কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ২১। শোভন সরকার
গত পর্বে: আম্রপালি, অদ্ধকাশী, বিক্রালার কথা বলতে বলতে উঠে এল মনিকর্ণিকা ঘাটের শ্মশানে নগরবধূদের এক বিচিত্র অনুষ্ঠানের কথা। কী সেটা?
শিবম বলল, ‘ইতিহাস ঘাঁটলে দেখি নগরবধূরা ছিলেন সমাজ ও শিল্পচর্চার উঁচুতলায় যাতায়াত করা স্বাধীন নারী, ছিলেন ‘সমগ্র নগরের বধূ’, সমাজের সকলের কাছে অত্যন্ত সম্মানের। যেমন ঐ যে আম্রপালির কথা বললাম, তিনিই নগরবধূর এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ইতিহাসের পাকচক্রে এখন এঁদের অত্যন্ত তীর্যক দৃষ্টিতে, অসম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়। সাধারণ মানুষ নগরবধূদের শরীরবিলাসী পণ্যেরই সমার্থক ভেবে থাকে।’
‘মনিকর্ণিকায় এদের নিয়ে কী গল্প আছে বলছিলে?’
‘জানো বোধ হয় যে অম্বরের রাজা মানসিংহ খ্রীষ্টিয় ষোড়শ শতকে বেনারসে প্রভূত গঠনমূলক কাজ করেন। সেই সময় মনিকর্ণিকা ঘাটের মহাশ্মশান নাথের মন্দিরেরও সংস্কার করেন। জনশ্রুতি আছে, প্রচলিত রীতি মেনে তিনি চাইছিলেন মন্দিরের উদ্বোধন হোক জাঁকজমকপূর্ণ নৃত্য-গীতের মাধ্যমে।। কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিল। শ্মশানে তো মৃত্যুর মিছিল লেগেই থাকে, চিতা জ্বলে, শোক সেখানে মেঘের মত ছেয়ে থাকে সারাক্ষণ। কাজেই তখনকার কোন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী শ্মশানে এসে নাচ-গানে রাজি হলেন না। ঠিক সেই সময় বিষণ্ন রাজার ইচ্ছে পূরণ করতে এগিয়ে এলেন বেনারসের নগরবধূরা। তাঁরাই শ্মশানে এসে তাঁদের গীত-বাদ্য-নৃত্যে মৃত্যুর ছায়ায় জীবনের উৎসব পালন করলেন। বেনারসে মৃত্যু তো শোকের নয়, বরং মুক্তির উৎসব। তাহলে শোকের আবহ আনন্দ-বিলাসে বাধা কেন হবে? সুতরাং সেই হল শুরু, তখন থেকেই প্রতি চৈত্র নবরাত্রিতে মনিকর্ণিকায় নগরবধূদের উৎসবের প্রথা চালু হল।’
‘ভাবাই যায়না!’
‘এখন যদি আনকোরা কেউ ঐ দিন সন্ধ্যায় মনিকর্ণিকা ঘাটে উপস্থিত হয়, তো সে হয়তো দেখবে এক অস্থায়ী মঞ্চে কিছু মহিলা চটুল গানের সঙ্গে নাচছে। ওপর ওপর দেখলে ঘাটে আসা মানুষদের নজরে এই নাচ রুচিহীন তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। অবশ্য তাদের দোষ দিই কী করে; আজকাল আমাদের অন্য মানুষের দিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গী বড়োই অসংবেদনশীল, স্বার্থপর।’
আমি চুপ করে শুনতে থাকলাম। শিবম আবার বলল,
‘নগরবধূরা বিশ্বাস করেন যে মহাশ্মশান নাথের সামনে নাচের মাধ্যমে তাঁদের সমস্ত পাপ ক্ষয় হয়। তাঁরা মনে মনে মহাদেবের কাছে প্রার্থনা জানান যেন এই জন্মেই তাঁদের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি হয়, পরের জন্মে যেন আবার ‘নগরবধূ’ হয়ে জন্মাতে না হয়। এই সময় আরও একটা ব্যাপার তাঁরা করেন — যদি কখনও তুমি এই অনুষ্ঠানে যাও দেখবে নাচের শেষদিকে এসে নগরবধূরা পায়ে বাঁধা ঘুঙুর খুলে মঞ্চে ছুঁড়ে ফেলছেন।’
‘কেন? এর পেছনেও কি বিশেষ কোন কারণ আছে?’
‘আছে তো। পায়ের ঘুঙুর তাঁদের কাছে পেশার শেকল, সাংসারিক বন্ধনের প্রতীক। সেটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে তাঁরা এক মুহুর্তের জন্য হলেও বন্ধন মুক্তির আস্বাদ পেতে চায়।’
মনটা কেমন ভারী হয়ে গেল। সত্যিই, আমাদের আশেপাশে ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতিতে কত অমূল্য রত্ন, কত দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রয়েছে, আমরা তার কতটুকুই বা জানি।
‘শিবম, বড্ড ভারী হয়ে যাচ্ছে এবার,’ আমি মেজাজটা একটু হালকা করতে চাইলাম, ‘আর তোমার খিদে পায়নি নাকি? আমার কিন্তু খুব খিদে পাচ্ছে। খালি পেটে ইতিহাস-দর্শন হজম হয় নাকি? আশেপাশে কোন খাবারের স্টল নেই? ঐ দেখ, ওখানে মনে হচ্ছে লোকটা চিপস, বিস্কুট এসব নিয়ে বসে আছে। চল দেখি।’
খেয়াল করলাম আমার হাতে চায়ের কাপটা এখনও রয়ে গেছে। উঠে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। ঘাটে ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও লোকজন যেখানে সেখানে নোংরা করে দেখে খারাপ লাগে, অন্ততঃ আমি ওদের দলে যোগ দিতে চাইনা। আমরা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা লোক বেশ পরিপাটি করে অস্থায়ী একখানা স্টল সাজিয়েছে। চিপস ইত্যাদি ছাড়াও দেখলাম পাউরুটি রয়েছে। দু’টো মালাই-টোস্ট আর চা অর্ডার দিলাম। বেনারসের ব্রেকফাস্টে এই মালাই-টোস্ট খুবই জনপ্রিয়। এখানকার মত স্বাদ অন্য কোন জায়গায় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়েনা। পাউরুটিগুলো বেশ পুরু, চৌকো আকারের, লোকটা ছুরি দিয়ে তার মাঝ বরাবর চিরে একটা পকেট তৈরি করল। তারপর ছুরির ডগায় সাদা রঙের বেশ অনেকটা মাখন তুলে নিয়ে পুরে দিল পাউরুটির ভিতরে। এবার সেই মাখন-ঠাসা পাউরুটি একটা তারের জালিতে রেখে বসিয়ে দিল কয়লার আগুনে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে পাউরুটি সেঁকার গন্ধে ভরে উঠল ঘাটের বাতাস — আহা, খিদে পেটে সেই কয়লার ধোঁয়াটে গন্ধের মাখন দেওয়া পাউরুটি যখন হালকা পোড়া রঙ মেখে আমাদের প্লেটে এল, পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা যেন থেমে গেল। ওপর থেকে হালকা করে নুন-চিনি-গোলমরিচ গুঁড়োও ছড়িয়ে দিল লোকটা, সঙ্গে মাটির ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠা ঘন চা — ‘অমৃতযোগ’ বোধ হয় একেই বলে।
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে ঘাটে এসে বসলাম আবার। ঘাটে লোকজনের চলাচল ততক্ষণে একটু বেড়ে গেছে, রোদটাও চড়া হতে শুরু করেছে। হালকা হালকা বাতাস তখনও বয়ে চলেছে, বেশ আরাম লাগছে ঘাটে। পেটের খিদে তো মিটল, কিন্তু মনের খিদে তখনও রয়ে গেছে। শিবম হঠাৎ নিজেই আবার আগের কথার প্রসঙ্গ তুলল, ‘ একটু আগে দেবদাসীদের কথা বলছিলাম, মনে আছে? ভারতীয় ইতিহাসের মধ্যযুগের কথা বলছি, ঐ ধর আনুমানিক ষষ্ঠ থেকে ষোড়শ শতক। মূলতঃ দক্ষিণ ভারতে এই প্রথার আধিক্য থাকলেও সমধর্মী প্রথা এদিকেও কোন কোন জায়গায় দেখা যেত। পুজোর ফুল-প্রসাদের মতই তখনকার সময়ে দেবদাসীরা অত্যন্ত ভক্তিভরে তাঁদের নৃত্য-গীত অভীষ্ট দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করতেন। সেটাই তখনকার চল। তারপর একটা সময় এল যখন এঁরা রাজদরবারেও নৃত্য প্রদর্শন শুরু করলেন। কেন? কারণ এই যে, রাজা স্বয়ং দেবতার প্রতিনিধি। তাছাড়া বিভিন্ন মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজাদের বিশেষ ভূমিকা থাকত। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হতে লাগল। রাজ দরবারের অনুকরণে অনেক সম্ভ্রান্ত বংশের লোকেরা নিজেদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে জলসার আয়োজন শুরু করল এবং সেখানে ডাকা হতে লাগল গাইয়ে মেয়েদের। এরপর একটা সময় এল যখন দেখা গেল কোন রকম অনুষ্ঠান ছাড়াই জলসার আয়োজন করে সেখানে তাঁদের মনোরঞ্জনের জন্য গাইয়ে-নাচিয়েদের ডাকা হচ্ছে।
মুঘল আমলেও নবাব-বাদশাহের দরবার বা নানা আঞ্চলিক রাজসভায় দেখা গেল অত্যন্ত দক্ষ শিল্পীরা সভার সভ্যদের মনোরঞ্জন করছেন। এঁদের বলা হত ‘তাওয়াইফ’। আরবী শব্দ ‘তাইফা’, অর্থাৎ, গানের বা নাচের দল। এর থেকেই ‘তাওয়াইফ’, মহিলা শিল্পী যাঁরা জনসমক্ষে, বিশেষ করে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের জন্য জলসা বা মেহেফিলে অংশ নিত। এঁরা পেশাদার শিল্পী ছিলেন। এঁদের নৃত্যকে ‘মুজরা’ বলা হতে লাগল।
বেনারস যে আগে থেকেই এরূপ গাইয়ে-বাজিয়ে নৃত্যশিল্পীদের স্বর্গরাজ্য ছিল তা আগেই বলেছি। মুঘলদের আগমনের সাথে সাথে নানা হিন্দুদের সাথে সাথে মুসলিম মেয়েরাও এখানে পেশাদার শিল্পী হিসেবে কাজ করতে শুরু করল। মূলতঃ নারিয়ল বাজার, রাজা দরোয়াজা, চৌক ও ডালমণ্ডী এলাকায় এঁরা বসবাস করতেন। তাওয়াইফদের বাড়িতে যেখানে মেহফিল বসত তাকে বলা হত ‘কোঠা’। অত্যন্ত ধনী বা সম্ভ্রান্ত বংশীয়রা বিশেষ সময়ে তাওয়াইফদের কোঠায় না গিয়ে নিজেদের বাড়িতে মুজরার জন্য ডেকে পাঠাতেন। সেই সময়ে এই ধরণের মজলিসের আয়োজন অত্যন্ত সম্মানজনক এবং বিলাসবহুলতার প্রতীক বলে মনে করা হত। এই তাওয়াইফদের মধ্যে যাঁরা বিশেষভাবে দক্ষ ও উচ্চমানের শিল্পী, তাঁদের সম্মান দিয়ে ‘বাইজি’ বলা হত।
এই যে আমি নগরনটী, নগরবধূ, দেবদাসী, তাওয়াইফ বা বাইজিদের কথা বললাম, এঁরা আসলে সবাইই উচ্চমার্গের মহিলা শিল্পী ছিলেন। আম্রপালির কথা বলতে গিয়ে বলেছি সে কথা। মধ্যযুগ বা তার পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মহিলারা যে স্বাধীনতার আঁচও পেতেন না, এঁরা তা অনায়াসে পেতেন, শিক্ষিত ছিলেন। শুধু নাচ-গান নয়, সাহিত্যে, চারুকারু কলাতেও এঁদের দক্ষতা সেই সময়ে দাঁড়িয়ে রীতিমত ঈর্ষণীয় ছিল। কাশীতে এঁদের কেবল পেশাদারী শিল্পী বলে দেখা হত না, বরং শিল্পকলার ধারক ও বাহক, পরবর্তী প্রজন্মের গুরু। তাঁদের আচার-ব্যবহার ছিল শৈল্পিক, মার্জিত। জানো শোভন, একটা সময় ছিল যখন লখনৌ বেনারসের সম্ভ্রান্ত বা ‘রইস’ শ্রেণীর মানুষেরা তাঁদের সন্তানদের বাইজিদের কাছে পাঠাতেন এঁদের কাছ থেকে ‘তহজীব’ অর্থাৎ সুললিত, সুমার্জিত আচার-ব্যবহার শিখতে।’
‘শিবম, সবই বুঝলাম, কিন্তু সবাই বাইজিদের এত খারাপ কেন মনে করে? তুমি যদি যে কোন মানুষকে জিজ্ঞেস কর, তারা একটা হাসি হেসে নোংরা ইঙ্গিত করে তাঁদের বেশ্যা ছাড়া আর কিছুই বলবে না। তুমি আমাকে এতক্ষণ যা বললে তাতে তো কোথাও এমন ইঙ্গিত পেলাম না যে সমাজে এঁদের নীচু চোখে দেখা হচ্ছে, বরং অত্যন্ত সম্মান দেওয়া হচ্ছে। তুমি তখন বললে যে ইংরেজরা এসে নাকি আমাদের মনকে এঁদের নিয়ে সংকীর্ণ করে তুলেছে। কী ব্যাপার সেটা, একটু খুলে বল।’
(ক্রমশ)
