চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর। পর্ব ১৬। দুর্লভ সূত্রধর

গত পর্বের পর

৪

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ

মরা-সাহেবের প্যান্ট

 

যেদিন প্রথম আমাদের পার্শ্ববর্তী জেলার প্রান্তিক, অভিজাত ও রাজনন্দিত পুরোনো অথচ একদা পরিকল্পিত এই জেলা শহরে একা নেমেছিলাম ট্রেন থেকে, সেদিন সামনে কোনো লক্ষ ছিল না। শুধু এই সত্যই ভেতরে কোথাও জেগে ছিল যে, আজ থেকে এক অজানা যাত্রায় আমি একা।

শহরের প্রাচীনতা কোথায় নেই এই শহরে? নামে, শের শাহের কিংবদন্তি সড়কে, সম্মতিনাথ নিগন্থ জ্ঞাতপুত্র অতিবীর মহাবীরের নাম-পরিচয়ে, মহার্ঘ বাগ-বাগিচায়, পুরোনো সৌধে, শাসকীয় তোরণে এই শহর অনন্য।

মফস্বলীয় ছোট্ট শহরের এক-আহাম্মকের অজানা যাত্রা শুরুর মতোই পুরোনো গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক বা জি টি রোড চলে গেছে এই শহরের পাশ দিয়ে। এই শহর থেকে হাওড়া যাওয়ার অজস্র লোকাল ট্রেন, প্রচুর দূরপাল্লার ট্রেনের ছুঁয়ে যাওয়া. নানাদিকে ডালপালা মেলে দেওয়া জংশন, প্রাচীনত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অটোমোবাইলের রমরমা।

প্রান্তিক হয়েও সদর!

 

কিন্তু সেদিন সেই বড়ো শহরের সমৃদ্ধির চোরা দম্ভের বিরাট দংষ্ট্রার সামনে আহাম্মক ছিল একা!

একা তো বোকা।

আহাম্মকেরা জন্ম-একা, জন্ম-বোকা।

হাতে তার আয়ুর্বেদিক ওষুধের ব্যাগ। পকেটে শহরের ডাক্তারবাবুদের একটি তালিকা। ফ্যান্টাস্টিক ডিস্ট্রিবিউটার-এর মালিক বিশু নাগ বানিয়ে দিয়েছেন।

পেটমোটা ওষুধের ব্যাগটি দেখলেই বোঝা যায় যে, সেটি কোনো ওযুধ কোম্পানির প্রতিনিধির ব্যাগ।

পরনে একটা স্ট্রেচলনের প্যান্ট। গায়ে সিল্কের জামা আর পায়ে বাটার অ্যামবাসাডর জুতো। এই ব্যাগ-হাতে, এই পোষাকে পারফেক্ট আহাম্মক দেখতে লাগে। কেননা এটা পুরোটাই েমকাপ, সাজানো।

 

প্যান্টটা আসলে ছিল মরা-সাহেবের প্যান্ট।

 

আমাদের সেই ছোট্ট প্রান্তিক শহরে খ্রীশ্চান জনসংখ্যা, বসতি এবং গির্জার সংখ্যা বিস্ময়কর। এর মধ্যে প্রটেস্ট্যান্ট, আর্মেনিয়ান, অ্যাংলিকান, লুথারানিয়ান, রোমান ক্যাথলিক— ইত্যাদি নানা সম্প্রদায়ের মানুষ ছিেলন। জানা যায়— প্রটেস্ট্যান্টরা এসেছিলেন আগে, পরে সম্ভবত প্রটেস্ট্যান্টদের শাখা অ্যাংলিকান সম্প্রদায় শহরে এসেছিলেন। রোমান ক্যাথলিকেরা এসেছিলেন অনেক পরে।

এখানে বিভিন্ন শ্রেণীর খ্রীশ্চান মানুষের আলাদা আলাদা পাড়া, িতনটি ছেলেদের ইস্কুল, িতনটি মেয়েদের ইস্কুল। শহরের রাস্তায় তখনও বিদেশি সাহেব ও খাঁটি ইংরেজ, স্কটিশ ও ইতালিয়ান ফাদার ও ব্রাদারদের দেখা মিলত। এই শহর থেকে অন্তত িতরিশ কিলোমিটার দূরের জেলার সদরে এবং অন্যত্র এবং বিশেষভাবে মহকুমা শহরগুলিতেও খ্রীশ্চান চার্চ ও ইস্কুল ছিল। আমাদের শহরটার মুকুটে সেসব পালকের কিছুমাত্র না থাকা সত্ত্বেও ছোট্ট শহরটাকেও কেন নিশনারি ধর্ম-প্রচারকেরা এতটা পছন্দ করেছিলেন তা চট করে বলা সম্ভব ছিল না।

উচ্চ জাতি ও বংশ গর্বে স্ফীত শহরের যাঁরা বিচক্ষণতার সঙ্গে জাতিপাতি নিয়ে সুকৌশলে মাথা ঘামাতেন, তাঁদের মত ছিল এই যে, হয়তো এখানকার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে একদা দারিদ্র্য ও অতি প্রাচীন ভূমিপ্রজ জনজাতি সম্প্রদায়ের বাসের আধিক্য থাকায় এই অঞ্চলটি খ্রীস্টিয় কর্তৃপক্ষের পছন্দের জায়গা হয়ে দঁাড়ায়।

একথার আপাত দৃষ্টিগ্রাহ্যতা সত্ত্বেও এমন কথা তাঁরা সযত্নে এড়িয়ে যেতেন যে, তদানীন্তনকালের বাঙালি জাতি-বর্ণের বিভাজনকে টিকিয়ে রাখা ও বর্ণগত পীড়নের একটা ব্যাপারকে তখনও কখনও চোরা, কখনও চড়া স্রোতের মতো মধ্যযুগীয় আহ্লাদে লালন করা হতো। সেই চাপ একদা নিমাই পণ্ডিতকে শ্রীচৈতন্যে পরিণত করেছিল— বঙ্গে কর্তাভজা, বলরামী, সাহেবধনী, খুশিবিশ্বাসী, সুফি, জাতবৈষ্ণবসহ অজস্র গৌণধর্ম দেখা দিয়েছিল। আর সেই অত্যাচারিত সমাজের ব্রাত্যত্ব ও দারিদ্র্যজনিত মনোবেদনার সুবিধা কলোনী ভারতের ঈষৎ পূর্বকাল থেকেই মিশনারিরাও পেয়েছিলেন। কিন্তু একথাও স্বীকার্য এই যে, এই অঞ্চলে আধুনিক িশক্ষা প্রসারের দায়ের অনেকটা প্রাথমিকভাবে মিশনারিরাও বহন করেছিলেন।

 

এইরকম একটা শহরে স্বাধীনতার পরও িবদেশী মানুষজনের আগমন ও তঁাদের চলাফেরার পরিচিত দৃশ্যের কিঞ্চিৎ আধিক্যের ছিল। কে জানে একদা এই শহর ও তার চারপাশে গড়ে ওঠা বিদ্যাচর্চাকেন্দ্রগুলির অতীতকথার মিথ, শহরটির ভৌগোসিক অবস্থান ইত্যাকার কারণের জন্যই জন্যই হোক অথবা জনশ্রুতি নির্মাণে আমাদের স্বভাবের কারণেই হোক এই শহরে ধর্মপিপাসু বিদেশি মানুষজনের যাতায়াত অক্ষুণ্ণ ছিল। হয়তো সেইসব কারণেই পুরোনো জামাকাপড়ের ব্যবসার সূত্রে ‘মরা সাহেবের প্যান্ট’-এর অভিধার ব্যবহার বেশ গেড়ে বসেছিল।

সেটা ১৯৭০-এর দশকের মধ্যভাগ। রাস্তাঘাটে, রাস্তার পাশের পায়ে-চলা পথের ওপর হামেশাই এই টেরিলিন, টেরিকট, স্ট্রেচলন বা গ্যাবার্ডিনের প্রায়-নতুন পুরোনো প্যান্টজামা বিক্রি হতো। নেহাৎই জনশ্রুতি ছিল এই যে, এগুলো সব নাকি ছিল প্রথম বিশ্বের পয়সাওয়ালা মানুষদের এক দুবার ব্যবহৃত পোশাক। এত এত প্রায় নতুন দেখতে পুরোনো পোশাক আসত কোথা থেকে তা ছিল সাধারণের কাছে রহস্যের। ধারণা ছিল একটু পুরোনো হলেই বিদেশের বড়োলোকেরা জামা-কাপড় বদলে ফেলে বা ফেলে দেয় আর এগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গরীব-গুর্বোরা কিনে পরে। এবং নানাবিধ ভাইরাসঘটিত ও চর্মরোগে আক্রান্ত হয়। শেষের কথাটিও জনশ্রুতিরই অঙ্গ ছিল এবং বলাই বাহুল্য এই সব জনশ্রুতির সঙ্গে সত্যের দূরত্ব ছিল যোজন যোজন।

 

কিন্তু সব দরিদ্রের মতো আমারও চর্মরোগের ভয় পেলে চলত না। এইরকম একটা পোশাক আমাকে জোগাড় করতেই হতো। গ্যাবার্ডিনের দাম তিন টাকা বেশি হওয়ায় অগত্যা স্ট্রেচলন তো স্ট্রেচলনই সই।

কিন্তু কীভাবে এত দরিদ্র হয়ে পড়েছিলাম তা বুঝতে গেল ব্যাপারটা আরও একটু গোড়া-ঘেঁষে বলতে হবে।

 

 

প্রথম পর্ব

পারিবারিক অগ্নুৎপাত

 

কলেজের পর পড়াশোনায় ইতি টেনে বসেই ছিলাম। পরের পর্যায়েও সুযোগ পেয়ে যেতাম। কিন্তু গোড়াতেই বাড়ি থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল অতঃপর পড়াশোনার জন্য কোনো পয়সা দেওয়া সম্ভব নয়। আসলে বৃহৎ সংসার একা চালিয়ে বাবা ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কাকার হাতে কিছুটা এসে পড়েছিল সংসারের ভার। কাকাই স্পষ্ট কার্কশ্য়ে বলে দিয়েছিলেন— দাদাদের কেউ কেউ সদ্য অল্পস্বল্প রোজগার করতে শুরু করলেও ন-দা, মেজদা, সেজদা আর ছোড়দির বাইরে থেকে পড়ার খরচ দিতে হচ্ছে, সুতরাং পারিবারিক ছোট্ট একটা ব্যবসা থেকে আমার পড়ার জন্য আর কিছু খরচা দেওয়া সম্ভব হবে না।

 

বাবার সঙ্গে কাকার বয়সের বেশ ফারাক ছিল। বাবাই তঁার থেকে ঢের ছোটো ভাইটিকে বড়ো করে তুলেছিলেন, বিয়ে দিয়ে নিজের ব্যবসায় স্থিতু করে দিয়েছিলেন।

কাকিমা গোলগাল, হাসিখুশি মানুষ। সারাদিন মা-কে সংসারে প্যালা দেওয়া, দুপুরবেলা বঙ্কিম বা শরৎচন্দ্রের একটা উপন্যাস বুকে নিয়ে ঘুম, আর দু-বেলা দু-খিলি পান ছাড়া সংসারে কাকিমার বিশেষ কোনো দাবিদাওয়া ছিল না।

 

কিন্তু কাকা ভয়ানক বুদ্ধিমান মানুষ।

তিনি তাঁর একমাত্র মেয়ে, আমাদের সুদিদির বিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছিলেন।

বাবার বয়সজনিত ক্লান্তির গোড়াতেই বাবার দোকান-দানি কাকা নিজের আর বাবার অংশের অভিভাবক হিসেবে নিজের নাম করে নিয়েছিলেন। ট্রেড-লাইসেন্সও কোনো এক ফাঁকে ট্রান্সফার করা হয়েছিল দু-জনের নামে। কাকা আর কাকার সবচেয়ে ন্যাওটা সেজদার নামে।

কাকার হিসাব ছিল নিখঁুত। দোকান অধিকারের আগে তিনি সেজদা-মেজদা-ন-দাকে অধিকার করেছিলেন।

আমার মতো আহাম্মকের পেছনে ইনভেস্ট করাটা বোকামি হবে তা জানতেন কাকা। সংসারে কী করে লাভবান হতে হয়,— সে কথাটা কাকা জানতেন এবং দাদাদেরকে সেই কথাটা ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।

দাদারা সকলেই ছিলেন বিজ্ঞানের ছাত্র, কৃতী।

আমি ক্লাস নাইনের পর বড়দি-মেজদি-নদি-র সঙ্গে হুড়োযুদ্ধ করে আর্টসে ভর্তি হয়েছিলাম।

ছেলেরা আর্টস পড়তে পারে এটা দাদারা কল্পনাতেই আনতে পারতো না। আর্টস-পড়া ছেলেরা আদতেই অপদার্থ, তাদের দ্বারা কিছু হওয়ার নয়। বিশেষভাবে আমার মতো আজব আহাম্মকের পক্ষে তো নয়ই! বইপত্র ছাড়াই, খাতা-কাগজের তীব্র অভাবের মধ্যেও আমি যে এটুকু করেছি সেটাই ছিল কাকা আর দাদাদিদিদের কাছে পরম বিস্ময়ের ব্যাপার।

আমার ছাত্র রাজনীতি করে ঘুরে বেড়ানোতে মা আর বাবার অসন্তুষ্টি ছিল। কিন্তু কাকাসহ রাজনৈিতক কর্মকাণ্ডকে সকলেই বিরক্তি ও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। সেই রাজনীতি ছিল বিরুদ্ধপক্ষের বিপজ্জনক রাজনীতি। ফলে তার ঢেউ বাড়ির চৌহদ্দি স্পর্শ করত হামেশাই। কেউ হয়তো কাকাকে বলল— ‘আপনার ভাইপোকে দেখলাম চৌরাস্তার মোড়ে মাইকে বক্তৃতা দিচ্ছে। বলে ভালো।’

গায়ে-পড়ে বলা এই আমার সব সংবাদই ছিল কাকার কাছে অসহনীয়— তার ওপর প্রশংসা!

কাকা এ-িবষয়ে সেজদাসহ দাদাদের মনে সহিংসতা ঢুকিয়ে দিতে কার্পণ্য করেননি। শুধু কাকিমার নীরব প্রতিরোধের কাছে কাকার ফক্কিকিরি পরাজিত হতো বার বার। কাকার মেয়ে, আমাদের সুদিদিও তার বাবকে ভালো মতো চিনত। সুতরাং বৃহত্তর পারিবারিক পরিসরটিকে জয় করলেও নিজের পরিবারের নিউক্লিয়ার অংশটিকে করায়ত্ত করতে পারেননি। কাকার সেই ব্যর্থতার রাগও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এই আহাম্মকের ওপরেই বর্ষিত হতো।

সন্দেহ নেই— কাকা নিজে রাজনীিত করতে এলে ফািটয়ে দিতেন। যে-কোনো মানুষকে নিজের পক্ষে টেনে আনার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তঁার। একজনের প্রতি আর-একজনকে বিদ্বিষ্ট করে তোলার ব্যাপারে তঁার জুড়ি পাওয়া ছিল ভার। এই বাড়ির প্রকৃত অধিকর্তা হিসেবে আপামর আত্মীয়স্বজনের কাছে তিনি নিজের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কাকার কথা বলতে গিয়ে দাদাদিদিদের কারও কারও উচ্ছ্বাসে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত।

বাবা আর মা কাকাকে, বিশেষ করে কাকার কূট চালকে এড়িয়ে চলতেন— কাকিমা তো নিজের স্বামী-রত্নটিকে রীিতমতো উপেক্ষাই করতেন বলে কাকা সন্দেহ করতেন।

আমাদের বড়োদাদার পর দুই দিদির পর জন্ম। বড়দাদা বাড়ির প্রথম সন্তান, তায় আবার পুত্রসন্তান।

শুনেছি বড়দাদার জন্মের সময় সকলেই খুব আহ্লাদিত হয়েছিলেন। বিশেষ করে কাকা। কিন্তু বড়দাদা আই টি পাশ করেই দন্ডকারণ্যের শরনার্থী শিবিরের কোনো এক কনিষ্ঠ সরকারি পদে চাকরি নিয়ে চলে গিয়েছিল। সেখানেই কোনো ভিনরাজ্যের সহকর্মিনীকে বিয়ে করেছিল— একবার আমাদের দেখা দিতে এসেছিল— আর ফিরে আসেনি। বোধহয় তার ভয় হয়েছিল আমাদের এত বড়ো পরিবারের ভরণপোষণের আংশিক দায় তার কাঁধে চেপে যেতে পারে!

আগে বড়দাদার সঙ্গে কাকার অঢেল কূটকাচািল ছিল। বড়দাদা হাতছাড়া হওয়ায় কাকা সেজদাকে পাকড়াও করেছিলেন। সেজদা তখনও পড়ার জন্য বাইরে থাকা সত্ত্বেও পরিবারের ক্ষমতােকন্দ্রের দমপতি বা কেন্দ্রপতি হওয়ার উদ্যোগে সেজদাকে ব্যবহার করার অফুরান প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল— পুত্রসন্তানের প্রতি এই পক্ষপাতেই তঁার ভিতরকার ষোড়শ শতাব্দীর বা মধ্যযুগীয় চিন্তাশাসিত তন্ত্রের চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে যেত।

শুধু কাকার নিজের মেয়ে, আমাদের সুদিদি নিজের বাবাকে অপছন্দ করত। কেননা তার জন্মের পর নাকি কন্যাসন্তান জন্মের কারণে কাকার কাছে কাকিমার অনাদর আরও বেড়ে গিয়েছিল।

সুদিদি বরাবর কাকার কাছ থেকে নিজে সতর্ক থেকেছে, আমাদের সতর্ক করে এসেছে। বিয়ে হয়ে যাবার পর বছরে একবারও সে এই বাড়িতে পা দিত না। তার বর, আমাদের জামাইবাবু তো কখনই আসতেন না। হয়তো জন্মাবধি মা এবং তাঁর প্রতি কাকার প্রকাশো ও সূক্ষ্ম অবহেলার এটাই ছিল সুদিদির প্রতিবাদ।

অষ্টমঙ্গলার দিন শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবার সময় সুদিদি আড়ালে ডেকে বলে গিয়েছিল— বাবার থেকে সাবধানে থাকিস। সত্যি-মিথ্যে মিশিয়ে, ঘন ঘন রঙ বদল করে সব্বাইকে হাত করার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাবা যা খুশি করতে পারে। জ্যেঠু, জেম্মা আর মাকে দেখিস। তেমন দরকার লাগলে আমাকে বলিস— আমার যতটা সম্ভব করব।

কিন্তু বাড়ির চক্রব্যূহ বা জতুগৃহের মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপার নিয়ে আমার তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। সেই সময়ও আমার ছিল না। তখন তো—

বিশ্বজগৎ আমারে মাগিলে

কে মোর আত্মপর!

আমার বিধাতা আমাতে জাগিলে

কোথায় আমার ঘর!

কিসেরি বা সুখ, ক’ দিনের প্রাণ?

ওই উঠিয়াছে সংগ্রাম গান,

অমর মরণ রক্তচরণ

নাচিছে সগৌরবে।

স্কুল নেই, কলেজ নেই, পাঠ্যপুস্তক নেই, পরীক্ষা নেই, অথচ অনবরত ইচ্ছামতো বই পড়ার স্বাধীনতা রয়েছে। খাতা-কাগজ-কেরোসিন, চৌদ্দটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানোর দাবি রয়েছে, আছে মুক্ত পৃথিবী গড়ার প্রকল্পনা। আর কী চাই!

মহানন্দে দিন আর মাসগুলো কাটছিল।

দেয়াল লেখা, পোস্টার রচনা, মিটিং-মিছিল।

কুহু তো ছিলই।

আর কী চাই।

(ক্রমশ)

Leave a Reply