কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৩০। শোভন সরকার
গত পর্বে: কেদার ঘাটের গৌরী-কেদারেশ্বর মন্দিরের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে মান্ধাতার আমলের আশ্চর্য কাহিনি।
‘মান্ধাতা দ্বিধান্বিত ছিলেন প্রথমে। উনি খেয়েদেয়ে উপাসনা কখনও করেননি। আজ তাই স্বয়ং শিবের আদেশে ঠিক কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। অবশেষে বিভিন্ন মুনি-ঋষিদের সাথে কথা বলে তারপর ঠিক করলেন যে তিনি খেয়েই হিমালয়ে যাবেন ও সমস্ত নিত্যপূজা সেরে আবার কাশীতে ফিরবেন। মুগডালের খিচুড়ি রান্না করলেন। রান্নার পর তা দুই ভাগ করলেন — অর্ধেক শিবের নৈবেদ্য, অন্যটা নিজের। কিন্তু একটা সমস্যা দেখা গেল।
মান্ধাতা কোনো অতিথিকে আগে খাইয়ে তারপর নিজে খেতেন। আজ তাড়া রয়েছে, অথচ কোনো অতিথির দেখা নেই। এমনিতেই তীর্থযাত্রার আগে খাওয়া নিয়ে মনের অবচেতনে দ্বিধা ও অপরাধবোধ রয়েই গেছে, তারপর যদি অতিথিসেবা ছাড়াই নিজে খেয়ে নেন, তাহলে উনি নিজের সামনেই আর দাঁড়াতে পারবেন না। ঠিক এই সময় তাঁর দরজায় এসে দাঁড়ালেন এক ভিক্ষু।
মান্ধাতা যেন হাতে চাঁদ পেলেন। ভিক্ষুকে অপেক্ষা করতে বলে ভেতরে চলে গেলেন তাঁর খিচুড়ির পাত্রের কাছে। দুইভাগের এক ভাগ যখন অতিথির জন্য তুলতে গেলেন, তিনি অবাক হয়ে দেখলেন যে ঐ খিচুড়ি পাথর হয়ে গেছে!’
‘অ্যাঁ! পাথর? সত্যি সত্যি?’
‘নাকি জমে শক্ত হয়ে গেছে?’
‘সত্যিই পাথর হয়ে গেছে খিচুড়ি। তারপর এদিকে যখন মান্ধাতা কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না, তখন সেই ভিক্ষু তাঁরই চোখের সামনে সেই পাথরের মধ্যে বিলীন হয়ে গেলেন। আর সেই পাথরটিই হল কেদারেশ্বর শিব… আর বুঝতেই পারছিস, ভিক্ষুটা আসলে কে…।’
‘সে বুঝলাম, কিন্তু তুই বলছিস এই কেদার মন্দিরের শিবলিঙ্গ খিচুড়ির ডেলার মত?’
‘দেখার চোখের উপর নির্ভর করছে। তবে হ্যাঁ, যে শিলাটি শিবলিঙ্গ হিসেবে এখানে পুজো করা হয় সেটির উপরিভাগ অন্যান্য শিবলিঙ্গের মত মসৃণ নয়, আকারটিও বেশ র্যান্ডম… অপ্রতিসম। মনে হয় যেন সত্যিই কেউ থালায় উঁচু করে খাবার সাজিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, ভালো করে দেখলে শিলার মাঝখান দিয়ে একটা লম্বা কাটা দাগ স্পষ্ট দেখা যায়। খিচুড়ির দুই ভাগ, মনে নেই?’
আমরা দু’জনেই গল্প শুনে হাঁ, কিছুই বলতে পারলাম না। মাঝি বোধ হয় এক-আধটু বাংলা বোঝে, সেও দেখি আমাদের অবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসছে, যেন মনে মনে বলছে, ‘হুঁ হুঁ বাছা, কাশীর কথা কী আর শুনেছ, এ তো হিমশৈলের কেবল অগ্রভাগ।’
অঙ্কিতা বলল, ‘ঠিক একই রকম আরও একটা কাহিনি আছে যেখানে মান্ধাতা মকর সংক্রান্তির দিন খিচুড়ি বানিয়ে সকল ব্রাহ্মণকে খাওয়ালেন। দিনের শেষে যখন তিনি নিজে খেতে বসবেন তখনই একজন অতিথি এসে খেতে চাইলেন। কী আর করার? মান্ধাতা নিজের জন্য রাখা খিচুড়ি দুই ভাগ করলেন, এক ভাগ অতিথির, অন্যটা নিজের। তারপর…’
‘…তারপর নিশ্চয়ই শিব নিজের স্বরূপে আবির্ভূত হলেন এবং বর দিলেন?’
‘একা নয়, একেবারে সপরিবারে দেখা দিলেন — গৌরী, গণেশ, কার্তিক…। আর খিচুড়ির দুইভাগ যথারীতি শিবলিঙ্গে পরিণত হল।’
‘দুর্দান্ত!’
‘আরও একটা কাহিনি জানি। এটার সাথেও আগের মিল রয়েছে। এটা বশিষ্ঠ নামের একজনকে নিয়ে। তিনিও কেদারেশ্বর ভক্ত এবং প্রতি বছর চৈত্র মাসে কেদারযাত্রা করতেন। বয়স হলেও দুর্বল শরীরে তিনি আবার যখন হিমালয়ে কেদারযাত্রা করতে চাইলেন, স্বয়ং শিব তাঁকে আটকালেন, বর দিলেন। তখনই বশিষ্ঠের অনুরোধে কেদারেশ্বর শিব অল্প সময় হিমালয়ে থেকে বাকি সময় কাশীতে এসে বাস শুরু করলেন। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করে যে এখানেই তাঁর মূল লিঙ্গের প্রকাশ, উত্তরাখণ্ডে নয়। এখানে…’
‘… কাশীতে কেদারনাথ দর্শনে ঐ কেদারনাথের চেয়ে সাতগুণ বেশি পুণ্যলাভ হয়,’ মাঝি বোধ হয় থাকতে পারছিল না আর না বলে। সে আবার নিজের ভাষায় বলল, ‘এখানে কেদার মন্দিরের ভেতরে বদ্রীনারায়ণ দর্শনও হয়।’
‘তাই?’
অঙ্কিতা মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি, মন্দিরের ভেতরে অনেকগুলি শিবলিঙ্গ ছাড়াও কাশীর বহু দেবদেবীর বিগ্রহ রয়েছে…।’
‘কীরকম?’ চন্দ্রাবলীর কণ্ঠে আগ্রহ ফুটে উঠল।
‘যেমন ধর… কাল ভৈরব, দণ্ডপাণি ভৈরব। এরা কাশীর নিরাপত্তার দেখভাল করে। এদের দেখা যায় গর্ভগৃহের দরজা পাহারা দিতে। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, দরজায় পাহারা দিচ্ছে আসলে ভদ্র ও সুভদ্র, আবার কেউ বলেন যে তারা হল শিবের দুই অনুচর নন্দী ও ভৃঙ্গী। এরা ছাড়াও ধর রয়েছে গৌরী-অন্নপূর্ণা, ছাপ্পান্ন বিনায়ক, স্কন্দ, পশুপতিনাথ, মীনাক্ষী…। আবার দশাবতার বিগ্রহও রয়েছে।’
‘শিব মন্দিরে বিষ্ণুর এত প্রাধান্য! কেন?’
‘এই রে, সেটা তো ঠিক জানি না। ঐ হবে হয়তো শৈব আর বৈষ্ণবদের পাশাপাশি আনার একটা প্রয়াস।’
চন্দ্রাবলী বলল, ‘একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস? মন্দিরটার নামটা? গৌরী-কেদারেশ্বর, শুধু কেদারনাথ নয়।’
‘ও হ্যাঁ, পুরোহিত বলেছিল এই ব্যাপারটা। এখানে শিবলিঙ্গের অর্ধনারীশ্বর রূপ — বাঁ ভাগ হলেন গৌরী, অন্য ভাগ কেদারেশ্বর।’
এবার মাঝি আবার উৎসাহিত হয়ে বলে উঠল, ‘দিদি, আপনি আওরঙ্গজেবের আক্রমণের সেই গল্পটা জানেন তো?’
অঙ্কিতা হ্যাঁ না বলার আগেই মাঝি নিজের ভাষায় বলতে শুরু করল। বেনারসি-ভোজপুরী আমরা ঠিক জানি না, সামান্য বুঝি, হিন্দির সাথে মিল আছে বলেই। কিন্তু এবার মাঝি যে গতিতে ভোজপুরী বলা শুরু করল যে আমাদের মাথার উপর দিয়ে যেতে লাগল সব। আমরা মাঝখানে থামিয়ে বললাম হিন্দিতে বলতে যাতে আমরা কিছু বুঝতে পারি। এবার সে সত্যি একটা আশ্চর্য ঘটনার বর্ণনা দিল।
আওরঙ্গজেবের সৈন্যরা তখন কাশীতে বিভিন্ন মন্দির ধ্বংসের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এল এই গৌরী-কেদারেশ্বর মন্দিরেও। অনেকেই মন্দিরের ভেতরে ঢুকতে তাদের নিষেধ করল। কিন্তু তারা কি আর সেসবে কান দিতে চায়? মন্দিরের ভেতরে ঢুকলে সামনেই পড়ল নন্দীর মূর্তি। এক সৈন্য তার সমস্ত বিদ্বেষ নিয়ে নিজের তলোয়ার বিঁধিয়ে দিল নন্দীর গায়ে। কিন্তু তখনই ঘটল এক কাণ্ড — তলোয়ারের আঘাতে নন্দীর সেই ক্ষতস্থান থেকে গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল! তাজ্জব ব্যাপার। মনে মনে অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেল তারা। কিন্তু বাদশাহের আদেশ মানতেই হবে। এবার তারা বল্লম দিয়ে আঘাত করল নন্দীর কানে। এবার ঘটল এক অঘটন — কানের ফাটল দিয়ে তৎক্ষণাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে এল মৌমাছি, ঘিরে ধরল সমস্ত আক্রমণকারীদের। হুলস্থুল কাণ্ড বেধে গেল, কেউ ধরাশায়ী, বাকিরা পালিয়ে বাঁচল। এভাবেই গৌরী-কেদারেশ্বর মন্দির আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেল।
এবার মাঝি গুনগুন করে গেয়ে শোনাল,
‘সাওন পুনো সোমদিনা, গৌরীকুণ্ড নাহায়ে,
পূজ কেদার হী মুক্তি হ্যায়, রহী অচল গতি পাওয়ে।’
তারপর বুঝিয়ে দিল আমাদের। শ্রাবণ মাসে পূর্ণিমা তিথি সোমবারে পড়লে তা শ্রেষ্ঠ যোগ বলে মানা হয়। এরকম তিথিতে এখানে গৌরীকুণ্ডে স্নান করে গৌরী-কেদারেশ্বরের পূজা করলে তার মুক্তিলাভ অনিবার্য।
মুক্তিলাভের সঙ্গে কেদার ঘাটের কিছু সম্পর্ক রয়েছে। আগেই বলেছি, হরিশ্চন্দ্র ঘাট ও তার আশেপাশের এই অংশ পূর্বে শ্মশানঘাট ছিল বলে একে আদি মণিকর্ণিকা বলা হয়। ঠিক এই কারণেই দেখি বহু মানুষ তাঁদের পূর্বজ বা আত্মীয়-স্বজনদের পিণ্ডদানের জন্য এই বিশেষ ঘাটকেই বেছে নেন।
ঘাটের দিক ছাড়া গৌরী কেদারেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ করার অন্য দরজাটি একটি সরু গলির উপর। গলিতে চলার সময় ঠিক করে লক্ষ না করলে অনেকেই মন্দিরের প্রবেশপথটি ছাড়িয়ে চলে যেতে পারেন। এই গলি দিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই একবার দেখেছিলাম একটি বেশ পুরোনো জরাজীর্ণ বাড়ি। জেনেছিলাম শ্রীরামকৃষ্ণ ১৮৬৮ সালে যখন বেনারসে আসেন, তিনি এখানেই ‘রাজা বাবু’ কালীনাথ বাপুলির আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেই সময় বাপুলিরা ছিলেন বেনারসের এক সম্ভ্রান্ত বাঙালি পরিবার। এঁদের পূর্বপুরুষ অযোধ্যার নবাবের দেওয়ান ছিলেন। অতি সাম্প্রতিক কাল অবধিও এই বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একজোড়া ‘পাদুকা’ রাখা ছিল। এজন্যই বাড়িটিকে অনেকে ‘পাদুকা মন্দির’ নামেও চেনেন। অবশ্য এই পাদুকা জোড়া শ্রীরামকৃষ্ণের কী না সেই বিষয়ে বিতর্ক ও সন্দেহের যথাযথ অবকাশ রয়েছে। আরও একটি বিশেষ ব্যাপার যে এই বাড়িতে এক সময় ‘কাশীযন্ত্র ছাপাখানা’ ছিল। এখান থেকে এক সময় রাজা বাবুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ‘কাশীবার্তাপ্রকাশিকা’ নামে এক বাংলা পত্রিকা।
বর্তমানে শরিকি জটিলতায় শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিধন্য বাড়িটি বিক্রি হয়ে গেছে। সেই পাদুকাজোড়া এখন তুলে দেওয়া হয়েছে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কর্তৃপক্ষের হাতে।
বাঙালিটোলা সংলগ্ন এই কেদার ঘাটে বাঙালিদের প্রচুর আনাগোনা। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আসেন তামিলনাড়ুর মানুষ। সেই তামিলনাড়ুরই এক শৈব সন্ন্যাসী কুমারগুরুপরার সপ্তদশ শতাব্দীতে কাশীতে এসে মুঘল শাসক দারা শিকোর কাছ থেকে জমি দাবি করেন এবং সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীকুমারস্বামী মঠ। তাঁরই উদ্যোগে কুমারস্বামী মঠের পক্ষ থেকে গৌরী-কেদারেশ্বর মন্দির, কেদারঘাট প্রভৃতি সংস্কার করা হয় এবং এখনও মঠ কর্তৃপক্ষই এগুলোর দেখভাল করে।
কাশীতে কেদার ঘাট যে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা অস্বীকার করার জায়গা নেই। সেই হিসেব বাদ দিলেও, কেদার ঘাট আমার কাছে নিজস্ব মহিমায় ওজস্বিনী। কেদার ঘাটের নাম করলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বেনারসে থাকাকালীন এক অন্যতম স্মরণীয় সন্ধ্যার কথা।
মাস্টার্সের প্রথম বছর। পুজো, দীপাবলি পেরিয়েছে সপ্তাহ খানেক হল। তখন হোস্টেলের ছেলেদের কাছে ‘দেব দীপাবলি’ শব্দবন্ধটি বারবার শুনতে লাগলাম। আগে কখনও শুনিনি, প্রথমে ‘ঐ হবে আরও এক বেনারসের উৎসব’ ভেবে অতটা পাত্তা দিইনি, রোজই তো বেনারসে কিছু না কিছু হয়েই চলেছে, এ আবার আলাদা কী হবে। কিন্তু সেবার যদি না যেতাম, কিছু মূল্যবান স্মৃতি সংগ্রহ করা থেকে বঞ্চিত হতাম।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
