঁছাতে পারল না তার কাছে। ইতিমধ্যে অসমসাহসী, বুদ্ধিমতী সুশীলা কোনোক্রমে বাঘের নাগাল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এসে জ্ঞান হারালেন। এই ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী তাঁবুর দর্শকরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
সুশীলাকে নিয়ে আসা হয় কলকাতার মেডিক্যাল কলেজে। মস্তিষ্কে গভীর ক্ষত, সার শরীরে ছোট বড় অসংখ্য বিষাক্ত ক্ষতে জীবন সঙ্কটের মুখে পড়া সুশীলার চিকিৎসার জন্য মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক কর্ণেল বার্ডের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। এক বছর ধরে চিকিৎসার পর সুশীলা সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিছুদিন পর ফেরেন তাঁবুতে। আবার বাঘের খেলা দেখাতে চান, বলেন- প্রিয়বাবু যদি কাছে দাঁড়িয়ে থাকেন, তিনি আবার বাঘের খেলা দেখাতে রাজি। এমনই আস্থা ও ভরসার জায়গা ছিলেন প্রিয়নাথ তাঁর শিষ্য-শিষ্যাকুলের কাছে। তবে ঐ দুর্ঘটনার পর স্বাস্থ্যভঙ্গ ও বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে বিপজ্জনক খেলার সাথে তাঁকে আর যুক্ত করা হয় নি। এই দুর্ঘটনা ছাপ ফেলে দেয় সুশীলার শরীরে। ১৯২৪ সালে মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ভারতীয় সার্কাসের এই নক্ষত্র নিভে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আলো ছড়িয়ে গিয়েছেন সেই যুগে যখন পতিসেবা ও সন্তান পালনেই ছিল নারীর মোক্ষলাভ।
(৪)
স্বাধীনোত্তর ভারতে শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি ও নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে ওঠার সাথে সাথে উত্তর মালাবারে নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলাদের সার্কাসের প্রতি আগ্রহ কমতে থাকে। কিছু কিছু সার্কাস- মালিক গরীব ও সরল মেয়েদের দিনের পর দিন, বছরের পর বছর খাটিয়ে নিতেন, না দিতেন ঠিকমতো বেতন, না ছুটিছাটা। এমন কি তারা বাড়ি গিয়ে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করার, তাঁদের সঙ্গে কিছুদিন কাটানোর সময় ও সুযোগ পেত না কাজের চাপে। কয়েকজন অভিভাবক পুলিশের দ্বারস্থ হলে তা আদালত পর্যন্ত গড়াল। সার্কাস তাঁবুর সেসব খবর ছড়িয়ে পড়ল তাঁবুর বাইরে। যে ভারতীয় সার্কাসে থালাসেরি ও কান্নুর অঞ্চল থেকে মালোয়ালী মহিলা শিল্পীরা আসতেন দলে দলে, তাঁরা ধীরে ধীরে সার্কাসকে বিদায় জানাতে লাগলেন। সার্কাস-মালিকরা সেই শূন্যস্থান পূরণে নেপালের দিকে নজর ঘোরালেন। নেপাল থেকে ভারতে আসতে না লাগে পাসপোর্ট, না লাগে ভিসা। ভারতীয় মুদ্রা নেপালি মুদ্রার থকে অনেক বেশি শক্তিশালী। ১৯৪০-এর দিকে নাইট ওয়াচম্যান, রাঁধুনি, মিউজিসিয়ান হিসাবে কিছু নেপালি পুরুষ ভারতীয় সার্কাসের তাঁবুতে আসেন। কিছু মালোয়ালি সার্কাসশিল্পী ভারতের উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলিতে শো করতে গিয়ে নেপালি মেয়েদের বিয়ে করেন। কোনো কোনো সার্কাসের কর্ণধাররা গরীব নেপালি পরিবারের শিশু ও কিশোরীদের সার্কাসে নিয়ে এসে তালিম দিয়ে শিল্পী করে তোলেন। সার্কাসের অন্যান্য কাজে যুক্ত নেপালিরা সার্কাস-মালিকদের এজেন্ট হয়ে গেলেন। নেপাল থেকে তাঁরা নিয়ে এলেন বাচ্ছা ছেলেমেয়েদের। সেইসব এজেন্টদের সদর দপ্তর হয়ে গেল কলকাতা। নেপালের হেত্তোদা অঞ্চল থেকে দশ থেকে পনেরো বছর বয়সী শ’য়ে শ’য়ে নেপালি ছেলেমেয়ে হাজির হলো কলকাতায়। এরপর বিভিন্ন সার্কাসের তাঁবুতে চাহিদা অনুযায়ী পাঠানো হত তাদের। বহু নেপালি ছেলেমেয়ে সীমান্ত পেড়িয়ে কাজের খোঁজে সার্কাসের তাঁবুতে ভিড় জমাল। বিশ শতকের ছ’য়ের দশকের দ্বিতীয়ভাগ থেকে ভারতীয় সার্কাসের তাঁবুতে নেপালি মেয়েদের আধিপত্য শুরু হলো। নেপালের হেত্তোদা অঞ্চল হয়ে গেল ভারতীয় সার্কাসের সূচনাপর্বের থালাসেরি-কান্নুর।
কমলা থ্রি রিং সার্কাসের ভারোত্তলোক নেপালি ভীম বাহাদুরের মতো কেউ কেউ সার্কাসশিল্পী হয়ে ওঠেন। জেমিনি সার্কাসের নেপালের হেত্তোদা অঞ্চলের মেয়ে বাসন্তী কুমারীর মতো কেউ কেউ ফ্লাইং ট্রাপিজ, অ্যাক্রোব্যাটিক্স, সাইকেলের খেলায় তুখোড় হলেও গড়পড়তা নেপালিদের শারীরিক সক্ষমতা জিমন্যাস্টিকসের পক্ষে উপযুক্ত নয়। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা ছিল নেপালি শিল্পীদের পক্ষে। তাঁদের সার্কাসে যোগদানের জন্য কোনো সামাজিক চাপ বা হুমকির কাছে মাথা নত করতে হত না সার্কাস-মালিকদের। বেতন খাতে খরচও কম। পুলিশ কোর্ট-কাছারির ঝামেলা নেই। পুলিশ প্রশাসনের কোনো আইনি বাধা না থাকায় ভারতের সার্কাসের তাঁবুতে নেপালি মেয়েদের নিয়োগ বেড়ে গেল। আবার নেপালিদের কাছেও ভারতীয় সার্কাসের তাঁবু অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশ আকর্ষণীয়।পরিবার ও অভিভাবকরা তিন থেকে পাঁচ বছরের চুক্তিতে স্বেচ্ছায় তাঁদের বাচ্ছাদের তুলে দিতে থাকলেন প্রশিক্ষণের জন্য। ভারতীয় সার্কাসের ইতিকথায় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার নেতিবাচক দিকগুলিই সার্কাসে শিল্পী ও কর্মীদের যোগান দিয়ে এসেছে চিরকাল। সার্কাস-মালিকরা মালোয়ালিদের থেকে নেপালিদের বেশি পছন্দ করা শুরু করল ।
ভারতীয় সার্কাসের চিরবিতর্কিত বিষয় শিশুশিল্পী। ‘বচপন বাঁচাও’ আন্দোলনের পুরোহিত নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত নেপালের কৈলাশ সত্যার্থির ছেলে ভূবন রিভু অভিযোগ করেন, নেপালের হেত্তোদা ও মাকনানপুরের মতো ছোট্ট অঞ্চল থেকে সাতশো মেয়ে সার্কাসের কাজের জন্য গিয়েছিল, কিন্তু কাউকেই সার্কাসে খুঁজে পাওয়া যায় নি। শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে।মধ্যপ্রদেশের বিদিশা জেলা থেকে আঠারো জন মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। বচপন বাচাও’আন্দোলন শুরু হলে ভারতীয় সার্কাসে শিশুশিল্পীদের অবস্থা নিয়ে গবেষণামূলক অভিযান চালানো হয় ২০০২ সালে। তিরিশটি সার্কাস দলের সাড়ে সাত হাজার কর্মীর ওপর ছ’মাস ধরে কাজ করেকয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন । সমীক্ষায় উঠে আসে, ৪৭.৮ শতাংশ শিশুশিল্পীই নেপালি, যাদের আনা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি ও নেপালের হেত্তোদা অঞ্চল থেকে। আন্তঃরাজ্য ও অন্তরাজ্য শিশু পাচার চক্র সক্রিয় এ ব্যাপারে। একবার পাচারকারীদের মাধ্যমে সার্কাসের তাঁবুতে শিশুদের আশ্রয় হলে তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে যায় সার্কাসের তাঁবু। অনেক সময় অভিভাবকরা তাঁদের হারানো ছেলেমেয়েদের খুঁজে পান সার্কাসের তাঁবুতে। আবার যে সমস্ত অভিভাবক যে সার্কাসদলে তাঁদের ছেলেমেয়েদের তুলে দিয়েছিলেন, সেই সার্কাসদলটিকেও খুঁজে পান না, কারণ সার্কাসদল বারবার নাম বদলায়। ছেলেমেয়েদের খোঁজ নিতে গিয়ে সার্কাসদলের হাতে নিগ্রহের ঘটনাও ঘটে। সমীক্ষায় উঠে আসে, মাত্র চারটি সার্কাসদল শিশুদের অনুকূল পরিবেশ দিতে পেরেছে। কয়েকটি বড়ো দল বাদ দিলে প্রায় সব দলেই শিশুশিল্পীরা চরম বঞ্চনার শিকার। তাদের না আছে ন্যূনতম মজুরি, না বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ। শৈশব মুখ লুকায় মুনাফার দাঁড়িপাল্লায়। রাজ্য ও রাজ্যের বাইরে শিশু পাচার ও নিখোঁজের সঙ্গে সার্কাসের যোগসূত্র খুঁজে পায় প্রশাসন। সার্কাস শিল্প উঠে পড়ে শিশুপাচারের কাঠগড়ায়।
২০০৩ সালে ভারতীয় সার্কাস ফেডারেশন নির্দেশ জারি করে, আর কোনো বাচ্ছাকে কোনো সার্কাসে নিয়োগ করা হবে না, প্রত্যেক সার্কাসকে তাঁবুর বাচ্ছাদের তালিকা জমা দিতে হবে ‘বচপন বাঁচাও’ আন্দোলন কর্তৃপক্ষের কাছে। এইসব বাচ্ছাদের পুনর্বাসনের জন্য এনজিওগুলি সাহায্য করবে। ২০০৪ এ গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের কেরালার তাঁবু থেকে ও গ্রেট রেমন সার্কাসের উত্তরপ্রদেশের তাঁবু থেকে কিছু বাচ্ছাদের উদ্ধার করে দু’টি এন জি ও। উত্তর প্রদেশে এক সার্কাসের তাঁবু থেকে উদ্ধারকার্যের সময় কৈলাশ সত্যার্থি সার্কাস দলের কাছে নিগৃহীত হন। এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৪-এ ‘রোপস ইন দেয়ার হ্যাণ্ড’ নামে একটি ডকুমেন্টারি করা হয় সার্কাসে বাচ্ছাদের অবস্থা ও তাদের উদ্ধারকার্য নিয়ে। এই ডকুমেন্টারিতে দেখা যায়, সার্কাস-মালিকরা অনেক ক্ষেত্রেই সহযোগিতার হাত বাড়ানোর বদলে উদ্ধারকারী দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই ডকুনেন্টারিটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলে চাপ বাড়ে সরকারের ওপর। এইসব শিশুদের উদ্ধার করে তাদের সামাজিক পুনর্বাসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রশাসনিক স্তরে। বচপন বাঁচাও আন্দোলনের ফলে ভারত ও নেপালের শিশুপাচারের বিরুদ্ধে তীব্র জনআন্দোলন গড়ে ওঠে। চাপ বাড়ে ভারতীয় সার্কাসের ওপর। সার্কাস-মালিকদের একাংশের মতে এই রেডগুলি করা হয়েছিল ছোটো কিছু সার্কাসে, যারা সার্কাস ফেডারেশনের সদস্যও নয় এবং সেখানে সার্কাস পরিবারের নীতি-নৈতিকতা মানা হত না, কিন্তু জাম্বো, র্যাম্বো, জেমিনি, অ্যাপোলোর মতো বড়ো সার্কাসগুলি ছিল আক্ষরিক অর্থেই পরিবার।
২০১১ সালে সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশে ১৪ বছরের নিচে ছেলেমেয়েদের সার্কাসে খেলা দেখানো নিষিদ্ধ হয়। এই নিষিদ্ধকরণ সার্কাসের বড়ো ক্ষতি করে দেয় কারণ ছোটো থেকে তালিম না দিলে সার্কাসশিল্পী তৈরী হয় না। গ্র্যান্ড রয়্যাল এবং রেয়ন সার্কাস ভারতীয় শিল্পীদের নিয়োগই বন্ধ করে দিল, কারণ দশ বছরের কম বাচ্ছাদের তারা তালিম দিতে না পারলে শিল্পী তৈরী করতে পারবে না। তারা মঙ্গোলিয়া, পূর্ব ইউরোপ, উজবেকিস্তান, কাজাকস্তান, ভিয়েতনাম কেনিয়া, ইথিওপিয়া থেকে শিল্পী নিয়ে এলো। ভারতীয় সার্কাসে ভবিষ্যৎ শিল্পীদের প্রজন্ম হারিয়ে গেল ভারতীয় সার্কাসের তাঁবু থেকে। এরই মধ্যে নেপাল ও উত্তর পূর্ব ভারতের কিছু মহিলা শিল্পী সার্কাসে জায়গা করে নিল চেহারার কারণে, তাদের দেখে বয়স বোঝা যায় না, বয়সের শংসাপত্ররও বালাই ছিল না।
শিশুরা টিভি সিরিয়াল, সিনেমা,গান নাচের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলে তারা শিশুশিল্পী হয়ে যায়। কিন্তু সার্কাসের মতো এক পারফর্মিং আর্টের জগতে তা হয়ে যায় শিশুশ্রম। উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরী করে শিক্ষা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে এই পারফর্মিং আর্টের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের বিকল্প ব্যবস্থা না করার ফলে ভবিষ্যতের সার্কাসশিল্পী উঠে আসার পথটি রুদ্ধ করে দেওয়াটা, সার্কাসের কফিনে পেরেক পুঁতে দেওয়ার সামিল।
——————————————————————
১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হলে একের পর এক প্রিন্সলি স্টেট ব্রিটিশের হস্তগত হলো। যারা এই মহাবিদ্রোহকে সমর্থন করেছিল, তাদের রাজত্ব গেল। আর যাদের রাজত্ব থাকল, ব্রিটিশদের দাবি মতো কর দিতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস উঠল। ততদিনে কৃষিজ পরিকাঠামো ও রাজস্ব ব্যবস্থার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে। একই সঙ্গে এই প্রিন্সলি স্টেটগুলি তাদের মিলিটারি কর্তৃত্বও হারাল। এই রাজ্যগুলির সংগ্রহে ছিল প্রচুর বন্যপ্রাণী। সেই বন্যপ্রাণীদের পোষার মতো ব্যয়ভার বহন করা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল। সার্কাসদলের খেলা দেখে সন্তুষ্ট হলে দেশীয় রাজা মহারাজারা তাঁদের সংগ্রহের জন্তুজানোয়ার উপহার দিলে, একদিকে যেমন সার্কাসদল পৃষ্ঠপোষকতা পেল, অন্যদিকে মহারাজাদের ক্ষয়িষ্ণু কোষাগার বন্যপ্রাণী লালনপালন করার বিপুল খরচ থেকে কিছুটা অব্যাহতি পেল।
ভারতীয় সার্কাস শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই সার্কাসের সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র তৈরী হয়েছিল সার্কাসে বন্যপশু সরবরাহের সূত্রে। ভারতের পুষ্কর ও সোনাপুরের পশুমেলা থেকে সার্কাসদলের ম্যানেজাররা পশু সংগ্রহ করত। দক্ষিণ এশিয়ার সার্কাসের পশুগুলি আসত এজেন্টদের মাধ্যমে। এইসব এজেন্টরা ভারতের বিভিন্ন বন্দর এলাকায় ডেরা বাঁধতেন। ১৮৩২ এর আগে কেপ অফ গুড হোপে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির পশু ব্যবসা রমরমিয়ে চলত। জাহাজীরাও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যেত বন্য পশু। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় জুওলজিকাল গার্ডেন গড়ে উঠলে সার্কাস ম্যানেজাররা সেখান থেকেও বন্য জন্তু জানোয়ার সংগ্রহ করত। উনিশ শতকের পথশিল্পীরা যারা বাঁদর সাপ ভাল্লুক নিয়ে রাস্তায় খেলা দেখাত, তাদের কাছ থেকেও জন্তু জানোয়ার সংগ্রহ করত সার্কাস দলের ম্যানেজাররা। এ দেশীয় সম্ভ্রান্ত ধনীদের পশুশালা থেকে সার্কাসে সার্কাসে পশু এসেছে পুরস্কার হিসেবে। কলকাতার মার্বেল প্যালেসের পশুশালা তখনকার ভারতের এক বিখ্যাত ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পশুশালা।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে জার্মান বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ী কার্ল হ্যাগেনবেকের ফার্ম হয়ে উঠেছিল বিশ্ব-সার্কাসে বন্য জন্তুজানোয়ার সরবরাহের এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। সারা বিশ্বজুড়ে মাকড়সার জালের তাঁর সাম্রাজ্য। তাঁর পশুশালা সমৃদ্ধ হত ইউরোপীয় শিকারী,আফ্রিকার উপজাতীয় সর্দারদের শিকারের ফসলে যেমন, তেমনি ভারতের রাজা মহারাজারাও ছিলেন সেই দলে। ১৮৮৭-র পর বিশ্বের যে কোনো সার্কাসের পশুশালা হ্যাগেনবেক ফার্মের সরবরাহ করা বন্যপ্রাণী ছাড়া ভাবাই যেত না। ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে এই ফার্মের বন্যপ্রাণী সংগ্রহ ও ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। জার্মান সরকারের জন্য দক্ষিণ পশ্চিম আফ্রিকায় ১৯০৬ সালে প্রায় দু’হাজার এক কুঁজের উট সরবরাহ করা হয়েছিল এই ফার্ম থেকে। আবার ঐ অঞ্চলের জার্মান সৈন্যরাও তাঁকে সেই অঞ্চলের প্রচুর বন্যপ্রাণী দিয়েছিলেন। ভারতীয় সার্কাসের পশুশালাগুলিও সমৃদ্ধ হয়েছে এই ফার্মের সরবরাহে। হ্যাগেনবেক সিনিয়রের পুত্র লোরেঞ্জ হ্যাগেনবেক তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, তিনি যখন কলকাতা্র আলিপুরে এসে চিড়িয়াখানার কাছে তাঁবু পেতেছিলেন, এ দেশের পশু প্রশিক্ষকরা খবর পেয়ে ভিড় করেছিলেন তাঁর তাঁবুতে।
প্রিয়নাথ বসুর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের দুই বিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার – সুলতান ও মুলতান। সুলতানকে আনা হয়েছিল বর্ধমানের মহারাজার পশুশালা থেকে। আর মুলতান লাহোরের এক পাঠান জমিদারের পশুশালা থেকে এসেছিল। তারা সার্কাসে নানা রকম খেলা দেখিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করত, যার মধ্যে একটি ছিল আগুনের রিং এর মধ্যে দিয়ে ঝাঁপ দেওয়া। মুলতানকে প্রচুর টাকায় ‘উডইয়ার অস্ট্রেলিয়ান সার্কাস’-এ বিক্রি করে দেওয়া হলে গ্রেট বেঙ্গলের পশুশালায় থেকে যাওয়া সুলতান খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিল। খেলা দেখানো তো দূরের কথা, সুলতানকে নড়ানো চড়ানো যেত না, চুপ করে বসে থাকত। সার্কাস ম্যানেজার বিখ্যাত পশু প্রশিক্ষকদের ডাকলেন প্রতিকারের জন্য। কেউ কিছু করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত অনেক টাকা দিয়ে ‘উডইয়ার অস্ট্রেলিয়ান সার্কাস’ থেকে মুলতানকে আবার ফিরিয়ে আনা হলো । কিন্তু সুলতানকে বাঁচানো গেল না। মুলতান খাঁচায় ফিরে আসার পর সুলতান মারা গেল। সার্কাসদল এই ঘটনাকে মূলধন করে প্রচার করল- বাঘ ও বাঘিনীর ভালোবাসা ও বিরহগাথা, বিধবা সুলতানের খেলা দেখতে আসুন এসপ্লানেড প্যারেড গ্রাউণ্ডে।
গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের ম্যাকাও, নাম লক্ষ্মী, তাকে শেখানো হয়েছিল ‘বন্দেমাতরম’ গানটি। গ্রেট বেঙ্গলের প্রদর্শনী শুরু ও শেষ হত লক্ষ্মীর বন্দেমাতরম গান দিয়ে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে ন্যাশনাল সার্কাসের জিরাফ ‘ছোটু’ গলা বাড়িয়ে বাচ্ছাদের কাছ থেকে লজেন্স নিত। হাওড়া স্টেশনে রেলগাড়ির কামরা থেকে বেড়িয়ে আসা ‘ছোটু’-র মাথা বার্তা পাঠাত কলকাতাবাসীকে- কলকাতায় ন্যাশনাল সার্কাস পা দিয়েছে। এইসব জন্তুজানোয়ারদের নাম দেওয়া হত হিন্দু দেবদেবীদের নামে। লক্ষ্মী-নারায়ণ, শ্মভু-নিশম্ভু, হিন্দু পুরাণের অংশ হয়ে যেত। আর তাদের বন্যতা হিন্দু ধর্মের ভক্তিভাবনায় জারিত হয়ে দর্শককে রোমাঞ্চিত করত। আবার ঔপনিবেশিক শাসনে সেইসব হিংস্র পশুদের সাথে মোকাবিলা করা ভারতীয়দের শৌর্য ও বীর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ সৈন্যদলে ঘোড়সওয়ার ছিল শুধু ব্রিটিশরা। ভারতীয়রা ছিল মূলতঃ পদাতিক। ভারতীয় সার্কাসে ভারতীয়দের ঘোড়সওয়ারের খেলা ছিল ব্রিটিশ আভিজাত্য ও জাতিগত বৈষ্যমের প্রতি এক সমুচিত জবাব। ‘বাঙালীর সার্কাস’-এ অবনীন্দ্রকৃষ্ণ বসু লিখেছেন- আমরা বাঘদের নিয়ে খেলা করি, কোনো চাবুক ছাড়াই, তারপর তাদের মাথায় চড়ে খেলা করি।
অনেক সময় সার্কাসের তাঁবুর বাইরে থাকত অস্বাভাবাবিক শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্ম নেওয়া প্রাণীদের প্রদর্শনী- তিন মাথাওয়ালা গরু, দু’মাথার ছাগল। দর্শকরা তাদের কাছ থেকে নিত আশীর্বাদ, বিনিময়ে সার্কাসদলের ক্যাশবাক্স ভারী হত।
ভারতীয় সার্কাসের শুরুর দিকে সার্কাসে জন্তু জানোয়ারের ওপর নিষ্ঠুরতা কমই ছিল। উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত যে ‘অ্যানি বেসান্ত সোসাইটি’ বা ‘রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনসন অফ ক্রুয়েলটি টু অ্যানিম্যালস’, গবেষণাগারে পশুপাখিদের নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, তারা সার্কাসে জন্তু জানোয়ারের খেলা নিয়ে বলে নি একটি কথাও।
একবার একটি সার্কাসে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে কেরোসিন পালিশ করে চকচকে করা হচ্ছিল। কাছেই ছিল একটি হ্যারিকেন। অসাবধনাবশত সেটি ভেঙে গেলে আগুনে পুড়ে যায় বাঘটি। কার্লেকর সার্কাসে দেশাত্মবোধক গান গাওয়া দু’টি কাক্তুয়াকে এক উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মচারীর সর্নিবন্ধ অনুরোধে স্যুপ খাওয়ানো হলে কাকাতুয়া দু’টির মৃত্যু ঘটে। একবার কলকাতা বন্দরে জাহাজ থেকে নামানোর সময় একটি উটের গলায় দড়ি পেঁচিয়ে গেল। উটটির মৃত্যু হলো। সেই মৃত উটটিকেই সার্কাসের প্রদর্শনীতে দেখানো হলো। চল্লিশটা শো করার পর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের জিরাফ ‘শম্ভু’ মারা গেলে কলকাতা ময়দানে সেই মৃত জিরাফটিকে দু’আনা পয়সার বিনিময়ে দর্শকদের দেখানো হয়।
হ্যাগেনবেকের জার্মান পশুশালায় বন্যপশুদের প্রশিক্ষণের জন্য কোনো নিষ্ঠুরতা দেখানো হত না, সে প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ছিল অহিংস। ভারতের বন্যপ্রাণী প্রশিক্ষকরা হ্যাগেনবেক মডেল অনুসরণ করে পশুগুলিকে সন্তানের মতো ভালোবেসে, বকেঝকে, দরকারমতো মৃদু প্রহার করে তাদের বশে আনতেন, শেখাতেন, সে প্রশিক্ষণে গাঁ গঞ্জের গৃহপালিত পশুকে বশে আনার কৌশলও ব্যবহার করা হত। বিখ্যাত পশু প্রশিক্ষক দামু ধোত্রে একবার অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও মালয় থেকে আনা একটি বাঘকে দাঁড় করাতে পারছিলেন না, বাঘটি বসেই থাকত। তখন তাঁর মনে পড়ে, ভারতে অনেক সময় তাঁদের সার্কাস দলের পথ আটকে বসে থাকে ষাঁড়। সেই ষাঁড় কিছুতেই নড়তে চায় না। তখন তার লেজ কামড়ে তাকে দাঁড় করাতে হয়। দামুও সেই পদ্ধতি অবলম্বন করলেন, বাঘ সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ে দামুর মুখোমুখি দাঁড়াল। দামুও তাকে প্রশিক্ষণ দিতে লাগলেন।
প্রফেসর প্রিয়নাথ বসু বলতেন, ভয় না দেখিয়ে শুধু ভালোবাসা দিয়ে বন্যজন্তুকে বশে আনা যায়। যারা কথায় কথায় চাবুক মারে , তারা বুঝতে পারে না, কোনো কোনো জন্তু সারাজীবন সে চাবুককে মনে রাখে। যেমন আলি। আলি ছিলেন দক্ষিণ ভারতের এক পশু প্রশিক্ষক। হাতিদের প্রশিক্ষণ দেবার জন্য নির্বিচারে প্রহার করতেন। একটি মেয়ে হাতি এলো তাঁর হাতির দলে, সে একই রকম ব্যবহার পেল। দলের একটা পুরুষ হাতি, যে একদিন নতুন অবস্থায় ঐরকম প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল, দেখল নতুন আসা ঐ মেয়ে হাতিটির ওপর প্রশিক্ষকের প্রহার। দিন দুয়েক বাদে ঐ পুরুষ হাতিটির কাছ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন আলি, হাতিটি তাঁকে পিষে মেরে দিল।
১৯৫০-৬০ এর দিকে ভারতের বিখ্যাত সার্কাসগুলির সম্পদ ছিল বন্যজন্তু- জেব্রা, সিম্পাঞ্জি, হাতি, সিংহ, বাঘ, চিতা, বিভিন্ন ধরনের হনুমান, টিয়াপাখি, কাকাতুয়া। জলহস্তী, সিম্পাঞ্জি, গোরিলা, জেব্রা সার্কাস-দর্শকের কাছে ছিল দারুণ আকর্ষণীয়। এগুলি পাওয়া যেত আফ্রিকার দেশগুলিতে। ১৯৭২ সালে বন্যপ্রাণী আমদানি রপ্তানির ওপর জারি হলো সরকারি নিষেধাজ্ঞা। সার্কাসশিল্পের ওপর সারাসরি প্রথম চাবুকটি পড়ল।
গ্রেট ব্রিটেনে পশু প্রেমিকরা সার্কাসে বন্যজন্তুর প্রশিক্ষণ ও খেলার বিরুদ্ধে সরব হলে ব্রিটিশ আদালত সিদ্ধান্ত নেবার ভার দেয় সে দেশের মিউনিসিপ্যালিটি ও কর্পোরেশনগুলিকে। ১৩৬টি ব্রিটিশ মিউনিসিপ্যালিটি ও কর্পোরেশন ঘোষণা করল, তাদের এলাকায় কোনো সার্কাসদল বন্যপ্রাণী নিয়ে খেলা দেখাতে পারবে না। ১৯৮৭ সালে গ্রেট ব্রিটেনের এক ছোট্ট সার্কাস ‘ক্রস ব্রাদার্স’ ম্যাডস্টোন কর্পোরেশনের মাঠে তাঁবু ফেলল। বন্যপ্রাণী রাখার জন্য তাদের লাইসেন্স বাতিল করল কর্পোরেশন। সার্কাসের সবাই তাঁবু ছেড়ে পালিয়ে গেল। রয়ে গেল সার্কাসের পাঁচটা সিংহ, ছ’টা বাঘ, দু’টো শুয়োর। খাবারের অভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকল। পশুপ্রেমীরা কর্পোরেশনের কাছে প্রাণীগুলির পুণর্বাসনের দাবি জানাল। কর্পোরেশন বাধ্য হলো সেই বন্যপ্রাণীগুলিকে নিজেদের হেফাজতে নিতে। কিন্তু খাবার জোগানো অসম্ভব হয়ে উঠল। প্রাণীগুলিকে গুলি করে মারা ছাড়া উপায় নেই। যেসব পশুপ্রেমীরা এতদিন বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল, তারা এবার নিশ্চুপ হয়ে গেল। আর এক দল যারা সার্কাসে বন্যপশু রাখার বিরুদ্ধে ছিল না, তারা এগিয়ে এলো এবার। ঐ তেরোটা পশুর পুণর্বাসনের জন্য কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে অর্থ জোগাড়ে লেগে গেল। কর্ণাটকের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী রামকৃষ্ণ হেগড়ে তখন চিকিৎসার জন্য লণ্ডনে। বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করলেন। প্রস্তাব দিলেন, যদি ভারতে নিয়ে যাবার খরচ তারা জোগাড় করে দিতে পারে তবে ছ’টি বাঘকে তিনি ব্যঙ্গালোরের ব্যানারঘাটা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারিতে আশ্রয় দিতে পারেন। ষাট হাজার পাউণ্ড চাঁদা উঠে এলো। ব্যানারঘাটা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির বারো একর জমিতে ঐ ছ’টি সাইবেরিয়ান- বেঙ্গল ক্রস ব্রিডেড বাঘের পাকাপাকি আস্তানা হলো।
ঐ বছরই ব্রিটেনে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ডঃ মার্থা কিল ওয়ার্থিংটনের Marthe Kiley Worthington নেতৃত্বে এক কমিশন গঠিত হলো। কমিশন ব্রিটেনের পনেরোটি সার্কাস ও আটটি চিড়িয়াখানায় সমীক্ষা করে একশো বিয়াল্লিশ পাতার এক রিপোর্ট পেশ করল। সে রিপোর্টে বলা হলো, বিনোদনের পাশপাশি সার্কাসে বন্যপ্রাণীদের প্রশিক্ষণ ও তাদের নিয়ে খেলা দেখানোর শিক্ষাগত ও তথ্যগত মূল্যও আছে। এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে গ্রেট ব্রিটেন সঙ্গে সঙ্গে আর নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নি। তবে ২০২০ সালে সার্কাসে বন্য পশু ব্যবহারের ওপর ব্রিটেন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ইউরোপীয় দেশগুলিতে কোথাও পুরোপুরি কোথাও আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
ভারতেও ১৯৮৭র দিকে সার্কাসে বন্যপ্রাণী ব্যবহারের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠল। মানেকা গান্ধী তখন কেন্দ্রের পরিবেশ মন্ত্রী। সার্কাসে বন্যপ্রাণী নিষিদ্ধকরণ করে অর্ডিন্যান্স জারি করলেন। সার্কাস-মালিকদের ফেডারেশন এর বিরুদ্ধাচারণ করে সুপ্রীম কোর্টে গেল। বনদপ্তর হানা দিল সার্কাসে সার্কাসে। সুপ্রীম কোর্ট সরকারের জারি করা অর্ডিন্যান্সকে মান্যতা দিলে ভারতীয় সার্কাস হলদে কালো ডোরাকাটাদের হালুম আওয়াজের বিনোদন থেকে বঞ্চিত হয়ে জৌলুসহীন হয়ে পড়ল। বন্যেরা বনে সুন্দর। সার্কাসের শেকল বাঁধা জীবনে স্বাধীনতা, প্রাকৃতিক স্বাচ্ছন্দ্য,মুক্তির স্বাদ নেই বন্য পশুদের। অভিযোগ, ভয় দৈহিক নির্যাতন এবং অভুক্তি, এই তিন হাতিয়ারের ওপর ভিত্তি করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভারতের পশুপ্রেমী সংগঠনগুলির গবেষণামূলক তথ্য থেকে উঠে আসে রাজকমল সার্কাসের ব্যাঙ্গালোরের তাঁবুর চিত্র-পশু পাখিগুলিকে দিনের পর দিন অপরিচ্ছন্ন খাঁচার মধ্যে রাখা, একটি সিংহের একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণভাবে হারানো, পক্ষঘাতগ্রস্ত পশুদের করুণ অবস্থা। গ্র্যান্ড ন্যাশনাল সার্কাসের একটি খাঁচায় চারটি সিংহ গাদাগাদি করে থাকে, দীর্ঘ সময় শিকলে বাঁধা থাকার ফলে সার্কাসের হাতিটি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। সুপ্রীম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এম্পায়ার সার্কাস দশটি বাঘ, দশটি সিংহ, একটি পাহাড়ি ভাল্লুক ও বেশ কিছু পশুপাখি নিয়ে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাওয়ার সময় ধরা পড়ে। সুন্দরবনের একটি অন্তঃসত্ত্বা বাঘিনীকে দিয়ে খেলা দেখানোর অভিযোগ ওঠে কোহিনুর সার্কাসের বিরুদ্ধে। গ্রেট রয়্যাল সার্কাসের বাইশ বছরের শিম্পাঞ্জী লক্ষ্মীর শরীরে ক্ষত দেখা যায় , ঠিকমতো বসতে বা দাঁড়াতে পারে না। জেমিনি সার্কাসের তাঁবুতে পশুদের খাঁচাগুলি অপরিচ্ছন্ন, ছোটো পাত্রে দেওয়া অপরিযাপ্ত খাবার ও জল। জাম্বো সার্কাসে একটি জলহস্তীর চোখের অসুখ। অধিকাংশ সার্কাসেই নেই কোনো পশুচিকিৎসক। ১৯৯৮ সালের আগে পর্যন্ত সরকারি নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সার্কাসদলগুলি জীবজন্তু রেখেছে প্রদর্শনীতে। ২০০০ সালে বন্য জীবজন্তুর খেলা নিষিদ্ধ হয়ে গেলেও অজন্তা সার্কাস তাদের জিম্মায় পশুগুলি রেখে দেয়। মামলা মোকদ্দমা হয়। ২০০৪ নাগাদ সরকার পশুগুলিকে পাঠিয়ে দেয় চেন্নাই রেসকিউ ক্যাম্পে। মেলায়, উৎসবে গাঁ-গঞ্জ-মফস্বল শহরের মাঠে ছোটো বড়ো সার্কাসের তাঁবু ছিল চিড়িয়াখানার বিকল্প। বাঘ সিংহ জলহস্তী ডোবারম্যানদের দেখা পাওয়ার রোমাঞ্চ, রিং মাস্টারের ছড়ির ছপাৎ শব্দ, সিংহ গর্জন, সার্কাস-শিল্পীদের নানা দুঃসাহসিক খুনসুটি, নকল যুদ্ধের রোমাঞ্চ- হারিয়ে গেল। সার্কাস থেকে উৎসাহ হারাল দর্শক। বিশেষতঃ বাচ্ছারা, যারা সার্কাস তাঁবুর প্রধান দর্শক। ভিড়ের ঘনত্ব ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে পেতে মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে গেল ভারতীয় সার্কাস।
(ক্রমশ)
