চলে যেতে যেতে আহাম্মকের ক-অক্ষর। পর্ব ১৭। দুর্লভ সূত্রধর

গত পর্বের পর

কিন্তু কোনোকালেই আহাম্মক কী চায় চারপাশের কেউ তো তার তোয়াক্কা করে না।

কিছু না-চাইলেও সে তো সকলের চক্ষুশূল!

ক্রমাগত এর কাছে, ওর কাছে, তার কাছে আমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা কাকার কানে আসতেই লাগল। এর আগেই, কাকা যখন দোকান নিয়ে ফাঁদ পাততে ব্যস্ত আর সেজদা যখন এই শহর থেকে দূরে উচ্চশিক্ষায় ব্যস্ত তখনই আমি দিন-রাত্রি এক করে রাজনীতির সক্রিয়তায় লিপ্ত থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের মতো মায়ের হাড় জ্বলাতন করেছি— সেই সংবাদও কাকার মাধ্যমে সেজদার কর্ণগোচর ছিল। বাবা কাকার হাতে সব দিয়ে দোকানে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ক্ষমতা, সময় ও শক্তি-অনুযায়ী কাকা পারিবারিক ক্ষমতা রাশ কিছুটা হাতে পেয়েছিলেন, ক্ষমতার নেশা তঁাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছিল। আর সব গ্রাসেচ্ছু ক্ষমতাবান যা করে সেটাই করলেন তিনি— আমাদের কারও হাতে যেন একটি পয়সাও না-পড়ে তিনি তার ব্যবস্থা করলেন।

অন্যদিকে রাজনীতি ছাড়াও আমার নাটকের পুরোনো বায়ু চড়েই ছিল শিরোদেশে। সর্বশরীরে জড়িয়েছিল নাটক আর সাহিত্যের শিকড়- বাকড়।

ফলে এই নাট্যদল, ঐ নাট্যদল করে নাটুকে হিসেবে একটা পরিচিতি দেখা দিয়েছিল। সেই বোকা বোকা মফস্বলীয় কবি হিসেবেও। সেকথা কাকাদের কাছে পৌঁছতে বেশি সময় লাগত না।

নাটক ও সাহিত্যে পয়সা খরচার রাস্তা আছে প্রচুর, কিন্তু অপেশাদার সৌখিনের আয়-পয় নেই মোটেই।

 

আহাম্মকের তুচ্ছ জীবনেতিহাসে সেসব কথা খুবই গুরুত্বহীন গল্পগাথার মতো।

হামেশাই শহরের অনেকানেক রাস্তা দিয়ে আমাদের হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে যেত।

তার কারণ ছিল এই যে, আমাদের ঐ ছোট্ট শহরে বিস্ময়করভাবে প্রেসের সংখ্যা ছিল প্রচুর। এখন, এতটা দূরে এসে নিশ্চিতভাবে এই প্রত্যয়ও দৃঢ় হয় যে, আমাদের সেই সেই গ্রামীণ ও সামন্ততন্ত্রপৃক্ত শহরটিতে কবিযশপ্রার্থী কিংবা লেখক-বুদ্ধিজীবী তকমালোলুপদের সংখ্যা ছিল পাঠক ও সম্ভাব্য উপভোক্তার থেকে অনেক বেশি। এমন লোলুপেরা দু-চারজন একসঙ্গে হলেই একটি করে পত্রিকার জন্ম হতো।

এবং সেই পত্রিকাসমূহের জন্মক্ষণেই সাহিত্যবিধাতা স্বল্পব্যবধানিক মৃত্যুরেখা নিশ্চিত করে দিতেন।

আমাদের মতো সাহিত্যপক্ক বালকেরা একবার যে প্রেস থেকে তাদের পত্রিকা ছাপত, পরবর্তী ছ-মাস সে-রাস্তা মাড়ানো তাদের পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। কেননা সেই প্রেসেই বাকি-বকেয়া পড়ত দেদার। সাধারণ নিউজ প্রিন্টই হোক আর নেপা নিউজ প্রিন্টই হোক—  কোনোরকমে কাগজের টাকাটুকু জোগাড় করে পত্রিকা বিক্রি করে টাকা দেওয়ার শর্তে পত্রিকা ছাপা হতো— পত্রিকা বিক্রিও হতো না, টাকাও জীবনে শোধ হতো না। সেই প্রেসপাড়া দিয়ে আমাদের যাতায়াত বন্ধ রাখতে হতো।

নাটকের ক্ষেত্রেও তাই-ই।

শহরে নাট্যদলের সংখ্যা ছিল বিস্ময়কররূপে অগণন। একটি দল ভেঙে দশটি দল। সেগুলো ভেঙে আরও আরও কয়েকটি।

সেই অর্থে শহরে থিয়েটার হল ছিল না। অপরিসর, গভীরতাহীন মঞ্চ, প্রক্ষেপিত শব্দের গন্তব্যের বিষমতা ইত্যাদি বাধা অতিক্রম করে ক্রমাগত নাট্যদলের বিস্তার ছিল দেখার মতো।

নাটকের দর্শকও ছিলেন প্রচুর।

কিন্তু সেই দর্শকের একটা বড়ো অংশ ছিল ‘পেয়ে থাকি’র দলে। অর্থাৎ ‘অতিথি’-মার্কা কার্ডের খরিদ্দার। নিজেদের বাড়ির লোকজন, বিশেষ বিশেষ অনুরাগিত কেউ কেউ এবং শহরের কেউকেটার দল!

সুতরাং প্রতিটি নাটকের শেষে মেকাপ, লাইট, সেটের কাঠের বাটামওয়ালা, মিউজিশিয়ান, সাউণ্ডসিস্টেম সরবরাহকারী, আবহসংগীতকার—  সকলের কাছেই বাকি টাকা থাকাটা ছিল অবশ্যম্ভাবী। এসব ক্ষেত্রে প্রাপকেরা কার কাছ থেকে চাইলে টাকা পেতে পারেন, সেটাই বুঝে উঠতে পারতেন না। এসবই ছিল সামূহিক ঋণ।—  এসব কথাও কাকার কানে অবধারিতভাবে পৌঁছে যেত।

কৌলীন্যহীন আমাদের এই ছোট্ট মফস্বল শহরে খবর পেতে সময় লাগার কথাও নয়।

এই রেপুটেশন নিয়ে বাড়িতে কল্কে পাওয়া মুশকিল ছিল। তাই ক্রমশই জোড় খুলে সম্পর্কগুলো শিথিল হয়ে আসছিল।

তবু নির্ভার মেঘের মতো দিব্যি চলছিল দিনগুলি। ছোটোখাটো ঝড়-বাদলের সম্ভাবনাকে হাওয়ার সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়ার কাল তখন।

বাড়ির বাগানের পেছনদিকের টিনের লুকোনো নিভৃত ঘর, রূপুদার সর্বত্যাগী ক্যামোফ্লেজিং সঙ্গসুখের অপূর্ব আবিষ্কার, বুলু গুহর প্রত্যাশাহীন যাপিতজীবন, আর রূপুদার সান্নিধ্যে বইয়ের জগৎ— মানুষ হিসেবে কুহুর কাছে গ্রাহ্যতা ও স্বীকৃতি—সব মিলিয়ে সে ছিল এক স্বপ্ননন্দিত সময়।

 

 

কিন্তু সব স্বপ্নই স্বল্পস্থায়ী এক পল। সব স্বপ্নই ভেঙে যায়। আর কী আশ্চর্য জন্ম নেয় নতুন কোনো স্বপ্ন। বাস্তবতাকেই তখন স্বপ্ন বলে মনে হয়— স্বপ্নভাঙা আগামীর রূপরেখাকে মনে হয় অভ্রান্ত। সব স্বপ্ন ভেঙেই রবীন্দ্রনাথের মতো পরম আনন্দময় রূপের জন্ম হয় না। বরং স্বপ্নভাঙা আগামীর কাঠিন্য ক্রমেই গ্রাস করতে থাকে স্বপ্নের  যাবতীয় আবেশকে।

 

কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণলগ্নে রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল বা তাঁর আত্মজাগরণ ঘটেছিল সদর স্ট্রীটের বারান্দায়। ‘জীবনস্মৃতি’তে তাঁর সেই আত্মোপলব্ধির অসামান্য বর্ণনা—

‘…জ্যোতিদাদা কিছুদিনের জন্য চৌরঙ্গি জাদুঘরের নিকট দশ নম্বর সদর স্ট্রীটের বাস করিতেন। আমি তাঁহার সঙ্গে ছিলাম। এখানেও একটু একটু করিয়া বউঠাকুরানীর হাট ও একটি একটি করিয়া সন্ধ্যাসংগীত লিখিতেছি, এমন সময়ে আমার মধ্যে হঠাৎ কী একটা উলটপালট হইয়া গেল।

একদিন জোড়াসাঁকোর বাড়ির ছাদের উপর অপরাহ্নের শেষে বেড়াইতেছিলাম দিবাবসানের ম্লানিমার উপরে সূর্যাস্তের আভাটি জড়িত হইয়া সেদিনকার আসন্ন সন্ধ্যা আমার কাছে বিশেষভাবে মনোহর হইয়া প্রকাশ পাইয়াছিল। পাশের বাড়ির দেয়ালগুলা পর্যন্ত আমার কাছে সুন্দর হইয়া উঠিল। আমি মনে মনে ভাবিতে লাগিলাম, পরিচিত জগতের উপর হইতে এই যে তুচ্ছতার আবরণ একেবারে উঠিয়া গেল, এ কি সায়াহ্নের আলোকসম্পাতের একটি জাদু মাত্র। কখনই তাহা নয়। আমি বেশ দেখিতে পাইলাম, সন্ধ্যা  আমারই মধ্যে আসিয়াছে, আমিই ঢাকা পড়িয়াছি। দিনের আলোতে আমিই যখন অত্যন্ত উগ্র হইয়াছিলাম তখন যাহা-কিছুকেই   দেখিতে-শুনিতেছিলাম সমস্তকে আমিই জড়িত করিয়া আবৃত করিয়াছি। এখন সেই আমি সরিয়া আসিয়াছে বলিয়াই জগৎকে   নিজের স্বরূপে দেখিতেছি।…

সদর স্ট্রীটের বারান্দাটা যেখানে গিয়া শেষ হইয়াছে সেইখানে বোধকরি ফ্রী-স্কুলের বাগানের গাছ দেখা যায়। একদিন বারান্দায় দাঁড়াইয়া আমি সেইদিকে চাহিলাম। তখন সেই গাছগুলির পল্লবান্তরাল হইতে সূর্যোদয় হইতেছিল। চাহিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ একমুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের উপর হইতে যেন একটা পর্দা সরিয়া গেল। দেখিলাম, একটি অপরূপ মহিমায় সমাচ্ছন্ন, আনন্দে ও সৌন্দর্যে সর্বত্রই তরঙ্গিত। আমার হৃদয়ের স্তরে স্তরে যে একটা বিষাদের আচ্ছাদন ছিল তাহা এক নিমেষেই ভেদ করিয়া আমার ভিতরটাতে বিশ্বের আলোক একেবারে বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িল। সেইদিনই নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, কবিতাটি নির্ঝরের মতোই যেন উৎসারিত হইয়া বহিয়া চলিল। লেখা শেষ হইয়া গেল, কিন্তু জগতের সেই আনন্দরূপের উপর তখনো যবনিকা পড়িয়া গেল না। এমনি হইল আমার কাছে তখন কেহই এবং কিছুই অপ্রিয় রহিল না।’

কিন্তু সব স্বপ্নভঙ্গেই তো আনন্দ বা সর্বজনিক প্রিয়তা জন্ম নেয় না— জন্ম নেয় বেদনার কুলিশকঠোর বোধ। কিন্তু সব স্বপ্নভঙ্গেই যা ঘটো তা হলো আত্মজাগরণ! এ-ব্যাপারে রবীন্দ্রনাঘ বা হরিপদ কেরানি বা আমাদের মতো জন্ম আহাম্মকের মধ্যে কোনো ভেদরেখা নেই! কৈশোর-অতিক্রমী নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের আবেগী মুক্তি শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের জীবনেও স্থায়ী হয়নি। বিশ্বব্যবস্থার মানুষী জগতে বহু কুশ্রী অভিজ্ঞতার দিন আর রাত্রি পেরিয়ে, বহু ঋতুচক্রের আবর্তনকে পিছনে ফেলে, ভিক্ষাবৃত্তিসঞ্চিত বহু লোভের করাল দংষ্ট্রাকে পরাজিত করেও এক আবর্জনাময় পৃথিবীকে ছেড়ে যাবার আগে তাঁর পুনর্বার মনে হয়েছিল— এতদিন বুঝি স্বপ্নে ছিলেন, প্রতারক সুখস্বপ্নে আবিষ্ট থেকে কঠিন সত্যকে ছিলেন ভুলে—

রূপ-নারানের কূলে

জেগে উঠিলাম,

জানিলাম এ জগৎ

স্বপ্ন নয়।

রক্তের অক্ষরে দেখিলাম

আপনার রূপ,

চিনিলাম আপনারে

আঘাতে আঘাতে

বেদনায় বেদনায় ;

সত্য যে কঠিন,

কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,

সে কখনো করে না বঞ্চনা। (শেষলেখা ১১ / ১০ মে ১৯৪১)

আহাম্মকের পক্ষে সুবিধা হয়েছিল এই যে, পরমের আহ্বান শোনার আগেই আঘাতে আঘাতে আমাকে বুঝে নিতে হয়েছিল এই সত্য যে, এ জগৎ স্বপ্ন নয়। কঠিন থেকে কঠিনতর বঞ্চনা আর প্রাপ্তিহীনতা, পরিজন আর পরিজন-নির্বিশেষে বৃহত্তর পরিজনের আক্রমণাত্মক আগ্রাসন থেকে আহাম্মকদের ফেলনা জীবনে মুক্তি নেই। রূপ-নারানের কূলে জেগে ওঠার মাত্র সাতদিন আগেও এমত প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে। —

কোন্্ স্বপ্ন বাঁধিবারে

বহিয়া ধূলির ঋণ

দেখা দিল

মানবের দ্বারে। (শেষলেখা ৯ / ৩ মে ১৯৪১)

আর আমাদের মতো স্বল্পপুঁজির আহাম্মকদের সকল ‘বাণীর মুরতি’ গড়ার যাবতীয় প্রচেষ্টা আজীবন ‘পিণ্ড পিণ্ড মাটি‘ হয়ে ‘যায় ছড়াছড়ি।’

(ক্রমশ)

Leave a Reply