খড়কুটোর জীবন : বনের খেলা । পর্ব ২২। লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

ডুগডুগির শব্দ পেলেই শব্দটাকে অনুসরণ করে ছুটে যেতাম। গিয়ে দেখতাম বাঁদরওয়ালা এক জোড়া বাঁদর-বাঁদরীর গলায় বাঁধা লোহার চেন বাম হাতে ধরে ঝোলা কাঁধে ডান হাতে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে আসছে। পিছনে পিছনে আমার মতো হাফ-প্যাণ্টের দল। এতগুলো পদ সঞ্চালনে পথের ধূলো উড়ছে। কৌতুহলী সবার চোখ বাঁদর আর বাঁদরীর দিকে। কয়েকটা কুকুরও ঘেউ ঘেউ করতে করতে পিছন পিছন চলেছে। হরিতলায় তেমাথার মোড়ে অশ্বত্থ গাছের নীচে এসে বাঁদরওয়ালা থামলো। ততক্ষণ তাকে কেন্দ্র করে একটা বৃত্ত রচিত হয়েছে।ঝোলাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে বাঁদরের চেন দুটো পা দিয়ে চেপে ধরে তিনি ডুগডুগিটা বাজাতে লাগলেন।

পাড়ার বিভিন্ন বয়সী লোকের ভিড় জমতে শুরু করলো। বাঁদর ওয়ালা ডুগডুগি বাজাতে বাজেতে  বলতে শুরু করলো — ‘ দেখে যান, দেখে যান বাঁদরের খেলা। আমার শ্রীদেবী আর মিঠুনের ড্যান্স। বাচ্চারা বাড়ি থেকে দুটো চাল আর একটা-দুটো টাকা নিয়ে এসো। ‘ এসব বলতে বলতে বাঁদর ওয়ালা ঝোলা থেকে বার করে  ফেলেছেন  লাঠি,রিং — এসবের মতো খেলা দেখানোর নানান সরঞ্জাম। মাঝখানে কেউ দুটো কলা নিয়ে এসে হাজির। বাঁদর যুগলকে  খাওয়াবে। বাঁদরওয়ালা চেনে ঢিল দিতেই কলাদাতার হাত থেকে কলা নিয়ে খেতে শুরু করলো। আমাদের মতো বাঁদর দের ছোটো বেলায় পরিচিত কেউ কিছু খেতে দিলে বাবা-মার অনুমতি নিয়ে খেতে হতো না। বাঁদর যুগলের যেমন কলা খাওয়ার জন্য প্রভুর অনুমতি লাগলো না। চোখ পিট পিট করছে আর কলা খাচ্ছে। এ দৃশ্য যে কোনো দিন দেখেনি সে বুঝবে না কলা খাওয়ার নান্দনিক আনন্দ। কেউ কলা দেখিয়ে কলা না দিয়ে বাঁদরের দাঁত খিঁচানি উপভোগ করছে। আমরা বাঁদরের দল দন্তবিকশিত করে হাততালি দিচ্ছি। এবার বাঁদরওয়ালা শুরু করলো একেপর এক খেলা।

— ‘এই দেখো আমার মিঠুন কেমন ডিগবাজি খায়।’ মিঠুন বাঁদরওয়ালার লাঠির ইশারায় ডিগবাজি দিতে শুরু করলো। তারপর – ‘এই দেখো আমার মিঠুন কীভাবে বাঁক কাঁধে দই বিক্রি করতে যায়।’ বাঁদরটি দুই পায়ে ভর দিয়ে লাঠি কাঁধে ধরে এক চক্কর ঘুরে এসে বসলো প্রভুর পাশে। ‘এইবার দেখো আমার মিঠুন আর শ্রীদেবী কেমন করে শ্বশুর বাড়ি যায়।’ বাঁদর বাম হাতে লেজটি ঝরে ধুতির কোথা ধরার ভঙ্গিতে বাঁদরীকে পাশে নিয়ে একটু হেঁটে এসে বসে পড়লো। সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখলো শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার পুলকানন্দ। এইভাবে বাঁদরের লং জাম্প, চোর-পুলিশ খেলা দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে যেতো। বাঁদরওয়ালা মাটির উপর বিছিয়ে দিতো গামছা। বাটিতে করে আনা চাল আর পয়সা ঢেলে দিতো সেখানে সকলে। পয়সা গুলো বেছে পকেটে রেখে চালগুলো ঝোলাতে ঢোকা তো বাঁদরওয়ালা। জমা ভিড়টা ফিকে হয়ে আসতো। বাঁদরওয়ালা ঝোলা কাঁধে আবার ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে চলে যেত অন্য পাড়ায়। আমরা তখনো পিছন পিছন চলতাম। অন্য পাড়াতেও দেখা খেলা আবার দেখতে হবে। গ্রাম থেকে বাঁদরওয়ালা চলে গেলে তবেই আমাদের ঘরে ফেরা।

শুধু বাঁদর খেলা নয় সাপুরেরা আসতো সাপের ঝাঁপি নিয়ে সাপ খেলা দেখাতে। দাসপাড়ার গাজন তলার গাছের নীচে বসতো সে আসর। বীণের আওয়াজ পেলেই ছুটে যেতাম দলে দলে। বিশেষত গ্রীষ্মের সময় যখন লোকের কাজ থাকতো না সকলে ভিড় জমাতো সাপের খেলা দেখতে। সাপুরে বাঁকের দুই দিকে সাজিয়ে রাখা সাপের ঝাঁপি গুলো প্রণাম করে করে নামিয়ে রাখছেন একটা একটা করে। সেগুলোর আকার নানা রকম। কোনোটি বড়ো, কোনোটি মাঝারি আবার কোনোটি ছোটো। বাঁশের বা বেতের মাটি লেপা ঝাঁপিগুলোতে সিঁদুর লাগানো এবং সরু দড়ি দিয়ে বাঁধা। ঝাঁপি গুলো দেখলেই বোঝা যেতো কোনটাতে বড় সাপ আর কোনটাতে ছোটো সাপ। আমাদের আগ্রহের বাঁধমানতো না। অপেক্ষা সই তো না সাপুরে একটা একটা করে কখন সাপ বার করবে।

পুকুরে স্নান করতে গিয়ে অনেক সময় দেখেছি জলঢোঁড়া সাপ। হেলে সাপ তো বাড়ির ইতিউতি ঘোড়ে । একদিন সুকান্তদের বিশাল বাবলা গাছে দেখি কতগুলো পাখি বাঁসার কাছে কিচির মিচির করছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি একটি বিশাল আয়তনের দাঁড়াস সাপ পাখির বাঁসা থেকে পাখির ডিমগুলি খাচ্ছে। পাখিদের সেই অসহায় চিৎকার এখনো মনে পড়ে নিজে যখন অসহায় হয়ে পরি। একবার কানু পালের মাটির ঘরের গর্ত থেকে খরিস সাপ ধরতে দেখেছিলাম জিধার ক্ষ্যাপা দাস কে। লেজ চেপে ধরে গর্ত থেকে টেনে বার করে নতুন মাটির হাঁড়িতে ঢুকিয়ে সরা চাপা দিয়ে বেঁধে ফেলার সে দুঃসাহসী কাজকে সকলে ধন্য ধন্য করছিলো। আমরা ভয়ে মরছিলাম যদি সাপের ছোবল খায় তাহলে তো শেষ। নিশ্চিত মৃত্যু। এই রকম আজরাইলের সঙ্গে ক্ষ্যাপা ওস্তাদের লড়াই ভোলার নয়। তবে সকলে বলছিলো – ক্ষ্যাপা ওস্তাদের সাপে কাটার ওষুধ জানা আছে। কামর খেলেও কিছু হবে না। আমার মনে হতো ঐরকম ওষুধ যদি পাওয়া যেতো। মনে মনে মা মনসাকে প্রণাম জানাতাম। আমাদের খড়ের চালের ফাঁকে বা ধানের গোলার মধ্যে অনেকবার দেখেছি স্যাঁকাপাটি সাপ। লাউডগা সাপকে চলতে দেখেছি পুঁই মাচাতে । কেঁচোর মতো একধরনের সাপ দেখতাম। সবাই বলতো কুঁয়ে সাপ। এসব সাপ দেখার অভিজ্ঞতা থেকে দেখতাম সাপুরের সাপ খেলা।
তো সাপুরে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না গানের সুরে সুরে বীণ বাজাতে  লাগলেন। অনেক মানুষের চোখ তার ঝাঁপি গুলির দিকে।  প্রথমে তিনি একটা একটা করে সাপের বর্ণনা দেন আর ঝাঁপির ঢাকনা খুলে সাপ বার করে বীণের তালে তালে খেলা দেখান। — ‘ এইবার দেখুন, লখীন্দরকে লোহার বাসর ঘরে দংশন করেছিলো যে কালনাগিনী সেই নাগিনীকে । ‘ বা কখনো বলেন — ‘ এই হলো পদ্মগোখরো , এর ফণা তে শ্রীকৃষ্ণের খড়মের ছাপ আছে। ‘ বা ‘ এইটা হলো দুমুখো সাপ ‘ ইত্যাদি। এদের মধ্যে কোনো সাপ ফণা তোলে, কোনোটা নিস্তেজ। কেউ সাপুরের মুঠি নাড়ানোর ফলে ফণা দোলাতে থাকে চিরিক চিরিক করে জিভ বার করে। সাপেরা ঝাঁপিতে উঠে গেলে শুরু হয় নানান রোগের তাবিজ বিক্রি। সর্প দংশনের ভীতিতে প্রায় সকলেই তাবিজ কেনে। মা মনসার নামে অনেকে চাল-পয়সা দিতে থাকে সাপুরের পাতা গামছাতে। বাঁদর ওয়ালার মতো তাকে চাল-পয়সার জন্য প্রার্থনা জানাতে হয়না। সাপ যে জ্যান্ত দেবতা। লখিন্দরের মতো কেউ মা মনসার কোপ দৃষ্টিতে পরতে চায়না। ঝাপান গানে সবাই তো শুনেছে বেহুলার প্রতি লখিন্দরের উক্তি – ‘উঠো উঠো বেহুলা সায়বেণের ঝি / তোরে পাইলো কাল নিদ্রা /মোরে খাইলো কী। ‘

একবার গ্রামে দেখেছিলাম ভালুকের খেলা। কালো লোমশ শরীরের নাদুসনুদুস ভালুকের গলায় আর মুখে বেড়ি পরানো। লোহার শিকলটা  ধরে ভালুক ওয়ালা তার লাঠির ইশারায় খেলা দেখাচ্ছিল। জ্বর এলে যেমন অনেক সময় শরীরে কাঁপুনি ধরে আর মুখ দিয়ে হুঁ হুঁ আওয়াজ বেরিয়ে আসে ভালুকটা খেলা দেখাতে দেখাতে অমন করছিলো। একে নাকি বলে ভালুক জ্বর।
এখন বন্য প্রাণীদের নিয়ে খেলা দেখানো নিষিদ্ধ। এখন বুঝি ছোটো বেলায় দেখা বাঁদরের নাচ ঠিক নাচ নয়। তার পিছনে থাকতো বাঁদরওয়ালার নিদারুণ অত্যাচার। পোষ মানানোর নামে সাপের ভেনামগ্ল্যাণ্ড কেটে ফেলা হতো। খেতে না দিয়ে নিস্তেজ করে দেওয়া হতো। খড়কুটোর জীবনে ঐ বন্যদের সঙ্গে নিজের বেশ মিল খুঁজে পাই প্রত্যহ।

(ক্রমশ)

সুপ্রিয় ঘোষ
+ posts

নদীয়ার চাপড়া বড়ো-আন্দুলিয়া সংলগ্ন আলফা গ্রামে সুপ্রিয় ঘোষের জন্ম। অঞ্চলসংস্কৃতি উৎসাহী ও সন্ধিৎসু সুপ্রিয় আড়ালেই সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে তাঁর কাজ করে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বই 'নদীয়ার হাট-হদ্দ'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *