কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৪৭। শোভন সরকার
গত পর্বে: সারনাথ ধ্বংস হল, বারাণসী তখনও গহড়ওয়ালদের দৌলতে জমজমাট। তবে তুর্কো-আফগান আক্রমণ বারাণসীর চেহারা পাল্টে দিল।
অনেকেই বারাণসীতে পবিত্রস্থানের ধ্বংস কেবল ধর্মীয় সংকীর্ণতার ফল হিসেবে দেখে থাকেন। তুর্কো-আফগান সৈন্যরা ধর্মের নামে উৎসাহিত ছিল ঠিকই কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে ধর্মকে আশ্রয় করে রাজনীতির বিস্তার আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী।
ইতিহাস গবেষকেরা বলছেন, কোনো ধর্মক্ষেত্রে কোনো মন্দির বা মসজিদ শুধুমাত্র একটি উপাসনার স্থল কিংবা স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং সেই স্থান, মন্দির বা মসজিদের উপর প্রকৃতপক্ষে কোন শাসকের নিয়ন্ত্রণ, তারই জাজ্বল্যমান প্রতীক। সেই দিক থেকে দেখলে বারাণসীর মতো এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মক্ষেত্রে মন্দির ভেঙে তার উপর মসজিদ দাঁড় করানোর অর্থ রাজনৈতিক বিজয়ঘোষের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত — যতদিন সেই স্থাপত্য দাঁড়িয়ে থাকবে, ভবিষ্যৎকে ইতিহাস মনে করিয়ে দেবে কে জিতেছিল সেই যুদ্ধে কিংবা কার হাতে ছিল আসল ক্ষমতা।
গহড়ওয়াল যুগে বারাণসী এক পবিত্র ধর্মক্ষেত্র হিসেবে নিজের অবস্থান নির্দিষ্ট করে নেয়; ফলস্বরূপ, বহুসংখ্যক তীর্থযাত্রীর নিয়মিত আনাগোনা শুরু হয় এখানে। শিক্ষিত ব্রাহ্মণদের প্রভাব বেড়ে যায়, ব্রাহ্মণকে দান-ধ্যানের গুরুত্ব চরমে ওঠে। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে ধর্ম ও ধর্মীয় আচার-আচরণের মাহাত্ম্য ব্যক্তিগত সীমার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজ ও রাজনীতির মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করে। অশ্বত্থ গাছ পুরোনো দালানকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বেড়ে উঠলে তাদের যেমন আলাদা করা মুশকিল হয়, ধর্ম ও রাজনীতি যেন তেমন করেই একসাথে মিলেমিশে যায়, আলাদা করা যায় না। এই পরিস্থিতিতে ধর্মকে আক্রমণ করার অর্থ রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া।
তুর্কো-আফগান বাহিনী ঠিক তাই করল। তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের লোভ ও আক্রোশের প্রভাব সরাসরি আছড়ে পড়ে বারাণসীর ধর্মীয় স্থানগুলির উপর। একের পর এক মন্দিরগুলি ধ্বংস করে সেই স্থানে দাঁড় করানো হল মসজিদ। নবনির্মিত মসজিদগুলি হয়ে উঠল বারাণসীর মতো ক্ষেত্রে তুর্কি শাসকের ক্ষমতা ও অস্তিত্বের দৃশ্যমান প্রতীক এবং জনমানসকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যম। বারাণসীতে ধর্মীয় স্বাধীনতাই যখন ক্ষমতার মূলাধার, তখন ধর্মীয় ইমারত নির্মাণের লড়াই আসলে একটাই প্রশ্নকে উসকে দেয় — কাশী, তুমি কার?
ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে দিল্লির সুলতানরা হয়ে ওঠেন উত্তর ভারতের একচ্ছত্র অধিনায়ক। মুইজুদ্দিন মুহম্মদ ঘোরীর অভিযানের পর থেকেই বারাণসী সুলতানদের বিশাল সাম্রাজ্যের এক অংশ হয়ে পড়ে। মসনদে থিতু হয়ে বসার পর নিজেদের কোষাগারে অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি সুনিশ্চিত করার জন্য তাঁরা তাঁদের বিজিত এলাকায় নিয়মিত রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থায় সমগ্র এলাকাকে ছোট ছোট ‘ইক্তা’য় বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি ইক্তার প্রধানকে বলা হত ‘মুক্তি’ বা ‘ওয়ালি’। মুক্তিরা স্বাধীনভাবে নিজেদের ইক্তাতে শাসন চালাতে পারত, তাদের দায়িত্ব ছিল মূলত নিজের নিজের এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রাজস্ব সংগ্রহ করে সরকারি কোষাগারে জমা করা। অমুসলিম প্রজার উপর আরোপ করা ‘জিজিয়া কর’ সুলতানি আমলের আরও একটি বিশেষ দিক ছিল। সিন্ধু অঞ্চলে আরবীয়দের আক্রমণের সময় থেকে স্থানীয় অমুসলিম প্রজা শাসকের ‘জিম্মি’ স্বীকার করে নিজেদের সুরক্ষার বিনিময়ে এই কর দিতে সম্মত হয়। সুলতানি আমলেও এই ব্যবস্থা চালু রাখা হয়। মহিলা, শিশু কিংবা অপারগ ব্যক্তি এবং হিন্দু ব্রাহ্মণদের এই কর থেকে ছাড় ছিল। ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে অবশ্য এই কর আদায়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয় এবং ব্রাহ্মণদের কাছ থেকেও জিজিয়া আদায় করা চালু হয়। তাতে বারাণসীর ব্রাহ্মণরা অসম্মত হলে তাঁদের হয়ে ধনী ব্যবসায়ী ও মহাজনেরা সেই কর দিতে শুরু করেন।
তুর্কি শাসকদের মধ্যে ‘শরিয়া’ অর্থাৎ মুসলিম আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করার প্রবণতা ছিল। তাঁদের সাম্রাজ্যের সর্বত্র, বিশেষ করে মুসলিম সমৃদ্ধ এলাকায়, যতটা সম্ভব শরিয়া মেনে চলার নির্দেশ ছিল। নতুন কোনো অমুসলিম উপাসনাস্থল নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তা সত্ত্বেও বারাণসীতে সুলতানি আমলে নির্মিত কিছু মন্দিরের তথ্য পাওয়া যায়।
দাস বংশের সুলতান ইলতুৎমিশের চেষ্টায় দিল্লির তৎকালীন টালমাটাল রাজনৈতিক অবস্থা খানিকটা সামলে ওঠে। এই সুযোগে বারাণসীও আবার নিজের পুরোনো গৌরব ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় রত হয়। জানা যায় সম্ভবত তুর্কি আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবিমুক্তেশ্বর মন্দিরের প্রাঙ্গণে এই সময়ে বিশ্বেশ্বর মন্দিরের নির্মাণ সম্ভব হয়। তখনকার বিখ্যাত গুজরাতি ধনপতি শেঠ বস্তুপাল এই মন্দির নির্মাণের জন্য প্রচুর অর্থ প্রদান করেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও সুলতানি আমলে নির্মিত মন্দিরের মধ্যে রয়েছে ১২৯৬ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বেশ্বর মন্দিরের সামনে পদম নামে কোনো এক সাধুর বিশাল পদ্মেশ্বর মন্দির বা ১৩০২ খ্রিস্টাব্দে বীরেশ্বর নামের কোনো এক ব্যক্তির মণিকর্ণেশ্বর মন্দির প্রভৃতি।
মুইজুদ্দিনের আক্রমণের পর বারাণসী যখন ধীরে ধীরে নিজেকে নতুন শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলেছিল, ঠিক তখনই ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে বারাণসীর ইতিহাসে আবার দুর্ঘটনার মেঘ ঘনিয়ে আসে। দিল্লির সুলতানদের দুর্বলতার সুযোগে জৌনপুরের শর্কী সুলতানেরা নিজেদের স্বতন্ত্র ঘোষণা করে। বারাণসী চলে যায় শর্কীদের হাতে। এই সময় আবার বারাণসীতে ধ্বংসের রাজনীতি জেগে ওঠে। পদ্মেশ্বর, বিশ্বেশ্বর সহ আরও বহু মন্দির ধ্বংস করা হয়। ১৪৪৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সুলতান মুহাম্মদ শাহ শর্কীর পত্নী বিবি রাজি জৌনপুরের লাল দরোয়াজা মসজিদটি নির্মাণ করান। ঐতিহাসিকরা মনে করেন এই মসজিদের কাঠামোর স্থানে স্থানে বারাণসীর পদ্মেশ্বর মন্দিরের ভগ্নাংশ ব্যবহার করা হয়েছে।
জৌনপুরের শর্কী শাসকদের ইতিহাসে এখানেই এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে তাঁরা যেমন মন্দির ভেঙে মসজিদের কাঠামো জোগাড় করেছেন, অন্যদিকে তেমনি তাঁদেরই দরবারি পৃষ্ঠপোষকতায় বারাণসীর শিল্প ও সংস্কৃতি এক অভূতপূর্ব গতি লাভ করেছে। শর্কী সুলতানরা ছিলেন বিদ্যাচর্চা-শিল্প-সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সমঝদার। দিল্লির অরাজক অবস্থা থেকে বাঁচতে কিংবা শর্কী সুলতানদের কাছে কদর লাভের আশায় মধ্য এশিয়া, সিরিয়া, বা পারস্য দেশের মতো দূর-দূরান্ত থেকে বহু বিদ্বজ্জন ও সুফি সন্তরা জৌনপুর ও বারাণসীতে আশ্রয় নেন। ফলে বিদ্যাচর্চায় বারাণসী সমৃদ্ধতর হতে থাকে। অনুকূল পরিবেশে দক্ষ শিল্পীরা এসে এখানে নিজেদের মেলে ধরতে শুরু করে। শর্কীদের উৎসাহে বারাণসীতে হিন্দু ও মুসলিম তাঁতিদের শৈল্পিক সমন্বয়ের নমুনা ফুটে ওঠে বেনারসি শাড়ির জমিনে। অন্যদিকে, সুলতান হুসেন শাহ শর্কী ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রকৃত বোদ্ধা ছিলেন। তিনি জৌনপুর ও বারাণসীতে ধ্রুপদী শিল্পীদের উৎসাহ বর্ধনের সাথে সাথে নিজেও সঙ্গীতচর্চা করতেন। বলা হয় রাগ জৌনপুরী ও হুসেনী টোড়ি ছিল তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত।
কট্টর মুসলমান শর্কী সুলতানদের আমলে বারাণসীতে অমুসলিমদের চরম ভোগান্তি যে সহ্য করতে হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এর প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু ধর্মের মধ্যে রীতিনীতির কঠোরতা আরও দৃঢ় হয়ে যায়, ছুৎমার্গের প্রবণতা বাড়ে, বর্ণ-জাতিভেদ চরম আকার ধারণ করে। বারংবার মন্দির ধ্বংসের প্রবণতা স্থানীয় ব্রাহ্মণদের বাধ্য করে নিজেদের ঘরের চার দেয়ালের অভ্যন্তরে দেবতার আসন প্রতিষ্ঠায়। এই কারণেই আজও বারাণসীর বহু প্রাচীন দেবতার অধিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায় একেবারে গৃহস্থের ঘরের কোনায়, কোনো সুবিশাল, ভব্য মন্দিরে নয়।
একদিকে দেবতাকে আড়ালে লুকিয়ে রাখার এই প্রবণতা, অন্যদিকে সামাজিক অস্তিত্বের সংকটে তৈরি হওয়া ভয় — এই দুইয়ের সুযোগে ব্রাহ্মণ সমাজ নিজেদের রক্ষার স্বার্থে দেবতার মন্দিরের চারিদিকে গড়ে তুলল নিয়ম-শৃঙ্খলার কঠিন প্রাকার। শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকায় অব্রাহ্মণদের পূজার অধিকার নিজেদের তৈরি নিক্তিতে মেপে তাদের বঞ্চিত করতে শুরু করল। জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার নামে পশুর থেকে তাদের আলাদা চোখে দেখা হতো না। এই ভেদাভেদের প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা চরমে উঠলে ভারতে ভক্তি আন্দোলন সমাজের সমস্ত শ্রেণির মানুষের কাছে শান্তির আশ্রয় হয়ে ওঠে।
ভক্তিবাদের সূত্রপাত প্রাচীন উত্তর ভারতে হলেও পঞ্চদশ শতাব্দীর আগে তা গণবিপ্লবের চেহারা নেয়নি। একটু পিছিয়ে গেলে দেখি, হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর উত্তর ভারতে ধীরে ধীরে কট্টর হিন্দু রাজপুত জাতির শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ব্রাহ্মণরা রাজপুতদের ক্ষত্রিয় বলে সম্মান দেয় এবং এর বিনিময়ে তারা পায় রাজার সুরক্ষা, জমিজমা ও উঁচু পদ। এভাবেই পারস্পরিক উৎসাহে সমাজে জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বীজ বহু পূর্বেই বপিত হয়েছিল। এই অবস্থায় ভক্তিবাদের মতো বিপ্লবী ধারণা ক্ষমতাশালী ব্রাহ্মণ বা রাজপুত শাসকদের চটিয়ে শক্তি অর্জন করতে পারেনি। উত্তর ভারতে তুর্কিদের আক্রমণে রাজপুতদের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে ব্রাহ্মণ-রাজপুত জোট, এবং ব্রাহ্মণেরা হারিয়ে ফেলে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব। এরকমই আবহে উত্তর ভারতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ভক্তি আন্দোলন। সংস্কৃতের মতো উচ্চবর্গীয় ভাষা নয়, বরং সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন ভক্তিবাদীরা। উত্তর ভারতের সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে তাঁরা লোকভাষাকেই প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার করে তোলেন।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
তৃতীয় অধ্যায় ‘ফিরে দেখতে যাওয়া’ প্রথম পর্ব
