কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৩১। শোভন সরকার

গত পর্বে: বেনারসে কেদারঘাটের গুরুত্ব বিশ্বনাথের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আমার নিজের স্মৃতিতেও এর এক বিশেষ স্থান। 

“… আকাশে সহস্র সহস্র নক্ষত্র জ্বলিতেছে — গঙ্গাহৃদয়ে তরণীর উপর দাঁড়াইয়া যেদিকে চাও, সেই দিকে আকাশে নক্ষত্র! — অনন্ত তেজে অনন্তকাল হইতে জ্বলিতেছে — অবিরত জ্বলিতেছে, বিরাম নাই। ভূতলে দ্বিতীয় আকাশ! — নীলাম্বরবৎ স্থিরনীল তরঙ্গিণীহৃদয়; তীরে, সোপানে এবং অনন্ত পর্বতশ্রেণীবৎ অট্টালিকায়, সহস্র আলোক জ্বলিতেছে। প্রাসাদ পরে প্রাসাদ, তৎপরে প্রাসাদ, এইরূপ আলোকরাজি শোভিত অনন্ত প্রাসাদ শ্রেণী। আবার সমুদয় সেই স্বচ্ছ নদীনীরে প্রতিবিম্বিত আকাশ, নগর, নদী, — সকলই জ্যোতির্বিন্দুময়।”

‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের এই বারাণসীর বর্ণনা যখনই পড়ি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কার্তিক পূর্ণিমার দেব দীপাবলির মোহনীয় দৃশ্য — ‘সকলই জ্যোতির্বিন্দুময়’। 

বিশ্বাস করা হয় যে এই বিশেষ তিথিতে মহাদেব ত্রিপুরাসুরকে বধ করেন। তারই উদযাপনে এই দিন স্বর্গের সমস্ত দেবদেবী ধরাতলে অবতীর্ণ হন, বিশেষ করে বেনারসে এবং গঙ্গাস্নান করেন। তাঁদেরই স্বাগত জানাতে বেনারসের সমস্ত ঘাট আলোয় আলোয় সেজে ওঠে। জানা যায়, ১৯৮৫-৮৬ সাল নাগাদ পঞ্চগঙ্গা ঘাটে রানি অহল্যাবাই হোলকারের বানানো হাজারা স্তম্ভে এক হাজার একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে এক হারিয়ে যাওয়া দীপদান উৎসবকে পুনর্জীবিত করা হয়। দেব দীপাবলিতে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর এখানেই সবার প্রথম প্রদীপ জ্বালিয়ে এই উৎসবের শুরু করার চল। এর পরেই একের পর এক সমস্ত ঘাট আলোকিত হয়ে ওঠে।  

এখনও মনে আছে আমার প্রথমবার দেব দীপাবলিতে ঘাটে যাওয়ার কথা। দু’জন বন্ধুকে সঙ্গে করে যখন ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছালাম, আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম দেব দীপাবলি নিয়ে মানুষের মধ্যে কতটা উৎসাহ, উত্তেজনা — ভিড় বাড়তে বাড়তে দেখি অসি ঘাট অবধি যেন মানুষের ঢেউ বইছে। স্রোতের সঙ্গে চলা ছাড়া উপায় নেই। পকেটের ফোন আর মানিব্যাগ সামলে ভিড়ের সাথে অসি ঘাটে গিয়ে পড়তেই সবচেয়ে আগে চোখে পড়ল কার্তিক পূর্ণিমার বিশাল চাঁদ আর গঙ্গার উপরে তার কম্পমান প্রতিফলন। 

দেব দীপাবলিতে কোন এক ঘাট। চিত্রঋণ: হিন্দুস্তান, বারাণসী সংস্করণ, ২৬ নভেম্বর ২০১৫

বাঙালি হিসেবে আমার মনে তখনও সবে সবে দুর্গাপুজো, কালীপুজো, ভাইফোঁটা সব উৎসব শেষ হয়ে যাওয়ার একটা মলিন রেশ রয়ে গেছে। তাই কালীপুজোর দিন পনের পরেই যখন দেব দীপাবলিতে এলাম, এক অশেষ উত্তেজনা এবং ভরপুর কৌতূহল আমার মনকে চাঙ্গা করে তুলল। ভিড়ের সঙ্গে একটু এগিয়ে আমরা একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে উত্তরের দিকে তাকাতেই হতবাক হয়ে গেলাম — ‘সকলই জ্যোতির্বিন্দুময়!’ সামনে যতদূর দেখা যায় চোখে পড়ে সারি সারি হলদে আলোর মালা আর অগণিত মানুষের ভিড়। সামনে ঘাট থেকে আদি কেশব — প্রায় সাত কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত বেনারসের কম-বেশি চুরাশিটি ঘাটই সাজানো হয়েছে প্রদীপ বা মোমের আলোয়। ঘাটের স্থানে স্থানে কাগজের বাটিতে বিক্রি হচ্ছে মোমবাতি, ফুলে সাজানো ‘দিয়া’ বা প্রদীপ। তাই শুধু ঘাট নয়, গঙ্গার বুকেও জোনাকির ঝাঁকের মত ভেসে রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ আলোকবিন্দু। 

আমরা ধীরে ধীরে ভিড়ের সাথে এগোতে থাকলাম। ঘাটগুলোর শোভা পাল্টে গেছে। আমার চিরচেনা ঘাটগুলো এই আলোয় অন্য জগতের মত বোধ হচ্ছিল। ঘাটের চলার পথে এগোতে এগোতে যখন কেদার ঘাটে পৌঁছলাম, দেখি বহু মানুষ গোল হয়ে মাঝে এক জায়গা ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এত লোক! কী দেখছে তারা? ভিড়ের মাঝে একটা জায়গায় বেশ উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, অনেকটা যেন মঞ্চের স্পট লাইট। সেখানেই মাইক থেকে ভেসে আসছে সুমধুর কর্ণাটকী ধ্রুপদী সঙ্গীতের সুর। কৌতূহল বেড়ে গেল আমার। আমরা ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই দেখি সেখানে ভরতনাট্যম শৈলীতে কয়েকটি ছেলে-মেয়ে নৃত্য প্রদর্শন করছে। এক পাশে এক দল পুরুষ ও মহিলা মৃদঙ্গম্‌, নাদস্বরম্‌, করতাল, বাঁশি ইত্যাদি নিয়ে কণ্ঠে সঙ্গত করছে সেই প্রদর্শনের। 

আমার চোখ আকৃষ্ট হল, কান লুব্ধ হল, মন উন্মত্ত হল। অন্য সব ভুলে আমরা মজে গেলাম সেই নৃত্ত-নৃত্য-গায়ন-বাদনে। দলটি তখন দক্ষযজ্ঞ, শিবের তাণ্ডব, পার্বতীর সাধনা ও বিবাহ — একের পর এক এই সমস্ত অতি পরিচিত পৌরাণিক ঘটনার আধারে তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করছে। আমি অবাক হলাম। খোলা আকাশের নিচে ঘাটের উপর এত ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে  এরকম উচ্চমানের প্রদর্শন সাধারণত দেখা যায় না, কিংবা আমি কখনও দেখিনি। 

আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ আরও উঁচুতে উঠেছে, যেন সেও দেখবে এই অভূতপূর্ব দৃশ্য। আমার চোখ আটকে গেল এক দেবোপম সুন্দর একটি শিল্পীর দিকে। মেয়েটির মুখভঙ্গী, স্মিত হাসি, সুললিত চলন আর সুদক্ষ হস্তমুদ্রা, বিশালকায় চোখের আবেগমথিত ভাব, আলতা মাখা পায়ের দৃপ্ত ছন্দের প্রতিটি ঝঙ্কার আমাকে অদম্য আকর্ষণ করল। সমবয়সীই তো মনে হচ্ছে। কে সে? কোথা থেকে এসেছে? কথা বলা যাবে? কী বলব? নাকি নিজেকে সেলিব্রিটি মনে করে আমার জিজ্ঞাসাকে পাত্তা দেবে না? 

আচমকা নাচের দলের সবার মধ্যে থেকে সেই মেয়েটি আমার চোখে একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে এসে উপস্থিত হল, অন্য কাউকে যেন আর দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটি পার্বতীর অভিনয় করছিল। যখনই তার পালা আসছিল, দর্শকদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার চোখে আলোর ঝলক খেলে যাচ্ছিল আমার অজান্তেই। 

পকেটে ফোন আছে, ফোনে ক্যামেরাও আছে, কিন্তু সেটা বের করে ছবি তুলতে গেলে আমি তো নিজের চোখে দেখতে পারব না ঠিক করে। তবুও স্মৃতির স্বার্থে মোবাইল বের করে কিছু ছবি তুললাম বটে, কিন্তু মন তৃপ্ত হল না। আমার মোবাইলের ক্যামেরা অতি সাধারণ, কাছের জিনিসের ছবিই কোনোমতে দেখার যোগ্য হয়। দূরের কোনো মানুষ বা দৃশ্য ধরতে আমার মোবাইল অপারগ। অতএব, চোখ আর মগজই ভরসা। 

এদিকে আমার সঙ্গী বন্ধুরা তাড়া দিতে লাগল, ‘কী রে শোভন! চল, রাত হয়ে যাচ্ছে তো! হোস্টেলে ফিরতে হবে তো। নাকি এখানেই থাকবি?’ ওদের কণ্ঠে ঠাট্টার সুর। সত্যিই অনেকটা পথ ফিরতে হবে। হেঁটেই যেতে হবে। বেশি দেরি হলে মেসে খাবার শেষ হয়ে যাবে। অগত্যা মনে একরাশ অতৃপ্তি নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম সেই দেব দীপাবলির রাতে। ঘাটের প্রদীপ তখন নিভতে শুরু করেছে। 

এই দিনের পরেই মনে মনে সংকল্প করলাম পরের বছর আবার আসব কেদার ঘাটে। সঙ্গে ভালো ছবি তোলার মত ফোন না হয় ক্যামেরা। নইলে আমার বেনারসে আসা ব্যর্থ। 

আগেই বলেছি, ছাত্র আমি, হাতের টাকা-কড়ি সবসময় বাড়ন্ত, নিজের ক্ষমতা নেই কিছু কিনি। ফোনটাও বিশেষ পুরোনো হয়নি যে নতুন ফোন কিনব। মা-বাবাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, নানা রকম কারণ দেখিয়ে অবশেষে একটা পয়েন্ট অ্যান্ড শ্যুট ক্যামেরা কিনলাম। তারপর অপেক্ষায় রইলাম পরের বছরের দেব দীপাবলির। 

মনের মধ্যে এবার প্রশ্ন এল, পরের বছর দেব দীপাবলিতেও কি ওরা আসবে? এলেও কি সেই মেয়েটি আসবে? বা, কেদার ঘাট না হয়ে যদি অন্য কোনো ঘাটে তারা তাদের অনুষ্ঠান আয়োজন করে তাহলে? কীভাবে জানব এসব? এত সব প্রশ্নের মধ্যে আমি সামান্য হলেও দমে গিয়েছিলাম। তবুও গিয়ে দেখতে ক্ষতি কী। 

গেলাম আবার। অনেক দিন আগে থেকেই জেনে রেখেছিলাম ঠিক কবে হবে সেই বছর দেব দীপাবলি। নির্দিষ্ট দিনে এক বন্ধুকে সাথে করে আবার ঘাটে এলাম। গত বারের সঙ্গে এবারের পার্থক্য এই যে এবার আমার গলায় একটা ক্যামেরা ঝুলছে। অসি ঘাটে এসে পড়তেই একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। ছবি তোলায় হাত অতটা সড়গড় হয়নি তখনও। রাতের ছবি তোলা একটু মুশকিল তো বটেই, অনেক অভ্যাস প্রয়োজন হয়। আমার এক সিনিয়র সাগ্নিক বেশ ভালো ছবিটবি তুলত। ওর কাছ থেকেই টুকটাক দেখে নিতাম। 

যাই হোক, যতই এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি না কেন, আমার মনে তখন তাড়া রয়েছে। যেতে হবে কেদার ঘাট। তাই অন্য ঘাটগুলিতেও বেশিক্ষণ দাঁড়াচ্ছি না। ক্যামেরার চার্জ বাঁচিয়েও রাখা প্রয়োজন। 

সমস্ত ঘাট আগের মতই সেজে উঠেছে আলোয় আলোয়। ভিড় যথারীতি প্রচুর। এই ভিড় ঠেলে দ্রুত চলাও দুষ্কর। অগত্যা ধীর পায়ে মনে উদ্বেগ আর আশঙ্কা নিয়ে অবশেষে এসে পৌঁছলাম কেদার ঘাটে।

(ক্রমশ)

প্রথম অধ্যায় কালভৈরবের সন্ধানে প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায় ঘাটে ঘাটে প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Author

Leave a Reply