কাগজের নৌকো। পর্ব ৪। ধারাবাহিক উপন্যাস। লিখছেন সায়ন্তন ঠাকুর

গত পর্বের পর…

সাদা রুমালটি বাম হাত থেকে নামিয়ে নিজের কোলের উপর রেখে সরোজ দেখল আসিফ লেগ স্টাম্প গার্ড নিয়েছে, সামান্য অবাকই হল যুবক, সাধারণত আসিফ মিডল স্টাম্প গার্ড নেয় অথচ আজ এরকম গার্ডের কারণ ঠিক বুঝতে পারল না, যেখানে অফ সাইডে চক্রবূহ্য সাজিয়েছে অবিনাশ, তাহলে কি অফে অন-এয়ার শট খেলতে চাইছে আসিফ? বছর কুড়ির সরোজের মুখে মৃদু হাসি ক্ষণিকের জন্য ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল, আসিফ সাধারণত ‘অন দ্য রাইজ’ খেলে, সে-কথা মাথায় রেখে অবিনাশ নিশ্চয় তাকে আউটসুইং দেবে, নতুন বল তার উপর এরকম ঝিরিঝিরি বাতাসের গতি কাজে লাগিয়ে আসিফকে শট নিতে বাধ্য করতে পারলেই আউটের সম্ভাবনা প্রবল আর আসিফের দ্রুত ফিরে যাওয়ার অর্থই হল টাউন ইস্কুলের হার প্রায় নিশ্চিত। গ্যালারির মিডল টিয়ারে পাশে বসা একজন অল্পবয়সী ছেলে উত্তেজিত গলায় সরোজকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ আসিফদার স্টান্স একটু আলাদা মনে হচ্ছে না?’

চোখ থেকে কালো রোদ-চশমা নামিয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল সরোজ, ‘দেখা যাক কী হয়!’

কথাটি বলেই মুখ তুলে আকাশের পানে চাইল একবার, কাজলকৌটোর পুরাতন অভিমানের মতো মেঘ আলতো বাতাসে ভেসে উত্তরপথে চলেছে, অদূরে দেবদারুবীথির আঙিনা সেই মেঘছায়ায় অস্পষ্ট, দু-একটি আনমনা সাইকেল গোপন ইশারার মতো ঘণ্টি বাজিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ইস্টিশানের দিকে, মুহূর্তের জন্য তিন বৎসর পূর্বের দিনটি সরোজের মনে পড়ল, সেদিনও এমন পৌষ মাসে আলো মুছে মলিন হয়ে এসেছিল জগত, বড়ো রাস্তায় কখন যে অতিকায় ট্রাক পেছন থেকে সাইকেল স্পর্শ করে…সাদা ফুলহাতা জামার নিচে নিজের শীর্ণ বাম হাতটি একবার দেখল সরোজ, কনুই থেকে কবজি অবধি সাদা হাড় বেরিয়ে এসেছিল, অজ্ঞান হওয়ার আগের মুহূর্তে সেই শ্বেতশুভ্র অস্থি যুগল দেখে সরোজের মনে হয়েছিল কোনও কিশোরী বৃষ্টিভেজা শাপলা ফুলের মতো আঙুল তুলে তাকে নিদ্রা দেবীর কুহকিনী মায়া ভুবনে নিয়ে যেতে চাইছে, সাপের বিষের সুবাসে দোলা লেগেছে আবছা চরাচরে, যেন বলে চলেছে, এখানে থেকো না, থেকো না, চলো আমার সঙ্গে, নীল কুসুমের দেশে, চলো!

নিচু হয়ে ক্রাচটি তুলে তার উপর ভর দিয়ে গ্যালারির মাঝে উঠে দাঁড়াল সরোজ, শুধু হাত নয়, সেই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় টাউন ইস্কুলের বামহাতি প্রতিভাবান ব্যাটসম্যানের ডান পায়ের গোড়ালি থেকে সম্পূর্ণ পাতাটি কেটে বাদ দিতে হয়েছিল, অবিনাশ লাল টুকটুকে বল হাতে রান-আপের দিকে যাচ্ছে, প্রায় অকেজো বাম হাত তুলে সাদা রুমালটি আবার বাতাসে ভাসিয়ে দিল সরোজ, আজ ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে, সাদা ধপধপে জামা প্যান্ট, একখানি ভি-গলা হাফহাতা ঘি-রঙা সোয়েটার, একমাথা চুলের উপর অভিজ্ঞানের মতো আটকে আছে সবজে গলফ-হ্যাট, পুরনো দীঘির ঘাটের শ্যাওলা মাখা নরম দাড়ি মুখখানিকে মায়াচ্ছন্ন করে তুলেছে, রুমাল নামিয়ে বসার সময় ক্ষণিকের জন্য ভাবল ইস্কুলের হয়ে যদি আজ খেলতে পারতো, বাম হাতি ব্যাটই সামলাতে পারে এমন গনগনে পেস, পরমুহূর্তেই মনে হল, থাক, কী হবে হার-জেতায়, ক্রিকেট মানে তো শুধু হার বা জিত নয়, ক্রিকেট হল আসলে প্রথম প্রেমের কুসুম সুবাস, এই যে মেঘাবৃত চরাচর, বাতাসে ভাসছে আসন্ন দ্বৈরথের ইশারা, একজন কিশোর বামহাতি বোলার আর প্রায় বাংলা দলের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা ডানহাতি ব্যাটসম্যানের যে হার-না-মানা লড়াই, ওই যে ছায়াময় দেবদারু গাছের সারি, ইস্টিশানের দিকে চলে যাওয়া মধ্যবিত্ত রিকশা, অদূরে গ্যালারির এককোণে অবিনাশের জন্য একরাশ উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে বসে থাকা হলুদ কার্ডিগান পরা প্রজাপতির মতো চঞ্চলা কিশোরী শবনম-এর থেকে বড়ো ক্রিকেট আর কী হতে পারে! দুচোখে ঘুম জড়ানো এই নিঝুম মফস্বলের অধিক মধুর খেলা জগতে আর কিছুই নাই!

বোলিং মার্কে ফিরে যাওয়ার পথে অভ্যাসবশেই নতুন বলের চকচকে দিকটি দুই আঙুলে সামান্য মুখের লালা নিয়ে ভালো করে ঘষার সময় অবিনাশ একমুহূর্তের জন্য আসিফের স্টান্স চিন্তা করল, লেগ স্টাম্প গার্ড মানে অফ সাইডে শট নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি অর্থাৎ উত্তেজিত করার সুযোগ থাকছে! পলকের জন্য হাসি ফুটে উঠল অবিনাশের মুখে, গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দেখল সেই সাদা রুমালটি সমুদ্রে ভেসে যাওয়া ক্ষীণকায় নৌকোর পালের মতো উড়ছে মেঘ-বাতাসে, সরোজদা কয়েকমাস আগে সন্ধ্যায় মাঠ থেকে ফেরার পথে একজন বোলারের গল্প করেছিল-হ্যারল্ড লারউড,নটিংহ্যামশায়ারে কাউন্টি খেলত, খনি শ্রমিকের ছেলে, বডি লাইন সিরিজের পর উনিশশো চৌত্রিশ সালে এমসিসি কমিটির পক্ষ থেকে যখন তাকে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হল লারউড কোনওভাবেই রাজি হয়নি, প্রবল চাপের মুখে পড়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিতেও বাধ্য হয় তখনই, গল্পটি শেষ করে সামান্য হেসে সরোজদা তাকে বলেছিল, জানিস অবিন, লারউডের মতো আত্মসম্মানবোধ প্রত্যেক প্লেয়ারের থাকা উচিত!

মুখ ফিরিয়ে বলের চকচকে দিকটি নিজের ডানদিকে রেখে সিমের উপর তর্জনি আর মধ্যমা সামান্য একপাশে রেখে আলতো করে ধরল লাল বলটি, মণিবন্ধ পাখির পালকের মতো নমনীয়, এক মুহূর্তের জন্য গতকাল সন্ধ্যায় বাড়ির উঠানে দুজন পাওনাদারের কটুকথার সামনে লণ্ঠনের মলিন আলোর মতো বাবার মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি মন অন্তরমহলে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল, চোখ সরু করে দেখল অদূরে ক্রিজে মাথায় হেলমেট না পরে একখানি পানামা হ্যাট চাপিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আসিফ, দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটি চেপে অস্ফুটে আসিফকে যেন বলল, তুই-ই দায়ী, তোদের জন্যই লারউডকে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল!

জনমানবপূর্ণ গ্যালারি সহ মঞ্চের উপর থেকে অমিত আর বাংলার নির্বাচক সুশীল সমাদ্দার দেখলেন একটি অতিকায় শার্দূল শুরু করল তার ছন্দোময় দৌড়, উত্তরপথগামী বাতাসের নৌকোয় চেপে নতুন বল মিডল স্টাম্পে গুড লেংথ স্পট স্পর্শ করে মহানন্দার বুকে উড়ে যাওয়া সাদা বকের মতো পাখা মেলে উড়ে গেল উইকেট কিপারের দিকে, নিপুন জাদুকরের জাদুদণ্ড দেখানোর ঢঙে আসিফ শেষমুহূর্তে ব্যাট আলতো করে তুলে নিয়ে ফলো থ্রুয়ে ছুটে আসা অবিনাশের চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারল একটি শতাব্দী প্রাচীন মৃত আগ্নেয়গিরি ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে, পরক্ষণে মাথা নিচু করে নিজেকে শুনিয়েই বলল, কনসেনট্রেট আসিফ, কনসেনট্রেট।

চোখ থেকে চশমা খুলে সুশীল সমাদ্দার অমিতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘উইকেটে এত ঘাস কেন?’

সামনে রাখা কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে অমিত সামান্য হেসে বললেন, ‘আমাদের ছেলেরা যেন ছোট থেকেই পেস সামলাতে পারে সে-কথা ভেবেই বোধহয় ঘাস রেখেছে!’

— আচ্ছা এই আসিফ ছেলেটি হেলমেট পরে না?

সুশীলবাবুর দিকে তাকিয়ে অমিত কৌতুকের স্বরে বললেন, ‘আপনি জানেন না? ওর ফেভারিট ব্যাট বোধহয় ভিভ রিচার্ডস!’

অমিতের কথা শুনে সুশীলবাবু আর কোনও কথা না বলে গম্ভীর মুখে চশমাটি রুমালে মুছে চোখে পরে সামনে মাঠের দিকে তাকালেন।

পরের দুটি বলও একই স্পটে রেখে আউটসুইং করল অবিনাশ, শেষ বলটি ব্যাটের ফেস ওপেন করে থার্ডম্যানের দিকে পাঠাতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে আসিফ নিজেকে সংবরণ করল, ওভারের শেষে স্কোরারের কালো বোর্ডে টাউন ইস্কুলের স্কোর দাঁড়াল শূন্য রানে এক উইকেট।

বোলিং চেঞ্জের সময় সরোজ পাশে বসা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আসিফের ব্যাটিং দেখলে?’

ছেলেটি সামান্য উত্তেজিত গলায় বলল, ‘ব্যাটিং কোথায় দাদা, আজ তো সারা মাঠ শুধু অবিনাশদার বোলিং দেখল!’

মৃদু হাসি সরোজের মুখে ভেসে উঠল, ‘কেন চার-ছয় না হলে বুঝি ব্যাটিং হয় না?’

অল্পবয়সী ছেলেটি টাউন ইস্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্র, এমন অদ্ভুত কথা কখনও শোনেনি, অবাক হয়ে সরোজের মুখের দিকে চেয়ে রইল।

ছেলেটির অবাক চাউনি দেখে সরোজ নরম স্বরে শুধোল, ‘তুমি ক্রিকেট খেলো?’

— হ্যাঁ, নাইন সি-সেকশন থেকে এবার ইস্কুলের জুনিয়র টিমে চান্স পেয়েছি!

— বাহ! বল না ব্যাট?

লাজুক হেসে ছেলেটি উত্তর দিল, ‘ব্যাট করি, তবে নিচের দিকে!’

‘ব্যাটিং-এ নিচ বা উপর বলে কিছু হয় না, ভালো লাগে কিনা সেইটা বড়ো কথা।’, মাঠের দিকে একপলক তাকিয়ে দেখল নতুন বল নিয়ে পার্থ বোলিং রান-আপের দিকে হাঁটছে, বোলিং চেঞ্জে পার্থকে দেখে একটু অবাক হল সরোজ, পাশের ছেলেটিকে অন্যমনস্ক গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কী?’

— তন্ময় ঘোষ।

মাঠে চোখ রেখেই সরোজ শুধোল, ‘সুরবালার ফার্স্ট চেঞ্জ বোলার দেবব্রত না?’

তন্ময় অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, দেবুদা আর অবিনাশদাই তো ওপেন করে!’

মাঠের দিকে আঙুল তুলে সরোজ পার্থকে দেখাল, ‘তাহলে আজ পার্থ এল যে!’

মাঠের দিকে চোখ ফিরিয়ে পার্থকে বোলিং রান-আপে যেতে দেখে তন্ময় বলল, ‘ও তো আমাদের ব্যাচের! হারাধন বাবুর কাছে প্রাইভেট পড়তে আসে।’

— নাইনে পড়ে?

— হ্যাঁ, যা জোরে বল করে, ওর সামনে আমরা মাঠে দাঁড়াতেই পারি না!

তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল সরোজ, ‘শুধু জোরে বল করলেই তো হবে না ভাই, আসল কথা হল লাইন আর লেংথ, সিম সোজা রাখতে না পারলে হাজার জোরে বল করলেও কোনও লাভ নেই!’

— না গো দাদা, লাইনও ভালো। ও তো আমাদের থেকে একবছরের সিনিয়ার!

সামান্য বিস্মিত হল সরোজ, ‘তবে যে বললে তোমাদের ব্যাচের!’

— এবছর ফেল করেছে তো! ওর বাবা মারা গেল না গতবছর, লেদ মেশিন কারখানা বন্ধ হয়ে ঘরে বসে ছিল ছমাস তারপর গেলবার পুজোর সময় সুইসাইড, বডি ঝুলছিল ফ্যানে।

রোদচশমা খুলে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে সরোজ নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘তাহলে ওদের চলে কী করে?’

— ওর মা এখন লোকের বাড়ি কাজ করে, ওতেই কোনওরকমে চলে।

পার্থর হাতে বল তুলে দিয়ে অবিনাশ শুধোল, ‘ফিল্ড কী নিবি?’

দু-এক মুহূর্ত চিন্তা করে পার্থ বলল, ‘তিনটে স্লিপ, একটা থার্ডম্যান দাও আর বাকি তুমি যেমন বলবে।’

— গালি, কভার, একস্ট্রা কভার, মিড-অফ, মিড-অন নে আর একটা ডিপ পয়েন্ট দিই?

অবিনাশের মুখের দিকে তাকিয়ে সামান্য ইতস্তত করে পার্থ বলল, ‘ডিপ পয়েন্ট না রেখে আমাকে একটা ডিপ স্কোয়ার দাও, সঞ্জয় মাঝে মাঝে পুল করে।’

— পুল করার মতো বল দিবি কেন, অফ স্টাম্পে রেখে বল করে যা, হাওয়া আছে, সিম সোজা রাখতে পারলে এমনিই সুইং করবে।

বলের চকচকে দিকটা সামান্য ঘষে পার্থ মাথা নিচু করল, ‘ঠিক আছে, ডিপ পয়েন্টই রাখো।’

পার্থর কাঁধে হাত রেখে অবিনাশ কেটে কেটে স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, ‘কাকুর বডি সিলিং থেকে নামানোর সময় আমি ছিলাম, গলা লম্বা হয়ে চোখ দুটো বেরিয়ে এসেছিল, ভুলে যাসনি নিশ্চয়, সেই একটা চোখ এখন তোর হাতে, এই লাল বল।’, এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর দৈববাণীর মতো শোনাল অবিনাশের কণ্ঠস্বর,’সঞ্জয়কে উড়িয়ে দে!’

সেদিন পার্থর চোখ দুটির কথা আজও ভুলতে পারেনি অবিনাশ, খর চৈত্রে ধূ ধূ শীর্ণা নদী চরের মতো শুষ্ক, কোনও কিশোরের ওইরকম ভাবশূন্য মরা চোখ যে হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বলের সিমে ডান হাতের আঙুল রেখে পার্থ নির্বিকার গলায় বলেছিল, ‘কিছু খেয়ে আসিনি, টাউন ইস্কুলকে তাড়াতাড়ি গুটিয়ে দিলে ডিম-কলা আর পাউরুটি খেতে পাব, তুমি চিন্তা করো না।’

বামদিকের গ্যালারির মাঝে সুতপা মুখটি শবনমের কানের কাছে এনে আহ্লাদি গলায় বলল, ‘কী বল করল রে তোর অবিন!’

কিশোরী শবনমের মরশুমি ফুলের মতো রেশম চুলের গোছা ঘাড় অবধি এসে জলপ্রপাত হয়ে যেন থমকে গেছে, হলুদ কার্ডিগান আর নীল সালোয়ার কামিজে যেন পাখা মেলেছে সহস্র প্রজাপতি, শীত সকালের আলতো রৌদ্রের মতো চোখ দুটি তুলে সুতপার দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় উত্তর দিল, ‘জানি।ওর নাম অবিনাশ, অবিন নয়।’

— বাব্বা! হয়েছে! তোর প্রেমিককে কেউ কেড়ে নিচ্ছে না।

কানে জোনাকির মতো এককুচি হীরের কানের দুলে হাত দিয়ে শবনম নির্বিকার স্বরে বেজে উঠল, ‘ও কি আমার ঝুমকোলতা যে কেউ কেড়ে নেবে!’

সুতপা গায়ে পাতলা মুগার চাদরখানি ভালো করে জড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘তোর যেন কী হয়েছে, আজকাল একটু ইয়ার্কিও বুঝিস না।’

— আমার জায়গায় থাকলে তুইও বুঝতিস না।

শবনমের হাতের উপর নিজের হাতটি আলতো রেখে সুতপা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন রে, আবার কিছু হয়েছে বাড়িতে?’

মাথা নিচু করে হাতব্যাগ থেকে দামি বিদেশি রোদচশমা নিয়ে চোখদুটি গোপন করে বলল, ‘এখানে মুসলমানের ঘরে জন্মালে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, তুই বুঝবি না।’

আশপাশ থেকে অনেকগুলি পুরুষ চোখের দৃষ্টি যে তার কাছে এসে পথ হারিয়েছে সে-কথা ভালো করে জানে শবনম,এই যতিচিহের মতো মফস্বলে তাকে নিয়ে মানুষের কৌতুহলের শেষ নাই- মুসলিম ঘরের মেয়ে বোরখা পরে না, লেডি-বার্ড সাইকেল চেপে জিন্স আর পাতলা টি-শার্ট গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, চিঠি বা গোপন কাগজের টুকরো পেলে ছেলেদের ইস্কুলের হেড স্যারের কাছে অবলীলায় জমা দিয়ে আসে, শুনেছে ছেলেরা নাকি তাকে আড়ালে ‘সাবাতিনি’ বলে ডাকে!

এসব কথা মনে করে আজকাল হাসিই পায় শবনমের, ওড়না দিয়ে মাথা ভালো করে ঢেকে দেখল অবিনাশ যেন এদিকেই চেয়ে রয়েছে, তাকে খুঁজছে কি? একবার ভাবল উঠে দাঁড়িয়ে হাত নাড়বে পরক্ষণেই মনে হল থাক, লাঞ্চব্রেকে দেখা হওয়াই ভালো। ঘন মেঘনীল টুপি মাথায় পরে মিড অফে দাঁড়িয়ে আছে অবিনাশ, ভারি মানিয়েছে টুপিটা, নাইকির এই টুপি আর খুব হাল্কা বোলিং শু গত শীতে বাবার কাছে আব্দার করায় নিউইয়র্ক থেকে পাঠিয়ে দিয়েছিল শবনমকে, শয়তান ছেলে মনে খুশি হলেও মুখে বলেছিল, শেষে আমাকেও টুপি পরালি!

পার্থর প্রথম বল ইনসুইং ইয়র্কারটি ব্যাট না প্যাডে লাগল সঞ্জয় নিজেও ভালো বুঝতে পারেনি, এগারোজন সমস্বরে চিৎকার করে উঠতেই গ্যালারি জুড়ে ভ্রমরের মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল, আম্পায়ার বিকাশ প্রসাদ গম্ভীর মুখে ঘাড় নেড়ে আবেদন নাকচ করলেন। পরের বল সামান্য শর্ট, সিম সম্ভবত সোজা মাটি স্পর্শ করেনি, পুশ করে মিড-অফের দিকে পাঠানোয় টাউন ইস্কুলের স্কোর হল এক উইকেটে এক।

স্টান্স নিয়ে আসিফ দাঁড়াতেই সামান্য চঞ্চল হল গ্যালারি, মঞ্চে সোজা হয়ে বসলেন সুশীল সমাদ্দার, নিঁখুত আউটসুইং কিন্তু আসিফ কেন প্রতিভাবান তা বোঝা গেল, বল উইকেট কিপারের কাছে যাওয়ার আগেই ব্যাকফুটে জায়গা নিয়ে ইচ্ছাকৃত ব্যাটের ফেস ওপেন করা

প্রচণ্ড জোর আঘাতে থার্ডম্যানের মাথার উপর দিয়ে গ্যালারির দিকে উড়ে গেল, প্রথম ছয়!

মিড অফে অবিনাশের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হওয়ায় মৃদু হাসল আসিফ।

চতুর্থ বলটি সামান্য শর্ট, মিড-অফ আর মিড-অনের মাঝখানের পথে একটি অলৌকিক সরলরেখা রচনা করে সবুজ মলমলের উপর দিয়ে লাল বল বাউন্ডারির দিকে নিমেষে মিলিয়ে গেল, আসিফের ফলো থ্রু হল দেখার মতো, ব্যাট-পা-শরীর একই রেখায় যেন প্রখ্যাত বেহালা বাদক ছড় টেনে মুহূর্তের জন্য একটি অপরূপ সুরঝঙ্কার সৃষ্টি করলেন। নিজের অজান্তেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলেন অমিত,অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘অবিকল গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ!’

মিড-অফ থেকে এগিয়ে পার্থর কাঁধে হাত রেখে অবিনাশ জিজ্ঞাসা করল, ‘গ্রিপ পাচ্ছিস না?’

হতভম্বের মতো মাথা নাড়ল পার্থ, মুখে অবিশ্বাসের ছায়া, ‘এই বল কেউ এভাবে মারতে পারে!’

‘পারে, আসিফ পারে। তুই অফস্টাম্পের উপর রেখে আউটসুইং দে, অন দ্য রাইজ প্লেয়ার, ওকে কভার ড্রাইভের টোপ দেখিয়ে বাধ্য কর শট খেলতে, ওটাই একমাত্র উপায়।’, এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ফের বলল, ‘গ্রিপ দ্যাখ আসিফের, বটম হ্যান্ড, ভুল ও করবেই, তুই একই স্পটে বল রাখ।’

বলল বটে মুখে কিন্তু অবিনাশ নিজেও খুব ভালো করে জানে সেট হয়ে যাওয়া আসিফকে আউট করা প্রায় অসম্ভব, কয়েক ওভার পর বলের পালিশ উঠে গেলে পুরনো বলে দিগবিজয়ী সম্রাটের মতো বাইজ গজ শাসন করার ক্ষমতা রাখে আসিফ মোহাম্মদ!

অবিনাশের অনুমান সত্য হল, পঞ্চম আর ষষ্ঠ বল ঝিমঝিম বাতাসকে কাজে লাগিয়ে আউটসুইং- অবিকল কপিবুক আউটসুইং, তবে আসিফও প্ররোচনায় পা না দিয়ে বিনা দ্বিধায় ব্যাট তুলে নিল।

দু-ওভার শেষে টাউন ইস্কুল এক উইকেটে এগারো।

তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে সরোজ বলল, ‘দেখলে, এই শেষ দু’বলে ব্যাট তুলে নিতে পারার শিক্ষাই আসল ক্রিকেট।’

উত্তেজিত শোনাল তন্ময়ের গলা, ‘আর স্ট্রেট ড্রাইভ? ওইভাবে ব্যাকফুটে জায়গা তৈরি করে থার্ডম্যানের ওপরের শট? সেইটা ক্রিকেট নয়?’

রোদ চশমা খুলে দু-এক মুহূর্ত মাঠের দিকে চেয়ে রইল সরোজ, তারপর নরম গলায় বলল, ‘ওটাও ক্রিকেট তবে কী জানো হাত-পা হারিয়েও ক্রিজে টিকে থাকার নাম জীবন।চালিয়ে খেলে ফতুর হওয়াকে বেঁচে থাকা বলে না!’

পরের ওভারে অবিনাশকে বল হাতে রান-আপে যেতে দেখে সমাদ্দার অমিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এবার খেলা জমবে!’

প্রথম বল ইনসুইং, সঞ্জয় স্কোয়ার লেগে পাঠিয়ে স্ট্রাইক দিল আসিফকে, শবনম সোজা হয়ে বসে সুতপার দিকে একবার তাকাল, সুতপা কোনও কথা বলে হাতটি নিজের কোলের উপর নিয়ে আঙুলের আলতো স্পর্শে যেন বুঝিয়ে দিতে চাইল, অবিনাশ পারবে!

বোলিং-মার্কে ফিরে যাওয়ার পথে অবিনাশ দেখল অভ্রান্ত নিশানের মতো উড়ছে সাদা রুমাল, গত সন্ধ্যায় বাবার অপমানিত মুখখানি ক্ষণিকের জন্য মনোপটচিত্রে ভেসে উঠেই পুনরায় মিলিয়ে গেল মহাশূন্যে, আকাশে তখন মরা আলোর নদী দুকুল ছাপিয়ে কোন অদৃশ্য অমরাবতীর পানে ভেসে চলেছে, একটি চিল বহুদূরে নিঃশব্দে মেলে দিয়েছে তার পাখা, অবিনাশের দৌড়ের সঙ্গে সমস্ত গ্যালারি স্তব্ধতার অক্ষরে লিখিত পুরাতন আখরের মতোই বাঙ্ময় হয়ে উঠল, আসিফ আউটসুইং ভেবে ব্যাট তুলে নিতেই কোন অলীক জাদুকরের মন্ত্রে বল ভেতরে এসে নদীবাঁকের মুখে ভেসে থাকা তালকোন্দা নাওয়ের বৃদ্ধ মাঝির নির্বিকার মুখের মতো আলতো ভাবে অফস্টাম্পের বেল স্পর্শ করে উইকেট কিপারের হাতে শান্ত বালক হয়ে যেন নিজেকে সমপর্ণ করল! ফলো থ্রুয়ের মাঝেই অবিনাশ দেখল দুহাত তুলে ছুটে আসছে উইকেট কিপার, গ্যালারি জুড়ে সহস্র হাততালি, হঠাৎ সব আয়োজন এক লহমায় থামিয়ে জেগে উঠল বিকাশ প্রসাদের প্রসারিত বাম হাতখানি, গম্ভীর স্বরে ধর্মযাজকের মতো ঘোষণা করলেন, নো বল!

পরের বলটি পুনরায় ব্যাট নাকি গ্লাভস স্পর্শ করে উইকেট কিপারের হাতে পৌঁছাল, প্রবল আবেদনের সামনে ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানালেন বিকাশ, তবে চতুর্থ বলে প্রাচীন কোনও অভিশাপের মতো নেমে এল অঘটন।

বলটি সামনে পুশ করে একরানের জন্য আসিফ ক্রিজ ছেড়ে বেরোতেই ফলো থ্রু সামলে ছুটে এল অবিনাশ, আসিফের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা, মাটিতে পড়ার মুহূর্তে অবিনাশ বুঝতে পারল বাম কনুই ব্যাটের ধাক্কায় অবশ হয়ে গেছে…কয়েক মুহূর্ত পর যখন পার্থর কাঁধে ভর করে উঠে দাঁড়াল তখন কনুই নীলবর্ণ, হাত তোলা তো দূরের কথা সামান্য নাড়লেই ঝনঝন করছে প্রচণ্ড ব্যথা, কোনওক্রমে দাঁত চেপে একবার আসিফের দিকে তাকাল অবিনাশ, কী যেন বলছে, কোনও উত্তর না দিয়ে যন্ত্রণা সহ্য করে অবিনাশ শুধু অস্ফুটে উচ্চারণ করল কতগুলি শব্দ, ‘এটা কিন্তু ক্রিকেট হল না আসিফ!’

অবিনাশের ড্রেসিংরুমে ফিরে যাওয়ার পথের দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল আসিফ, নিজেকে শুনিয়েই মনে মনে বলল, ‘বড়ো অভিনেতা হয়েছ হে, কনুই লক্ষ্য করে ব্যাট চালানো কেউ বুঝতেই পারেনি! আহ! ট্রফি এবার আমার!’

(ক্রমশ)

সায়ন্তন ঠাকুর
লেখক | + posts

জন্ম পৌষ মাসে, রাঢ়বাংলার এক অখ্যাত মফস্সলে। সায়ন্তন মূলত মূলত গদ্য লেখেন। প্রকাশিত বইপত্তর-- নয়নপথগামী(উপন্যাস), শাকম্ভরী(উপন্যাস), বাসাংসি জীর্ণানি(গল্প সংকলন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *