কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৫৪। শোভন সরকার

গত পর্বে: ম্যাজিস্ট্রেট ডেভিস সাহেব নিজের বাংলোয় এক ভয়ংকর আক্রমণের মুখোমুখি হলেন। বুদ্ধি খাটিয়ে বেঁচে গেলেন। কিন্তু রক্ষা পাননি চেরি সাহেব।

ঘোড়সওয়ার সেনাদলের মুখে ডেভিস সাহেব শুনলেন চেরি সাহেবের বাংলোয় ঘটে যাওয়া হত্যালীলার বিবরণ। সেদিন সকালে ওয়াজির আলী যখন চেরি সাহেবের বাংলোয় পৌঁছালেন, সাহেব তাঁকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। সঙ্গে সশস্ত্র লোকজন দেখেও তাঁর বিশেষ সন্দেহ হয়নি। ওয়াজির যে সঙ্গে সবসময় সেপাই রাখেন তা বেনারসের সবাই ততদিনে অনেকবার দেখেছেন। তাঁকে ভেতরে প্রাতঃরাশের জন্য নিয়ে গেলেন সাহেব। সঙ্গে ঢুকল আরও জনা চারেক লোক। তাঁকে চা খেতে দেওয়া হল, কিন্তু তিনি কিছুই মুখে তুললেন না, বরং তাঁকে ক্যালকাটা সরানোর ব্যাপারে শোর সাহেবের সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ জানাতে শুরু করলেন। ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে গলা চড়ালেন। চেরি সাহেবের দিকে আঙুল তুলে বললেন যে তিনিই এই সব কিছুর জন্য দায়ী। 

এসব কথা বলতে বলতেই কখন ওয়াজির আলীর লোকেরা এসে চেরি সাহেবকে শক্ত করে চেপে ধরে ফেলল। ওয়াজির আলীও তলোয়ার খুলে তাঁর উপর হামলা করলেন। প্রথমে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেও আহত চেরি সাহেব সেই অবস্থায় পালাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু রক্ষা হলো না। তাঁকে সেই মুহূর্তে শেষ করে ফেলা হল। চেরি সাহেবের সঙ্গী আরও যে ইংরেজরা ছিলেন, তাঁদেরও একই দশা হল। এর পরেই ওয়াজির আলী তাঁর দলবল নিয়ে ডেভিস সাহেবের বাংলোয় চড়াও হলেন, কিন্তু প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও সাহসের জোরে তিনি বেঁচে গেলেন। 

সেদিনই সন্ধ্যা নাগাদ মাধোদাসের বাগানবাড়ি দখল নেওয়ার পর ব্রিটিশ বাহিনী বুঝতে পারল যে ওয়াজির আলী পালিয়ে গেছেন। তাঁর পেছনে ধাওয়া না করে তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হল। কোনোরকম অশান্তি রোখার জন্য চুনারের জেনারেল এরস্কিন সাহেবকে চার মাস বেনারসে সৈন্যসহ রেখে দেওয়া হল। 

এই হত্যালীলার ষড়যন্ত্র নিয়ে তদন্ত শুরু হলে উঠে এল বেশ কিছু নাম — জগৎ সিং, ভবানীশঙ্কর সিং, শিবনাথ সিং, মহাদেব সিং তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ঘটনার পর ওয়াজির আলী পালিয়ে গেলেও দেখা গেল এঁদের মধ্যে কেউই বেনারস ত্যাগ করে যাননি। ঘটনার প্রায় দু’ মাস পর, একে একে এঁদের সবাইকে বন্দী করে বিচারে তোলা হল, কেবল শিবনাথ সিং ও মহাদেব সিং ছাড়া। এই দু’জনের ঠিক কী হল, সে ব্যাপারে বিস্তারিত আমরা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা করব। বরং এখন ওয়াজির আলীর কী অবস্থা সেদিকে নজর দেওয়া যাক। এক বছরের মধ্যে জয়পুরের রাজার সাহায্যে তাঁর রাজ্য থেকে উদ্ধার করা হল ওয়াজির আলীকে। জয়পুর থেকে প্রথমে তাঁকে বেনারস এবং পরে ক্যালকাটায় নিয়ে যাওয়া হল। কাকতালীয়ভাবে, যেদিন তাঁকে বেনারস ফেরত আনা হল, সেদিনই বেনারস হত্যালীলার এক বছর পূর্ণ হল। 

বিচারে ওয়াজির আলীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১৮১৭ সালে ফোর্ট উইলিয়ামে ইংরেজদের হাতে বন্দী অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। অপরদিকে, জগৎ সিং ও ভবানীশঙ্করকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ভবানীশঙ্করের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী হলেও কোনো কারণে জগৎ সিংকে শেষমেশ দক্ষিণ অতলান্তিক মহাসমুদ্রের মাঝখানে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, এই সেই বিখ্যাত সেন্ট হেলেনা দ্বীপ যেখানে পরবর্তীতে ফরাসি সামরিক নেতা সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে আমরণ নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। 

কিন্তু বাবু জগৎ সিং সেই দ্বীপে গিয়ে কী করলেন? 

ঘটনাচক্রে এই আত্মাভিমানি ব্যক্তিকে সেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। নির্বাসনের জন্য হেলেনা দ্বীপের উদ্দেশে যখন তাঁকে নিয়ে নদীপথ বরাবর নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, বঙ্গোপসাগরের ‘কালাপানি’ পর্যন্ত পৌঁছানোর পূর্বেই তিনি গঙ্গাসাগরে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণত্যাগ করেন।

বাবু জগৎ সিং সম্বন্ধে ইতিহাস এই পর্যন্ত বলে এতদিন চুপ হয়ে ছিল। কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর তখনও অজানা। অপার কৌতূহল নিয়ে তাঁর বর্তমান প্রজন্মের উদ্যোগে ২০২৩-২০২৪ সালে সম্পন্ন এক গবেষণায় ইতিহাসের গভীর নীরবতা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এমন কিছু সত্য যা বেনারসের ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে। সে কথায় আসছি অচিরেই। কিন্তু তার আগে আমাদের বোঝা দরকার ইতিহাসের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারটি। 

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে ইংরেজদের লেখা ইতিহাসের অধিকাংশ স্বাভাবিকভাবেই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। কাজেই তাতে পক্ষপাতদুষ্টতা কোন ফাঁকে ঢুকে পড়ে তা আমরা বুঝতেই পারি না। উদাহরণ দিই। ১৭৯৯ সালে চেরি সাহেবের বাংলোয় ঘটে যাওয়া হত্যালীলার যে বিবরণ আমরা পড়লাম, তার মূল সূত্র হিসেবে আমি ডেভিস সাহেবের পুত্র স্যর জন ডেভিসের লেখা বিবরণকে ব্যবহার করেছি। পিতা ডেভিস সাহেবের সঙ্গে ওয়াজির আলীর লোকজনদের লড়াইয়ের প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। কাজেই তাঁর বিবরণ বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু তাঁর কিংবা অন্য যে সমস্ত ব্রিটিশ আধিকারিকদের লেখায় এই ঘটনার উল্লেখ পাই, তা পড়ে ওয়াজির আলী এবং তাঁর সমস্ত সহযোগীদের ইতিহাসের কিছু খলচরিত্র ছাড়া অন্যথা বলে মনে হয় না। কিন্তু সত্যিই কি তাই? ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে আমরা নিজেদের দৃষ্টিতে আমাদের পূর্বপুরুষদের অনুসন্ধান করলে তাঁরা আমাদের কাছে নতুনভাবে ধরা দেন। 

ওয়াজির আলীর উদ্যম ইংরেজদের অভিসন্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল বলেই কি তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি? লখনৌ, বেনারস এবং কোলকাতার মধ্যে ব্যবসায় ব্রিটিশ কোম্পানি বেশ ভালো লাভের মুখ দেখছিল। সেই সময় দাঁড়িয়ে অবধের নবাব যদি তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে পড়ে তো তাঁকে তো যেনতেন প্রকারেণ ক্ষমতা থেকে সরাতেই হয়। অন্যায়ভাবে সত্যিই যখন তাঁকে সরানো হল, ওয়াজির আলী অবধ, বেনারস, এমনকি শেষ পর্যন্ত ক্যালকাটা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করার উদ্যোগ নেন। এত বড় একটা পরিকল্পনায় তিনি সফল না হলেও এক কিশোর হয়ে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মতো এত বড় সংস্থাকে স্পর্ধা জানানোর সাহসকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আবার ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের অনেক আগে বেনারসের বুকে ওয়াজির আলীর নেতৃত্বে হওয়া এই বিদ্রোহকে কেউ ভারতের স্বাধীনতার প্রথম আন্দোলন বলে দাবি করলে তা নস্যাৎ করে দিতেঅ পারি না।  

বাবু জগৎ সিং ঔপনিবেশিক ইতিহাসে চাপা পড়ে যাওয়া ঠিক এমনই এক ব্যক্তি। ব্রিটিশদের অসহযোগিতার কারণে তিনি কাশীর সিংহাসন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে নিজে মনে করতেন। কাজেই তাঁর সঙ্গে বঞ্চিত নবাব ওয়াজির আলীর গড়ে ওঠা সম্পর্ক খুব অযৌক্তিক নয়। কিন্তু জগৎ সিংয়ের সাথে কাশীর রাজবংশের সম্পর্কটা ঠিক কী? 

আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি যে কাশীর ভূমিহার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জমিদার মনোরঞ্জন সিংয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র মনসারাম। তাঁর আরও তিন ভাই ছিল — দাসরাম, মায়ারাম এবং দয়ারাম। মনসারাম বেনারস অঞ্চলের জমিদারি লাভ করলে তিনি ভাই দাসরামকে শিবপুর ও কাটিহারের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করলেন। এই দাসরামের পুত্র শিবলাল সিং এবং শিবলালের চতুর্থ পুত্র হলেন আমাদের আলোচ্য জগৎ সিং। তিনি শিবপুর, কাটিহার, নাদেসর ও বরুণা নদী সংলগ্ন এলাকার ইজারা লাভ করেন। সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে গোলমালের সুযোগে বেশ কয়েকবার জগৎ সিং নিজে সিংহাসনে বসার দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, কিন্তু ইংরেজদের অনুমোদন মেলেনি। মনে মনে তাদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ রয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এরই মধ্যে আনুমানিক ১৭৮৭-৮৮ সাল নাগাদ এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। বাবু জগৎ সিং তখন জগৎগঞ্জ নামে এক নতুন শহরতলি পত্তনের কাজে ব্যস্ত। শ্রমিকদের মধ্যে কেউ খোঁজ দিল যে তাঁর শিবপুর পরগণার মধ্যে সারনাথ বলে এক স্থানে এক বিশাল পরিত্যক্ত জংলা জমি রয়েছে। সেখানে নাকি অনেক পুরোনো ইট-পাথর পড়ে পাওয়া যায়। সেগুলো কাজে লাগালে কেমন হয়? প্রস্তাব মন্দ নয়। জগৎ সিংয়ের অনুমতি সাপেক্ষে তাঁর শ্রমিকের দল সেখান থেকে ইট-পাথর তুলে এনে সেগুলো জগৎগঞ্জের বাজার-ঘাট গড়ার কাজে ব্যবহার করতে লাগল। 

এ পর্যন্ত সবই ঠিক চলছিল। কিন্তু একদিন মাটি খুঁড়ে ইট তুলতে তুলতে তারা খুঁজে পেল বেলেপাথরের এক গোলাকার বাক্স। এ ধরনের জিনিস তারা আগে দেখেনি। সঙ্গে সঙ্গে খবর গেল জগৎ সিংয়ের কাছে। এবার সেই বাক্স খুলতেই তা থেকে বেরিয়ে এল সুন্দর সবুজ মার্বেল পাথরের এক চোঙাকার আধার! কী জিনিস এটা? লোকজনের ভিড় জমতে লাগল — বাচ্চা-বুড়ো সবাই চলে এসেছে আশেপাশের এলাকা থেকে। সবাই হাঁ হয়ে দেখছে। কিন্তু তাদের অবাক হওয়ার পালা তখনও শেষ হয়নি — সেই আধারের মধ্যে একে একে পাওয়া গেলো ক্ষয়ে যাওয়া প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ খানা মুক্তা, সোনার ন’খানা আর রূপোর আটখানা কানের ফুল, খান চৌদ্দ চুনি, এবং কোনো মানুষের হাতের তিন টুকরো অস্থি। এ তো এক স্মৃতি মঞ্জুষা! এ কার অস্থি? ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। 

কেউ বলল এ অস্থি নিশ্চয়ই কোনো সতী রাজমহিষীর হবে — স্বামীর মৃত্যুর পর চিতায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। অন্য কেউ আবার বলল যে সেটা যাঁরই হোক, হয়তো কোনো উপযুক্ত সময় এলে যথাযথ সৎকার করবে বলে পরিবারের লোকজন সেসব সংরক্ষণ করেছিল। 

এরকম আরও কত জনে কত কথা বলল। শেষে প্রশ্ন উঠল অত ভেবে কী কাজ? এখন যা কর্তব্য সেটাই করা হোক। বেনারসে যেমন কোনো মৃতের মুক্তির জন্য গঙ্গায় অস্থি বিসর্জন করা হয়, এঁর গতিও তাই হোক। 

অতএব, সেই অস্থি সসম্মানে গঙ্গাজলে বিসর্জন দেওয়া হল।

(ক্রমশ)

প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব

তৃতীয় অধ্যায় ‘ফিরে দেখতে যাওয়া’ প্রথম পর্ব

Disclaimer
The views and opinions expressed in this series are solely those of the author and do not represent the views, policies, or positions of any organisation, institution or society of any kind or the government. The content of this series is written in the author’s personal capacity and does not reflect any official information or stance.

Leave a Reply