রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১৯। অনুবাদে অর্ণব রায়
এখানে বলে রাখি, আউট ফ্যাক্টরি হল মূল ফ্যাক্টরি বা বড় ফ্যাক্টরির একটা শাখামাত্র। তোমরা বোধহয় ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছ, কোনও একটি সংস্থার অধীনে বিপুল পরিমান জমি নিয়ে নীল চাষ করা হয়। যেমন এখানে সংস্থাটি হল মূলনাথ। কখনও কখনও জমি একাধিক চাষীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে সেটা করা হয় জমির পরিমান খুব বেশী হলে তবেই। সুতরাং, এই দুই ক্ষেত্রেই কাজকারবার এতটাই বিস্তৃত ও এতদূর ছড়ানো যে সেগুলোকে একার দ্বারা সামলানো সম্ভব নয়। তার জন্য আলাদা আলাদা ব্যাবস্থাপনা থাকা দরকার। আর সেই কারনেই সংস্থার বিভিন্ন কাজ বিভিন্ন সহকারী প্ল্যান্টারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। যেমন, এই ফসলটি চাষ করার সময় ইউরোপীয় ধাঁচের রক্ষণাবেক্ষণ দরকার। আর যখনই আমি এই ফসলটির কথা বলছি, জানবে, একবার কাটা হয়ে গেলে নীলগাছ খুব দ্রুত পচে যায়। ফলে বুঝতেই পারছ, একটা বিশাল অঞ্চলের ফসল কেটে তারপর এক জায়গায় জড়ো করে তারপর সেই বিপুল পরিমান ফসল কোনও বিশেষ একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া (যার দূরত্ব হয়ত পঞ্চাশ মাইল), একরকম অসম্ভব কাজ। আর যদি পচে যাওয়ার সমস্যা নাও থাকত, তাহলেও কি এত পরিমান ফসল এতটা দূরে বয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হত? সুতরাং, আউট ফ্যাক্টরি হল সেই জায়গা যেখানে আশেপাশের এলাকার ফসল কেটে দ্রুত নিয়ে যাওয়া যায়। ফসলের মরশুমে একজন সহকারী প্ল্যান্টার এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। যদি তিনি বিবাহিত হন, মানে সবদিক থেকে দেখতে গেলে সেটা হওয়াই কাঙ্ক্ষিত, তাহলে এটাই তার বাড়ি হয়ে যায়। আর যদি তিনি অবিবাহিত হন, তাহলে তার এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াবার স্বাধীনতা থাকে। বিশেষ করে যখন ফসল বোনার সময় ও ফসল থেকে নীল উৎপাদন করার সময় একজনের নজরদারির খুব প্রয়োজন হয়। তিনি এই সময় ঘুরে ঘুরে সবকিছুর ওপর নজর রাখতে পারেন।
বগাডাঙা আধাআধি রাস্তা। এই জায়গাটাকেই আমরা ঘোড়াদের, চাকরদের ও আমাদের বিশ্রামস্থল হিসেবে ঠিক করে নিয়েছিলাম। ফলে আমরা বাকী দিনটা এখানেই থেকে গেলাম। ঠিক যেভাবে একজন প্ল্যান্টার আর একজন মফঃস্বলের যাত্রী গ্রামে গ্রামে যাত্রা করার সময় থাকে, সেভাবে। ট্রেনে করে যাতায়াত করার সময় যেরকম হুড়োহুড়ি করতে হয়, সেরকম ভাবে একেবারেই নয়, বরং অনেক ধীরেসুস্থে, আরাম করে। তা বলে এটা ধরে নিও না যে একজন প্ল্যান্টার দিনে ষোল মাইলের বেশী যাত্রা করতে পারে না। যদি দরকার পরে, আর চাষের মরশুমে এরকম দরকার হামেশাই পড়ে, তাহলে বারবার ঘোড়া বদলে তারা দিনে তিরিশ থেকে চল্লিশ মাইল অবধি চলে যেতে পারে।
পরের দিন সকালে আবার চাকরদের মালপত্র দিয়ে আগে পাঠিয়ে দেওয়া হল। আমাদের যাত্রার ব্যাবস্থা আগের দিনের মতই থাকল। ফেরিনৌকায় নদী পার হয়ে আমরা আবার ঘোড়ায় চড়ে কৃষ্ণনগরের দিকে চললাম। সেটা মোটামুটি আরও ষোল মাইল দূরে। মাঝখানে আর একটা জায়গায় নদী পার হতে হল। জায়গাটার নাম হাঁসখালি (মানে হাঁস চলার নদী)। সেখানে গিয়ে দেখলাম একখানা বড় ভৌলিয়া নৌকা দাঁড়িয়ে আছে। জানতে পারলাম এইচ— অ্যান্ড ডাব্লিউ— কোম্পানির অতি পরিচিত প্ল্যান্টার মিঃ এইচ— কিছুক্ষণ আগেই নেমেছেন ও কৃষ্ণনগরের দিকে গেছেন। আমরা করলাম কী, আমরা আমাদের ঘোড়া ছেড়ে ওনার রেখে যাওয়া ঘোড়াগুলোয় চড়ে রওনা দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই যে হাতিটা তার মালপত্র বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সেটাকে পার করে গেলাম। এই পার করার সময় আমি যে ঘোড়াটায় ছিলাম, হাতি দেখে সেটা এত ভয় পেয়ে গেল যে তড়বড় করে ছুটে আমাকে নিয়ে একটা বড় গর্তের মধ্যে পড়ছিল প্রায়। যাই হোক একটু পরেই আমরা মিঃ এইচ— ও তার সঙ্গীদের ধরে ফেললাম। মিঃ এইচ— একটা খুব সুন্দর বার্মার ছোট ঘোড়া চড়ে যাচ্ছিলেন। ভদ্রলোককে দেখে মনে হল, তিনি জীবনের এমন একটা স্তরে এসে পৌঁছেছেন যখন ঘোড়ার পিঠে চেপে দিনমান ছুটোছুটি আর তাঁর ভালো লাগছে না। বাকী পথটা তাই আমরা পায়ে হেঁটেই গেলাম।
কৃষ্ণনগরে ঢোকার রাস্তাটা এত সুন্দর আর গাছে ভরা যে দেখে মনে হয় কোনও ইউরোপীয় শহরের কাছাকাছি চলে এসেছি। টিক গাছে ছাওয়া চওড়া রাস্তা, ছায়াভরা আর অতিশয় মসৃণ। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর এই রাস্তা কিছুটা সরু হয়ে একটা স্থানীয় বাজারের মধ্যে দিয়ে যায়। এখানে একটা ছবির মত সুন্দর আর সম্ভ্রম উদ্রেগকারী হিন্দু স্থাপত্যকলায় নির্মিত প্রবেশপথ বা তোরণ রয়েছে। এই প্রবেশপথটি আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর স্থাপত্যের নিদর্শন। রাস্তাটা তার তলা দিয়ে গেছে। এটা একটা চতুস্কোণ বাড়ি বা মিনারও বলা চলে। এখন ধীরে ধীরে ধ্বংস্তুপে পরিণত হচ্ছে। চারপাশ থেকে অনেক খিলানের কোনা বেরিয়ে আছে। এই খিলানগুলি একসময় বিশাল বিশাল কাঠের বাঁকানো দরজা ধরে থাকত। দেখে মনে হয়, এই ধ্বংস্তুপটা আসলে রাজবাড়ির বাইরের মিনার বা দরজা। এই রাজাবাড়ি এখন রাজা শিরীষ চন্দ্র রায়ের বাসস্থান। এই বাড়িটির দক্ষিণের খিলান পার করে চওড়া মসৃণ পথ দিয়ে আমরা কৃষ্ণনগরে প্রবেশ করলাম। আমার জীবনে এই প্রথম আমি কোনও সিভিল স্টেশনে পা রাখলাম।
নিশ্চই বলে দিতে হবে না, সিভিল স্টেশন হল মিলিটারি স্টেশনের ঠিক বিপরীত একটা শহর। এখানে ওই কোর্ট আর অন্যান্য সরকারী অফিস, তাতে কাজ করা সরকারী কর্মচারী, এরা সব থাকে। বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো এই শহরের আইন-কানুন, দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলা, কর আদায় ব্যাবস্থা— সব এখানেই থাকে।
প্রথমেই বলি, এখানে একজন জাজ থাকেন। তাকে সিভিল বা সেসনস্ জাজ বলা হয়। তিনি এখানকার প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। তার কোর্টকে আপিল কোর্ট বা আপিল আদালত বলা হয়। অর্থাৎ নিম্ন আদালত থেকে আপিলের মাধ্যমে মামলা এই আদালতে আসে। যে সমস্ত দেওয়ানী মামলার কাগজপত্র ইংরেজীতে লেখা এবং যেখানে মামলায় দাবীর অঙ্ক ৫০০০ টাকার বেশী নয়, তিনি এই আদালতে সে সমস্ত মামলার বিচার করতে পারবেন। অন্যদিকে ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে তিনিও তার জেলায় ঘটে যাওয়া যে কোনও মামলার বিচার করতে পারবেন। আর এই জেলার বিস্তার তিন থেকে চার হাজার বর্গ কিলোমিটার। তার যেকোনও ব্যাক্তিকে সাতদিনের জেল হেফাজত দেওয়ার অধিকার আছে, তবে সেই ব্যাক্তি ব্রিটিশ হলে সে তার এক্তিয়ারের বাইরে থাকবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট তার কেস সুপ্রিম কোর্টে বা মহারাণীর কোর্টে পাঠিয়ে দেবে।
আইনের চোখে ব্রিটিশদের এই বিশেষাধিকারকে ন্যায়সঙ্গতভাবেই এত মূল্য দেওয়া হত এবং এত দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা হত যে কয়েক বছর আগে কোনও এক প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে এই সুরক্ষা কবচকে খর্ব করার সামান্য চেষ্টাতেই কলকাতাতে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল এবং টাউন হলের সামনে বিপুল পরিমান মানুষ মিছিল ও ক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল। এখনও দিনটিকে ব্ল্যাক অ্যাক্ট মিটিং বলে স্মরণ করা হয়। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত একটা আপোসে আসা গেছিল। জাজের হাতে দেওয়ানী মামলার বিচার করার পূর্ণ অধিকার রইল, কিন্তু যে বিষয়টি আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও সকলের কাছে বেশী আপত্তিজনক, সেই ফৌজদারী মামলা, তাতে শাস্তি দেওয়ার অধিকার এবং কারও ব্যাক্তি স্বাধীনতা হরণ করার অধিকার জাজের হাত থেকে সম্পুর্ণ তুলে নেওয়া হল।
তোমাদের মনে হতে পারে, এরকম কেন? বিচার তো সকলের জন্য সমান হওয়া উচিৎ, তাই না? নিশ্চই— আর মুর্গী রান্নায় যে ঝোল হবে, মোরগ রান্নাতেও সেই ঝোলই হওয়া উচিৎ। এর উত্তরে বলা যেতে পারে, কোনও ব্যাক্তির বিচার তার সমকক্ষ ব্যাক্তির দ্বারাই হওয়া উচিৎ। যদি বিজেতা হিসেবে, শাসক হিসেবে, তাদের সভ্যতার উন্নয়নকারী হিসেবে বা শিক্ষক হিসেবে আমরা নিজেদের তাদের থেকে উন্নত মনে করি, তাহলে ছাত্রদের শিক্ষকদের স্তরে তুলে নিয়ে এস, যারা উন্নততর স্থানে বসে আছে, তাদের অবনমন ঘটিও না।
(ক্রমশ)
