ধূসর চিলেকোঠা । পর্ব ৭ । লিখছেন শেখর সরকার

গত পর্বের পর…

প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সদানন্দ কনক মজুমদারের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠল। গ্রামে সবার ভীষণ কৌতূহল, সবার আগ্রহ এই যে সদানন্দ এবার নিজের ওপর আক্রমণের ঘটনাটা খোলসা করে বলবে। কিন্তু সদানন্দ পুরো ঘটনাটাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল — যেন তার সাথে এই ঘটনা ঘটেইনি। নিজেকে আরও সঙ্কুচিত করে নিল সদানন্দ।

যতদিন সে বিছানাতে শুয়ে ছিল, ততদিন তার ঊষার কথা খুব মনে পড়ছিল। একটি ছেলে আর কত আর তার যত্ন করবে? ঊষার মৃত্যুর আজও তাকে মাঝে মাঝে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। সবাই বলছিল যে একটি ছেলের যখন জন্ম হয়েছে, ব্যাস! আর সন্তান নেওয়ার কোনও দরকার নেই। কিন্তু সুদর্শন মানেনি। সে চেয়েছিল এক কন্যা সন্তান। দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হয়েছিল জেনে আপৎকালীন সময়ে কোনও সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে ঊষার চিকিৎসা হয়নি। বর্ষার রাতে সেই দিন নিবু  নিবু বাতির আলোতে ঊষার চিৎকার আজও মনে করে সদানন্দ। ঊষার গর্ভ আর তার নিজের হয়ে থাকেনি। কনক মজুমদারের হাতুড়ে চিকিৎসায় বেঘোরে প্রাণ হারাতে হয়। সে ঘটনার পর থেকেই তার হরিভক্তি আরও বেড়ে গিয়েছিল। এখনও সে রক্তের দাগ মাটিতে ভেসে ওঠে। রক্তের ঢেউ যে ঘর থেকে বের হয়েছিল সেটা এখন কান্নাতে পরিণত হয়েছে।  অনন্তর বউ সুবলা তাকে মাঝে মাঝে রান্না করা খাবার দিয়ে যায়।

যেদিন তার গানের আসরে ঊষার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল, সদানন্দর এখনও মনে আছে সেই চেহারার কথা। শুষ্ক কাঠ কাঠ চেহারা, গায়ে মার দেওয়া তাঁতের শাড়ী, মুখে খিলি পান, কপাল ভর্তি চন্দন আর গলাতে গাঁদা ফুলের সম্ভার। এই সবই ঊষার থালার মতো মুখটিকে গোপন করার চেষ্টা করেছে। তবে সেটা সদানন্দের নজর এড়ায়নি। বত্রিশ প্রহর কীর্তন সাধারণত সে শুনত না, শুধু মাত্র ঊষাকে দেখার জন্য সেবার শুনেছিল।

সদানন্দ কিন্তু খুব ভালো করে জানে যে তার পৌরুষত্ব আসলে এক ডুগডুগির জন্য বানানো লাউের মতো — ভেতরে ফাঁপা। তবে বাইরে হাত দিয়ে জোরে বাজালে শব্দ হয়। তার অর্জুনবিষাদযোগ মাঝে মাঝেই হয়ে যায়। তখন সে ঘরের একটি কোনে চুপটি করে বসে থাকে। অথবা সে গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে চলে যায়। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচন। প্রধান হিসাবে তাকেই  সব দায়িত্ব নিতে হবে। পিতা- পুত্রের সম্পর্কে এখন সে আস্তরণ খোঁজার চেষ্টা করে। এরকম নয় যে একজন আরেকজনের কাছে অচেনা কিন্তু তবুও যেন মনে হয় এক বিস্তর দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়।

অবিনাশ পিতার গুণগান শুনে আসছে  বিদ্যালয়ের পাঠক্রমের বই থেকে — “…পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।।” পিতাকে সে খুশি করতে চায় কিন্তু সে নিজেকে তাতে আরও হারিয়ে ফেলে। বিছানায় শয্যাশায়ী থাকাকালীন দু’জনের মধ্যে হঠাৎ করে আলোচনা শুরু হয়। যদিও অবিনাশ জানে যে এই আলোচনা না হলেও তেমন কিছু চুন পান থেকে খসবে না।

সুদর্শন জিজ্ঞেস করে, “অভি, তোর মা-র কথা মনে পড়ে?”

প্রশ্নের জবাব দিতে অবিনাশের কিছুটা দেরি হয়। সে কিছুটা প্রস্তুতি নিয়ে উত্তর দেয়।

— প্রশ্নটার সাথে বর্তমান সময়ের কী সম্পর্ক? তুমি কি শুধু মা-র কথা স্মরণ করো তোমার শরীর খারাপ করলে? তোমাকে তো কোনদিন আমি মা-কে নিয়ে কোনও গল্প করতে শুনিনি। আমি মাকে নিয়ে যত গল্প শুনেছি সব সুবলা কাকিমার কাছ থেকে।

— তাহলে তুই বলতে চাস আমি তোর মা-কে মনে রাখিনি?

— আমি কিছু জানিনা।

সুদর্শন মনে করে  প্রতিকূল অবস্থাই অবিনাশকে দৃঢ় করে তুলছে। অবস্থা যেন এক নিত্য সঙ্গী হয়ে গিয়েছে — সবই যেন মনে হয় এক অদৃশ্য সুতার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তবে ঊর্মিলা-সুদর্শনের পত্র নিয়ে, অবিনাশ যথেষ্ট গোপনে অগ্রসর হচ্ছে। চিঠির মধ্যে  হঠাৎ করে কীভাবে সাহিত্যর স্ফুরণ হয়েছিল, সে আজও বুঝে উঠতে পারে না। যতদূর জানে, বাড়িতে  বাবার সংগ্রহ  বলতে কতগুলো পুরনো গানের খাতা। তাহলে সুদর্শন কি এক স্বামীহারা মহিলাকে প্রভাবিত করার জন্য হঠাৎ করে বঙ্কিম পড়া  শুরু করেছিল? একটি পুরুষের বাঁচতে গেলে একটি মহিলার দরকার হয়। অন্তত নিয়ামতপুরে সে তাই দেখেছে। একজন  মহিলা  এক পুরুষকে ধরে সারাজীবন বাঁচার সঙ্কল্প নেয়। কোথাও ছিন্নমূল হয়ে যায় না। সহধর্মিণী থেকে প্রেমিক, প্রেমিক থেকে  শুরু করে পুরুষ দেহের নৈরত্নর্য, বাকি পুরুষের উষ্ণদৃষ্টি থেকে নিরাতপ, স্বামীর দেহের ও  তার সমাজের মানের নৈকষ্য, সন্ধ্যায় স্বামীর ক্লান্ত শরীরের নোলার নোঙর — এই সবই বিভিন্ন ভূমিকায় এক স্ত্রীকে নিগুঢ় ভাবে প্রতিপালন করতে হয়। খেমটি বুড়ি, ঊষা — সবাইকেই এই যাত্রাপালার  মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। ঊর্মিলা নিজেকে এই গুহ্যর মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করাতে চায়নি। তাই সে এখন শিলিগুড়িতে আছে। বড় শহরে। ওখানে ব্যাঙের মতো কেউ জীবনযাপন করেনা। সবারই  মধ্যে বৈসাদৃশ্য আছে। সবারই আলাদা জগত আছে। বুড়িতোর্সা থেকে জন্ম নেওয়া এক নদী মিলিত হয়েছে মহানন্দার পাড়ে।

সুদর্শন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছে গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ের দিকে। সকাল সকাল তেমন কিছু পেটে পড়েনি। এক বাটিতে মুড়ি, চিনি আর জল — পেটের পক্ষে খুব উপকারী। দয়াময়ের বাড়ির সামনে দিয়ে সে যাবে না — বরং সে জমির আল বরাবর হাঁটবে এবং সোজা গিয়ে উঠবে। সে জানে এখন তাকে দেখলেই লোকজনে এখন প্রশ্নের ছড়ি ঘোরাবে —  সেসবের উত্তর সে দিতে চায় না অথবা দিতে অপারগ। সে তার নিজের ছেলেকেও এব্যাপারে কিছু বলেনি। মাঝে মাঝে তাকে নিজেই গিয়ে অফিসের দরজা খুলতে হয়। যেহেতু নির্মল এসেছে, সেহেতু একটু বাড়তি ব্যস্ততা দেখাতেই হবে। অফিসের বারান্দাতে গোরু, ছাগলের মল-মূত্র পড়ে থাকে। পরিষ্কার প্রায় হপ্তা বাদে করা হয়। সব কিছু এলোমেলো হয়ে আছে অফিস জুড়ে। কুড়িটি বুথ নিয়ে নিয়ামতপুর গ্রামপঞ্চায়েত। ঝগড়া-বিবাদ, জমি সংক্রান্ত ঝামেলা, পরিবারের আন্তরিক ঝামেলা নিয়ে সারাদিন ব্যস্ততাতে কাটে। এগুলো বাদ দিয়ে বাকিটা সময় বেশ একাকী কাটে সুদর্শনের। তবে শিবচণ্ডীপাটে যে পুকুর খনন করা হয়েছিল, তার পুরো কাজের হিসেব-দলিল চেয়েছে নির্মল। নির্মলের পেছনে দয়াময়ের হাত আছে — তাই মনে করে সুদর্শন। তবে এই প্রশ্ন এখনও গ্রামে ঘোরাঘুরি করে যে গ্রামে এত শত জমি থাকা সত্ত্বেও কেন সুদর্শন নিজের জমির পাশে এক জমি খননের কাজ শুরু করেছিল? এর পেছনে নিজের স্বার্থসিদ্ধি ছিল না তো? তবে এই প্রশ্ন কারো মুখের ওপর করার সাহস ছিল না। দয়াময় সেরকমই একজনকে খোঁজার চেষ্টা করেছিল। তারই মধ্যে নির্মলের গ্রামে পদালোকন। তবে দয়াময় এব্যাপারেও অবগত যে, নির্মল এতটাও গোবর গণেশ নয় যে সে যা বলবে তাই স্বীকার করবে। নির্মল সুদর্শনকে পর্যবেক্ষণ করছে। সকাল বেলা অফিসে দেখা হয় দু’জনের মধ্যে। একটু দৃষ্টির আদান-প্রদান। বেলা গড়ালেই সুদর্শন বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। দোকানের খাতাপত্র তাকে দেখতে হবে। নির্মলকে দেখেও না দেখা করতে পারেনি। আগ বাড়িয়ে গিয়ে কথা বলতে হলো।

— ওইদিনের ফলের জন্য ধন্যবাদ। সেদিন তো কথা হলো না আর। একদিন চলে আসুন। আমার পাশের প্রতিবেশী অনন্তর বউ সুবলা বেশ ভালো রান্না করে। বাড়ি তো চিনেই গিয়েছেন।

কিছুটা চমকিত হয়ে  নির্মল আপ্যায়নের আবদার স্বীকার করল।

— ঠিক আছে চলে আসব। আপনার বাড়িতে আমার আরেকবার যাওয়ার ইচ্ছে। অনেক কথা বলার আছে আপনার সাথে। গেলে কিন্তু দেশি মুরগির তরকারি আর খিচুরি খাওয়াতে হবে।

— আরে চলে আসুন না। কোনও সমস্যা নেই। আড্ডা দেওয়া যাবে অনেকক্ষণ ধরে।

এই বলে সুদর্শন গটগট করে বারান্দায় থাকা গোবরগুলোকে পাশ কাটিয়ে হাঁটা শুরু করল। যদিও নির্মলের কথার মধ্যে উৎসাহ লক্ষ্য করা গিয়েছে, কিন্তু তবুও  তার কথা মধ্যে যেন একটা শ্লেষের ভাব বোঝা গেল। যেন কিছুটা নিজেকে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে  এগিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। তবে এসব নিয়ে আর বেশি ভাবতেও পছন্দ করে না। শিবচণ্ডীর পুকুরে কিছু কচুরি পানা দেখা যাচ্ছে। দূরে একা একা আলোক চক্রবর্তী মাথায় একটি ভাঙ্গা ছাতা  নিয়ে মাছ ধরছে। আকাশটি যেন মেঘলা করে আসছে। সব যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। দূরে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। তাকে জলদি ফিরে যেতে হবে বাড়ি। খেতের ফসলগুলো হাওয়াতে দোলা খাচ্ছে।  বাড়িতে অবিনাশ কী করছে? একটু আড়ষ্ট হয়ে আসা মুখ, ধুলোর রাস্তায় জমা হওয়া ঘাসের ওপরে  টলমলিয়ে পদক্ষেপ — সত্যি জীবন এতো সহজে ছেড়ে যাওয়ার দ্রব্য নয়। জীবন হল কোমলগান্ধারের বিপরীতে এক উদ্যম নৃত্য। এখানে স্থবিরতা আর নিয়ম মানার পাথরে বারবার লাথি দিতে হয়।

সুদর্শন ধুতির কোঁচাকে আরও শক্ত করে ধরে, চারিদিকে এতো মেঘের গর্জন কথা থেকে এলো? দূরে থেকে তার বাড়ির চিলেকোঠা সে দেখতে পায়। মাঝে মাঝে ভাবে ঊষা এখনও ঘরে বসে আছে পান-সুপুরি সাজিয়ে। তবে সবই ভ্রম। তার একসময়ে গভীর ক্রোধ ছিল সমাজের আর দেশের প্রতি। পিতার মৃত্যু,  স্ত্রীর মৃত্যু, দেশত্যাগ —- কোনও কিছু আবদার করার কেউ ছিল না। কাউকে দশগাল কথা শোনাবার মতো কেউ নেই। ক্রোধ দুঃখে পরিণত হলে পুরো কায়মন ভেঙ্গে যায়। তখন শুরু হয়ে যায় আত্মসমর্পন। কিন্তু পুরোপুরি আত্মসমর্পণকে কক্ষনো স্বীকার করেনি তাদের পরিবাবের চোদ্দপুরুষ। এবং এই জিনিসটি সে অবিনাশের মধ্যে দেখতে পায়। তাই সুদর্শন মনে করে ক্রোধকে বাঁচিয়ে রাখা খুব জরুরি অন্তত এই নিয়ামতপুরে।

বৃষ্টি থামা পর্যন্ত একটি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থেকেই দেখল প্রকৃতির এই ভয়াল রূপ। দূরেই দেখা যায় লোকদেবতা মাশানদেবতার অর্ধভগ্ন দেহ, যেহেতু মূর্তির কোনও বিসর্জন হয় না, তাই মূর্তি ক্রমশ রং বদলাতে থাকে — ভয়ঙ্কর সুন্দর থেকে বিকট কুৎসিত। সব মিলিয়ে যেন এক সীমাহীনতা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সম্মুখীন। দূরে ছোটো একটি শিমুল গাছের মগডালে শ্বেতশুভ্র বক দাঁড়িয়ে তার বাসা আটকে রাখার চেষ্টা করছে। ক্ষুদ্রতা এবং অর্থহীনতা সর্বোপরি এই সীমাহীনতার থেকেও মস্তিষ্কে গাঁট বেঁধেছে। তাকে বাড়িতে পৌঁছাতে হবে, সেখানে তার পরিবারের একমাত্র উত্তরপুরুষ বসে আছে। অবিনাশ হচ্ছে তার একমাত্র পুত্র। সেই তাকে “পুত্‌” নামক নরক থেকে বাঁচাবে। দ্রুত পা চালিয়ে সুদর্শন বাড়িতে পৌঁছাল।

(ক্রমশ)

পরবর্তী পর্ব…

শেখর সরকার
+ posts

শেখরের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কোচবিহারের জেলার একটি সাধারণ গ্রামে। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে শহরে আসা। শহরের আচার্য ব্রজেন্দ্র নাথ শীল কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক এবং মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি।
বর্তমানে পুণেতে ফিল্ম এবং টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের পরিচালনা ও পটকথা লেখন বিভাগের ছাত্র। শৈশব থেকেই সিনেমার পোকা ও বর্তমানে সেই পথেই পদচারণাকারী একজন প্রত্যাশী চিত্রনির্মাতা। নেশা বলতে ভ্রমণ, ফটোগ্রাফি, বই সংগ্রহ আর দীর্ঘ আড্ডা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *