কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২৯। শোভন সরকার
গত পর্বে: চেত সিং মহলের নীরবতা কত বাঙ্ময়। এসে পড়লাম হরিশ্চন্দ্র ঘাটে।
সেই ত্রেতা যুগের কথা। রাজা হরিশ্চন্দ্র তাঁর স্ত্রী শৈব্যা ও পুত্র রোহিতাশ্বকে নিয়ে সুখে বাস করছিলেন। কিন্তু ‘চক্রবৎ পরিবর্তন্তে সুখানি চ দুখানি চ’ — জগতের নিয়ম মেনে আমাদের গল্পের নায়কের সুখ বেশিদিন রইল না। কোনো একবার শিকারে বেরিয়ে তিনি অজ্ঞানবশত ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্রের ধ্যানভঙ্গ করে ফেলেন। রাজা ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু বিশ্বামিত্রের ভাবনা কিছু ভিন্ন ছিল — মুনি-ঋষিদের মন, বোঝা বড় দায়। তিনি রাজার কাছে রাজসূয় যজ্ঞ করার খরচাপাতি চাইলেন। রাজা ভাবলেন, এ আবার এমন কী? বিশ্বামিত্র ভুল ভাঙিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বললেন যে তিনি রাজার স্ত্রী-পুত্র ছাড়া বাকি সমস্ত কিছু নেবেন। রাজা বিচলিত হলেন না, তিনি সত্যিই নির্দ্বিধায় সব দিয়ে দিলেন। তবুও বিশ্বামিত্রের মন ভরল না। তিনি আরও কিছু চাইলেন। রাজার কাছে এখন দেবার মত আর কী-ই বা আছে? এক মাস সময় চেয়ে বললেন যে তিনি এই সময়ের মধ্যে ঋষির প্রয়োজনীয় দাবি মিটিয়ে দেবেন।
এক মাসের মাথায় হরিশ্চন্দ্র সপরিবারে কাশীতে এসে পৌঁছালেন। কিন্তু বিশ্বামিত্রকে দেবার মত তখনও তাঁর কাছে কিছু জমা হয়নি। শৈব্যা তখন উপায় বললেন — তাঁকে বিক্রি করে দিলে কিছু পয়সা আসবে। হরিশ্চন্দ্র কিছু আপত্তির পর এক সময় উপায়ান্তর না দেখে প্রথমে শৈব্যাকে সপুত্র বিক্রি করে দিলেন। তারপর কাশীর শ্মশানঘাটে গিয়ে ডোমরাজার কাছে নিজেকেও বিক্রি করে দিলেন। সেখানেই তিনি নিজের সত্যরক্ষার জন্য পরিবারহীন হয়ে মৃতের সৎকার করে অর্থসঞ্চয় করতে থাকলেন।
একদিন তাঁর সত্যরক্ষার পরীক্ষা চরমে উঠল। শ্মশানঘাটে কাঁদতে কাঁদতে এলেন এক নারী, কোলে এক মৃত বালক, তাকে সাপে কেটেছে। হরিশ্চন্দ্র তাঁদের দেখে চমকে উঠলেন — তাঁরই স্ত্রী মৃত পুত্রের সৎকার করতে শ্মশানে এসেছেন। কিন্তু হরিশ্চন্দ্র নিজে তাঁর কর্তব্যে অবিচল রইলেন — মৃতের সৎকারের জন্য তো মূল্য দিতেই হবে। অন্তরের প্রবল ঝড়-ঝঞ্ঝার আঁচটুকুও বাইরে আসতে না দিয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে সহায়হীনা শৈব্যার কাছে মৃতদেহ সৎকারের কর চেয়ে বসলেন।
ঠিক তখনই ঋষি বিশ্বামিত্র রাজার কৃতকর্মে সন্তুষ্ট হয়ে ধর্মরাজ ও অন্যান্য দেবতাদের নিয়ে রাজার কাছে এলেন এবং তাঁকে তাঁর ইচ্ছানুসারে বর দিলেন।
রাজার এই সত্যবাদিতা ও নির্লোভ চরিত্রের গুণে তিনি পুরাণে-গাথায় অমর হয়ে রইলেন। তাঁরই নামে কাশীর সেই শ্মশানঘাটের নাম হল হরিশ্চন্দ্র ঘাট। অনেকের বিশ্বাস এইটিই হল কাশীর প্রাচীনতম শ্মশানঘাট — একে তাই কেউ কেউ ‘আদি মণিকর্ণিকা’ বলেও উল্লেখ করে থাকেন। মজার ব্যাপার এই যে, বিংশ শতাব্দীর পূর্বে এই ঘাট হরিশ্চন্দ্র ঘাট বলে পরিচিত ছিল কিনা তার কোনো প্রমাণ বিরল, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর নাম ‘মশান’ বা ‘শ্মশানঘাট’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বামী যুক্তানন্দ এই ঘাটের অতীত খুঁজতে গিয়ে বলছেন, ‘… প্রাচীনকালে কাশীর বিস্তার রাজঘাটের কাছাকাছি পর্যন্তই সীমিত ছিল। ওই সময় বর্তমান সঙ্কটা ঘাটকে শ্মশান ঘাট বলা হত। এই শ্মশান ঘাটকে হরিশ্চন্দ্রের পরম্পরা সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। কাশীখণ্ডও এমন ধারণাকে সুদৃঢ় করে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন বারাণসী নগর দক্ষিণদিকে আরও বাড়তে থাকে, তখন থেকেই সঙ্কটা ঘাটস্থিত শ্মশান ভূমির প্রতিষ্ঠা বর্তমান হরিশ্চন্দ্র ঘাটে হয়। হরিশ্চন্দ্র ঘাটে পাওয়া পনেরশো থেকে ষোলশো খ্রিস্টাব্দের সতী স্মারক থেকে প্রমাণ হয় যে, এই ঘাট পনেরশো থেকে ষোলশো খ্রিস্টাব্দে একটি শ্মশান ঘাট ছিল।’
এখনও অবধি এইটিই হল কাশীর একমাত্র ঘাট যেখানে দাহকার্যের জন্য বিদ্যুৎ চুল্লি রয়েছে। ১৯৮৯ সালে চুল্লিটি ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’-এর অংশ হিসেবে চালু করা হয়। আগে এই ‘বিজলি ঘর’ বিদ্যুতে চললেও সাম্প্রতিক কালে এখানে জ্বালানি হিসেবে সিএনজি ব্যবহার শুরু হয়েছে।
চন্দ্রাবলী জিজ্ঞেস করল, ‘তোরা কেউ এই ঘাটে এসে বসেছিস?’
একটু অবাক হয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই মড়া, শ্মশান ঘাট ইত্যাদি নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা ভয়ের, অশৌচের অনুভূতি জেঁকে বসে আছে। বাড়ির বয়স্কদের মুখে নানা রকম গল্পও শুনেছি ভূতে ধরা নিয়ে, ভর হওয়া নিয়ে। বাড়ির ছোটরা নিতান্ত দুর্ভাগা না হলে শ্মশান ঘাটে যায় না, আমিও যাইনি। শ্মশান ঘাটে গিয়ে দুঃসাহসিক রাত কাটানোর কথা কেবল গল্পেই পড়েছি, বাস্তবে ভাবিনি কখনও। তাই বেনারসে এসে শ্মশানে এসে বসার কথা আমার মাথাতেও আসেনি আগে।
আমরা মাথা নাড়লাম।
‘কখনও সময় করে এসে বসিস। নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাবি।’
সেদিন কথাটা শুনেছিলাম, সামান্য বিচলিত হয়েছিলাম, কিন্তু তার রেশ টের পেয়েছিলাম আরও পরে। শীঘ্রই সে প্রসঙ্গে আসব, বলব কাশীর শ্মশান ঘাটে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা।
আজ আমাদের নৌকা এগিয়ে চলল লালী ঘাট, শঙ্করাচার্য ঘাট, বিজয়নগরম্ ঘাট ছাড়িয়ে। বিজয়নগরের মহারাজা ঘাটগুলোর প্রভূত সংস্কারকার্য করেন। বিজয়নগরম্ ঘাটের উপরের দক্ষিণী স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত সুদৃশ্য বাড়িটি তাঁরই অবদান। পরে মহারাজা বাড়িটিকে স্বামী করপাত্রীকে দান করে দেন। এখন এটি তাঁর আশ্রম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, সন্ত লালীবাবার নামে ঘাটের নাম লালী ঘাট। এখানে রয়েছে তাঁর গুদড়দাস আখড়া।
বিজয়নগরম্ ঘাটের পরেই দেখলাম কেদারঘাটের অপূর্ব দৃশ্য। সকালের নরম আলোয় নৌকা থেকে ঘাটের উজ্জ্বল রঙিন দক্ষিণী ধাঁচের শোভা নজর কেড়ে নেয় এখানকার গৌরী-কেদারেশ্বর মন্দির। হিন্দুদের কাছে কাশীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্দির এটি। বলা হয় কাশী হল সমস্ত তীর্থের নির্যাস। হিন্দুরা বিশ্বাস করে কাশী দর্শন করলে সমস্ত তীর্থ ভ্রমণের ফল লাভ হয়। যারা উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ের সুদীর্ঘ ও প্রায় বারো হাজার ফিট উচ্চতার চড়াই করে কেদারনাথ মন্দিরে যেতে পারে না, তাদের কাছে কাশীর এই মন্দিরটি যথাযথ বিকল্প। অনেকটা যেন উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ যাত্রার অনুভব করাতেই গঙ্গা থেকে বেশ অনেকগুলি প্রশস্ত ধাপ খাড়া উঠে গেছে গৌরী কেদারেশ্বর শিব মন্দির পর্যন্ত। ঘাটেই রয়েছে গৌরীকুণ্ড-ও, ঠিক যেমন মূল কেদারনাথ যাত্রাপথে দর্শনার্থীদের গৌরীকুণ্ড হয়ে এগিয়ে যেতে হয়।
অঙ্কিতা আপন মনে বলে উঠল, ‘ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায় এখানে এলেই।’
‘এসেছিলি আগে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘বাবা-মা’র সাথে এসেছিলাম অনেকদিন আগে। ভেতরটা খুবই সুন্দর, খুবই — অন্তত আমার স্মৃতিতে…। ছাপ ফেলে যাওয়া বলে না? সেটাই। তারপর মন্দিরের ভেতরের আলো-আঁধারি পরিবেশে কেউ… বোধহয় মন্দিরের পূজারী… আমাদের কেদারেশ্বরের গল্প বলেছিল। গল্প শোনার সেই অনুভূতি… এখনও ফিরে ফিরে পাই, মনে করলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।’
‘কেন? খুব ভয়ের নাকি?’ চন্দ্রাবলীর কণ্ঠে আগ্রহ।
‘না, ঠিক ভয়ের নয়, কিন্তু একটা দারুণ রোমাঞ্চ লাগে।’
‘বল না, আমরাও শুনি।’
‘কেদারেশ্বর শিব কাশীতে কীভাবে এলেন, মূলত সেটা নিয়েই গল্প। রকমফের রয়েছে, কিন্তু প্লট প্রায় একই।
একটা সেই মান্ধাতার আমলের কাহিনিটা… মানে সত্যি সত্যি রাজা মান্ধাতার রাজত্বকাল। রাজপাটে আর তার ভাল লাগে না। সংসার ছেড়ে চলে গেল হিমালয়ে, কেদার দর্শন করার মন। কিন্তু সেখানে বহুদিন কঠোর তপস্যা করেও তার উদ্দেশ্য সফল হল না। তখনই শিব আকাশবাণী করে মান্ধাতাকে বললেন যে হিমালয়ে নয়, কাশীতে… সেখানে গেলেই তাঁর দর্শন সম্ভব। মান্ধাতা বলল, আমি তো আপনাকে রোজ না দেখে থাকতে পারব না। কিছু একটা উপায় করুন যাতে আমি মনের মত দ্রুত গতি পাই।’
‘মনের মত গতি? মহাভারতের সেই বক-যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নোত্তরের কথা মনে পড়ে গেল। সেই যে বলল না, মনের গতিই সবচেয়ে বেশি।’
‘আবার সেই গুপি-বাঘার জুতো!’ আমি বললাম।
‘হ্যাঁ রে, বলছি তো, গতি কেমন ছিল সেটাও আছে এই কাহিনিতে। শিব মান্ধাতাকে বর দিয়ে ফিরে যেতেই সে কাশীতে চলে এল এক নিমেষে।’
‘ডিসি কমিক্সের ফ্ল্যাশ তো!’ আমরা হেসে উঠলাম।
‘ওরকমই ধরে নে, আর কী।’
‘তারপর? কাশীতে এসে মান্ধাতা শিবের দর্শন পেল?’
‘না, এসেই পেয়ে গেল এমন হল না। অনেক খুঁজে খুঁজে যখন পেল না, আবার সে রোজ হিমালয়ে যেতে শুরু করল। এখন তো আর আগের মত সময়ের সমস্যা নেই। চোখের পলকেই পৌঁছে যাচ্ছে, এদিক ওদিক ঘুরে পূজা-তর্পণ এসব করে আবার কাশীতে ফিরে আসছে।’
‘রোজ?’ আমি অবাক।
‘হ্যাঁ, রোজ। তারপর অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও যখন মান্ধাতা কেদার দর্শন করতে পারল না, সে আবার শিবকে ডেকে বলল… আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। আগের মত আর চলতে ফিরতে পারি না। কিছু একটা উপায় কর। তখন শিব আবার আড়াল থেকে বললেন, বৎস, তুমি বুড়ো না… দুর্বল হয়ে গেছ। তা বাছা তুমি এক কাজ কর, আগে খাও, তারপর যাত্রা শুরু কর। শরীরে বল থাকলে সব হয়। অত নিয়ম-টিয়ম বুঝি না বাপু, ভক্তকে বুঝি।’
‘এরকম নাকি? তাহলে সবাই কেন বলে উপোস করে শিবরাত্রি করতে হবে? কত নিয়ম, ভক্তির চেয়ে ভয় বেশি।’
‘কী জানি। লোকে অনেক সময়ই না জেনে নিয়ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে… বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো!’
‘তারপর কী হল মান্ধাতার? খেয়েদেয়ে কেদার যেতে শুরু করল?’
‘এবারেই তো আসল ঘটনাটা ঘটল।’
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
