কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৩২। শোভন সরকার
গত পর্বে: দেব দীপাবলিতে ঘাটে এসে চোখ আর মন আটকে রইল কেদার ঘাটে। এক বছর অপেক্ষার পর ফিরে এলাম সেই জায়গায় আবার তার সন্ধানে।
দূর থেকেই জটলাটা দেখতে পেয়েছিলাম। যতই কাছে যাই, মনের উৎকণ্ঠা বেড়ে যায় — এরা কি তারাই? সে কি আছে? এক বছর ধরে যে দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছি, এল কি তা?
এসেছে। ওরাই এসেছে। সেই মেয়েটিও এসেছে।
ভিড় ঠেলে সরিয়ে মোটামুটি একটা যুতসই জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম — এবার শুধু চোখে নয়, আমার ক্যামেরা দিয়েও দেখতে শুরু করলাম তাদের উপস্থাপনা। তখন মনে হচ্ছিল যেন মাঝের এক বছর সব কিছু থমকে ছিল — পাথর হয়ে যাওয়া ঘুমন্ত পুরীর মত। আমি এলাম, আর আবার সব গা-ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠল, যেন কিছুই হয়নি, যেন সময় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল এতকাল, যেখানে ফেলে রেখে গিয়েছিলাম সেখান থেকেই আবার শুরু হয়েছে সব কিছু।
চোখের সামনে পৌরাণিক চরিত্রগুলো একের পর এক প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। কর্ণাটকী ধারার সঙ্গীত মূর্ছনায় ভরে রয়েছে ঘাটের প্রতিটি কোণ। লঘুশব্দ, অপশব্দের কোনো স্থান নেই সেখানে। মুগ্ধ দর্শক মাঝে মাঝেই আবেগমথিত হয়ে তাদের নামে জয়ঘোষ করে উঠছে। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিল্পীর মৃদঙ্গম্ গম্ভীর দিমিক দিমিক স্বরে নাদব্রহ্মকে আহ্বান করছে। ধীরে ধীরে সেই ধ্বনিপুঞ্জ কৃষ্ণঘন মেঘের শীতলতার মত আমার সমস্ত চেতনাকে আবিষ্ট করে তুলছে। এই সমস্ত দৃশ্যের প্রেক্ষাপটে অনতিদূরেই হরিশ্চন্দ্র ঘাটের আগুন মাঝে মাঝে লকলক করে উঠে জীবনে মৃত্যুর উৎসবের আলোকমালা সাজিয়ে দিচ্ছে।
মন ভরে সেদিন ছবি আর ভিডিও রেকর্ড করে নিয়েছিলাম। গত বছরের অতৃপ্তির অনুভূতি আর রইল না। আর সেই মেয়েটির সঙ্গে কি সেদিন সাক্ষাৎ বা কথা হল কিনা, সেই বিষয় এখানে অবান্তর।
সেই সন্ধ্যার পর কেটে গিয়েছে বহুকাল। ক্যামেরাখানি ভগ্নদশায় পড়ে আছে ঘরের কোনো এক কোণে; অথচ মনের মধ্যে সেই সন্ধ্যার ছবি আজও উজ্জ্বল। স্মৃতি গচ্ছিত রাখা গেলেও সময়কে রাখা যায় না — হাতের মুঠোয় শুকনো বালি ধরে রাখার মতই কোন্ ফাঁকে ঝরে যায়, বয়ে যায়।
আমাদের নৌকাও আমাদের ক’জনকে নিয়ে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গঙ্গায় ভেসে চলেছে স্মৃতির পুষ্পচয়ন করতে করতে। কেদার ঘাটের পর চোখের সামনে পেরিয়ে গেল চৌকী ঘাট ও ক্ষেমেশ্বর ঘাট। এই দুটিও শ্রীকুমারস্বামী মঠের পক্ষ থেকে সংস্কার করা হয় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য বিভিন্ন ঘাটের মতই সরকারি সেচ বিভাগ এগুলির পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করে।
ক্ষেমেশ্বর ঘাটের পর অম্বরের রাজা মান সিং-এর নির্মিত মানসরোবর ঘাট। আমাদের ঘাটের কাছেই এক সময় একটি সরোবর ছিল। এখানে স্নান করার তুলনা হিমালয়ের মানস সরোবরে স্নান করার সঙ্গে করা হত। তবে এখন সেই সরোবরকে বুজিয়ে দালান-বাড়ি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে একের পর এক। সরোবরটি এখন একটি কুয়ো হিসেবে ঘাটের কাছেই অবস্থিত শ্রী রামতারকা অন্ধ্র আশ্রম প্রাঙ্গণে রয়ে গেছে।
এরপর নারদ ঘাট। আগে এর নাম ছিল কুবাই ঘাট। এখানে নারদেশ্বর শিবের মন্দির আছে বলে তার নামে ধীরে ধীরে এটি নারদ ঘাট নামে পরিচিত হয়। দক্ষিণ ভারতীয় সাধু স্বামী সতীবেদানন্দ দত্তাত্রেয় এই ঘাটটি নির্মাণ করান। ঘাটের উপরে প্রতিষ্ঠিত আছে দত্তাত্রেয় মঠ। মঠের অধিবাসীরা বিশ্বাস করেন যে এই মঠটি প্রায় হাজার বছর পুরোনো।
মাঝির সাথে কথা বলতে বলতে এই নারদ ঘাটের ব্যাপারে এক মজার কথাও জানতে পারলাম। অনেক দম্পতি এই ঘাটে স্নান করা থেকে বিরত থাকেন। কেন? কারণ নারদমুনির নামের এই ঘাটে স্নান করলে সেই দম্পতির সুখে নারদের নজর লাগে, ঝগড়া-বিবাদ শুরু হয় — নারদ তো ঝগড়া বাধাতে ওস্তাদ!
নৌকা নারদ ঘাটের পর একে একে আমাদের নিয়ে পেরিয়ে চলল রাজা ঘাট বা অমৃতরাও ঘাটে পেশোয়া অমৃতরাওয়ের সুদৃশ্য মহল, পাণ্ডে ঘাট (পূর্বে সর্বেশ্বর ঘাট), পূর্ববঙ্গীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত দিঘাপতিয়ার রাজার মহলে অলংকৃত দিগপতিয়া ঘাট, বাংলার রাজা প্রতাপাদিত্যের তৈরি চৌষট্টি যোগিনীর মন্দির সংলগ্ন চৌষট্টি ঘাট, রাজস্থানী ধরনে উদয়পুরের রাণা জগৎ সিং-এর স্মৃতি বিজড়িত রাণামহল ঘাট, এবং তারপর দ্বারভাঙ্গা ঘাট।
বর্তমানে আমরা যে দ্বারভাঙ্গা ঘাট ও মুন্সী ঘাট দেখি, একসময় দু’টি একসাথে মুন্সী ঘাট নামেই পরিচিত ছিল নাগপুরের মন্ত্রী শ্রীধর নারায়ণ মুন্সীর নামে। তাঁরই তত্ত্বাবধানে ১৮১২ সালে মুন্সী ঘাট এবং ঘাটের উপরের সুবিশাল রাজকীয় প্রাসাদটি নির্মিত হয়। ১৯১৫-১৯২০ সাল নাগাদ দ্বারভাঙ্গার মহারাজা রামেশ্বর সিং বাহাদুর প্রাসাদ সহ মুন্সী ঘাটের দক্ষিণ অংশ কিনে নিলে তার নাম হয়ে যায় দ্বারভাঙ্গা ঘাট। এই প্রাসাদটি এখন ‘বৃজরামা প্যালেস’ নামে একটি বিলাসবহুল হোটেল হিসেবে পরিচালিত হয়।
এক সময় এই মুন্সী ঘাট সংলগ্ন বাঙালিটোলা এলাকায় প্রচুর বাঙালি বাস করত। এখন সেই সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। তবে এই ঘাটের সঙ্গে বাঙালিদের আরও একটি বিশেষ যোগাযোগ আছে — সত্যজিৎ রায় ও ফেলুদা।
১৯৫৬ সালে সত্যজিৎ রায় কাশীর বাঙালিটোলায় ‘অপরাজিত’র শ্যুটিং করেন। তারও বাইশ বছর পর ১৯৭৮ সালে বাঙালিটোলার বিভিন্ন জায়গা ছাড়াও নাগোয়াঁ, কেদার ঘাট, দ্বারভাঙ্গা ঘাট প্রভৃতি স্থানে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর শ্যুটিং করেন। সিনেমার যে দৃশ্যে মগনলাল মেঘরাজ নিজস্ব বজরায় ঘাটে এসে নামেন, সেটা এই দ্বারভাঙ্গা ঘাটেই তোলা হয়। এখনও যদি কেউ সেখানে যান তো দেখবেন মুন্সী ঘাট এবং দ্বারভাঙ্গা প্যালেস-এর মাঝে ঘাট থেকে উপরের দিকে খাড়া উঠে গেছে একটি সিঁড়ি। ছবির একটি দৃশ্যে ফেলুদা ঠিক এই সিঁড়ি দিয়েই মছলিবাবাকে অনুসরণ করে উপরে উঠে যান এবং তারপর গলির ভিতরে ছোট এক দরজা দিয়ে প্যালেসের মধ্যে ঢুকে যান। যখন সত্যজিৎ এই প্রাসাদে শ্যুটিং করেন তখন এটি একরকম পরিত্যক্ত হিসেবেই ছিল। প্রাসাদের ভেতরেই কিছু অংশকে সিনেমার অন্যতম চরিত্র মছলিবাবার আস্তানা হিসেবে দেখানো হয়।
বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি যে এই প্রাসাদের মধ্যে যে বৈদ্যুতিক লিফ্টটি রয়েছে সেটা সম্ভবত বেনারসের ইতিহাসে সবচেয়ে পুরোনো। একসময় দ্বারভাঙ্গার মহারাজা স্বয়ং এই লিফ্টটি ব্যবহার করতেন।
দ্বারভাঙ্গা ঘাট পেরোতে লক্ষ্য করলাম ইতিমধ্যে আমাদের নৌকা ঘাটের অনেকটাই কাছাকাছি চলে এসেছে। মুন্সী ঘাট পেরিয়ে চোখে পড়ে ১৭৮৫ সালে ইন্দোরের রানী অহল্যাবাই হোলকারের নির্মিত অহল্যাবাই ঘাট। ঘাটের উপরে তাঁরই স্থাপিত মহলের সাথে রয়েছে হনুমান ও শিব মন্দির। পূর্বে এই ঘাটের নাম ছিল কেবলগিরি ঘাট।
আমাদের নৌকা এসে ভিড়ল শীতলা ঘাটে। সামনেই শীতলা দেবীর লাল রঙের মন্দির। এই ঘাট আর মন্দিরও রানী অহল্যাবাইয়ের অবদান। আগে পুরোটাই দশাশ্বমেধ ঘাটেরই অংশ ছিল। শীতলা মন্দির স্থাপনের পর ধীরে ধীরে মন্দিরের নামে ঘাটটির নাম হয়ে যায়।
অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে এই শীতলা মন্দিরের স্থানে এক সময় পৌরাণিক মাতৃকাদের মধ্যে একজনের অধিষ্ঠান ছিল। কোনো কোনো পুরাণে একে ‘মাতৃতীর্থ’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। শীতলা দেবীর উপাসনার উৎস খুঁজতে গেলে এর বিশেষ কোনো উল্লেখ কোনো প্রাচীন গ্রন্থে বা কাশী মাহাত্ম্যে পাওয়া যায় না — প্রকৃতপক্ষে শীতলা দেবী উঠে এসেছেন গ্রাম্য লোকাচারের মধ্যে থেকে। অথচ এই দেবীর গুরুত্ব গ্রাম বা শহরের যে কোনো উপাসকের কাছে কোনো অংশে কম নয়। প্রায় সারা বছর ধরেই এই মন্দিরে তাদের ভিড় লেগে থাকে। এই মন্দিরের প্রাঙ্গণে রয়েছে দশাশ্বমেধেশ্বর শিবলিঙ্গ। বলা হয় যে বেনারসের দশাশ্বমেধ ঘাটে স্বয়ং ব্রহ্মা দু’টি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি এই দশাশ্বমেধেশ্বর, অন্যটি ব্রহ্মেশ্বর।
শীতলা মন্দিরের একটু নীচের দিকে একটা প্রায় চোখের আড়ালে রয়ে যায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির — শূলটঙ্কেশ্বর মহাদেব মন্দির। ছোট্ট দরজা, অনেকেই খেয়াল করে না। বর্ষার সময় এটি জলের তলায় চলে যায়। শ্রীমা সারদা দেবী যখন বেনারসে আসতেন প্রায়ই এই ঘাটে গঙ্গা স্নানে আসতেন। স্নানের পর বিশ্বনাথ মন্দিরে প্রচণ্ড ভিড়ে না গিয়ে তিনি শূলটঙ্কেশ্বরকেই বিশ্বনাথ জ্ঞানে পুজো দিতেন। বলতেন, ‘এই ছুলটঙ্কেশ্বরই আমার বাবা বিশ্বনাথ।’
শীতলা ঘাটের ঠিক পাশে উত্তর দিকের ঘাটটিই দশাশ্বমেধ ঘাট। স্থানিক মাহাত্ম্যে কাশীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন ঘাট হল এই দশাশ্বমেধ — নানা পৌরাণিক কাহিনিতে ও লোককথায় জমজমাট। এর আশেপাশেই বিভিন্ন তাৎপর্যপূর্ণ গন্তব্যের অবস্থান, যাতায়াতের সুগমতা, সুদৃঢ় ও প্রশস্ত ঘাট, বাজার-ঘাট, প্রচুর হোটেল, খাওয়া-দাওয়ার সুবিধা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে এখানে প্রায় সব সময়ই ভিড় লেগে থাকে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের প্রায় সকলেই আর কোথাও যান বা না যান, এই ঘাটে ক্ষণিকের জন্য হলেও আসেন। আসার আরও একটি কারণ এই ঘাটের বিশ্ববিখ্যাত সন্ধ্যারতি। বর্ণে-গন্ধে-ধ্বনিতে-অনুভবে এই ঘাটের গঙ্গা আরতি বেনারসে আসা অগণিত পর্যটকদের তৃপ্ত ও তুষ্ট করে চলেছে।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব

