উড়নচণ্ডীর পাঁচালি। পর্ব ২৮। লিখছেন সমরেন্দ্র মণ্ডল

0

(গত পর্বের পর)

বিশ শতকের শেষ পর্বে। সম্ভবত ২০০৬ কি ২০০৭ সাল হবে। কবি ও সংগঠক শ্যামা বিশ্বাসের পরিকল্পনায় ‘জলঙ্গী কবিতা উৎসব’ শুরু হলো। কৃষ্ণনগর টাউন হলেম মাঠ জুড়ে তিন দিনের এলাহি আয়োজন। গেলাম সেই উৎসবে যোগ দিতে। ওখানেই প্রবীরের সঙ্গে দেখা। বুকে জড়িয়ে নিল সে। সেই সত্তরের আগুনের স্পর্শ পেলাম যেন। তারপর সম্পর্ক হয়ে উঠল আরও নিবিড়। ওর অনুরোধে একটি কবিতাগ্রন্থের মুখবন্ধও রচনা করে দিতে হয়েছিল। অনিল ঘড়াই তার সম্পাদিত ‘তূর্য’ পত্রিকার প্রবীরকে নিয়ে একটা সংখ্য করল, সেই সংখ্যায় অনিলের অনুরোধে লিখতে হলো কে নাতিদীর্ঘ গদ্য। আবার প্রবীর যখন আমাকে নিয়ে ‘মৌসুমী’ পত্রিকার একটা সংখ্যা করেছিল। সে এমন কিছু কবিতার উল্লেখ করেছিল, যা স্বয়ং লেখকই ভুলে মেরে দিয়েছিল।

সে অন্য প্রসঙ্গ হলেও, প্রসঙ্গ এটাই, অনিল আর প্রবীরের সখ্য অত্যন্ত নিবিড় হয়ে উঠেছিল। অনিল যেমন মধুমেহ আর কিডনি আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ বরফ-মাস নিজের শরীরের সঙ্গে লড়াই করে হেরে গেছিল, তেমনি প্রবীরও মধুমেহর সঙ্গে চোখের কঠিন অসুখে ভুগছিল। তবুও সে কবিপতার টানে ছুটে বেড়াচ্ছিল। আত্মজা মৌসুমীর জন্মদিনে বৃক্ষরোপণের আয়োজন করেছিল। আমৃত্যু সেই নির্ঘন্ট সে বজায় রেখেছিল।

মিলিটারি মেজাজে লড়াই চালিয়ে গেলেই অসুখ ওকে রেহাই দেয়নি। বিব্রত করতে করতে একদিন হারিয়ে দিল। অনিল চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরেই প্রবীর টা টা বাই বাই করে চলে গেল নবদ্বীপ শ্মশানে। শুধু স্মৃতি হয়েই থেকে গেল শহরের বুকে।

একজন অজস্র মানুষ

অনেকদিন ধাত্রীভূমি কৃষ্ণনগরে কাটানো হলো। এবার ফিরে আসি মহানগরে। এখন তো এই মহানগরই আমার বাসভূমি। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর হয়ে গেল মহানগরে আশ্রয় নিয়েছি। সেই বা কম কী! মানবজীবনের খানা-খন্দ পেরোতে পেরোতে কত মুখের ছবিই না পড়ে ফেললাম। কয়েকজনের কথা বলেছি আগেই। আরও কতজন রয়ে গেল বাকি। সকলের কথা কি বলা যায়? কত মুখের ছবি আলগা হয়ে ঝুলে পড়ে দেওয়ালে। কত মুখ মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তবুও কিছু কিছু মুখের কথা না বললেই নয়।

পাঁচালি লিখতে লিখতে একটা মুখ ভেসে এলো। প্রণবদা! কবি প্রণব চট্টোপাধ্যায়। মৃদুভাষী, বিনয়ী। ছিলেন গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের নেতৃস্থানীয় পদে। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। থাকতেন দমদম-বাবুইহাটি অঞ্চলে, নাকি লেক টাউনে? ঠিক ঠাহর করতে পারছিনা। কিন্তু প্রণবদার বাড়িতে তো গিয়েছি বার দুয়েক। একবার দ্বিপ্রাহরিক আহারও করেছি। সে অবশ্য গিয়েছিলাম কবি অর্ধেন্দু চক্রবর্তীর সঙ্গে। আমি তো ভূগোলে কলম্বাস, সুতরাং মানচিত্রে গোল বাধবে এ আর এমন কী!

প্রণব চট্টোপাধ্যায় লিখতেন কম। যখন ‘অমৃত’ পত্রিকা বের হতো ‘যুগান্তর’ দপ্তর থেকে, সেই পত্রিকায় তিনি লিখতেন। শারদীয় অমৃততে তাঁর কবিতা থাকতো। প্রথম যৌবনেই সেসব পড়া ছিল। ‘নন্দন’ পত্রিকাতেও পড়েছি তাঁর কবিতা। কিন্তু তাঁর বইপত্র পড়া ছিল না। হদিশও জানা ছিল না। সরকারি চাকুরে প্রণবদা একটু আড়ালেই থাকতেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির পরিচালনবর্গের সদস্য। প্রায়ই আসেন আকাদেমিতে। কিন্তু আমরা তো নিয়মিত যাই না, ফলে চেনাজানাও ছিল না।

আমরা ক’জন মিলে তখন ‘অন্তরীক্ষ’ নামে একটা ছোটো পত্রিকা বের করতে শুরু করেছি। ১৯৯৭ সালের কথা। আমরা মানে, আমার সঙ্গে ছিল অনির্বাণ ঘোষ, সঞ্জয় চৌধুরী আর হীরক মুখোপাধ্যায়। সঞ্জয় আর হীরক প্রথম থেকে ছিল না, এসেছিল একটু পরে। সে কথা বলছি একটু বিলম্বে। আগের কথাটা বলে নিই। তা সেবার পত্রিকা বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা হাতে এলো। ঠিক করা হলো, একটি কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান করা হবে, নির্দিষ্ট কয়েকজন কবিকে নিয়ে। সঙ্গে কোনও নির্জনবাসী কবিকে সংবর্ধিত করা হবে। এক রোববার অর্ধেন্দু চক্রবর্তীর বাড়ি যাওয়া হলো। অর্ধেন্দুদার সঙ্গে হৃদ্যতা ছিল বেশি। আমার সঙ্গে কয়েকবছরের সম্পর্ক।

আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্য, সিদ্ধেশ্বর সেন বা মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যাযকে সম্মাননা জানাবো। তিনজনেই তখন অসুস্থ। পরে মঙ্গলাচরণের বাড়ি গিয়ে তাঁকে সম্মাননা জানানো হয়েছিল। সে অন্য বৃত্তান্ত। অর্ধেন্দুদা পরামর্শ দিলেন প্রণব চট্টোপাধ্যায়কে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য। কারণ এই চার কবির মধ্যে প্রণবদাই ছিলেন কবিমুখের আড়ালে। কিন্তু কবি প্রণব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় নেই। অর্ধন্দেুদা বললেন তিনি চিঠি লিখে দেবেন। এই সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য চিত্রশিল্পী ও নাট্যকার ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করলাম। অনুষ্ঠানের দিন, তারিখ সব ঠিক হল। কিন্তু প্রণবদাকে কোথায় পাব? বাড়ি তো সেই বাগুইহাটি নাকি লেকটাউন। অর্ধেন্দুদা খবর নিলেন বেহালার সরশুনাতে গণতান্ত্রিক লেখক-শিল্পীদের এক সভায় তিনি আসছেন। ছুটলাম চিঠি হাতে। একটা স্কুলঘরে ছাত্রদের সারিসারি বেঞ্চিতে একদিকে তিনি বসে আছেন। আমিতো চিনতাম না, চিনিয়ে দিলেন একজন। তাঁর হাতে চিঠি দিলাম। তিনি পড়লেন। আমার দিকে চোখ তুলে বিষ্ময়ে প্রশ্ন করলেন, আমাকে? আমাকে কেন? অনেকেই তো আছেন।

বললাম সকলে চাইছে।

-আমার কবিতা পড়েছো?

-পড়েছি। অমৃত, নন্দনে পড়েছি বহুদিন। তিনি হেসে উত্তর দিলেন, ঠিক আছে। যাবো। কিন্তু বেশি হইচই কোর না।

সম্মতি পেয়ে আমি তো তৃপ্ত। এবার গেলাম ইন্দ্রনাথদার কাছে। ‘দেশহিতৈষী’ অফিসেই তাকে পাওয়া গেলাম। সবিস্তারে জানালাম। বললেন, আমি তো বাইরে যাবো। তোমরা অনুষ্ঠান করো, আমার আসতে একটু দেরি হবে। তোমরা অন্য কাউকে সভাপতি কর।

অর্ধেন্দুদার সঙ্গে আলোচনা করে গেলাম ‘গল্পগুচ্ছ’ সম্পাদক অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। তিনি এক কথায় রাজি। আমন্ত্রণপত্র ছাপা হল। এগিয়ে এলো বন্ধু কবি মিহির সরকার, সে ‘সহজ’ পত্রিকা করে। অনুষ্ঠানের সহযোগী হিসাবে ‘সহজ’ আর অর্ধেন্দু চক্রবর্তীর ‘আবর্ত’ রইল। সে এক এলাহি ব্যাপার। আমরা কবিতা পড়ার জন্য কোনও চালু বা প্রতিষ্ঠিত কবিকে ডাকিনি। আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় শ্যামল সেনকে। সঙ্গে প্রণবদা আর অর্ধেন্দু তো ছিলেনই। গান গেয়েছিলেন প্রণবদার ভাইবো আবীর চট্টোপাধ্যায়। আর প্রণবদার ভাই সমর চট্টোপাধ্যায় তো ছিলেন আকাদেমির সচিব হিসাবে। তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম আকাদেমির সচিবকে নয়, প্রাবন্ধিক ও গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের রাজ্যসম্পাদক অনুনয় চট্টোপাধ্যায়কে।

পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠান চলার মধ্যকালীন সময়ে ইন্দ্রদা প্রবেশ করলেন। একটু সামনের দিকে বসলেন। কেউ একজন চেয়ার ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাকে মঞ্চে ডাকা হল দু-কথা বলার জন্য। তিনি শুরুতেই বললেন, ‘আজ অন্তরীক্ষ একটা ঐতিহাসিক কাজ করেছে। তারপর তিনি প্রণবদার খোজ ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কথা বলেন। পরদিন গণশক্তিতে বেশ বড় করে বের করে সেই খবর। কালান্তরেও বেরিয়েছিল। কিন্তু বিপত্তি হল এর পরেই। আমরা কিছুটা বিব্রতই হলাম। কে বা কারা রটিয়ে দিল প্রণবদাকে ধরতে পারলেই লিটল ম্যাগাজিন মেলার কবিতা পড়ার সুযোগ পাবে। ব্যাস, শুরু হয়ে গেল প্রণবদাকে সংবর্ধনা দেওয়ার উমেদারি। ততদিনে আমাদের বুধবারের আড্ডা শুরু হয়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোনও না কোনও পত্রিকার তরফ থেকে প্রণবদার কাছে সংবর্ধনার প্রস্তাব আসতে শুরু করল। কুণ্ঠিত স্বরে প্রণবদা জিজ্ঞাসা করতেন, কী করা যায় বলতো? তোমরাই তো আমাকে এদের চেনালে।

আমি আর কী বলব! বলতাম, ভাল তো। আমি নিজেই বিবেচনা করে দেখুন।

-কিন্তু এদের উদ্দেশ্য তো ভালো নয়।

প্রণবদার মতো একজন প্রাজ্ঞ মানুষকে আর কিছু বলা যায় না। নিশ্চুপ থাকাটাই শ্রেয়। সেই পথই অবলম্বন করতাম। যারা তাকে সংবর্ধিত করতে চাইতেন, তাদের মধ্যে বামপন্থী চিন্তায় লালিত এমন মানুষ প্রায় ছিলই না। ছিল দক্ষিণপন্থী ও চোরা বামপন্থীর দল। যারা ধান্দার বাইরে কিছু বোঝে না। প্রকৃত বামপন্থীরা বরং তার কাছাকাছি কমই থাকতো। এর পরেই দেখা গেল দক্ষিণপন্থীদের পত্রিকায় প্রণবদার কবিতার ছড়াছড়ি। সে কবির কবিতা পঞ্চাশ থেকে আশির দশক পর্যন্ত কিছু নির্বাচিত পত্রিকা ছাড়া, অন্য কোথাও পড়ার উপায় ছিল না, হঠাৎই তার কবিতা প্রকাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। কেউ কেউ তার গুচ্ছ কবিতা ছাপতে শুরু করল। লিটল ম্যাগাজিন মেলায় বা সরকারি কবিতা উৎসবে এইসব দক্ষিণপন্থী কবিরা নিয়মিত কবিতা পড়তে শুরু করলেন। প্রকৃত বামপন্থীরা ক্রমশ আড়ালে চলে গেলেন।

তিন দশক কবিতা লিখে প্রণবদা যা পাননি, মাত্র এক দশকেই তিনি তা পেয়ে গেলেন। কবি হিসাবে তরুণ কবিদের কাছে স্বীকৃতি। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির পরিচালন সমিতির সদস্য হিসাবে বুধবার ছাড়াও অন্যদিন নানা কাজে তাকে আসতে হতো। তখন কোনো না কোনোও পত্রিকা সম্পাদককে ডেকে নিতেন। আমরাও গেছি অনেক সময়। তখন দেখতাম তার মুখে তৃপ্তি খেলা করছে। কিন্তু এই তৃপ্তি বেশিদিন রইলো না। বামফ্রন্ট জমানার শেষ দিকে দক্ষিণপন্থীদের আনাগোনা বাড়ছে আকাদেমি চত্বরে। অনেকেই তীব্র বামবিরোধী প্রচারও করছেন। প্রণবদার আশপাশ তেকে সরছে অনেকে, নিজেদের আলাদা বৃত করছে। রাজনৈতিক অবস্থাও ভাল নয়। এই সময় প্রণবদার মুখটা বিষণ্ণ মনে হতো। মাঝে মাঝেই বলতেন, কী হবে বল তো সমর?

জমানা বদলে গেল। প্রণবদা বাংলা আকাদেমিতে আসা বন্ধ করে দিলেন। কখনো কোনও অনুষ্ঠানে হয়তো আসেন। রাজ্যে পালাবদলের  পরে প্রথম পাঁচ বছরে বার চার-পাঁচেক তিনি এসেছিলেন কবিতা পড়তে। তারপর তাকে দেখা যায়নি। কিন্তু অদ্ভুত একটা বিষয় দেখা গেল প্রণবদার মৃত্যুর পর। বেশিদিন আগের কথা। পালাবদলের সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষের দিকে। সালটা ২০১৭ কি ২০১৮ হবে। প্রণবদা প্রয়াত হয়েছেন এখবরটা পাওয়ার পরেই দক্ষিণপন্থীরা, এবং আগে যারা চোরাবামপন্থী ছিল, এখন প্রকাশ্যেই সরকারপন্থী, তারা স্মৃতিসভার আয়োজন করল ঢাক পিটিয়ে এবং সকলেই তারস্বরে ঘোষণা করল, তাদের সঙ্গেও প্রথম আলাপ প্রণবদার। তাদের সঙ্গেই প্রণবদা সবচেয়ে বেশি মেলামেশা করতেন। আর গণতান্ত্রিক লেখক-শিল্পী সংঘ বা অন্যান্য বামপন্থী মানসিকতা ও মননে লাক্ষিত পত্রিকাগুলি প্রায় নির্জনে তার স্মরণসভা করলো। একদা এইসব সভায় যারা ভিড় করতো, সেইসব মুখ কেমন অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রণবদা নিজেই বিস্মৃত হতে শুরু করলেন। তিনি তো লিখেছিলেন, ‘হাঁটতে হাঁটতে আমি যেন/ রোদ্দুর থেকে দূরে সরে যাচ্ছি/এখন সম্পূর্ণই ছায়া করলিও’। সেইসব প্রবল দক্ষিণপন্থীদের কাঝে প্রণবদা ছায়া হয়ে গেলেও, আমরা কিন্তু সযত্নে রেখেছি অম্লান স্মৃতিজলে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *