সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২১। বরুণদেব

গত পর্বের পর

১৮৮০ সালের ক্রিসমাস রাতে চিয়ারিনির ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় বিষ্ণুপন্থ ছত্রের হাত ধরে ভারতের যে সার্কাসযাত্রা শুরু, তা মহারাষ্ট্র ও কেরালাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে।

বিশ শতকের শুরুর দিকে মহারাষ্ট্রে একের পর এক সার্কাসদল গড়ে উঠল। আইনজীবী পটবর্ধনের পটবর্ধন সার্কাস, মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরের কলান দাস সার্কাস, মাধুস্করস গ্র্যান্ড সার্কাস, অনেক ছোটোবড়ো সার্কাসদল। কোনোটা খ্যাতি পেয়েছে, কোনোটা পায় নি। কোনোটি অল্পদিনের মধ্যে তাঁবু গুটিয়েছে, কোনোটি দীর্ঘায়ু হয়েছে। ১৯১২-র দিকে কারলেকার গ্র্যাণ্ড সার্কাস ছত্রের সার্কাসের সমকক্ষ হয়ে উঠেছিল। ১৯২০-তে মহারাষ্ট্রের বাবুরাও কামিরের সার্কাস ২৯ বছর ধরে চলেছিল। মহারাষ্ট্রের আহমেদনগরের মোরে প্যাটেল, বন্য জন্তুর প্রশিক্ষক, তাঁর ছোটো সার্কাস নিয়ে মোষের গাড়িতে চেপে মাহারাষ্ট্রের গ্রামে গ্রামে খেলা দেখিয়ে বেড়াতেন।  বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরুতে হাজি ইয়াকুব ও মইদিন, দু’ ভাইয়ের  ‘বোম্বে গুলশন আনোয়ার সার্কাস’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দক্ষিণ মালাবার অঞ্চলে মাইথিনকুট্টি নামে এক সার্কাসশিল্পীর শুরু করা গুলমহম্মদ সার্কাস আটত্রিশ বছর ধরে  ধারাবাহিকভাবে চলেছিল।

কার্লেকর ও পরশুরাম লায়ন সার্কাসের ওয়েট লিফটার  আগ্রার থারাবাঈ স্ট্রং ওম্যান বলে পরিচিত ছিলেন সার্কাস এরিনায়। বুকের ওপর গ্রানাইট বোল্ডার ভাঙার খেলা দেখাতেন। মাথার চুলে ট্রাক বেঁধে ট্রাকটাকে টেনে নিয়ে যেতেন। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে নিজের নামে খুললেন-থারাবাঈ সার্কাস।

অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়নগরম অঞ্চলে জন্মানো রামমূর্তি ছোটোবেলায় যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত। পরিচিতরা বলল, ভালো করে খাওয়াদাওয়া করো, ওষুধপথ্যির সঙ্গে নিয়ম করে ব্যায়ামটাও  করো। যখন বড়ো হলেন, এক বলশালী যুবকে পরিণত হলেন। ভারতের বিভিন্ন বড়ো বড়ো সার্কাসে ওয়েটলিফটিং, বুকের ওপর দিয়ে ট্রাক চলে যাওয়ার খেলা দেখাতে লাগলেন। শেষমেশ কুড়ি জন বলশালী শিল্পীকে নিয়ে  খুলে ফেললেন নিজের সার্কাস- হিন্দু হারকিউলিস সার্কাস, যদিও বেশিদিন চলে নি সে সার্কাস। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা মদনমোহন মালব্যর ডাকে সাড়া দিয়ে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরশিক্ষা বিভাগের ডিন পদে যোগ দিলেন মাসিক দু’হাজার টাকা বেতনে, সেই যুগের সর্বোচ্চ বেতন। ষাট বছর বয়সে ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হয়ে একটা পা হারান। শেষ জীবন কাটে নিজের শহর বিজয়নগরমে। বিজয়নগরম মিউনিসিপ্যালিটি তাঁকে সম্মান জানিয়ে তাঁর নামে একটি পার্ক  ও সেই পার্কে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করে। প্রফেসর রামমূর্তির সার্কাসের স্থায়িত্ব স্বল্পকালীন হলেও তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। জনশ্রুতি, তাঁকে অনুসরণ করে ১৯১৬ সালে কৃষ্ণমূর্তি ও ইয়াকনাথ মূর্তি থালাসেরি অঞ্চলে সার্কাসদল খোলেন।

১৯২০-র শেষ কয়েক বছরে গড়ে উঠল কিলারির ছাত্র কে রমনের স্টার সার্কাস। শিবাজীর সময়ের মারাঠা সৈনিকের পূর্বপুরুষ রক্ত নিয়ে তামিলনাড়ুর তঞ্জাভুরের বাসিন্দা টি এম রাজারাম খুললেন কার্লোসন গ্র্যাণ্ড সার্কাস। ১৯৩০-এর দ্বিতীয় ভাগের ভারতে উঠে এলো একের পর এক মালোয়ালি সার্কাসদল – জুবিলি, ইম্পেরিয়াল, ওয়েস্টার্ন। যুদ্ধের বাজারে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলো। শেষও হয়ে গেল।  ১৯৪০-এর দ্বিতীয় ভাগ ভারতের সার্কাস শিল্পের গৌরবের সময়। নতুন নতুন সার্কাস কোম্পানি উঠে আসতে থাকে। ১৯৪১ সালে মহারাষ্ট্রের ‘ভিম রাও সাস্নিক সার্কাস’ বিখ্যাত হয়ে উঠল। ১৯৪৮ সালে কীলেরি কুনহিকান্নানের দুই প্রিয় শিষ্যের হাত ধরে তামিলনাড়ুর পোল্লাচি শহরে শুরু হলো প্রভাত সার্কাসের যাত্রা। গ্লোব অফ ডেথ ও ডোম অফ ডেথ- এই খেলা দুটি ভারতে প্রথম চালু করে প্রভাত সার্কাস।

এক অদক্ষ সার্কাসকর্মী থেকে সার্কাসশিল্পীর উত্তরণের গল্প বলে ১৯৪২-এর ব্রডওয়ে সার্কাসের তাঁবু। অল্প বয়সে সি পি কুনহিরমন তাঁর গ্রাম ইরানহলি ছেড়ে কাজের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন একদিন। পুনে শহরে এক সার্কাসদলের তাঁবুতে জুটে গেল একটা কাজ। অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে শুরু করে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সার্কাসশিল্পী। টাকাপয়সা কিছু জমান। কিনে নেন মিনার্ভা সার্কাস। সার্কাসের নাম বদলে দেন- ব্রডওয়ে সার্কাস। ১৯৪২ সালে মহীশুরের কাছে মাণ্ডিয়া অঞ্চলে যাত্রা শুরু হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যে নাম ছড়াল সে সার্কাস।

১৯৪৩ সালে গোয়ালিয়রের মহারাজা জিয়াজি রাও সিন্ধিয়া মালাবারের শিল্পীদের নিয়ে খুললেন সিন্ধিয়া রয়্যাল সার্কাস। এক বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল। সে সার্কাসের সাজসরঞ্জাম, জন্তু জানোয়ার নিয়ে গ্রেট রেমন সার্কাসের প্রফেসর কে গোপালন পরের বছর খুললেন মহালক্ষ্মী সার্কাস। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ১৯৪৮ সালের পনেরই অগস্ট নতুন নামে চালু হয় সে সার্কাস- ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল সার্কাস।  ১৯৫০-এর প্রথম ভাগে অনেক সার্কাস, ছোটো ও বড়ো, তৈরি হলো যেমন তেমনি বন্ধও হয়ে গেল। ১৯৫৪র দিকে প্রায় ১০০ টা ছোটো, মাঝারি সার্কাস বন্ধ হয়ে গেল। ১৯৫৬-য় মাহারাষ্ট্রের বিখ্যাত সার্কাস,  পরশুরাম লায়ন তঁবু গোটালো।

উত্তর ভারতের বিভিন্ন মেলা ও উৎসবকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু সার্কাস গড়ে উঠেছিল। তারা এক মেলা থেকে অন্য মেলায় বছরভর ঘুরে বেড়াত, এমনকি কোথাও কোথাও সকাল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্তও প্রদর্শনী চলত। উত্তরপ্রদেশের রাজেন্দ্র গুপ্তা খুললেন এশিয়ান সার্কাস। কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের সার্কাস মানচিত্রে নাম করল। রাজেন্দ্র গুপ্তার মৃত্যু হলে তাঁর ছেলে রাজীব গুপ্তা ভার নিলে সার্কাসের। দিল্লীতে যখন সার্কাস তাঁবু ফেলল, প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে উপহার দিলেন একটি সাদা বাঘের ছানা।

১৯৭০-র দিকে উত্তর ভারতে পানামা, এম্পায়ার, গোল্ডেনের মতো কিছু কিছু সার্কাস উঠে এলো। তারা টিকে রইল বেশ কিছুকাল। কেরালার সার্কাসশিল্পীরাও এই সময়ে কয়েকটি সার্কাস চালু করলেন, সেগুলো অবশ্য এক বছরের বেশি টিকল না।

১৯৭৩ সালে জেমিনি সার্কাসের অংশীদার টি কে কুনহিকান্নান নিয়ে এলেন আরও একটি সার্কাস- বাহিনী সার্কাস। ১৯৭৪ সালে কয়েকটা পশুপাখি, তাঁবু আর অল্প কয়েকজন শিল্পীকে নিয়ে মুল্লোলি গোপালন পাঞ্জাবের পাতিয়ালা শহরে শুরু করেন রাজকমল সার্কাস। থালাসেরি অঞ্চলের লোক।  গোপালন ছিলেন খুব গরীব ঘরের ছেলে।  ছোটোবেলায় সার্কাসে যোগ দেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে রাজকমল ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় সার্কাস হয়ে যায়।

উত্তরপ্রদেশের মহঃ আলি বেগ মুন্না, গ্রেট রেমন সার্কাস,জেমিনি সার্কাসের বিখ্যাত ট্রাপিজ শিল্পী, ১৯৬৩ সালে রাশিয়ায় ভারতের সার্কাসশিল্পীদের প্রতিনিধিদলে ছিলেন। জেমিনি সার্কাস ছেড়ে খুললেন নতুন সার্কাস- লায়ন সার্কাস, ১৯৮৫ সালে।

১৯৮৭ সালে চেন্নাইয়ে মারা গেলেন গ্রেট ওরিয়েন্টালের মালিক অচুথান। সার্কাসের দায়িত্ব নিলেন তাঁর বড়ো ছেলে। সে সার্কাস বিক্রি হয়ে গেল আর এক সার্কাস-মালিক পি টি দিলীপের কাছে। গ্রেট ওরিয়েন্টাল নাম মুছে গেল। মহারাষ্ট্রের  পি টি দিলিপ আদতে কেরালার লোক। তাঁর বাবা পি থমাস ১৯৪০এর দিকে দক্ষিণ কেরালা ছেড়ে মহারাষ্ট্রে চলে আসেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে দিলীপ কিছুদিনের জন্য যোগ দেন একটা সার্কাসে। সার্কাস ছেড়ে উত্তর ভারতের বিভিন্ন বিনোদনমূলক প্রদর্শনীতে শোম্যান হিসাবে খেলা দেখালেও মন পড়েছিল সার্কাসে। ১৯৮৯ সালে ‘এরিনা সার্কাস’ নামে একটা ছোট্ট সার্কাস কিনে নিলেন, নাম দিলেন – ফ্যান্টাস্টিক সার্কাস। দু’বছর পর কিনলেন আরও দু’টি সার্কাস- গ্রেট ওরিয়েন্টাল আর ভিক্টোরিয়া। এই তিনটে সার্কাস কোম্পানি একত্রিত করে নাম দিলেন র‍্যাম্বো সার্কাস। পথ চলা শুরু ২৬শে জানুয়ারি, ১৯৯১। ইউরোপ ও আমেরিকার সার্কাসের সংস্কারী ধারায় র‍্যাম্বো সার্কাসকে গড়ে তুললেন। দিলীপের ছেলেরাও সুজিথ ও সুমিত বাবার সাথে সার্কাসের জগতে নিজেদের জীবন কাটিয়ে দিলেন।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে চলা বোম্বে জি এ সার্কাস বিক্রি হয়ে যায় ১৯৭৪ সালে। বিভিন্ন কার্নিভালে মোটর সাইকেলের খেলা দেখিয়ে বেড়ানো গুর্মুখ সিং বোম্বে জি এ সার্কাস কিনে নিয়ে নতুন নামকরণ করেন- যমুনা সার্কাস। অমর ও অন্যান্য সার্কাসে  প্রায় তিরিশ বছর কাটানোর পর অমর সার্কাসের  ক্যাম্প ম্যানেজার থালাসেরির কে চন্দ্রন একটা ছোটো সার্কাস কেনেন। ১৯৭৭ সালে জন্ম নেওয়া এই সার্কাসের নাম বারবার বদল হতো। চন্দ্রন যখন কেনেন তখন তার নাম ছিল রয়্যাল সার্কাস। চন্দ্রন নাম রাখলেন গ্রান্ড সার্কাস। এক দশক ধরে সে সার্কাস সুনামের সাথে চলল।

আজকের ভারতীয় সার্কাস এক মৃতপ্রায় শিল্প। দিন গুনছে ফসিল হবার জন্য। ১৮৮০ থেকে যাত্রা শুরু করা ভারতীয় সার্কাস মহারাষ্ট্র থেকে যাত্রা শুরু করলে থালাসেরির কীলেরি কুনহিকিন্নান যে প্রদীপের আলো জ্বালিয়েছিলেন, সেই আলোকবর্তিকা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল বলেই উত্তর ভারত দক্ষিণ ভারত পশ্চিম বা পূর্ব, ব্যক্তিগত মালিকানায় সার্কাসদলগুলি গড়ে উঠেছিল, প্রসার লাভ করেছিল, বিশ্ব-সার্কাস মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছিল।

পূর্ব ভারতে সার্কাসশিল্প গড়ে উঠেছিল বাংলাকে কেন্দ্র করে। সেই সার্কাসশিল্পের সুতিকাগার উনিশ শতকীয় নবজাগরণের কলকাতা।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply