সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ৩০। বরুণদেব
কলকাতার বৌবাজারের মুখোপাধ্যায় পরিবার থেকে উঠে আসেন বিশ্ববিখ্যাত বারপ্লেয়ার রমণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বউবাজারে মাখনবাবুর স্কুলে প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি ভর্তি হন ময়রাপট্টির ব্যায়ামের আখড়ায়। নিজের চেষ্টায় প্যারালাল বারের অনুশীলন। পরিচয় হলো বিখ্যাত ব্যায়ামবীর পান্নালাল বর্ধনের সঙ্গে। বৌবাজারে শ্রীনাথ দাসের বাড়িতে বসল এক ব্যায়াম প্রদর্শনী। সেখানেই প্রথম আত্মপ্রকাশ রমণচন্দ্রের। সিঙ্গল ট্রাপিজের খেলা দেখিয়ে নাম কুড়োলেন। ময়রাপট্টির আখড়ায় খেলা দেখতে এসে প্রতিভা চিনে নিতে ভুল হয় নি প্রিয়নাথ বোসের। ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে ডেকে নিলেন রমণচন্দ্রকে। খুব অল্প বেতনে যোগ দিলেন। সেখানে তখন বারের খেলায় আলো ছড়াচ্ছেন কৃষ্ণলাল বসাক, পান্নালাল বর্ধন, বেণীমাধব ঘোষ, বনমালী দাস। বারক্লাউন হিসেবে দর্শকের সামনে আসা রমণচন্দ্র, প্রিয়নাথের ভাই মতিলালের পরামর্শে শিখে নিলেন বারের খেলা। ভাগলপুরের প্রদর্শনীতে পুরোদস্তুর সার্কাসশিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ।রমণচন্দ্রের শৃঙ্খলা সংযম অধ্যবসায় দেখে প্রিয়নাথ বসু তাঁর নাম দিলেন- রমণ ঠাকুর। ট্রাপিজের রডের ওপর হ্যাণ্ডব্যালান্সিং ও হেডব্যলান্সিংয়ের খেলা দেখাতেন নিপুণভাবে। ভারতীয় সার্কাসে হেডব্যলান্সিং খেলাটির প্রবক্তা তিনিই। বারের খেলায় তাঁর মুন্সিয়ানা তাঁকে বিখ্যাত করেছে, অন্যান্য ভারতীয় সার্কাসশিল্পীদের কাছে তো বটেই ইউয়রোপীয় শিল্পীদের কাছেও তাঁকে ঈর্ষণীয় করে তুলেছে। সে সময় সার্কাসে সাধারণত তিন-বারের খেলা প্রচলন ছিল। রমণচন্দ্র তিনটি বারের মাঝের বারটির ওপর আরও দুটি বার লাগিয়ে সূচনা করলেন পাঁচ বারের খেলা। তাঁর এই পাঁচ বারের খেলা দেখেই মালাবার অঞ্চলের শিল্পীরা চালু করেন ছয়,সাত বারের খেলা।
১৯১২-১৩ সাল নাগাদ কলকাতায় বসেছে দু’টি সার্কাসদলের প্রদর্শনী। পান্তির মাঠে প্রফেসর বোসের সার্কাস আর নেবুতলা থানার কাছে (আজকের সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার) কার্লেকার সার্কাস। কার্লেকার সার্কাসের প্রথম কলকাতা সফর ছিল সেটা। বোসের সার্কাসে পাঁচটি বারের খেলা দেখাচ্ছেন রমণচন্দ্র। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর এই নতুন আইটেমটির । কার্লেকার সার্কাসের মালাবারী শিল্পীরা নিজেদের খেলা শেষ করে রমণচন্দ্রের এই পাঁচ-বারের খেলাটি দেখতে আসছেন বারবার। উদ্দেশ্য, ক্রীড়া কৌশলটি বুঝে নেওয়া। দিনের বেলায়ও চলছে গোয়েন্দাগিরি। ভগবান সিং নামে এক শিল্পী বোসের সার্কাসের তাঁবুতে আসছেন এই খেলাটির সাজসরঞ্জাম, ক্রীড়াকৌশল বুঝে নিতে। মালাবারী শিল্পীদের বারের খেলার দুরূহ ও জটিল সংস্করণগুলির পথ প্রদর্শক বাঙালী রমণ ঠাকুরের এই পাঁচ-বারের খেলা।
প্রিয়নাথ বোসের সার্কাস ছেড়ে রমণচন্দ্র যোগ দিয়েছিলেন আবেলস গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাস, হিপোড্রোম সার্কাসে। যুক্ত হয়েছেন কিছু ইউরোপীয় ও অস্ট্রেলীয় সার্কাসেও । দেশে বিদেশে ঘুরেছেন। গ্র্যান্ড সার্কাসে থাকাকালীন তিনি দেখাতেন ওভার ফ্লাইং- একটি বারে পাক খেয়ে মাঝের বারের উপরে শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে ঐ বারটি টপকে তৃতীয় বার ধরে দু’বার ডিগবাজি খেতেন। বিদেশের মাটিতে প্রথম খেলাটি দেখান যখন, তখন সার্কাস তাঁবু ফেলেছে হংকং শহরে। অনুমান, বিশ্বসার্কাসে এই খেলাটির উদ্ভাবন তাঁর হাত ধরেই।
শেষ জীবনে এসে নিজের সার্কাসদল চালু করেন রমণচন্দ্র, ১৯১৬ সালে। মুখার্জি’স সার্কাস। বেশ কয়েক বছর বাংলা ও বাংলার বাইরে নানা জায়াগায়, ব্রহ্মদেশে ভ্রমণ করেন মুখার্জিস সার্কাস নিয়ে। কিন্তু দলে ছিল প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব। ফলতঃ কয়েক বছরের মধ্যে তাঁবু গোটায় বাঙালির আর এক সার্কাস। হাত বদল হয়ে এই সার্কাস বিখ্যাত হয়।
ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার নয়না গ্রামে জন্ম মহেন্দ্রনাথ দসের। শৈশবে পিতাকে হারিয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে শুরু হয় তাঁর সংগ্রাম। স্কুলের পথ ভুলতে বাধ্য হন। ফৌজদারি আদালতে টুকটাক ফাইফরমাশের কাজ করে দিন গুজরান। সেসব ছেড়েছুড়ে অল্প বয়সেই শরীরচর্চায় মনোনিবেশ। প্যরালাল বার, হরাইজন্টাল বারের খেলাগুলির তালিম নিয়ে এক ব্যায়াম-স্কুলে প্রশিক্ষকের কাজ পেয়ে যান। কয়েক বছর পর যোগ দেন অ্যাবেল’স গ্রেট ইস্টার্ন সার্কাসে। সেখানে তখন রমণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বারের খেলায় আলো ছড়াচ্ছেন। এক বছর পর অ্যাবেলস ছেড়ে ছোট্ট একটা সার্কাসদল তৈরী করে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে মেলায় মেলায় ঘুরতে লাগলেন। রংপুর, দিনাজপুর, কুচবিহার, দার্জিলিং জুড়ে স্টেজ ভাড়া করে খেলা দেখালেন। এ সার্কাসদলের নাম – রয়্যাল বেঙ্গল সার্কাস।
এই সার্কাস যখন কলকাতায় এলো, ভবানীপুরে নব রূপে তার উদ্বোধন করলেন প্রিয়নাথ বসু। তার কিছুদিন আগেই বিখ্যাত সার্কাসশিল্পী শ্যামাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছে। রয়্যাল বেঙ্গল সার্কাসের উদ্বোধনী ভাষণে প্রিয়নাথ বসু বলেন-‘বাংলার এক নক্ষত্র খসিয়া গিয়াছে শ্যামাকান্তের মৃত্যুতে। পূর্ব্বাকাশে আর এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের আবির্ভাব সূচনা করিতেছেন বিক্রমপুরের এক উদীয়মান বীর মহেন্দ্রনাথ।‘
মহেন্দ্রনাথ বুকে পাথর ভাঙা, বুকের ওপর দিয়ে গরুর গাড়ি চালানো, লোহার শিকল ছেঁড়া ইত্যাদি খেলা অবলীলায় দেখাতেন। দেড়শো মণ ওজনের ভারী লোহার রোলার বুকের ওপর দিয়ে চালানোর দুঃসাহসিক খেলা তিনিই প্রথম প্রবর্তন করেন। তাঁর সার্কাস দীর্ঘায়ু হয় নি ঠিকই কিন্তু ১৯৩০ সাল নাগাদ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার আগে পর্যন্ত এই অমায়িক ভদ্র সার্কাসশিল্পী এক বীরগাথা লিখে গিয়েছেন ভারতীয় সার্কাস-ইতিহাসের পাতায়।
কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কৃষ্ণলাল বসাকের ক্যারিস্মা এক শিশুকে শরীরচর্চায় আগ্রহী করে তোলে। সেই শিশুটির নাম গৌরগোপাল সেন। দর্জিপাড়ার নিমু গোস্বামী লেনের দক্ষিণারঞ্জন বসাকের আখড়ায় তিন বছর ব্যায়ামের তালিম নিয়ে নাড়া বাঁধলেন মথুর সেন লেনের পূর্ণ পালের আখড়ায়। প্রশিক্ষণ শেষ করে প্রফেসর বোসের সার্কাসদলে যোগ দিলেন। প্রফেসর বোসের সার্কাসের সূচনা পর্ব থেকেই রিং ও ল্যাডার বিভাগের এক সুদক্ষ শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৮৯৪ খ্রীস্টাব্দে কোয়েটার বালুচিস্তান গেজেট লেখে- ‘গৌর গোপাল ইজ এ ম্যান অফ ইমেন্স স্ট্রেন্থ হুইচ হি এক্সিবিটস ইন দ্য ল্যাডার বিজনেস।‘ সুন্দর কর্ণেটও বাজাতে পারতেন তিনি। কয়েক বছর বোসের সার্কাসে কাজ করার পর তাঁবুর জীবনকে বিদায় জানিয়ে যোগ দিলেন কাস্টমস অফিসের চাকরিতে।
————————————————————————
বিডন ষ্ট্রীটের বর্ধিষ্ণু সাহা পরিবারে জন্ম ভবানীচরণ সাহার। পিতা উপেন্দ্রনাথ সাহা ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকায় দূরন্ত ভবানীকে সময় দিতে পারতেন না। তাকে মানুষ করার জন্য স্মরণাপন্ন হলেন বাল্যবন্ধু অতীনবাবুর, যিনি ক্ষুদিবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। ক্ষুদিবাবু ছিলেন সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রতিষ্ঠাতা। ক্ষুদিবাবুর বাড়িতে থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি জিমন্যাষ্টিক্স, কুস্তি শিখতে লাগলেন ভবানী। অল্প বয়সেই বেশ কিছু পালোয়ানকে কুস্তিতে হারিয়ে দিয়ে বাহবা পেলেন।
বাবুসমাজের আয়েশী কলকাতায় প্রচুর টাকা খরচ করে কুস্তির আখড়া স্থাপন করে বাঙালী যুবকদের কুস্তি চর্চায় উৎসাহিত করেন কলকাতার বনেদী গুহ পরিবারের অম্বু গুহ। তাঁর ভারত বিখ্যাত আখড়ায় অন্যান্য প্রদেশের শিক্ষার্থীরাও কুস্তি শিখতে আসতেন। অম্বুবাবুর আখড়ার দায়িত্ব নেন তাঁর পুত্র ক্ষেতুবাবু, তিনি নিজেও এক নামকরা পালোয়ান। ভবানী এলেন ক্ষেতুবাবুর আখড়ায়। জহুরী জহর চেনে। ক্ষেতুবাবু ভবানীর মধ্যে প্রতিভা খুঁজে পেলেন। তাঁর শিক্ষায় ভবানী হয়ে উঠলেন পালোয়ান।
সার্কাসের সেই জনপ্রিয়তার যুগে জিমন্যাস্টিক্স, কুস্তি, শারীরিক কসরৎ চর্চা করা ছেলেরা সার্কাসের প্রতি আকৃষ্ট হত। কলকাতায় এলো প্রফেসর রামমূর্তির সার্কাস। গোটা শহর ভেঙে পড়ল সার্কাস দেখতে। ভবানীও গেলেন। শো শেষ হবার পর রিঙে ঢুকে খেলার সরঞ্জামগুলি পরীক্ষা করছিলেন ভবানী। প্রফেসর রামমূর্তি এগিয়ে এসে আলাপ করলেন। উনিশ বছরের ভবানীর শারীরিক গঠন দেখে মুগ্ধ হলেন প্রফেসর। প্রতিদিনই ভবানী রামমূর্তির আমন্ত্রণে যান সার্কাস দেখতে । রামমূর্তি তাঁর সার্কাসে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু মায়ের অনুমতি মিলবে না। যেদিন রামমূর্তি তাঁবু গুটিয়ে বিদেশ যাত্রা করলেন, ভবানী গোপনে বাড়ি ছাড়লেন। রামমূর্তির দলের সঙ্গে চলে গেলেন সোজা রেঙ্গুন। সার্কাস জীবনের সেই শুরু । তিনটে মোটর গাড়িকে টেনে রাখা, দুটো হাতি বুকের ওপর তোলা, সাড়ে চার মণ বারবেল মাথার ওপর তোলা, দু’টন রোলার বুকের ওপর তোলা, মোটা লোহার শিকল ছিঁড়ে ফেলা, ঘোড়ার পেটে চামড়ার শক্ত বেল্ট বেঁধে সেই বেল্ট দাঁতে কামড়ে ধরে ঘোড়াটাকে শূন্যে তোলা – নানারকম বাহুবলী খেলা দেখাতে শুরু করলেন সার্কাসে। দেশ বিদেশের প্রসিদ্ধ পালোয়ানের সঙ্গে কুস্তিতে তিনি কখনো হারেন নি, জিতেছিলেন বা সমান সমান হয়েছেন। যে দেশেই কুস্তি করেছেন সে দেশেই চ্যম্পিয়ন হয়েছেন। রামমূর্তির সার্কাস থেকে ভীম ভবানী গেলেন কৃষ্ণলাল বসাকের সার্কাসে। সেখান থেকে কিছুদিন আগাসীর সার্কাসে। প্রিয়নাথ বসুর সার্কাসে বুকের ওপর পাথর ভাঙা, বুকে হাতি তোলা, চলন্ত মোটর গাড়ি আটকানোর মতো পালোয়ানী খেলা দেখাতেন ভবানীচরণ।
রামমূর্তির সার্কাস যখন জাভায়, এক ওলন্দাজ পালোয়ান রামমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ জানালেন। ভবানী বললেন, গুরু শিষ্য এক জায়গায় থাকলে আগে শিষ্যের সঙ্গে লড়তে হয়, শিষ্যের পরাজয় হলে তবে গুরুর সঙ্গে টক্কর। সেই ওলন্দাজ পালোয়ানকে ভূপতিত করতে মিনিট দুই-তিনের বেশি লাগল না ভীম ভবানীর। সাংহাইতে এক মার্কিন পালোয়ানকে হারিয়ে এক হাজার ডলার বাজি জেতার পর বিপদে পড়লেন ভবানী। ঐ মার্কিন পালোয়ান তাঁকে গুপ্ত হত্যার সংকল্প করে। সে যাত্রা সাংহাইয়ের কন্সালের চেষ্টায় রক্ষা পান। সেই কন্সালের চলন্ত নতুন মিনার্ভা মোটরগাড়ি থামিয়ে পুরস্কারস্বরূপ গাড়িখানা উপহার পান ভবানী।
কলকাতায় এক প্রদর্শনীতে তাঁর খেলা দেখে সমাজের কিছু গণ্যমান্য মানুষ তাঁকে উপাধি দেন – ভীম ভবানী। স্বদেশী আন্দোলনের সময় ঢাকা, মৈমনসিং ইত্যাদি অঞ্চলে বেশ কিছু আখড়া তৈরী করে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। শেষ দিকে নিজে একটি সার্কাসদল খুলে লোয়ার চিৎপুর রোডে খেলা দেখাতেন। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে নিমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর তাঁবু ছাড়লেন এই বাঙালি পালোয়ান।
যে বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম, সেই বছরই জন্মগ্রহণ কড়েছিলেন সুরেশ বিশ্বাস,
১৮৬১ সালে, নদিয়ার কৃষ্ণনগর থেকে পনেরো মাইল দূরে নাথপুরের এক সাধারণ পরিবারে। তিনি পরিচিত হন কর্নেল সুরেশ বিশ্বাস নামে। তিনি সরাসরি ভারতের সার্কাস জগতে অংশগ্রহণ করেন নি ঠিকই, কিন্তু তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের এক প্রতিকূল পর্বে জড়িয়ে গিয়েছে সার্কাসের তাঁবু। ছোটোবেলা থেকেই দূরন্তপনা, পশুপাখি নিয়ে পড়ে থাকা, গাছে উঠে পাখির ছানা চুরি করা, সাপের মাথা কেটে দেওয়া, পাগলা কুকুরকে খালি হাতে মেরে ফেলা। একবার কয়েকজন সাহেব শিকারে গিয়ে একটি বুনো শুয়োরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সুরেশ মাছ ধরে ফিরছিলেন বন্ধুদের সাথে। হঠাৎই সেই বুনো শুয়োরের সামনে পড়ে গেলেন। মাছ ধরার ছিপের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করলেন শুয়োরের মুখে। শুয়োরটা পড়ে গেল। সাহেবদের পোষা কুকুর ও বন্দুকের বাঁট দিয়ে সাহেবদের বরাহ শিকার সম্পন্ন হলো। স্থানীয় সাহেব মেমদের কাছে প্রিয়পাত্র হয়ে গেলেন সুরেশ।
একটু বড়ো হলে পিতা গিরিশচন্দ্র বিশ্বাস কলকাতায় মিশনারিদের স্কুলে ভর্তি করে দিলেন সুরেশকে। কিন্তু স্কুলের ক্লাসে মন টেকে না। সুরেশকে ভবানীপুরের লণ্ডন মিশনারী স্কুলে (পরবর্তীকালের ইউনাইটেড মিশনারী স্কুল) ভর্তি করে দেওয়া হলো বটে কিন্তু দূরন্তপনা উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল। তেরো বছর বয়সে সে ছেলে স্বেচ্ছায় খ্রীস্টান হয়ে গেল। বৈষ্ণব পিতা ত্যাগ করলেন পুত্রকে। ফুটপাতে দিন কাটে সুরেশের। চেয়েচিন্তে জোটে খাবার। যদি কোনো সাহেব এই ইংরেজি জানা কিশোরকে লণ্ডনে নিয়ে যায় সেজন্য সাহেবদের মাল বয়ে মুটেগিরি করা। দু’চার পয়সা রোজগার হয়। কিন্তু সুরেশের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় না। অগত্যা একদিন টিকিট কেটে বর্মার জাহাজে উঠে পড়া। সেখানে কাজ তো জুটলই না, উল্টে বর্মার দস্যুদের কবল থেকে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে পালালেন। তবে বর্মা থেকে ফেরা হলো না। অগ্নিদগ্ধ এক বাড়ি থেকে গৃহকত্রীকে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে বাঁচালেন। সে বাড়িতেই জুটল ঠাঁই। কিছুদিন পর চলে গেলেন মাদ্রাজে। এক মাদ্রাজি পরিবারের শিশুদের দেখাশোনার কাজ জুটল। ষোলো বছর বয়স যখন, ফিরলেন কলকাতায়। এক সাহেবের দাক্ষিণ্যে থাকা খাওয়ার একটা ব্যবস্থা হলো। কলকাতা বন্দরে যাতায়াত ছিল সুরেশের। বছরখানেকের মধ্যে জুটে গেল জাহাজের স্টুয়ার্টের কাজ। এরপর সেই ঈপ্সিত লণ্ডন। সে শহরের ইস্ট এন্ড পাড়ায় ডেরা বাঁধলেন। কাগজ ফেরি করতে লাগলেন। শহর থেকে কেনা কিছু ভারতীয় জিনিসকে লণ্ডনের গ্রামে গ্রামে অ্যান্টিক বলে চালিয়ে ফেরি করতে লাগলেন। কিছু পয়সাকড়ি হাতে এলো। এবার শুরু করলেন পড়াশোনা। রসায়ন, গণিত, জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো প্রিয় বিষয়ের পাশাপাশি ইন্দ্রজাল শিখতে লাগলেন। ভোজবাজি শেখার জন্য স্থানীয়দের কাছে শিখতে লাগলেন ল্যাটিন ও গ্রীক ভাষা।
কিছুদিন পর কেণ্ট প্রদেশের এক সরাইখানায় সুরেশের অস্থায়ী যাপন। সেখানে কিছু সার্কাসকর্মীর সঙ্গে পরিচয় হলো। জীবন বাঁক নিল। এক সার্কাসের ম্যানেজারকে নানারকম কসরৎ দেখিয়ে খুশি করে কাজ জুটে গেল সেই সার্কাসে। ছোটোবেলায় পশুপাখি কুকুর বিড়ালকে পোষ মানানো সুরেশ,সেই সার্কাসে বাঘ সিংহকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল করায়ত্ত করলেন। জীবজন্তুর খেলা আর ম্যাজিক শো-এ নাম করলেন সুরেশ। ঐ সার্কাসের এক জার্মান মহিলা শিল্পী ছিলেন এক বিত্তবান পরিবারের কন্যা, বাড়ি থেকে পালিয়ে সার্কাসের তাঁবুতে আশ্রয় নিয়ে সার্কাসশিল্পী হয়ে ওঠেন। সুরেশ তাঁর প্রেমে পড়লেন। ইতিমধ্যে সংবাদপত্রে এক বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলো- ঐ মহিলার মা শয্যাশায়ী। বিজ্ঞাপন দেখে পরিবারের সাথে আবার যোগাযোগ তৈরী হলো ঐ জার্মান মহিলার। এদিকে চালচুলোহীন এক সার্কাসশিল্পীর হাতে মেয়েকে তুলে দিতে রাজি নন ঐ পরিবারটি। প্রাণনাশের হুমকি এবং সুরেশ বিশ্বাসের ইউরোপ ছেড়ে আমেরিকায় পলায়ন।
নিউইয়র্কে পৌঁছে বিখ্যাত ওয়েলসাহেবের সার্কাসে দায়িত্ব পেলেন বাঘ সিংহ দেখাশোনা করার। সার্কাসদল গেল ব্রাজিল। সেখানে সার্কাসশিল্পী হিসাবে রিঙে খেলা দেখালেন। ব্রাজিলে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর খ্যাতি। সার্কাস ছেড়ে যোগ দিলেন ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় পশুশালার প্রধান হয়ে। একাধিক ভাষা জানতেন- পর্তুগীজ, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, স্প্যানিশ, ডাচ। কিছুদিন পর আবার জীবিকার পরিবর্তন, যোগ দিলেন ব্রাজিলের সেনাবাহিনীতে। এই নতুন জীবনে সৈনিক থেকে কর্নেল পদে উন্নীত হলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ বীরত্বের জন্য সম্মান পেলেন। রিও ডি জেনিরোতে অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে জায়গা করে নিলেন।১৯০২ সালে একচল্লিশ বছর বয়সে ঐ শহরেই এই বর্ণময় জীবনের সমাপ্তি, যে জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আশ্রয় দিয়েছে সার্কাসের তাঁবু, খ্যাতি দিয়েছে, উত্তরণ ঘটিয়েছে। কর্নেলের সমাধিক্ষেত্র যেমন রিও ডি জেনিরো শহরে আছে তেমনি মধ্য কলকাতার একটি রাস্তা তাঁর নামে।
১৯০৫ সালে জন্ম সতীশচন্দ্র কুকড়ীর। স্কুলের ক্লাসঘরের চেয়ে জিমন্যাষ্টিক্স মাঠের দিকে মনোযোগ বেশি। গোবরবাবুর আখড়ার খ্যাতি তখন ছড়িয়ে পড়ছে ভারতে। বালক সতীশ গোবরবাবুর আখড়ায় ভর্তি হলেন। ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সে আখড়ায় নিয়মিত চর্চা। রামবাগান ফ্রেণ্ডস ইউনাইটেড ক্লাবে বন্ধুদের সঙ্গে ডাম্বেল, বারবলের অনুশীলন। জাগলিং, ভারী পাথর বুকে তোলা, বুকের ওপর দিয়ে গরুর গাড়ি চলে যাওয়ার নিয়মিত অনুশীলন। এরপর সার্কাসজীবন। সুযোগ মিলল কে বসাকের সার্কাসে। দু’তিন মাস থাকার পর আগাসীর সার্কাসে যোগ দিলেন। এরপর দু’একটি সার্কাসে খেলা দেখিয়ে সাত আট মাসের জন্য গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসে। সেখান থেকে সেলার্স সার্কাস।
১৮৮৯ সাল। কলকাতা দেখলো বেলুনে চেপে মানুষের উড়ান। পার্সিভাল স্পেনসার্স নামে এক ব্রিটিশ কলকাতার রেসকোর্স ময়দান থেকে বেলুনে চেপে আকাশে উড়লেন। বেলুনটির নাম রাখা হয়েছিল এম্প্রেস অফ ইণ্ডিয়া। এই দুঃসাহিসক কাজ আলোড়ন ফেলে দিল কলকাতায়। রাজকৃষ্ণ রায়ের প্রহসনে সেই বেলুন উড়ান উঠে এলো- – ‘হাজার হাজার কাতার কাতার লোক চলেছে ভাই/ ছেলেবুড়ো কানা খোঁড়া/ কেউ তো বাকি নাই/ বেলুন রাজ সাহেব ভায়া/ বেলুনে তুলবে কায়া/ উড়বে খুব লাগিয়ে হাওয়া/ লুটবে টাকা তাই ।’
একবার গড়ের মাঠ থেকে আকশে উড়ে বেলুন নামল বসিরহাটে। সংবাদপত্রের ছড়ায় – ‘উঠলো বেলুন গড়ের মাঠে, / পড়লো বেলুন বসিরহাটে।’
কলকাতার সিমুলিয়া অঞ্চলের কাঁসারি পাড়ার বাসিন্দা বাবু রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নবগোপাল মিত্রের ন্যশনাল সার্কাসের দুর্ধর্ষ অ্যাক্রোবাট শিল্পী। ব্রিটিশ শাসনের ঘোর প্রতিবাদী এই শিল্পী ভারতের প্রথম ব্যোমযাত্রী । যে কাজ বিদেশী পারে, সে কাজ বাঙালিই বা পারবে না কেন! অতএব বাবু রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই উড়ান কৌশল শেখার জন্য উপস্থিত হলেন স্পেনসার্স সাহেবের কাছে। প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হলে ১৮৮৯ সালের ১০ই এপ্রিল ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির ছাদ থেকে স্পেনসার্স সাহেবের সঙ্গে বেলুনে চেপে উড়লেন। দু’মাস বাদে নারকেলডাঙ্গার গ্যাস কোম্পানির ছাদ থেকে একাই গেলেন বেলুন উড়ানে। ১৮৮৯ সালের জুন মাসের সেই দিনটিতে কাতারে কাতারে কলকাতাবাসী রুদ্ধশ্বাস সাক্ষী হয়ে রইল সে ঐতিহাসিক ঘটনার। ঠিক ছিল বেলুন একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে প্যারাসুটে নেমে আসবেন রামচন্দ্র। বেলুনটি ওড়ার পর রামচন্দ্র রুমাল নাড়লেন। নিচে থেকে বেলুনের দড়িটি ছিন্ন করে দেওয়া হলো। বেলুন উড়ছে তো উড়ছেই। রামচন্দ্র আর ঝাঁপ দেন না। প্যারাসুটের ছাতাও খোলে না। দুরু দুরু বুকে সকলে আকাশের দিকে তাকিয়ে। সেন্ট জেভিয়ার্সের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপক লাঁফোর অনুমান, রামচন্দ্র আর প্রাণ নিয়ে নিচে নামতে পারবেন না। সকলকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে রামচন্দ্র ঝাঁপ দিলেন বটে, কিন্তু প্যারাসুটের ছাতা আর খোলে না। আকাশে পাক খেতে খেতে প্রায় পঞ্চাশ- ষাট হাত নিচে নেমে এলেন রামচন্দ্র। অবশেষে প্যারাসুট খুলল। আকাশের বুকে বেলুনবাজি আর ডিগবাজির সেই অভিনব সার্কাসের সাক্ষী কলকাতা করতালিতে ফেটে পড়ল। বাঙালির ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেল নবগোপাল মিত্রের ন্যাশানাল সার্কাসের অ্যাক্রোব্যাট রামচন্দ্রর দুঃসাহসিক আকাশযাত্রা। ন্যশানাল সার্কাস বেশিদিন চলে নি। নারকেলডাঙ্গার সেই গ্যাসকোম্পানি বাগমারি খালের পাশে বর্ণহীন হয়ে গিয়েছে সময়ের ধুলোয়। বাবু রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ও মুখ ঢেকেছেন আত্মবিস্মৃত বাঙালির ইতিহাসের ধূলিধূসরিত অধ্যায়ে।
(ক্রমশ)
