সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ৩২। বরুণদেব
সার্কাসের খেলায় পারফরম্যান্সই শেষ কথা নয়, আবহ ও জাঁকজমকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই প্রধান হয়ে দাঁড়ায় মহিলা শিল্পীদের আবেদন। উগ্র প্রসাধন, স্বল্পবসনের আকর্ষণ, চটুল বিনোদনের আবেদনে শিল্প আর নিষ্কলুষ থাকে না তখন। সস্তা মনোরঞ্জনের অনুচ্চারতি দাবি সার্কাসের তাঁবুতে মহিলা শিল্পীদের চাহিদার কারণ হয়ে যায়। পূর্বাশ্রমের সঙ্গে নাড়ির টানটা ঢিলে হয়ে যেতে যেতে, ‘সার্কাসের মেয়ে’ হয়ে যেতে যেতে নিজেদের আসল নাম গোপন রাখতে রাখতে সার্কাসের দেওয়া ছদ্মনামটিকেই আশ্রয় করে জীবনের মানে খুঁজতে থাকে। ১৯৭০- ৮০ সালের সার্কাসের তাঁবুর পরিবেশের অভিজ্ঞতা সার্কাসশিল্পী সাবিত্রী চন্দ্রনকে বাধ্য করে নিজের নাম গোপন রাখতে- দর্শক আসন থেকে পুরুষরা আকৃষ্ট হলে খুঁজে বের করে চিঠি লেখে, রাস্তায় বেড়ুলে নানারকম মন্তব্য।
স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে সার্কাসের আবহ ভারতমাতা ‘সুশীলা সুন্দরী’-দের নির্ভীক পদচারণার আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়েছে যেমন, তেমনি কলকাতার অনেক বাবুই সার্কাসের নীল চক্ষু বাদামী বর্ণের মহিলাদের প্রতি আসক্ত হতেন। বিশ শতকের প্রথম দিকে তাঁদের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া নিয়ে শহরে কানাকানি পড়ে যেত। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতেও সার্কাস গ্যালারির বিনোদিনী দৃষ্টি মহিলা শিল্পীদের শরীরকে অন্যচোখে দেখে। সার্কাসের মেয়েরা বাজার বা শহরে গেলে ইভটিজিংয়ের শিকার হয়, উত্তরপ্রদেশ বা বিহারে মহিলা শিল্পীর সার্কাসীয় নৃত্যে চলে গণ-সিটি ।
আবার কখনো কখনো দালাল গোষ্ঠী বিদেশী মহিলা সার্কাসশিল্পীদের দিয়ে পোল ড্যান্সারের বিনোদনে বর্ষশেষের হৈহল্লায় উষ্ণতা আনে। আফ্রিকান পুরুষ শিল্পীদের নিকষ দৈত্যাকার চেহারার বাইসেপ ট্রাইসেপের পুরুষত্বের আবেদন দর্শক টানে যতটা, তার থেকে ঢের বেশি দর্শককে হাতছানি দেয় বিজ্ঞাপনের খোলামেলা ঝলমলে পোশাকের সাদা চামড়ার ভিয়েতনাম, কালো চামড়ার কেনিয়া, পাহাড়ি নেপালি বা বাদামী চামড়ার ভারতীয় মেয়েরা। এক শ্রেণির সার্কাসীয় দর্শক তখন সার্কাস অনুরাগী থাকেন না, নিছকই খরিদ্দার। এ গল্প চিরকালীন।
শুরুর দিকে বাঙালির সার্কাসের চালিকাশক্তি ছিল পৌরুষ, গোরাদের সঙ্গে টক্কর, তার সূত্রে হিন্দুমেলার পথ ধরে স্বাদেশিকতা। সার্কাসের এরিনা হয়ে উঠেছিল পরাক্রম দেখানোর এবং সেই পরাক্রমকে কেন্দ্র করে এক পরাধীন জাতির বিনোদনের মঞ্চ, সেখানে যেমন জাত বিজাত নেই, তেমনি পুরুষ মহিলা নেই। ভারতীয় সার্কাসের সূচনা পর্বের কাহিনীতে বিষনুপন্থ ছত্রেকে নিয়ে যত আলোচনা হয়, সেই তুলনায়, তাঁর স্ত্রী খানিকটা উপেক্ষিতই রয়ে যান। ভারতীয় সার্কাসের উত্থানে স্বামীর সঙ্গেই তিনি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দায়িত্ব সামলেছিলেন, ট্রাপিজ ও অশ্বারোহণের খেলায় যেমন, তেমনি সার্কাস পরিচলানায়ও। সেই শুরুর পর্বেই গোঁড়া হিন্দু সমাজের নিয়ম নীতিকে তোয়াক্কা না করে তিনি সমানভাবে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন।
কলকাতায় সার্কাস যখন জনপ্রিয় হচ্ছে, প্রায় সেই একই সময়ে বাংলা রঙ্গমঞ্চও ঢেউ তুলছে সমাজে। নাটকের মঞ্চে সোনাগাছির মেয়েদের প্রবেশ নিয়ে যে সমাজে এত ছিচ্ছিকার, সেই সমাজই আর এক বিনোদন, সার্কাসে মেয়েদের সাহসী ও বেপোরোয়া শারীরিক কসরত দেখে দেয় হাততালি। যখন বাংলার নাট্যমঞ্চে বিনোদিনী, গোলাপদের মঞ্চে অভিনয় করা নিয়ে ঢি ঢি পড়ে যাচ্ছে, গিরিশ ঘোষ, অমৃতলাল বসুদের ছায়া মাড়ানো পাপ বলে মনে হচ্ছে, তখন সার্কাসের সুশীলা সুন্দরী,মৃণ্ময়ীদের মতো মহিলা শিল্পীদের পরাক্রমে সেই সমাজ হর্ষিত হচ্ছে, প্রিয়নাথ বসু, কৃষ্ণলাল বসাকরা তাঁদের সার্কাস পরিচালনার মধ্যে দিয়ে সমাজের সম্মানীয় বিশিষ্টজন হয়ে উঠছেন। দু’টি জগতের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল শরীর নিয়ে বীরত্বের প্রদর্শন। আর সেটাই হয়ে উঠেছিল সার্কাসের অহংকার। বিশ শতকীয় কলকাতার সমাজ বদলে নাটকের মঞ্চের পাশাপাশি সার্কাসের তাঁবুও তার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে সার্কাস। সমাজের পতিত শ্রেণীর, অন্ধ গলির নারীদের, সমাজের সামনের সারিতে উত্তরণের পথে তাঁবুর করতালির পাশাপাশি হিক্কা উঠছে অমূল্যচরণ তর্কালঙ্কারের মতো বুদ্ধিজীবিদেরও। ১৯০০ সালে সময়ের পরিবর্তন ও চিন্তাধারা’য় এই বিনোদনের জগতগুলিকে তিনি বলছেন ‘উল্টোপুরাণ’। এ চিত্র ভারতের সর্বত্রই। রুক্মাবাঈ সার্কাসের রুক্মাবাঈ নিজেকে ‘ভারতীয় লেডি হারকিউলিস’ বলে বিজ্ঞাপিত করতেন। ১৯৩৫ সালে উত্তরপ্রদেশের ‘চেতনা আর্য সোসাইটি’ নামে এক হিন্দু জাগরণ সঙ্ঘ ‘দেশীয় নারী ও তাদের পুনর্জন্ম’ শিরোনামে এক প্যম্ফলেটে সেই রুক্মাবাঈকে ইঙ্গিত করে বিদ্রুপে ভরিয়ে দিয়েছিল- ‘সকলেই ঝাঁসির রানি হতে পারে না। আজকের ভারতীয় নারীর চুলাকে রক্ষা করে আদর্শ গৃহিণী হয়ে তাদের স্বামীর লড়াইয়ে অংশীদার হওয়া দরকার। থিয়েটার বা ঐ ধরনের শিল্পের মঞ্চে যে নারীরা ডিগবাজি খায়, জন্তুজানোয়ারের সঙ্গে খেলা দেখায়, সে নারীরা হিন্দু নারী ও আমাদের মহান ভারতকে লজ্জা ছাড়া আর কিছু দিতে পারে না।‘
চামার জুতো সেলাই করে, অস্পৃশ্যদের কাজ সকাল সকাল রাস্তার ময়লা পরিষ্কার করা, কামারের সম্পর্ক শুধু লোহার সাথে – সার্কাস যখন এইসব সামাজিক ভেদাভেদের প্রাচীরে কুঠারাঘাত করছে তখন যে সমস্ত বিনোদনের অভিঘাতে সে সময়ের ভারতীয় সমাজের আদিম সামাজিক গণ্ডিগুলি ভেঙে যাচ্ছে, সার্কাস সেই জনপ্রিয় বিনোদনের সূচীপত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে যাচ্ছে।
পুরুষ আধিপত্যকে পিছনের সারিতে ফেলে দিয়ে সার্কাসীয় বিনোদনে প্রাধান্য নিয়ে জাঁকিয়ে বসছে নারী। হিন্দু মহিলাদের ভীরুতা ঘুচিয়ে দিয়ে সুশীলা সুন্দরী যখন বাঘের সাথে খেলা দেখাতে লাগলেন তখন সার্কাস সমাজে হিন্দু মহিলাদের জাগরণের বার্তা পাঠাল। সার্কাসদলগুলি তাদের বিজ্ঞাপনে মহিলা শিল্পীদের কথা সগৌরবে বিজ্ঞাপিত করে আকর্ষণ করছে দর্শককে। চার বছর ধরে সফলভাবে চলা রুক্মাবাঈ সার্কাসের রুক্মাবাঈ পেয়েছিলেন ‘প্রফেসর’ তকমা, যে তকমা সার্কাসের পুরুষদের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। উত্তরপ্রদেশের ‘নবজাগরণ সোসাইটি ফর হিন্দু এন্ড মহাম্যাডান ওমেন’ ১৯৩৫ সালে একটি প্যাম্পফ্লেটে রুক্মাবাঈকে প্রগতিশীল নারী হিসেবে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়ে লিখেছিল- ‘তিনি ঝাঁসির রানি, যিনি জাহাজকে টেনে নিয়ে যেতে পারেন’। চরম পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সার্কাসের মহিলারা পুরুষ আধিপত্যকে চপটাঘাত করছে। সেই ট্রাডিশন বিশ্বজুড়ে। সেই ট্রাডিশন সময়ের সরণী বেয়ে। ১৯৮০র দিকে অ্যাপোলো সার্কাসের শিল্পীদের মধ্যে পঁচাত্তর জন মহিলা, পঁয়ষট্টি জন পুরুষ, জাম্বোতে নব্বই জন মহিলা, চল্লিশ জন পুরুষ, ন্যাশনাল সার্কাসে পঞ্চান্ন জন মহিলা, পঁয়তাল্লিশ জন পুরুষ।
তাই এই সময়ে মৃতপ্রায় সার্কাসের দূরবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ২০২৫এর কৃষ্ণনগরের বারোদোলের মেলায় রায়ান সার্কাসের শিল্পী জন বলে ওঠেন – ‘নাও হোয়ার আর দোজ গার্লস?
ভারতীয় সার্কাসে মহিলাদের গর্বিত পদার্পণের অনেক আগেই উনিশ শতকের প্রথম দিকে এক ভ্রাম্যমান মহিলা শিল্পী বাংলার গ্রামীণ মেলাগুলিতে এক মুসলিম সুফির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের নিয়ে অলৌকিক কাণ্ডকারখানা দেখিয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তাঁর নাম সাবিরা। তিনি একই সাথে ‘আল্লার মেয়ে’ ও ‘ভানুমতির ভাইঝি’ নামে পরিচিত ছিলেন। দর্শকরা দর্শনীর বিনিময়ে তাঁর কাছে আশীর্বাদ নিত। কোনো সমাজব্যবস্থাতেই খেটে খাওয়া প্রান্তিক সমাজের নারীরা পর্দনশীন থাকেননি। সার্কাসের তাঁবু সেই প্রান্তিক সমাজের আশ্রয়স্থল।
প্রফেসর বোসের সার্কাসের সম্মান ও সমাদরের পিছনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল তাঁর দলের নারী শিল্পীদের। বাঙালির সার্কাসের বিজয় অভিযানের সেইসব সৈনিকরা যাঁদের অনেকেই প্রফেসর বোসের তালিমে শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন সুশীলা সুন্দরী। হিন্দু মহিলারা ভীরু, এই প্রচলিত ধারণাকে চুরমার করে দিয়েছিলেন সুশীলা। পর্দানশীন, ভীরু বাঙ্গালী নারীসমাজে সুশীলা সুন্দরী ছিলেন ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির’। ট্রাপিজ , ল্যাডার ও অন্যান্য খেলা পারদর্শীতার সঙ্গে দেখালেও তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল বাঘের খেলা দেখানোর জন্য। রিঙের মধ্যে দুটো বাঘ নিয়ে খেলা দেখাতেন । ইতিপূর্বে কলকাতা দেখেছে এক বিদেশী রমণীর সিংহের সঙ্গে খেলা। সেখানে কাছাকাছি দঁড়িয়ে থাকত সশস্ত্র প্রহরী। কিন্তু সুশীলা সুন্দরী যখন বাঘের ওপর শুয়ে থাকতেন, তাদের চিবুকে চুম্বন দিতেন, কাছাকাছি সশস্ত্র প্রহরী তো থাকতই না এমন কি একখানি চাবুক বা ছড়িও থাকত না। সার্কাসে হিংস্র বাঘের সঙ্গে খেলায় সুশীলা সুন্দরী ভারতীয় সার্কাসে প্রথম মহিলা শিল্পী। শান্ত ধীর পদক্ষেপে ঢুকে যেতেন বাঘের খাঁচায়, নির্দেশ দিতেন হিংস্র জন্তু দু’টিকে, নির্দেশমতো তারা কখনো উঠে দাঁড়াত, কখনো দর্শকদের দিকে বিশাল হাঁ মুখ দেখাত, কখনো বালিশ হয়ে সুশীলা সুন্দরীকে শুয়ে থাকতে দিত। হিংস্র বাঘের খাঁচায় ঢুকে কোনোরকম প্রহরা ছাড়া তিনি যেসব দুঃসাহসিক কাণ্ডকারখানা দেখাতেন তা বিশ্ব সার্কাসেও নজিরবিহীন। তৎকালীন সংবাদপত্রগুলি, ইংলিশম্যান, ইণ্ডিয়ান মিরর, ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সুশীলা সুন্দরীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। উনিশ শতকের সেই সময়টায় যখন স্ত্রীশিক্ষার আলো সবেমাত্র ঢুকছে কলকাত্তাই সমাজে তখন সে প্রথাগত শিক্ষার আলো না পেয়েও সুশীলা সুন্দরী পরোক্ষে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন গোঁড়া উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের গৃহকর্মে নিপুণা, রান্নাঘরের আলোআঁধারে জীবন কাটিয়ে দিয়ে পতিসেবাই ধর্ম ও পুণ্যকর্ম বাঙ্গালী নারীর ন্যারেটিভকে। ২৫ শে নভেম্বর, ১৯০১ এ ইংলিশম্যান পত্রিকা লিখছে- ভীরু ও দুর্বল রূপে বাঙালি হিন্দু নারীরা চিহ্নিত হলেও মিস সুশীলা সুন্দরীর মতো খেলোয়াড় যিনি খালি হাতে দুটি অত্যন্ত হিংস্র রয়্যাল বেঙ্গল বাঘের খাঁচায় প্রবেশ করেন কোনো প্রকার বাহ্যিক সুরক্ষা ছাড়াই এবং তাঁর ক্রীড়াকৌশল প্রদর্শন করেন অকুতোভয়ে, এমন দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে মনে বিস্ময় জাগে।
আবার ট্রাপিজের খেলায় এই সুশীলা সুন্দরীই শুধুমাত্র দাঁতের সাহায্যে একটি দড়ি ধরে থাকতেন, সে দাড়ি বর্তমান সময়ের সার্কাসের মতো রাবারের দণ্ড নয়। দড়িটিকে অবলম্বন করে শূন্যে ঝুলে থাকত চার-পাঁচজন লোক। ডবল ল্যাডারের খেলায় হাত ও পায়ের সাহায্যে একটি বারের দুই প্রান্তে দু’টি প্রকাণ্ড ল্যাডার নিয়ে ব্যালান্সের খেলা দেখাতেন, সঙ্গে থাকত আট ন’জন শিল্পী, কেউ পরীর মতো ঝুলত, কেউ কাঁধ কোমর জড়িয়ে থাকত। মাটি থেকে তিরিশ ফুট উঁচুতে দোদুল্যমান সুশীলা সুন্দরীর খেলা দেখে করাচির ফিনিক্স পত্রিকা তাঁর সম্বন্ধে লিখেছিল- ‘ফেয়ারি উইং কিং’। আবার জীবন্ত সমাধির খেলাও দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর সার্কাস-পূর্ব জীবনের কথা বিশেষ জানা যায় না। সে জীবন নিয়ে যে কল্পনা বা রটনা, তার পিছনে কতখানি সত্য আছে বলা মুশকিল, অবনীন্দ্রকৃষ্ণ বসু লিখেছেন, সুশীলা সুন্দরীকে আবিষ্কার করেছিলেন প্রিয়নাথ বসু। নাটকের মঞ্চে গিরিশ চন্দ্র ঘোষ যেমন ছিলেন বিনোদিনীর মেন্টর, তেমনি সার্কাসের তাঁবুতে প্রিয়নাথ ছিলেন সুশীলার মেন্টর। সুশীলার সাহসী খেলা দেখে এক ইউরোপিয়ান তাঁর ভ্রমণ সংস্থায় চলে আসার প্রলোভন দেখান। প্রফেসর বসু এ কথা জানতে পেরে বাধা দিয়েছিলেন। সুশীলা তাঁর টাকা পয়সা সার্কাসের ম্যানেজারের কাছ থেকে নিয়ে চুপি চুপি সেই সংস্থায় চলে যান। সেই ইউরপিয়ান সুশীলার টাকা পয়সা আত্মসাৎ করে ভারত ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি দিলে, বাধ্য হয়ে সুশীলা আবার সার্কাসে ফিরে আসার জন্য প্রফেসর বোসের কাছে কাকুতি মিনতি করেন। সুশীলার নামে স্ক্যান্ডাল ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে বোসের সার্কাসে তাঁর ফের আশ্রয় মেলে কিন্তু আগের থেকে অর্ধেক টাকায়।
১৯২৪ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া সুশীলা সুন্দরীর পঁয়তাল্লিশ বছরের অকুতোভয় যে জীবন বিচিত্র ও সুঃসাহসিক খেলায় সার্কাসবিশ্বকে মোহিত করে রেখেছিল, তার শুরু হয়েছিল সুশীলার এগারো বছর বয়সে। তাঁর পারিবারিক জীবনের কথা বিশেষ কিছু জানা যায় না, শুধুমাত্র তাঁর বোন কুমুদিনীর কথা ছাড়া। প্রিয়নাথ বা সুশীলা সুন্দরী কেউই তাঁদের সম্পর্ককে সীলমোহর না দিলেও প্রিয়নাথ বোসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে গল্প লেখা হয়েছে আধুনিক সময়ে। তবে অখ্যাত অজ্ঞাত সুশীলা সুন্দরী সুপ্রশিক্ষক প্রিয়নাথের সুযোগ্যা এক শিষ্যা, গুরু-শিষ্যার চৌত্রিশ বছরের যুগলবন্দী সার্কাসের বন্দীসে যে সুরঝংকার তুলেছিল তাতে আবিষ্ট হয়েছিল সার্কাস বিশ্ব, অহংকারী হয়েছিল বাঙালির সার্কাস ইতিহাস।
সুশীলা সুন্দরীর বোন কুমুদিনী ছিলেন বোসের সার্কাসের আর এক সম্পদ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে একজন বাঙ্গালী মেয়ে ঘোড়ায় চড়ছে যখন কল্পনার অতীত তখন অশ্বারোহী কুমুদিনী রিঙের মধ্যে স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিমায় নানারকম খেলা দেখিয়ে গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিচ্ছেন। দেখাচ্ছেন ফ্লাস ব্যালান্সিং, পিরামিড অ্যাক্ট, ট্রাপিজের খেলা। দর্শকদের করতালিতে তাঁবুই শুধু ফেটে পড়ছে তাই নয়, সমকালীন পত্র পত্রিকাগুলিও প্রশংশায় পঞ্চমুখ। ১৮৯৪ সালে ২৯ শে জুন করাচীর ‘সিন্ধ গেজেট’ লেখে- ‘ওয়াণ্ডারফুল ম্যাডাম, মোস্ট ওয়ান্ডারফুল’।
কুমুদিনীর সার্কাস জীবন শুরু হয় যখন তাঁর বয়স আট বছর। প্রিয়নাথ বসুর আখড়ায় আসার জন্য প্রতিদিন বাড়িতে দুটি ঘোড়া যেত। একদিন বিকেলে ঘটল এক বিপর্যয়। কুমুদিনীর ঘোড়াটি সুশীলার থেকে অপক্ষাকৃত বড়ো। কুমুদিনীর সহিস ঘোড়াটিকে ছেড়ে একটু সামনে এগিয়ে গিয়েছে। হঠাৎ কোনো কারণে ভয় পেয়ে ঘোড়াটি ছুটতে শুরু করল। শহরের মাঝপথ দিয়ে একটি বালিকাকে পিঠে নিয়ে একটি বলগাহীন ঘোড়া ছুটে চলেছে, পিছনে পিছনে আরও অনেক মানুষ ছুটছে উৎকণ্ঠায় ও কৌতূহলে। কুমুদিনী ঘোড়ার জিন আঁকড়ে ধরে ঘোড়ার পিঠের ওপর শুয়ে পড়ে ঘোড়ার সঙ্গে নিজেকে আটকে রাখল। শহরের নানা পথ ঘুরে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট ও হ্যারিসন রোডের সংযোগস্থলে এসে থামল ঘোড়াটি। কুমুদিনী ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এসে লাগাম ধরল। খবর পেয়ে ছুটতে ছুটতে এসে পৌঁছলেন প্রিয়নাথ। এক বিস্ময়কর প্রতিভার সন্ধান পেলেন। ঘষেমেজে তৈরী করলেন সেই ছোট্ট বালিকাটিকে। অশ্বারোহিনী কুমুদিনী সার্কাসবিশ্বকে মুগ্ধ করে দিলেন। করাচির ফিনিক্স পত্রিকা তাঁকে ভূষিত করল ‘এম্প্রেস অফ এরিনা’ বলে। কুমুদিনীর আগে যোগীন্দ্রনাথ পালের শিষ্যাগোলাপ ও বসন্ত নামে দুই মহিলা শিল্পী বা কুমুদিনীর পরে আরও অনেক মহিলা শিল্পী অশ্বারোহনের খেলা দেখালেও কুমুদিনীই ছিলেন সার্কাসের রিঙে অশ্বারোহনের সাম্রাজ্ঞী।
বোসের সার্কাসে ছিলেন ভল্টিং অ্যাক্ট শিল্পী বাঙালী নারী মুলতানবালা। সার্কাসের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু বোসের কাছে, খুব অল্প বয়স থেকেই। তারপর অশ্বারোহনের নানা কৌশল শিক্ষা প্রশিক্ষক গাস বার্ণসের কাছে। ভলটিং অ্যাক্টে পারদর্শী শিল্পী হয়ে ওঠেন। গ্লাস ব্যালান্স, ট্রাপিজের খেলাতেও ছিলেন সমান দক্ষ। নাম পরিচয় গোত্রহীন এইসব বাঙালী সার্কাসশিল্পীরা রাষ্ট্র সমাজ ইতিহাসের কাছে উপেক্ষিতই রয়ে গিয়েছেন।
আর ছিলেন রাজুবালা ও শশীকলা। হিংস্র বাঘের খেলায় সর্বপ্রথম ভারতীয় মহিলা হিসাবে সুশীলা সুন্দরীর প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে রাজুবালা ও শশিকলা প্রিয়নাথ বোসের সার্কাসের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন। শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দু’টি প্রকাণ্ড বাঘের সঙ্গে খেলা দেখাতেন তাঁরা।
প্রিয়নাথ বোসের সার্কাসে মৃণ্ময়ী ছিলেন তারকা শিল্পী। সার্কাসের পোস্টার তাঁকে সিংহের ওপর বসে থাকা দেবী হিসেবে বিজ্ঞাপিত করত। হাতির পিঠে অথবা সুন্দরবনের বাঘের সঙ্গে খেলা দেখিয়ে দর্শককে বিস্মিত করে দিতেন মৃণ্ময়ী। সমকালীন পত্রপত্রিকা বন্দেমাতরম বা স্টেটসম্যানে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল তাঁর খেলা। মৃণ্ময়ী খেলা দেখানোর আগে গাওয়া হত গান, গানটি লিখেছিলেন মতিলাল বসু-
‘জানে বিশ্বজন/ যুঝে আমরণ/ হইলে মিলন/ ব্যাঘ্র বারণে! / দেখ তাহা ভুল,/ জগতে অতুল/ দ্বিরদে শার্দ্দূল/ বন্ধু বন্ধনে!/ কাঁদায়ে কল্পনা,/ গজে বাঘাসনা,/ বঙ্গ-বীরাঙ্গনা/ বরে মরণে!’
পশুর পশুত্বকে নিয়ন্ত্রণ করা পরাক্রমী দেবীপ্রতিমার প্রতিমূর্তি হিসেবে যে মৃণ্ময়ীকে উপস্থাপিত করত সার্কাসের এরিনা, সেই মাদার ইণ্ডিয়া মৃণ্ময়ীই স্বামীর মৃত্যুর পর বৈধব্য যাপনকে সঙ্গী করেছিল ।তাঁবু অথবা সমাজের প্রচলিত সংস্কার!
বোসের সার্কাসে সুচিন্তা ও সুকুমারী, দুই বোন, অস্বপৃষ্ঠে বেয়ার ব্যাক রাইডার, ল্যাডার, তারের খেলায় সুনাম অর্জন করেছিলেন। বোসের সার্কাসে আর এক বঙ্গ মহিলা হিঙ্গনবালা ছিলেন বিশিষ্ট জিমন্যাস্ট। হিঙ্গনবালা পরবর্তীকালে বিশিষ্ট যাদুকর গণপতি চক্রবর্তীর দলে যোগ দেন।
বেণীমাধব ঘোষের অক্রোবাট’স সার্কাসে বেণীবাবুর শিষ্যা প্রমীলা সুন্দরী সার্কাসের তাঁবুতে চলন্ত মোটর গাড়ি থামেতেন, ঘোড়াবিহীন পাল্কিতে লোক বসিয়ে বর্শা দিয়ে ঠেলে নিয়ে যেতেন, তিরিশ মণ ওজনের পাথর বুকের ওপর ভাঙতেন, বুক ও উড়ুর মধ্যে দিয়ে দু’খানি গরুর গাড়ি চালানোর খেলা দেখাতেন। কলকাতা ময়দানে প্রফেসর বোসের সার্কাসেও খেলা দেখিয়েছেন তিনি।
ভরতীয় সার্কাসের প্রারম্ভিক পথ চলার যুগে প্রফেসর বোসের একক প্রচেষ্টায় একাধিক বাঙ্গালী মহিলা শিল্পী গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের তাঁবুতে আলো ছড়িয়েছেন, ভেঙে দিয়েছেন উনিশ শতকের নারীসমাজের অচলায়তন। এখানেই প্রফেসর বোস ও তাঁর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস বাঙালির ইতিহাসে ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে, হয়ে উঠেছে উনিশ শতকের যুগসন্ধিক্ষণের বাঙালির বৈপ্লবিক ও ঐতিহাসিক যাত্রাপথের এক অনন্য নজির।
বোসের সার্কাসের মহিলা শিল্পীরা কোন সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে সার্কাসের তাঁবুর ঝুঁকিবহুল ভ্রাম্যমাণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন অথবা বাধ্য হয়েছিলেন সে জীবনের হাতছানিতে সাড়া দিতে, তা জানা যায় না। শিক্ষাঙ্গনে পা দেওয়ার সদ্য অনুমতি পাওয়া নারীসমাজ উচ্চবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। জীবনের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এই সার্কাস নারী শিল্পীরা সমাজের প্রান্তিক সম্প্রদায় থেকে এসে হাততালি কুড়িয়েছেন তাঁদের শিল্প নৈপুণ্যে এবং হারিয়েও গিয়েছেন বিস্মৃতির অতলে, তাঁবুর প্রশংসার হাততালি কখন যেন উপেক্ষার হাততালি হয়ে গিয়েছে।
রেবা রক্ষিত। অভিবক্ত বাংলার কুমিল্লা জেলায় ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন।দেশ বিভাগের পর পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন কলকাতায়। বিষ্ণুচরণ ঘোষের জন্ম ১৯০০ সালে। বহু ভারতীয় ব্যায়ামক্রীড়ার জনক বিষ্ণুচরণ মানিকতলার গড়পার রোডে নিজের বাড়িতে গড়ে তোলেন ব্যায়াম প্রশিক্ষণ স্কুল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে তাঁর জন্যই ব্যায়ামচর্চা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর আখড়ায় তালিম নিতেন শান্তি চক্রবর্তী, কমল ভাণ্ডারি, মনোহর আইচ, মনোতোষ রায়, অলিম্পিক সার্কাসের প্রতিষ্ঠাতা সুবোধ ব্যানার্জী। এই আখড়ারই ছাত্রী রেবা রক্ষিত। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে ‘মিস বেঙ্গল ফর বডি বিল্ডিং’ খেতাব জিতে নেন। কমলা সার্কাস, ইন্টারন্যাশনাল সার্কাস, জেমিনি সার্কাসের মতো প্রথম সারির সার্কাসে বুকের ওপর হাতি তোলা, ভারোত্তলনের খেলা দেখিয়ে গেছেন ধারাবাহিকভাবে। সে যুগের দুর্গোৎসবে বিভিন্ন ক্লাবে প্রদর্শনী করেছেন। ভারতীয় নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম ধারাবাহিকভাবে সার্কাসের হাতি বুকে তুলে নিতেন। সার্কাস থেকে অবসর নেওয়ার পর শারীরশিক্ষার প্রশিক্ষক হয়ে যুক্ত ছিলেন বালিগঞ্জ কালচারাল ইন্সটিউটের সঙ্গে। হায়দ্রাবাদের নবাব তাঁকে ‘দেবী চৌধুরানী’ নাম দিয়ে সম্মানিত করেন। রেবা রক্ষিত পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ২০১০ সালে। তিনি যুক্ত ছিলেন নানা সমাজসেবামূলক কাজে। শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে অবদানের জন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘পদ্মশ্রী’ পান।
বাংলার সার্কাসের এক বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়ের নাম রাজবালা দাসী। বিস্মৃত কেননা বাঙালির সার্কাস নিয়ে আলোচনার যেটুকু বিক্ষিপ্ত ইতিহাস রয়েছে, সেখানে তিনি ব্রাত্য হয়ে আছেন।
রাজবালা দাসীর জন্ম কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলের মালোপাড়ায় ১৮৮৭ সালে। চার মাস বয়সে মাতৃবিয়োগ, কয়েক বছর পর হারালেন বাবাকেও। চার ভাইবোনের মধ্যে কনিষ্ঠ রাজবালা। আত্মীয়স্বজনের প্রতারণায় পৈতৃক বাড়িটি বেদখল হয়ে গেল। প্রতিবেশিনী ক্ষুদিবালা দায়িত্ব নিলেন ভরণপোষণের, চার ভাইবোনের, রাজবালার সঙ্গে তাঁর দুই বোন ও এক দাদার। ক্ষুদিবালা বিয়ে দিলেন রাজবালার বড়দির, কলকাতার রামবাগানে। রাজবালা ও তাঁর বাকি ভাইবোন আশ্রয় নিলেন দিদির কাছে। কিন্তু বিধবা হলেন বড়দি। বড়দির শ্বশুর বাড়ি আর বাকিদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিল না। সহায় সম্বলহীন বিধবা বড়দি আশ্রয়ের খোঁজে চলে গেলেন ঢাকা, অস্বীকার করলেন ভাইবোনদের দায়িত্ব নিতে।
প্রফেসর বোসের গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস তখন কলকাতায়। তাঁর দলের জন্য অল্পবয়সী মেয়েদের চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এই তিন সহায় সম্বলহীন বালক বালিকা আশ্রয় পেল প্রফেসর বোসের তাঁবুতে। সার্কাসের মালিক তখন মতিলাল বসু। রাজবালা তালিম পেলেন ট্রাপিজ ও ব্যালান্সের খেলায়। খ্যাতি ছড়াল। রাজবালার ব্যালান্সের খেলা দেখতে দেখতে দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে হাততালি দিতেন।
মুগ্ধ হয়েছিলেন আর একজনও। গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের মালিক মতিলাল বসু। ছত্রিশ বছরের বিবাহিত পুরুষ, একাধিক পুত্রকন্যার জনক মতিলাল ১৮৯০ সালে উজ্জয়িনীতে সফরের সময় সেখানকার এক কালীমন্দিরে বিয়ে করলেন এগারো বছরের রাজবালাকে। ততদিনে রাজবালা সন্তানসম্ভবা। এর ছ’মাস উনিশ দিনের মাথায় অমৃতসরে জন্ম হলো তাঁদের মেয়ের। নাম রাখা হলো ইন্দুবালা। এই ইন্দুবালাই সঙ্গীত সাম্রাজ্ঞী হয়ে শ্রোতাদের মন কেড়ে নেবেন একদিন। মতিলালের পিতা, হিন্দু মেলার অন্যতম রূপকার, সে যুগের বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার মনোমোহন বসু, যিনি রঙ্গমঞ্চে পতিতাদের প্রবেশের প্রতিবাদে নাটক লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তিনি মতিলাল-রাজবালার এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেন নি। তবে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের জনক প্রিয়নাথ বসু ইন্দুবালার শৈশবেই ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন , ইন্দুবালা একদিন ‘গাইয়ে হবে’।
ইন্দুবালার জন্মের পর রাজবালা সার্কাসের প্রতি উৎসাহ হারালেন। কলকাতায় ফিরে এসে দয়াল মিত্র লেনে আস্তানা গাড়লেন। বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যে মতিলালের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। মাত্র তিপান্ন বছর বয়সে বহুমূত্র রোগী মতিলাল মারা গেলেন।
রাজাবালার আর এক গুণ ছিল সঙ্গীত। হাতেখড়ি হয়েছিল স্বামী মতিলালের হাতেই। মেয়ের জন্মের পর সার্কাস সঙ্গ ত্যাগ করে বাড়িতে ওস্তাদ রেখে রেওয়াজ করতে শুরু করলেন। বাংলা পুরাতনী, টপ্পা, কীর্তন অনুশীলন চলল। সংসারের ব্যয়ভার বহন করার জন্য বেছে নিলেন সঙ্গীতর জীবন। খ্যাতিও পেলেন। তাঁর বাড়ির সাংগীতিক আসরে আসতে লাগলেন সে সময়ের বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞরা – সাতকড়ি ওস্তাদ, গিরিবালা, গোবিন্দ প্রসাদ মিশ্র, গোবিন গুরু, চণ্ডী বন্দোপাধ্যায়, বড়ো দুলী খাঁ। আসতেন কাজী নজরুল ইসলাম, শিশির কুমার ভাদুড়ি।
সার্কাসশিল্পী ও সঙ্গীতশিল্পী রাজবালা অভিনয়ের জগতেও নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। ১৮৯৩ সালে রামবাগানের ‘রাজাহরির দল’-এ ছবছর বয়সে ‘গঙ্গা আনয়ন’ যাত্রাপালায় ভগীরথের ভূমিকায় অভিনয় করা রাজবালার মিনার্ভা থিয়েটারে গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘শঙ্করাচার্য্য’ নাটকে অভিনয় দিয়ে পেশাদারী মঞ্চে নাট্যাভিনয় শুরু ১৯০৯ সালে। এরপর ১৯১১-তে ‘তপোবল’ নাটক। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে রাজবালার। কিন্তু দীর্ঘ সময় নাটক থেকে বিরতি নিয়ে সঙ্গীতে মনোনিবেশ করেন। রঙ্গমঞ্চে ফেরেন ১৯২৪-এ নবীনচন্দ্র সেনের ‘রৈবতক’ নাটক দিয়ে।
রাজবালা সামাজিক কাজে এগিয়ে এসেছেন বারবার। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর বন্যার সময় সোনাগাছির মেয়েরা আর্তদের সাহায্যের জন্য খুলেছিলেন ‘ভিখারিনী থিয়েটার’। মঞ্চস্থ হলো নাটক- রিজিয়া। সোনাগাছি উৎসাহ দিল সে যুগের রুপোগাছি রামবাগানকে। ত্রাণ সংগ্রহের জন্য রাজবালার উদ্যোগে স্থাপিত হলো- কাঙালিনী থিয়েটার। পরিবেশিত হলো নাটক- নরমেধ যজ্ঞ। রাজবালা নিজে এই নাটকে সমাপ্তি-র ভূমিকায় অভিনয় করেন। সোনাগাছির মেয়েদের অনুসরণ করে অভিনয়ের আগে লাল পেড়ে গেরুয়া শাড়ি পরে নিজেদের অঞ্চল ঘুরে বন্যাদুর্গতদের জন্য অর্থ পোশাকআশাক সংগৃহীত হতো রাজবালার উদ্যোগে। সংগৃহীত অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী জমা পড়ত বঙ্গীয় বন্যাত্রাণ ভাণ্ডারে।এর কিছুদিন পরে ১৯১০ সালে ‘রামগাবান নারী সমিতি’ নামে এক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরী করলেন রাজবালা। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের তত্ত্বাবধানে ৯১, আপার সার্কুলার রোডে সায়েন্স কলেজে খোলা হয়েছিল বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি। রামবাগান নারী সমিতি রাজবালা দাসীর উদ্যোগে অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী তুলে দেয় সে কমিটির হাতে ১৯শে অক্টোবর, ১৯১২-তে- দেড়শো কেজি চাল, ত্রিশটি নতুন কাপড়, দুশো চৌষট্টিটি পুরোনো কাপড়, নব্বইটি জামা, দু’টি র্যাপার। এছাড়া সাত কিস্তিতে প্রায় ন’শো ছিয়ানব্বইটি শাড়ি, একশো নব্বইটি জামা ও অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রীও জমা দেওয়া হয় বঙ্গীয় রিলিফ ফাণ্ডে। মায়ের সঙ্গে রামবাগান সেবা সমিতির এইসব সমাজকল্যাণমূলক কাজে এগিয়ে এসেছিলেন মেয়ে ইন্দুবালাও। ১৯২২ সালে ২৬শে নভম্বর যুগান্তর পত্রিকার বিজ্ঞাপনে মেলে রামবাগান সেবা সমিতির সমাজ কল্যাণের খবর-
উত্তরবঙ্গের বন্যা পীড়িতের সাহায্যের জন্য রামবাগান নারী সমিতি কর্তৃক কাঙালিনী থিয়েটার। স্টার রঙ্গমঞ্চ। অদ্য সোমবার ৪ঠা অগ্রহায়ণ ২০শে নভেম্বর রাত্রি ৮টায় । ১। নরমেধ যজ্ঞ ২। ভিক্ষাদান ৩। নির্ধারিত নৃত্যগীত ৪। রেশমী রুমাল।
বেঙ্গল রিলিফ ফাণ্ড ভূয়সী প্রশংসা করে জানাল- ‘গতাকালও তাহারা স্টার থিয়েটারে অভিনয়লব্ধ ১৭০০ টাকা প্রদান করিয়া দেন। এ’স্থলে ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, অভিনয়ের জন্য যে ৪১০ টাকা ব্যয় হইয়াছে তাহা শ্রীমতী ইন্দুবালা দাসী একাই স্বয়ং দান করিয়াছেন।‘ ইন্দুবালার বয়স তখন তেইশ বছর এবং তিনি সঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতার পরও নারী সমিতির সেবামূলক কাজের ধারা অব্যাহত ছিল।
২৩ নং ওয়েলিংটন স্ট্রিটে সে সময়ের শিল্পীরা গড়ে তুলেছিলেন বেঙ্গল আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, যেখানে ছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, পঙ্কজ মল্লিক, মন্মথ মিত্রর মতো কিংবদন্তী শিল্পীরা। ইন্দুবালা এই অ্যাসোসিয়েশনের সভ্যা হিসেবে আগ্রণী ভূমিকা নিতেন সমাজসেবামূলক কাজে, যার শিক্ষা পেয়েছিলেন মা রাজবালার কাছে।
কাঙালিনী থিয়েটার দলের পর রাজবালা গড়ে তোলেন ‘দি রামবাগান ফিমেল কালী থিয়েটার’, মেয়েদের নিয়ে প্রথম পেশাদারী নাট্যদল। সে নাট্যদলে দানীবাবুর শিষ্য যোগীন্দ্রনাথ সরকার নির্দেশনার কাজে সাহায্য করতেন। ১৯১২ সালে মনমোহন থিয়েটার হলে পরিবেশিত হয় বিল্বমঙ্গল ও হীরের ফুল। এছাড়াও কলকাতায় এবং কলকাতার আশেপাশে অভিনীত হয়েছে একাধিক নাটক- রেশমি রুমাল, আলিবাবা, পরদেশী ও চন্দ্রগুপ্ত। রামবাগানের এই মহিলা নাট্যদলের বিজ্ঞাপনে থাকত যোগীন্দ্রনাথের নাম কারণ সে যুগে নাটককে ঘিরে যে সাংস্কৃতিক কৌলীন্য, তা রামবাগানের মেয়েদের নামে যায় না, ঝুঁকি থাকে, রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষু সর্বদা সজাগ। সমাজের গেল গেল রব উপেক্ষা করেই এই নাট্যদল দু’বছর টিকেছিল এবং বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
সার্কাস, সঙ্গীত এবং নাটকের অঙ্গনে অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা রাজবালা ছায়াছবির জগতেও স্বমহিমায় ভাস্বর। একটিমাত্র ছবি করেছিলেন, বাংলা ও হিন্দি ডাবল ভার্সানে – ‘রাতকানা’। ১৯৫৩ সালের ৩রা অগস্ট রূপবাণীতে মুক্তি পায়। বিরতিতে দর্শকদের জলযোগ করানো হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় রাজবালার অভিনয় প্রশংসিত হয়। গায়িকা হিসেবে ইন্দুবালার তখন ভারতজোড়া খ্যাতি। রাতকানার ফিল্ম রিভিউয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা রাজবালাকে ইন্দুবালার মা বলে উল্লেখ করে। আজকাল পত্রিকা লেখে- কালো বৌ-এর ভূমিকায় ইন্দুবালার মাতা ভালো।
স্বল্প দৈর্ঘ্যের অভিনয় জীবন থেকে অবসর নিয়ে সংসার ও সঙ্গীত নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন রাজবালা বাকি জীবনটা। চুরাশি বছর বেঁচে ছিলেন। স্বামী মতিলাল বসুর বিখ্যাত পরিবারের পারিবারিক স্বীকৃতি না পাওয়া রাজবালা, সার্কাসের ট্রাপিজের দড়িতে জীবন শুরু করে অদম্য লড়াই, জেদ নিয়ে রঙ্গমঞ্চ, সঙ্গীত থেকে সার্কাসজীবনে অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। সময়ের দলিলে অনুল্লিখিত উপেক্ষিত রয়ে গিয়েছেন, না সঙ্গীত চর্চার, না রঙ্গমঞ্চের, না সার্কাসের তাঁবুর ইতিকথায়। কোথাও তাঁর উল্লেখ বিশেষ নেই। কিন্তু তাঁর সংগ্রামের কথা না বললে বাঙালির সার্কাসের ইতিকথা পূর্ণতা পায় না।
(ক্রমশ)
