সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২২। বরুণদেব

গত পর্বের পর

(৩)

পলাশীর যুদ্ধের পর মুর্শিদাবাদ লুঠের মাল নিয়ে দু’শোটি নৌকার শোভাযাত্রা ভাগীরথীর জলে। ডাঙায় সৈন্যসামন্তের মিছিল ব্যাণ্ড বাজাতে বাজাতে নৌকাগুলিকে পাহারা দিতে দিতে এসে থামল কলকাতায়। ক্ষমতার প্রবাহ এখন বিপরীতমুখী। মুর্শিদাবাদ শহরে পা দিয়ে রবার্ট ক্লাইভের মুর্শিদাবাদের ঐশ্বর্য্যের কাছে লণ্ডনকে ম্লান মনে হয়েছিল। তিন বছর ধরে বর্গী আক্রমণের মোকাবিলা করে আলিবর্দী খাঁ-র রেখে যাওয়া ধনরত্ন ঘসেটি বেগমের হস্তগত হওয়ার পরও মুর্শিদাবাদের কোষাগারে যে রাশি রাশি সোনা রূপা মণিমুক্তার সন্ধান পেয়েছিলেন ক্লাইভ, সেই মুর্শিদাবাদ লুঠের বখরা থেকে তিনি নিজে পেলেন প্রায় ২,১১,৫০০ পাউণ্ড। বখরা পেল ফোর্ট উইলিয়ামের অন্যান্য সাহেবরা, বাদ গেল না নেটিভরাও। সিরাজের হাতে কলকাতা আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হলো। সে তালিকায় গোবিন্দরাম মিত্র, শোভারাম বসাক, আলিজান ভাই, রতন সরকার, নীলমণি মিত্রদের মতো কোম্পানির সঙ্গে থাকা বাঙালিদের সঙ্গে রতন, ললিতা, মতিবেওয়ার মতো গোবিন্দরাম মিত্রের গণিকারাও ছিলেন।

সিরাজের ‘আলিপুর’ ক্লাইভের পুণরুদ্ধারে আবার ‘কলকাতা’ হয়ে গেলে, কালাজ্বর, আমাশা, স্কার্ভি, পিত্তজ্বর, ম্যালেরিয়ার বনজঙ্গলের কলকাতার নগরায়ন শুরু হয়ে গেল ক্লাইভের হাত ধরে। সিরাজের আক্রমণের ভয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া লোকজনকে ফিরিয়ে আনার সাথে সাথে নতুন লোকেদের জন্যও দরজা খুলে দেওয়া হলো। কলকাতাকে বাসযোগ্য করার জন্য, কমলালেবু ও অন্যান্য ফলের গাছ বাদে জঙ্গল সাফ করে শহরের গায়ে রোদ হাওয়া লাগানোর কাজ শুরু হয়ে গেল।

১৮৫৮ সালে সামান্য জনবসতির গোবিন্দপুরে নতুন কেল্লা তৈরী শুরু হলে সেখানকার বাসিন্দারা ছড়িয়ে পড়ল শোভাবাজার, সুতানুটি, তালতলা অঞ্চলে। পাঁচজন ইংরেজ বিচারক নিয়ে গড়ে উঠল দেওয়ানী আদালত। রাত্রি দশটা থেকে সকাল পাঁচটা পর্যন্ত শহরের নানা স্থানে রাতপাহারায় বসল গোরা পুলিশের চৌকি।  দমদম ছাড়াও ক্লাইভের বাড়ি হলো কলকাতার ছায়া সুনিবিড় ক্লাইভ স্ট্রীটে। সেখানে পতপত করে উড়ত কোম্পানির পতাকা, ক্লাইভের ছেলেকে ঘুম পাড়ানো  গান শোনাতেন মীরজাফরের দেওয়া দাই – ‘দেখো মেরি জান কোম্পানি নিশান।/ বিবি গৈয়ে দমদমা উড়ি হৈ নিশান,/ বড়া সাহেব ছোট সাহেব, বঙ্কা কাপ্তেন,/দেখো মেরি জান, লিয়া হৈ নিশান।‘ জলা জঙ্গল ধানজমি কলাবাগান তামাক চাষের কলকাতা ধীরে ধীরে হয়ে উঠল নগর কলকাতা, ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভরকেন্দ্র। কাশীজোড়া, শান্তিপুর, ঢাকা থেকে তাঁতিদের শহরে আনার প্রয়োজন মনে হলো ব্যবসায়িক স্বার্থে। কোম্পানিকে বেশ কয়েক বস্তা চাল-ডাল বেচা ব্যবসায়ী গঙ্গারাম ঠাকুর, নকুড় সরকার  ফিরে এলেন কলকাতায়। নগরায়ণের ফলশ্রুতিতে গোবিন্দপুর, সুতানুটি, কলকাতা ও তার আশপাশের আদি বাসিন্দা দরিদ্র হিন্দু-মুসলমানরা নানা স্থান থেকে উৎখাত হতে থাকল একদিকে, আর একদিকে কুলিমজুর, গাড়োয়ান, কারিগর, চাকুরিজীবি নিম্নবিত্তদের ভিড় বাড়ল। ধনীদের অট্টালিকার পাশাপাশি গরীবদের হোগলা খড়ের কুঁড়েঘর গড়ে উঠতে লাগল ব্যাঙের ছাতার মতো।

সাত সমুদ্র পেরিয়ে টেমসের পাড় থেকে ক্লাইভের আমলের পাঁচ পাউণ্ড মাসমাইনের রাইটাররা চামড়া পোড়ানো,ওলাওঠা, কলেরা, ম্যালেরিয়ার কলকাতায়, পালকিতে চড়ার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে, পুরোনো কেল্লার গুদামখানায় গাদাগাদি করে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া মারামারি করতে করতে, পলাশীর যুদ্ধের পর  দেখল, কলকাতার নগরায়ণের ফলে একদিকে যেমন তাদের হাত-পা ছড়িয়ে থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে তেমনি ক্লাইভের মুখে হাসি ফোটাতে চাওয়া নবাবী সমর্পণের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, কোম্পানির সামান্য কর্মচারী হয়েও বড়োলোক হবার রাস্তাও প্রশস্ত হয়ে গিয়েছে। পলাশী পরবর্তী একশো বছরের ইঙ্গ-নবাব বা নবাব-ইঙ্গ শাসনে হঠৎ ধনী হয়ে যাওয়া গোরা ও নেটিভরা ন্যায় নীতিকে বিসর্জন দিয়ে টাকা, আরও  টাকা, আরও  আরও টাকার নেশায় মশগুল হতে হতে বিলাস-ব্যসন-উচ্ছৃংখলতায় আদিগঙ্গার জলকে পূতিগন্ধময় করে তুলল। ছিয়াত্তরের মণ্বন্তরে যখন ফ্যান দাও ফ্যান দাও করে মানুষ মরছে, নিজের মেয়েকে বিক্রি করে দিচ্ছে, তখন ব্রিটিশ রাজকোষে জমা পড়ছে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব। বাদ গেল না এ দেশীয়রাও। কোম্পানির মুন্সি হিসেবে ষাট টাকা বেতনে কাজ শুরু করা শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণদেব মাতৃশ্রাদ্ধে খরচ করে ফেলছেন ন’লক্ষেরও বেশি টাকা।  সেই মণ্বন্তরের কয়েক বছর আগে ইহলোক ত্যাগ করা মাসিক ষাট টাকা বেতনের কোম্পানির মুন্সি রামচাঁদ রেখে যাছেন তাঁর সম্পত্তি – নগদে ও কাগজে বাহাত্তর লক্ষ টাকা, কুড়ি লক্ষ টাকার মণিমুক্তা, আঠারো লক্ষ টাকার জমিদারি, সোনা ও রূপার চারশোটি কলসি, টাকার মূল্যে সোওয়া কোটি ।

পলাশী যুদ্ধের আগে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মুনাফা অর্জন ছিল মূল উদ্দেশ্য। রাজদণ্ড হাতে নেওয়ার পরপর কোম্পানির প্রশাসকরা এ দেশের জমাট বাঁধা কুসংস্কার, জাত-বেজা্‌ অস্পৃশ্যতা, সহমরণ নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাতেন না, ইউরোপীয় শিক্ষার আলোকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারেও বিশেষ উদ্যোগী হতেন না পাছে গোরাদের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরী হয়ে যায়। যখন খ্রিস্টান মিশনারীরা খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পা রাখল, ইস্ট  ইণ্ডিয়া কোম্পানী কলকাতার বদলে তাদের পাঠিয়ে দিল দিনেমার অধ্যুষিত শ্রীরামপুরে, পাছে তাদের শাসনের ভরকেন্দ্র কলকাতায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। শাসনভার চালানো ও এ দেশের নাগরিক সমাজের কাছের লোক হবার জন্য ব্রিটিশরা প্রথমদিকে ফারসী ও সংস্কৃত শিখতে লাগল আর এ দেশীয়রা করেকম্মে খাওয়ার জন্য ইংরাজি শব্দ মুখস্ত করতে লাগল। শ্রীরামপুর মিশনারি তাদের সার্টিফিকেট দিত- এ ব্যক্তি দু’শোটি ইংরাজি শব্দ জানে, কাজেই কোম্পানির চাকরিতে বহাল করা যেতে পারে। ব্রিটিশ কর্মচারীদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য ইংরাজি স্কুল খুলে গেল কলকাতায়, সেখানে ধনী বাঙালিরাও তাদের ছেলেমেয়েকে পাঠাতে লাগল। আর রাঁড়-ভাঁড়-সুরা- বুলবুলির লড়াইয়ে গা ভাসিয়ে দেওয়া বাঙালি কলকাতার সমাজে সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, কুসংস্কার, জাত-বেজাত, অস্পৃশ্যতা নিয়ে, শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে, রাজ করতে লাগল। যে পুরোহিত সকালে গঙ্গাস্নান করে কোশাকুশি নিয়ে ধনীদের অট্টালিকা থেকে অট্টালিকায় সংবাদপত্র হয়ে, কোন বাবু পুজোয় কত জাঁকজমক করছে, দানধ্যান করছে, এসব খবর দিয়ে অর্থ উপার্জন করত, যে ব্রাহ্মণ পালকি বেহারা ছায়া মাড়িয়ে দিলে তার গালে থাপ্পড় কষিয়ে বাবুর কাছে বিচার চাইতে যেত এবং তা মনোমতো না হওয়ায় সেই বাবুর বাড়ির সামনে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করত এবং তার ফলস্বরূপ যে সমাজপতিরা সেই বাবুর বাড়ির সামনেই চিতা জ্বলাত, যে সমাজপতি সাধারণ মানুষকে  সমাজচ্যূত করত, পৈতে ছুঁয়ে অভিশাপ দিত। তাদের সিংহভাগই গায়ত্রী মন্ত্রের অর্থ জানত না,সংস্কৃত সাহিত্য বা বেদে তাদের জ্ঞানের ভাঁড়ার প্রায় শূন্য। তারাই পাশ্চাত্য শিক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে লম্ফঝম্ফ করত। কলকাতার সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনে স্বীয় সম্পত্তির পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে মানিকতলায় পা রাখলেন বর্ধমানের রাধাকান্তপুরে জন্ম নেওয়া রাজা রামমোহন রায়।

কোরাণ বাইবেল পড়া, ফারসী ইংরাজি ভাষায় দক্ষ, একেশ্বরবাদীতে বিশ্বস্ত, তিব্বতে গিয়ে লামাদের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কোনোরকমে  প্রাণ নিয়ে পালানো রামমোহন, প্রাচ্যের সাহিত্য ও  শাস্ত্রে আস্থা ও বিশ্বাস রেখেও পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের আলোকে সমাজকে আলোকিত করতে চেয়ে সোচ্চার হয়ে, সতীদাহ প্রথা নিবারণে, কুসংস্কার দূরীকরণে অগ্রনী ভূমিকা নিয়ে, উনিশ শতকের কলকাতার নবজাগরণের কান্ডারী হয়ে উঠলেন। পাশে পেলেন কলকাতার মুষ্টিমেয় কিছু বাঙালি ও ইংরেজকে। কলকাতায় পড়ে গেল শোরগোল। একেশ্বরবাদীদের উপাসনার জন্য হিন্দু ইহুদী খৃস্টান মুসলমান, সকলের জন্য দরজা খুলে দেওয়া রামমোহনের ব্রাহ্ম সভার ‘অলখনিরঞ্জন’ সুরতরঙ্গ কলকাতার বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে গোঁড়া হিন্দুদের রোষানল আরও গেল বেড়ে। গোঁড়া হিন্দু সমাজের প্রবল পরাক্রান্ত রাধাকান্তদেবরা রামমোহনের বিরুদ্ধে সমাজকে একজোট করে তীব্র শ্লেষে ও ব্যঙ্গে ধর্মের ধুনিতে আগুন জ্বালাতে লাগলেন। রাস্তাঘাটে ঘড়েবাইরে জমায়েতে জমায়েতে বাচ্ছা থেকে ছেলেছোকরা, সমাজপতি থেকে বাঈজী মজলিশের বাবুরা, সুর করে বলতে লাগল-

‘ব্যাটা সুরাই মেলের কুল/ ব্যাটার বাড়ি খানাকুল/ ব্যটার জাত বোস্টম কুল, / ব্যাটা সব্বনাশের মূল।/ ওঁ তৎসৎ বলে ব্যাটা বানিয়েছে ইস্কুল/ ও সে জেতের দফা করলে রফা মজালে তিনকুল।’

 

বাদ গেল না গোরারাও। রামমোহনের বন্ধু উইলিয়াম অ্যাডাম রামমোহনের প্রভাবে একেশ্বরবাদী হয়ে গেলে খ্রীস্টান মিশনারীদের সঙ্গে বাঁধল বিরোধ। ‘কোরাণ পড়লেই মুসলমান হয়ে যায় না, বাইবেল পড়লেই খ্রিস্টান হয়ে যায় না, বেদ উপনিষদ পড়লেই হিন্দু হয়ে যায় না’- এই যাঁর মত, তিনি ধর্মের অমানবিক পিশাচ আচার বিচার কুসংস্কারের প্রাচীরে আঘাত করলে, পাশ্চাত্য শিক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার কথা বললে, কলকাতার নগর কীর্তনের খোল কত্তালের সুর বেসুরো হয়ে উঠল। তা আরও কর্কশ হলো গরাণহাটায় হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা নিয়ে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply