আমাজনের পথে। হেনরি ওয়াল্টার বেটস। পর্ব ৭। অনুবাদে সোমরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়
১৬১৫ সালে পারা শহর প্রতিষ্ঠিত হয়। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে, খ্যাতনামা পর্তুগিজ রাষ্ট্রনায়ক পোম্বালের ভাইয়ের শাসনামলে এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এক নগরীতে পরিণত হয়েছিল। ব্রাজিলের মধ্যে এই প্রদেশই সর্বশেষ পর্তুগালের শাসন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং প্রথম সম্রাট ডম পেদ্রোর কর্তৃত্ব স্বীকার করে। এর কারণ ছিল এখানে পর্তুগিজদের বিপুল জনসংখ্যা ও তাদের শক্তিশালী প্রভাব। এহেন পরিস্থিতিতে ১৮২৩ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই পাল্টা বিদ্রোহ শুরু হয়। সেই সংঘর্ষে শত শত মানুষ নিহত হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত বিদ্বেষের জন্ম হয়। পরবর্তী বহু বছর ধরে এই বিরোধ অব্যাহত থাকে। যখনই সাধারণ মানুষের মনে হতো যে রিও থেকে পাঠানো গভর্নররা পর্তুগিজ অভিবাসীদের প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছেন, তখনই ছোটখাটো বিদ্রোহ দেখা দিত। অবশেষে ১৮৩৫ সালে এক বৃহৎ বিদ্রোহ সমগ্র প্রদেশকে গ্রাস করে। প্রেসিডেন্ট এবং সরকারের প্রধান কর্মকর্তাদের হত্যা করে বিদ্রোহের সূচনা হয়। সংঘর্ষ দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। স্থানীয় নেতারা এই চরম মুহূর্তে উগ্রপন্থী মিশ্রবর্ণের মানুষ এবং কিছু আদিবাসী গোষ্ঠীকে নিজেদের পক্ষে আহ্বান জানান।
প্রথমে স্লোগান ছিল—”পর্তুগিজদের মৃত্যু হোক”। পরে তা বদলে দাঁড়ায়—”ফ্রিম্যাসনদের মৃত্যু হোক”। সে সময় ফ্রিম্যাসন সংগঠনটি শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের এই বিরাট অংশের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বিদ্রোহীরা নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ছয় মাস পর তারা রিও থেকে পাঠানো নতুন প্রেসিডেন্টকে মেনে নিলেও, তিনি তাদের জনপ্রিয় নেতা ভিনাগ্রেকে বন্দি করলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর যে প্রতিশোধের খেলা শুরু হয়, তা ছিল ভয়াবহ। পারার পেছনের নির্জন খাঁড়িগুলোতে অসংখ্য অর্ধ-আদিবাসী ও মিশ্রবর্ণের মানুষ সমবেত হয়। ভিনাগ্রের ভাই তিনবার প্রেসিডেন্টের কাছে তাঁর মুক্তি দাবি করেও বিফল হলে, নির্ধারিত দিনে তারা চারদিকের ঘন অরণ্যের গোপন পথ ধরে শহরে প্রবেশ করে। পরবর্তী নয় দিন ধরে পারার প্রতিটি রাস্তায় নির্মম যুদ্ধ চলে। নদীপথ থেকে একটি ইংরেজ, একটি ফরাসি এবং একটি পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজ গোলাবর্ষণ করে বৈধ সরকারকে সহায়তা করে। তবু শেষ পর্যন্ত সরকারি বাহিনী এবং শান্তি-শৃঙ্খলার সমর্থকেরা শহর ছেড়ে কয়েক মাইল দূরের একটি দ্বীপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এরপর শহর ও সমগ্র প্রদেশ জুড়ে নৈরাজ্যের এক অধ্যায় শুরু হয়। বিজয়োন্মত্ত বিদ্রোহীরা ঘোষণা করে—ইংরেজ, ফরাসি ও মার্কিন অধিবাসীদের বাদ দিয়ে বাকি সব শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করা হবে। যারা প্রথমে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দিয়েছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পালাতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, প্রদেশের অভ্যন্তরে বৈধ সরকারের সমর্থকেরা, যাদের মধ্যে ছিল বহু বন্ধু আদিবাসী গোষ্ঠী, কৃষ্ণাঙ্গ এবং মুলাত্তো জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ, তারা কয়েকটি শক্ত ঘাঁটিতে নিজেদের সংগঠিত করে প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। অবশেষে রিও দে জেনেইরো থেকে পাঠানো সামরিক বাহিনী ১৮৩৬ সালে রাজধানী এবং প্রধান শহরগুলি পুনর্দখল করে। এর ফলে দশ মাসব্যাপী নৈরাজ্যের অবসান ঘটে এবং প্রদেশে আবার সরকারি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। শাসননীতি, স্থানীয় দলের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং পর্তুগিজদের সংযত আচরণ; আর সেইসঙ্গে পারার সকল শ্রেণি ও বর্ণের মানুষের স্বভাবসিদ্ধ নির্বিরোধ ভালমানুষি মিলিত হওয়ার সুফল পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। তবে ততদিনে দেশজুড়ে জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে উঠেছিল এবং বেশ কিছুদিন ধরেই সেই নিরাপত্তা বজায় ছিল। এর মধ্যে কয়েকজন দাগী অপরাধীকে নির্বাসিত অথবা কারারুদ্ধ করা হয়, বাকিরা ক্ষমা পাওয়ার পর আবার শান্তিপ্রিয়, নির্বিরোধ নাগরিক জীবনে ফিরে যান। সব মিলিয়ে আমি প্রায় দেড় বছর পারায় ছিলাম। দেশের অভ্যন্তরে প্রতিটি স্বল্পমেয়াদি অভিযানের পরই আবার সেখানে ফিরে এসে কয়েক মাস করে থাকতাম। এইভাবে চলেছিল ১৮৫১ সালের ৬ই নভেম্বর পর্যন্ত, যেদিন আমি তাপাজোস ও উচ্চ আমাজনের উদ্দেশে আমার দীর্ঘ অভিযানে রওনা হই। এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত সাড়ে সাত বছর স্থায়ী হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়কালে আমাজন অঞ্চলের রাজধানী এবং সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে আমার পরিচয় বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।
অন্যান্য ব্রাজিলীয় বন্দরনগরীর তুলনায় পারা যে কতটা শ্রেষ্ঠ, তা আমাকে প্রায়ই বলা হত। শহরটি পরিচ্ছন্ন; শহরতলি ছিল আরও বেশি তারুণ্যে পরিপূর্ণ। অফুরন্ত সবুজ, ছায়া এবং অপূর্ব গাছপালায় ঘেরা সেখানকার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত মনোরম। এখানকার মানুষের আচার-আচরণ ও স্বভাবও ছিল সহজ-সরল, শান্তিপ্রিয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ। দক্ষিণের প্রদেশগুলোর দুর্নামের অন্যতম কারণ ছিল সেখানে নিরন্তর ঘটে চলা হত্যালীলা। পারায় এসব ঘটনা একেবারেই বিরল। তবে কর্মোদ্যম ও পরিশ্রমের দিক থেকে পারার অধিবাসীরা দক্ষিণ ব্রাজিলের মানুষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। খাদ্যসামগ্রী ও বাড়িভাড়া ছিল সস্তা, আর মানুষের চাহিদাও ছিল সামান্য। এমন মানের আহার ও বাসস্থানেই তারা সন্তুষ্ট থাকত, যা ইংল্যান্ডের দরিদ্রতম মানুষও পছন্দ করতেন না। ফলে তারা সময়ের একটি বড় অংশ ইন্দ্রিয়সুখে এবং সরকার ও ধনী নাগরিকদের আয়োজিত নানা আমোদ-প্রমোদে বিনা খরচে অংশগ্রহণ করেই কাটিয়ে দিত। পাইকারি ও খুচরো—উভয় ধরনের বাণিজ্যই প্রধানত পর্তুগিজদের হাতে ছিল। শহরে তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই হাজার। নানা ধরনের কারিগরি পেশায় যুক্ত ছিল মিশ্রবর্ণের মানুষ, মুলাত্তো, মামেলুকো, মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ এবং আদিবাসীরা। স্বচ্ছল ব্রাজিলীয়রা ছোটখাটো দোকানদারি বা দৈনন্দিন টুকিটাকি কাজ পছন্দ করতেন না। বড় পাইকারি ব্যবসায়ী হতে না পারলে তাঁরা বরং গ্রামাঞ্চলে বাগান বা কৃষিজমির মালিকের জীবন বেছে নিতেন, তাতে সম্পত্তি ও আয় যত সামান্যই হোক না কেন। কৃষ্ণাঙ্গরা মূলত ক্ষেতমজুর ও মালবাহকের কাজ করত। অন্যদিকে জলপথের কাজে প্রায় সর্বত্রই আদিবাসীদের দেখা যেত। পারা ও দেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যে ব্যবহৃত নানান বিচিত্র আকারের ডোঙা ও নৌকার মাঝি-মাল্লাও প্রধানত তারাই ছিল। শিক্ষিত ব্রাজিলীয়দের মধ্যে খুব কমই সম্পূর্ণ ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন। কারণ বহু বছর ধরে পর্তুগাল থেকে আগত অভিবাসীদের প্রায় সকলেই ছিলেন পুরুষ। তাঁরা সাধারণত ভদ্র, প্রাণবন্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ ছিলেন। পর্তুগিজ পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অজ্ঞতা ও গোঁড়ামি থেকেও তাঁরা ধীরে ধীরে নিজেদের মুক্ত করছিলেন, বিশেষত মহিলাদের প্রতি আচরণ ও তাঁদের সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ে। আগে পর্তুগিজরা তাঁদের স্ত্রীদের সামাজিক মেলামেশায় অংশ নিতে দিতেন না। এমনকি কন্যাদের পড়াশোনা শেখার অনুমতিও দিতেন না। ১৮৪৮ সালে ব্রাজিলীয় মহিলারা সবে এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন এবং বাবারও মেয়েদের শিক্ষার উপকারিতা সম্পর্কে ধীরে ধীরে সচেতন হয়ে উঠছিলেন। এই ধরনের সামাজিক সংস্কার অবশ্য ধীরে ধীরে ঘটে। সম্ভবত মহিলারা বরাবর যে অপমানজনক সামাজিক অবস্থানে আটকে ছিলেন, তারই আংশিক ফল হিসেবে ব্রাজিলে নারী-পুরুষের সম্পর্ক তখনও খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার মানও ছিল বেশ নিচু। আমার বিশ্বাস, পারায় বর্তমানে এ অবস্থার উন্নতি ঘটছে। কিন্তু আগে প্রায় সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই অবাধ যৌনসম্পর্ক যেন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছিল। জনসংখ্যার একটি বড় অংশের জীবন প্রেমজ সম্পর্ক ও গোপন প্রণয়েই মেতে থাকত। তবে এই পরিস্থিতি যে জলবায়ু কিংবা দেশের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে হয়েছিল, তা আমি বিশ্বাস করি না। কারণ দেশের অভ্যন্তরের অনেক ছোট শহরেও আমি বসবাস করেছি, যেখানে মানুষের জীবনযাত্রা এবং সামগ্রিক নৈতিকতার মান ছিল ইংল্যান্ডের ছোট শহরগুলোর মতোই সংযত ও পবিত্র।
(ক্রমশ)
