খড়কুটোর জীবন : ঝড়ের পাখি। পর্ব ১৮। লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

ঝড় এলেই ঠাকুমা বারান্দা থেকে একটা কাঠের পিঁড়ি নামিয়ে দিতেন উঠানে। তারপর ক্ষুদ ছড়িয়ে দিয়ে বলতেন — ‘ হে পবন, স্থির হও, ক্ষুদ খাও, পিঁড়িতে বসো। ‘ আমরা ঠাকুমার সঙ্গে গলা মেলাতাম। দমকা বাতাস বৃষ্টির ফোঁটা এনে ভিজিয়ে দিতো ঘর-বারান্দা। পুঁই মাচাটা দুলতো ক্রমশ। সবুজ পাতাগুলো বেয়ে গড়িয়ে যেতো জল। বারান্দায় গুটিসুটি বসে দেখতাম ঝড়ের মাতন। দূরের অশ্বত্থ গাছটা ক্রমাগত মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতো ঝড়ের আবেদনকে। ঝড়ে উড়ে এসে উঠোন জুড়ে বসতো ছিন্ন পাতা, আহত ডালপালা। পাখির বাসা ভেঙে পড়তো উঠানের নিম গাছ থেকে। কখনো পাখির ডিম বা ছোট্ট ছানাগুলো গড়াগড়ি খেতো উঠানে। মা পাখির আর্তরব মিলিয়ে যেতো ঝড়ের সোঁ সোঁ আওয়াজে। কলা গাছের পাতাগুলো ছিঁড়ে এক্কেবারে হাওয়া হাওয়া হয়ে যেতো। ঝড়-বৃষ্টি থামতেই আবার ঝকঝকে আকাশ। ঘর থেকে নেমে যেতাম উঠানে। পাখির ছানাগুলো কে বিড়ালের মুখ থেকে বাঁচিয়ে আবার বাসা সহ তুলে দিতাম নিম গাছের ডালে। মা উঠান ঝাঁট দিতে শুরু করতো। পাটকাঠির বেড়া দেওয়া রান্না ঘর বৃষ্টি ভেজা। ধানের তুষ ছড়িয়ে শুকনো করে দিতো ঠাকুমা। জ্বালানি গুলো ভিজে একশা । দুপুরের জ্বলন্ত উনান ঝড়ের সময় নাদা দিয়ে ঢাকা থাকতো। ঝড় শেষে সেই ঢাকা খুলে ভিজে যাওয়া ঘষিগুলো উতো দিয়ে শুকিয়ে নেওয়া হতো রাতের রান্নার জন্য।

মাঝে মাঝে ঝড়ের শেষে বাড়ি থেকে পাড়ায় বার হয়ে যেতাম। দেখতাম বাঞ্ছা দাদুর খেজুর গাছের খেজুর গুলো শেষ বিকেলের মেঘ ভাঙা রোদে চক চক করছে। মনসিজ আর চিটে গাছের বেড়াটা পথের দিকে হেলে পড়েছে। একটু গিয়েই তেমাথাতে দেখতাম নেঙ্টি কাঁসারির  বিশাল বিশাল তাল গাছে ঝুলে থাকা বাবুই পাখির বাসাগুলোর অনেকগুলিই মাটিতে পরে। আমরা সেগুলো কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে এসে বাতায় ঝুলিয়ে রাখতাম। অবাক হয়ে দেখতাম অপূর্ব সেই শৈল্পিক নিদর্শন। ঘরের চালের খড়ের ফাঁকে বাসা বানাতো চড়ুই-এর দল। সারাদিন লেগে থাকতো তাদের কিচির-মিচির। তাড়ালেও যেতো না। গোলার মধ্যে থাকা ধান গুলো খেয়ে তুষ বানিয়ে দিতো। উঠানে মা বেদে পাটি বিছিয়ে ধান, গম বা কোনো শস্য মেলে দিলে ঠাকুমা আর আমি বসে যেতাম চড়ুই তাড়াতে। ছাগল, হাঁস, মুরগী বা শালিকের দলকেও তাড়াতে হতো। বিড়াল আর চড়ুই-এর ঝাঁকের লুকোচুরি চলতো সমানে। কাকা বাবুই আর চড়ুই-এর কথোপকথন নিয়ে ‘স্বাধীনতার সুখ’ বলে একটা ছড়া বলতো —
“কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই;
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা ‘পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”
বাবুই হাসিয়া কহে- “সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়;
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।” আজ বুঝি নিজের ঘরে থাকার সুখ কাকে বলে।

গ্রাম থেকে একটু দূরেই পিচ ঢালা বাস রাস্তা। রাস্তার দুদিকে অর্জুন, সুবাবুল,সেগুন, ইউক্যালিপটাস আর রাধাচূড়া -কৃষ্ণচূড়ার সাড়ি। ঝড়ে ভেঙে পড়তো তাদের শুকনো ডালপালা। জ্বালানির জন্য সেগুলো টানতে টানতে বাড়ি নিয়ে যেতো অনেকেই। তবে কৃষ্ণচূড়াকে বাকল খসিয়ে অর্জুন কিছু বলতো কিনা জানিনা। রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা পাখির পালক, ছিন্ন বুনো ফুল, পাতা প্রভৃতি থেকে বোঝা যেত যুদ্ধের শেষে যেন কোনো দেশ। মাঠের দিকে তাকালেই দেখা যেতো পাটের ক্ষেতে নুইয়ে পড়া পাট গাছ। সারা প্রকৃতিকে মনে হতো রতিক্লান্ত রাধিকা।

গ্রামের ভিতরে দেখতাম কারো খড়ের চালের মটকা উড়ে গেছে। কারোর চালের টিন উড়ে গিয়ে পড়েছে অন্য কোথাও। কোথাও চাল উড়ে গিয়ে মাটির দেওয়াল বার হয়ে গেছে। এলোমেলো সব। কারোর ঘর নিকানো ন্যাতা অন্য কারোর বাড়িতে উড়ে গিয়ে পড়েছে সেই নিয়ে ঝগড়া। কার গাছের আম অন্য কেউ কুড়িয়েছে, সেই আম আবার পাড়ায় বিক্রি করেছে -এসব নিয়ে ঝড়ের শেষে আর এক ঝড় উঠতো গ্রামে। চারু ঠাকুমা কাঁদতে শুরু করতো কেননা তার গোলার টিনের চালের মটকাতে টিন দিয়ে যে মোরগ বানানো থাকতো তা প্রতি ঝড়েই দুমড়ে যেতো। তিনি ততক্ষণ কেঁদে চলতেন যতক্ষণ না কেউ মই লাগিয়ে চালের উপর উঠে মোরগের ঝুঁটি আর লেজ সোজা করে দিচ্ছে। এই মোরগ ছিলো ঠাকুমার বড্ড সখের। বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা ছোটোরা কখনো মুখে মোরগের মতো ক-ক-কর-ক আওয়াজ করলেই ঠাকুমা বুঝতে পারতেন সে ডাক তার উদ্দেশ্যে। তিনি আমাদের উদ্দেশ্য বাতাসে ভাসিয়ে দিতেন কিছু অপশব্দ। আমরা মুগ্ধতার হাসি ছড়াতে ছড়াতে চলে যেতাম । অন্য সময় এই ঠাকুমাই আমাদের হাতে দিতেন আমের বা কুলের আচার বা নারকেল নাড়ু।

আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন আমাদের পুরাতন পাকা বাড়ি ছাড়তে হয়। আমরা তিন ভাই, মা আর বাবা। আমাদের আশ্রয় হয় পথের ধারে একটা টালি দেওয়া মাটির দেওয়ালের ঘরে। ঝড় এলে আমি ভীষণ ভয় পেতাম। বাবা কাজে বাইরে থাকতো। ঝড়ের সময় মা আমাদের তিন ভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঠের চৌকির নীচে বসে থাকতো। আমরা ভয়ে চোখ বুজে সে প্রলয় পেরিয়ে যেতাম। ঘরের মধ্যে সব ধূলিধূসরিত হয়ে যেতো। ঝড় থামতেই শুরু হতো সে সব ঝাড়াঝাড়ি। চাল বেয়ে বৃষ্টি পড়তো যে সব স্থানে সেগুলোতে বাটি ঘটি বসিয়ে রাখা হতো। যাতে ঘর কাদা না হয়। পরে সেই সব জল ফেলে দেওয়া হতো। ঝড়-বৃষ্টির রাতে লম্ফর আলোয় এসে হাজির হতো বাদলা পোকার দল। ভাতে-জলে একাকার হয়ে যেতো সে পোকা। মাঝে মাঝে থালায় জল দিয়ে তার মাঝে বসিয়ে রাখা হতো লম্ফ। আলোর লোভে সে পতঙ্গ এসে মরতো থালার জলে। সমস্যা হতো মাঝ রাতে ঝড়-বৃষ্টি এলে। ঘুম চোখে বিছানা গুটিয়ে বসে থাকতে হতো সারারাত। তবে মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙতো না। শীতল হাওয়ায় ছেঁড়া কাঁথার উষ্ণতায় স্বপ্নের দেশে হারিয়ে যেতাম। তখন শুধু ভাবতাম বড়ো হয়ে কাজ করবো। কাজ করে উপার্জিত অর্থে সবার আগে পাকা বাড়ি বানাবো। মায়ের চোখে শুধু বৃষ্টি আর বাবার বুকে যে ঝড় সেদিনগুলিতে দেখতাম তা আজো স্পষ্ট মনে আছে।

( ক্রমশ)

+ posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *