কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২২। শোভন সরকার
গত পর্বে: বিষণ্নতা ও খিদের ভার থেকে আমাদের মুক্ত করল কাশীর এক জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। তারপর শিবম শোনাল মুঘল আমলের তাওয়াইফদের স্বর্ণযুগের কথা।
‘দেখ, ব্রিটিশরা এদেশে এসে যখন ধীরে ধীরে নিজেদের শাসন কায়েম করল, তারা এমন উপনিবেশ তৈরি করতে চাইল যার মানুষেরা হবে জাতে ভারতীয়, কিন্তু স্বভাবে ইংরেজ। তারা চাইল এখানকার মানুষদের ‘সভ্য’ করতে।’
‘ঠিকই বলেছ শিবম, ওদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল যে এদেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে নিজেদের ভিক্টোরিয়ান মরালিটির নিক্তিতে মাপা — মানে ঐ ধর বাড়ির কর্তা গোছের ব্যবহার, এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না।’
‘তাও মানা যেত, কিন্তু ওরা জোর জবরদস্তি করে সব কিছুকে নিজেদের রুচির চেনা ছাঁচে ফেলতে চাইল। সিপাহী বিদ্রোহে এদেশীয় রাজা-বাদশাহ থেকে শুরু করে সমাজের নানা শ্রেণীর মানুষের কাছ থেকে ইংরেজরা যখন বেশ বড়সড় ধাক্কা পেল, তাতেই তারা নড়েচড়ে বসল। আচ্ছা, তুমি কানপুরের আজীজন বাই-এর নাম শুনেছ? সিপাহী বিদ্রোহের কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল।’
‘না, এরকম কারও নাম শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।’
‘ইনি কানপুরের এক বিখ্যাত তাওয়াইফ ছিলেন।শোনা যায় সিপাহী বিদ্রোহের আবহে ইনি নিজেই গিয়ে নানা সাহেবের সাথে হাত মেলান। আজীজন বাই বিভিন্ন সময়ে তাঁর কোঠিতে আসা ইংরেজদের থেকে খবরাখবর সংগ্রহ করে গোপনে পৌঁছে দিতেন নানা সাহেবকে। তারপর কানপুরের ইংরেজদের উপর হামলা চালানোর সময় নিজের দলবল নিয়ে তিনিও সক্রিয় অংশ নেন। বন্দী হন। তাঁকে ক্ষমা চাইতে বলা হল। কিন্তু তা কি হয়? আজীজন বাই-কে ভেঙে ফেললেও মচকানো সহজ ছিল না। শেষে তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে মেরে ফেলা হয়।’
‘আশ্চর্য সাহস তো তাঁর! অথচ দেখো স্কুলের ইতিহাস বইতে এঁর কথা তো পড়ানো হয়না। তাওয়াইফদের কথা আজকের মানুষ কেবল গোপনে বলতেই পছন্দ করে। আচ্ছা বাদ দাও, সিপাহী বিদ্রোহের পর কী হল তুমি সেটা বল।’
‘হ্যাঁ, দেশের নানা প্রান্তে বিদ্রোহের পর বেশ বড়সড় একটা বদল এল। রানী ভিক্টোরিয়া ভারত শাসনের দায়িত্ব সরাসরি নিজের হাতে তুলে নিলেন, এরই প্রভাবে এদেশীয় শাসকদের নবাবগিরি-রাজত্ব-জমিদারি সব অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মুছে দেওয়া হতে লাগল।’
‘একটা ব্যাপার কিন্তু শিবম মানতেই হবে যে ব্রিটিশ রাজ ভারতে এসে অনেক উন্নতি সাধন করেছে। ওদের ভুল বা দোষ, যাই বল না কেন, ছিল আসলে ওদের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার আর ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি অশ্রদ্ধা, অসহনশীলতার ভাব।’
‘একদম তাই। রানির শাসনের সময় ভারতীয় উপমহাদেশে আইন-কানুন ঢেলে সাজানো হয়। তখন ইংরেজদের আইন-কানুনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় হিন্দু ব্রাহ্মণ বা মুসলিম মৌলবীদের একপাক্ষিক গোঁড়া দৃষ্টিভঙ্গী। ভারতীয় উপমহাদেশের মত বিস্তৃত এলাকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বা বিশ্বাসের মানুষ বা পিছিয়ে পড়া জনজাতি তাদের ধর্তব্যের মধ্যেই এলো না। ফল যা হবার তাই হল, বুঝলে। ব্রিটিশ রাজ শুরু হলে সেই প্রাচীনপন্থী আইন-কানুনের হাত ধরেই তাওয়াইফ বা বাইজিদের প্রকাশ্যে নাচ-গান অত্যন্ত হীন নজরে দেখা শুরু হল। সোজা কথায় তারা এই সমস্ত উঁচুদরের শিল্পীদের ‘বেশ্যা’ বলে দাগিয়ে দিল। তাদেরকে ইংরেজরা ‘তাওয়াইফ’ বা ‘বাইজি’র মত সম্মানজনক শব্দের বদলে ‘নচ গার্ল’ (বাংলা ‘নাচ’ থেকে ব্রিটিশদের মুখে ‘নচ’) বলে উল্লেখ শুরু করল।’
‘কেন, ‘নচ গার্ল’ বললে সমস্যা কোথায়?’
‘দেখো, অর্থগতভাবে এমনিতে শব্দটায় কোন সমস্যা নেই, সমস্যা ছিল তাদের ইঙ্গিতে, তাদের অস্তিত্বের লঘুকরণে, বাইজিদের আকাশছোঁয়া সম্মানের সিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে ধূলোয় ছুঁড়ে ফেলার মত ব্যাপার আর কি। যাই হোক, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইংরেজদের এই শুচিবাইয়ের পরিণতি হল ‘অ্যান্টি-নচ মুভমেন্ট’ বা ‘নাচিয়ে-বিরোধী আন্দোলন’।’
‘আন্দোলন? এত বড় ব্যাপার?’
‘হ্যাঁ। তবে আধুনিক ভারতে আন্দোলন বলতে যেমন রাস্তায় নেমে পড়ে অন্যায়ের বিরোধিতা করে যে আন্দোলন দেখি, সেরকম ব্যাপারটা ছিল না, বরং ধীরে ধীরে সমস্ত সমাজ ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত আর কি। ঐ ধর, সামাজিকভাবে তাদের বয়কট করা, তাদের ‘পতিতা’ হিসেবে ঘৃণার নজরে দেখার অভ্যাস তৈরি করা। এদের ভিলেন বানিয়ে নানা সংস্থা স্থাপিত হল, এদের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয়রাও সক্রিয় অংশ নিল কিন্তু। দাঁড়াও, এদের লেখা একটা জিনিস পড়ে শোনাই তোমাকে।’
শিবম মোবাইল বের করে ইন্টারনেট ঘেঁটে কিছু একটা খুঁজল। বলল, ‘এই দেখ, ‘সোশাল সার্ভিস লীগ, মুম্বই’, ‘পাঞ্জাব পিওরিটি আসোসিয়েশন, লাহোর’ এসব তখনকার সময়ের এরকমই কিছু সংস্থা। এই দেখ এখানে তাওয়াইফদের বিরুদ্ধে এদের একটা প্রচারের কিছু লেখা তুলে দিয়েছে, তোমাকে পড়ে শোনাচ্ছি।
‘…চক্ষে এর নরকের দ্বার, বক্ষে এক সাগর বিষ, কটিদেশে নরকের আগুন। তার দুই হাত যেন শানিত ছোরা, একবার যে সব পুরুষ তার কবলে পড়েছে, তাদের নিশ্চিত বলির অপেক্ষা শুধু। তার মিঠে কথা ভারতের ধ্বংসের পথ, হায়রে, তার হাসিই হল ভারতের মরণবাণ।’ দেখলে? বোঝো, এরকম যদি চলতে থাকে তাহলে বেচারি তাওয়াইফরা আর যায় কোথায়!’
‘সেই নবাব, রাজা-বাদশাহ এঁরা যে তাওয়াইফদের এত খাতির করত, তাঁরা কেন পিছু হঠলেন?’
‘বললাম না, ব্রিটিশ রাজ শুরু হওয়ার পর থেকে এদের সমস্ত ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হল ধীরে ধীরে। তাদের রাজস্ব আয়ের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেল। আর আয় বন্ধ হলে কী করে তাওয়াইফদের পয়সা দেবে বল?’
‘হুম। আচ্ছা, তুমি ‘জলসাঘর’ সিনেমাটা দেখেছ? সত্যজিৎ রায়ের, ১৯৫৮ সালের সিনেমা। হঠাৎ ঐ সিনেমার জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের কথা মনে পড়ে গেল। এক সময়ের বিলাসিতা ও প্রাচুর্যের ক্ষয়ে যাওয়ার গল্প। আচ্ছা, এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছি, কী ভয়ংকর সংকট এসে উপস্থিত হয়েছিল এদের জীবনে।’
‘সিনেমাটা দেখিনি এখনও, দাঁড়াও আজকেই দেখব গিয়ে। তবে তুমি যে সংকটের কথা বলছ, সেটা বেনারসের তাওয়াইফদের কাছে রূঢ় বাস্তব হয়ে পড়েছিল। সমাজের কেউই যখন এই তাওয়াইফদের আশ্রয় দিল না, রাস্তায় বেরোলে অপমান করতে লাগল, বেঁচে থাকার তাগিদে অনেকে সত্যি সত্যিই পতিতালয়ে ঠাঁই নিতে বাধ্য হল। সেই সঙ্গে কত্থক, ঠুমরি, দাদরা, টপ্পা, গজল এসব তো হারিয়েই যেতে বসল।’
‘তুমি কোন সময়ের কথা বলছ?’
‘বিংশ শতাব্দীর শুরুর কথা। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন তখন জোর কদমে চলছে।’
‘তুমি তো এতক্ষণ মূলত সমস্ত উত্তর ভারতের তাওয়াইফদের কথা বললে। কিন্তু বেনারসের তাওয়াইফদের তখন কী অবস্থা?’
‘বেনারসের তাওয়াইফরা গান্ধীজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯২০ সালের নভেম্বরে গান্ধীজি বেনারসে আসেন, নানা জায়গায় বক্তৃতা দেন। টাউন হলে প্রায় কুড়ি হাজার লোকের ভিড়ে মিশে ছিলেন বেনারসের এক অন্যতম সেরা তাওয়াইফ বিদ্যাধরী বাই আর তাঁর দলবল। উৎসাহিত হয়ে বিদ্যাধরী জলসায় কেবল দেশভক্তিমূলক গান গাইতে শুরু করলেন। শুধু তাই নয়, রীতিমত খাদির কাপড় পরা শুরু করলেন তিনি। নিজের বাড়িতে মাঝে মাঝেই অন্য তাওয়াইফদের সঙ্গে মিটিং করে তাঁদেরও গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে শুরু করেন।’
‘আমার চোখের সামনে যেন ভাসছে। এক দাপুটে মহিলা একা হাতে দেশের সংস্কারের কাজে নেমে পড়েছেন।’
‘বিদ্যাধরী সত্যিই অত্যন্ত প্রতিভাধর আর প্রভাবশালী মহিলা ছিলেন। একইরকম ছিলেন হুসনা বাইও। সেই সময় তিনি ছিলেন বেনারসের তাওয়াইফদের ‘চৌধুরাইন’, অর্থাৎ প্রধান। হুসনা বাইয়ের ‘রাজা দরোয়াজা হাভেলি’-তে ১৯২১ সালে বেনারসের সমস্ত তাওয়াইফদের নিয়ে এক বিশাল সভার আয়োজন করা হল। সবাইকে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে স্বদেশী পণ্য গ্রহণ করতে আহ্বান করলেন। সভায় সিদ্ধান্ত হল যে কোথাও কোন রকম অশ্লীলতা প্রদর্শন করা চলবে না, জীবনধারায় পরিবর্তন এনে দেশের সেবায় লেগে পড়তে হবে।
সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতিতে ভিন্ন রঙ লাগতে শুরু করল। গণিকাবৃত্তির প্রতি গান্ধীর নেতিবাচক মনোভাব বরাবরই ছিল। গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত মানুষেরা এবার বেনারসের দালমাণ্ডিতে তাওয়াইফদের সেই মনোভাব নিয়েই দেখতে শুরু করল। মন্দিরে মন্দিরে তাওয়াইফদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ও সমালোচিত হতে থাকল, আনন্দ-উৎসবের অনুষ্ঠানে এঁদের অংশগ্রহণের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হল। এমনকী বহু বছর ধরে চলে আসা বুধোয়া মঙ্গল উৎসবও বন্ধ হয়ে গেল।
এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ল বেনারসের তাওয়াইফদের জীবনধারায়। যে সমস্ত স্থানীয় ধনী ব্যাক্তিরা তখনও এঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিল, তারা এবার পিছু হঠল। এঁরা শাসক বল বা স্বদেশী — সবার কাছে সমানভাবে ঘৃণ্য হয়ে উঠলেন, এ যেন ব্রিটিশদের ‘অ্যান্টি-নচ মুভমেন্ট’-এরই বর্ধিত রূপ। আর একটু আগেই বললাম, এসবের কারণেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হল ঠুমরি, টপ্পা, দাদরা, বা কত্থকের মত ধ্রুপদী সঙ্গীতের ধারা। উচ্চশ্রেণির তাওয়াইফরাই তো এই উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত ধারার অঘোষিত রক্ষক ছিলেন।’
‘দাঁড়াও, দাঁড়াও! এক সঙ্গে এত কিছু কীভাবে আমি বুঝব শিবম। হ্যাঁ, আমি এটা বুঝলাম যে কীভাবে সিস্টেমেটিক্যালি সমস্ত তাওয়াইফদের একঘরে করে দিতে দিতে একেবারে অদৃশ্য করে দেওয়া হল তথাকথিত নীতিমান সমাজ ব্যবস্থায়। কিন্তু তুমি কী একটা উৎসবের নাম বললে…’
‘বুধোয়া মঙ্গল।’
‘হ্যাঁ, এই নাম আমি প্রথম শুনলাম। কী ব্যাপার এর? তাছাড়া বেনারসের কত্থক কিংবা ঠুমরি-টপ্পা শুনেছি বেশ স্বতন্ত্র। সেগুলোর কথা জানতেও ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে আমার এবার।’
(ক্রমশ)
