পরিবেশকর্মী হত্যা : একটি আলেখ্য। পর্ব ৬। লিখছেন অনির্বাণ সিসিফাস ভট্টাচার্য

0

(গত পর্বের পর)

পোচিং থেকে আদিবাসী-উচ্ছেদ – অন্ধকার, অরণ্য ও আফ্রিকান পরিবেশ-হননের উত্তরাধিকার

২০১৮-য় কেনিয়ার কিয়াম্বু অরণ্যের জলাভূমির ভেতর মাইনিং কোম্পানির এক্সক্যাভেটর বাকেটগুলো চোখে পড়লে তাদের মধ্যে কোথাও চোখে পড়ত জোয়ানা স্টুচবেরিকে। বাকেটের ভেতর ঢুকে বসে আটকেছিলেন এনক্রোচমেন্ট। কেনিয়ার ফরেস্ট সার্ভিস পাশে এসেছিল। এক্সক্যাভেটর বাকেট সহ সমস্ত মেশিনারি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। বদলে জোয়ানার দিকে তোলা এনক্রোচারদের গানপয়েন্টের শাসানি। জমির দাম হুহু করে বাড়া কিয়াম্বু অঞ্চলে নেকড়ের মতো এসে পড়ছিল বিল্ডাররা। জলাভূমি, অরণ্যের সীমানা থেকে ক্রমশ এনক্রোচারদের অরণ্যের ভেতরের দিকে ঢোকা। স্টুচবেরির প্রতিবাদ ছিল অন্যদের থেকে জোরে। ২০২১-এর ১৫ জুলাই নাইরোবির কাছে বাড়ির ১৫০ মিটার আগে গাড়ি থেকে নামতে বাধ্য হয়েছিলেন। সামনে কাঠের স্তূপ জড়ো করে রাখা। কে রেখেছে? উঠে সরাতে গেলেন। ছ ছ’টা গুলি। প্রতিবেশীরা যখন শরীর খুঁজে পেলেন, ইঞ্জিন চলছে। জুয়েলারি, ঘড়ি সব অক্ষত। নিঃস্পন্দ পরিবেশকর্মী। স্পয়লার অ্যালার্ট – দোষীদের এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। ২০১৭ সালে কেনিয়া সরকারের প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণের ৩০ বছর আগে নিজের বাড়িতে প্লাস্টিক ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন তরুণী জোয়ানা। পুরোনো পোর্সেলিন, টাইলস দিয়ে চেয়ার টেবিল বানাতেন। কখনও বিল্ডিং সাইটের ভাঙা আসবাবের অংশ দিয়ে জানলার ফ্রেম। নিরস্ত্র ৬৭ বছরের এই বৃদ্ধার পেছনে ছ ছ টা গুলি। জরুরি ছিল খুব?

২০১৮-য় এভাবেই কিয়াম্বু অরণ্যে বিল্ডারদের এক্সক্যাভেটর বাকেটের ভেতর বসে এনক্রোচমেন্ট আটাকাতেন জোয়ানা স্টুচবেরি (ছবিসূত্র – দ্য গার্জিয়ান)

 

ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত জোয়ানা থেকে ঊনসত্তর পেরনো মার্কিন তথ্যচিত্রকার জোন রুট। তরুণী, ব্লন্ডে, হাস্যমুখর জোয়ানের স্বামী অ্যালেনের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘মিস্টিরিয়াস ক্যাসলস অফ ক্লে’ (১৯৭৮) বা ‘মার্চ অফ দ্য পেঙ্গুইন্স’ (২০০৫), যার মধ্যে প্রথমটির অস্কার মনোনয়ন। প্রখ্যাত প্রাইমেটোলজিস্ট লুই লিকির পরিচিত জোন অ্যালেনের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর কেনিয়ার লেক নাইভাসা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন ভেবেছিলেন। অ্যান্টি-পোচিং, ওভার-ফিশিং নিয়ে অতিরিক্ত ভোকাল হয়ে শত্রুর পর শত্রু জোটালেন, স্থানীয় একাংশের বিদ্বেষে পড়লেন সহজেই। ২০০৬-এর ১৩ জানুয়ারি রাত দেড়টায় জানলার বাইরে থেকে একাধিক গানশট। রক্তস্নান। জোনের বয়স সত্তর ছোঁয়ার আর পাঁচদিন বাকি ছিল। অথবা একেবারে সাম্প্রতিক ‘আই ড্রিমড অফ আফ্রিকা’-খ্যাত কুকি গলম্যান। ইটালিজাত কুকি পারিবারিক কফি প্ল্যান্টেশন থেকে কেনিয়ায় পাকাপাকি বসবাস শুরু করে গ্রেট রিফট ভ্যালির কাছে তৈরি করেন ৩৫,০০০ হেক্টর র‍্যাঞ্চ এবং লাইকিপিয়া নেচার কনজারভেন্সি ও মুকুতান রিট্রিট। খরায় ছিন্নভিন্ন আফ্রিকান রিফট ভ্যালির কাছে ক্যাটল র‍্যাঞ্চিং-এ আসতে থাকল স্থানীয়রা। কুকির সঙ্গে প্রায়শই বিবাদ। অস্ত্র যোগাযোগ, হিংস্রতা, দারিদ্র এবং জাতি-গত বৈরিতায় সাদা-কালো দূরত্ব বেড়ে যাওয়া আফ্রিকায় ক্রমশ নিরাপত্তা হারাচ্ছিলেন কুকি। ২০১৭-র ২৯ মার্চ মুকুতানে দাউ দাউ আগুন। ৪০০০ হেক্টর অরণ্য ধূলিসাৎ, এবং কুকির মেয়ে সেবাকে হত্যার চেষ্টা। সেবা বেঁচে ফিরে এসেছিলেন। ২৩ এপ্রিল অন্য একটি আক্রমণে পেটে দু দুটি গুলি খেয়েও বেঁচে গেছিলেন কুকি নিজেও। কিন্তু রাজনৈতিক সুবিধেবাদ ও দারিদ্র-খরার জাঁতাকলে কালো-আফ্রিকান ও সাদা আগন্তুক আফ্রিকানদের এই শাশ্বত বিরোধ এবং পরিণতিতে অনিয়ন্ত্রিত হত্যা বা হত্যার চেষ্টা – এই লেগ্যাসি বন্ধ হয়নি একেবারেই।

জোন রুট (ছবিসূত্র – স্যান্ডপেপারফিল্মস)

কেনিয়ায় গ্রেট রিফট ভ্যালিতে স্থানীয়দের সঙ্গে কুকি গলম্যান (ছবিসূত্র – ক্যাপিটাল নিউজ)

 

ভিরুঙ্গার প্রখ্যাত ডায়ান ফসের অ্যান্টি-পোচিং স্ট্রাগলের বাইরে নামের পর নাম। অবাধে বৃক্ষচ্ছেদনের পাশাপাশি আফ্রিকান পরিবেশকর্মী হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পোচিং, যথেচ্ছ শিকার এবং আইভরি ব্যবসা। ডব্লু.ডব্লু.এফ. বলছে, ১৯৩০-তে আফ্রিকার ১০ মিলিয়ন হাতির সংখ্যা পঞ্চাশ বছর পর ১৯৮০-তেই কমে হয়ে যায় ১.৩ মিলিয়ন, যা বর্তমানে ‘সেভ দ্য এলিফ্যান্টস’ সমীক্ষায় পাঁচ লক্ষের আশেপাশে। কেনিয়ার ওয়াইল্ডলাইফ অথরিটি বলছে, প্রতি বছর ৩০,০০০ হাতিকে মারা হয় শুধুমাত্র দাঁতের জন্য, আইভরির জন্য। ২০০১-এর হিসেবে হাতি কমে ২০২৩-এ হয়েছে ৩০ শতাংশ। ২০২১-এ মনিটরিং দ্য ইল্লিগাল কিলিং অফ এলিফ্যান্টসস সংস্থার একটি সমীক্ষা বলছে, হাতি মৃত্যুর ৪০ শতাংশ কারণ পোচিং। নামিবিয়া বা জিম্বাবোয়ে হাতি হত্যার গ্রাফ তুলনায় নিম্নমুখী হলেও নামিবিয়ায় ভয়ঙ্কর ২০২২-এ ৮৭টি গন্ডার মারা হয়েছে, যা ২০২১-এর (৪৫) তুলনায় ৯৩ শতাংশ বেশি, যার অধিকাংশই সেদেশের এটোশা ন্যাশনাল পার্কের ভেতর। চীন, ভিয়েতনাম, ব্রিটেন, জাপানের বাজারে হুহু করে বেড়েছে চোরাগোপ্তা রপ্তানি, দেশীয় আইভরি ব্যবসা। এবং এই আইভরি ব্যবসাকে ধরতে, পোচিং আটকাতে আরও কয়েকটা নাম। ২০১৭ অবধি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী ৪২,০০০ হাতি, ৭০০০ জিরাফকে নিহত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে প্রায় ১১৫০টি বেআইনি অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করেছিল এনজিও পি.এ.এম.এস ফাউন্ডেশন। ২০১৭-র ১৬ আগস্ট ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা একান্ন ছোঁয়া ওয়েন লটারকে তানজানিয়ার দার-এস-সালাম এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময়ে গাড়ির ভেতরে গুলি করে শেষ করে দেওয়া হয়। এই ওয়েন চলে যাওয়ার আগের বছর নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখছিলেন রজার গাওয়ারের কথা। হেলিকপ্টার পাইলট রজার গাওয়ার তানজানিয়া সরকারের সঙ্গে ফ্রেডকিন কনজারভেশন ফান্ডের হয়ে পোচিং সংক্রান্ত তথ্য ঘাঁটতে তানজানিয়ায় এসেছিলেন। সেরেঙ্গিটি ন্যাশনাল পার্কের মাশোয়া গেম রিজার্ভে সাফারি গাইড নিকি বেস্টারের সঙ্গে হেলিকপ্টারে একটি মৃত হাতির খুব কাছাকাছি পৌঁছে হাতিটিকে পরীক্ষা করতে গেলেন রজার। হঠাৎ গুলি। নিকি কোনওরকমে বাঁচলেও পাইলট বছর সাঁইত্রিশের তরুণ রজার গাওয়ার ঝাঁজরা হয়ে যান ২০১৬-র ২৯ জানুয়ারি। উদ্ধারের জন্য দল আসার আগেই নিঃস্পন্দ এই মানুষটি। অথবা মার্কিন পশুসংরক্ষণবিদ এসমন্ড ব্র্যাডলি মার্টিন। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সাতের দশক থেকে কেনিয়ার বসবাস। হাতির দাঁতের জন্য আইভরি ট্রেড বাঁচাতে এশিয়া-আফ্রিকা তন্নতন্ন করে ফেলেছেন স্ত্রী, রিসার্চ পার্টনার ক্রাইসির সঙ্গে। গন্ডারের শিংয়ের ভেষজ গুণ আছে, এমন ভ্রান্ত মিথ ভেঙে দিয়ে গন্ডার হত্যা কমাতে সেমিনার, টক, মাঠে নেমে বোঝানো – বাকি রাখেননি এসমন্ড। মায়ানমার থেকে ফিরে এসে সেদেশে আইভরি ব্যবসা, পাচার নিয়ে লিখছিলেন কেনিয়াতে বসেই। ২০১৮-র ৪ ফেব্রুয়ারি ঘাড়ে ফেটাল ছুরিকাঘাত। নিরস্ত্র, বৃদ্ধ এসমন্ড ৭৬ পেরোচ্ছিলেন। এবং জর্জ অ্যাডামসন। ছাপ্পান্ন’র সেই এলসা, সেই ‘বর্ন ফ্রি’। ভারতের ইটাওয়াজাত ব্রিটিশ জর্জ এবং অস্ট্রেলিয়ার জয় – এবং তাঁদের আফ্রিকান র‍্যাপসডি। পশুরা মানুষের থেকে কম অবিশ্বাসী হয়। বিশ্বাসহন্তা পশুদের রক্তে আছে কি? মানুষের রক্তে থিকথিক করছে বিষ। বিচ্ছেদ, পরিচারকের হাতে স্ত্রী জয়ের রহস্যজনক খুন, এবং কেনিয়ার কুরা ন্যাশনাল পার্কে বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দেওয়া একা সাদা দাড়ির তরুণ বৃদ্ধ জর্জ। ১৯৮৯-এর ২০ আগস্ট নিজের সহযোগী এবং এক পর্যটককে বাঁচাতে গিয়ে সোমালি পোচারদের সঙ্গে মারণ সংঘর্ষ। বৃদ্ধ জর্জ তিরাশি ছুঁয়েছিলেন।

এসমন্ড ব্র্যাডলি মার্টিন (ছবিসূত্র – দ্য ইকোলজিস্ট)

তানজানিয়ায় রজার গাওয়ার এবং তাঁর সেই হেলিকপ্টার (ছবিসূত্র – মোঙ্গাবে)

জর্জ অ্যাডামসন (ছবিসূত্র – কেনিয়া জিওগ্রাফিক)

 

তথাকথিত হোয়াইট সুপ্রিমেসির বাইরে কালো আফ্রিকানরা? পরিবেশ আন্দোলনে, এবং পাল্টা হিংস্রতায় কতটা কাঁপছে আদিবাসী আফ্রিকা? ফিকিলে সাঙ্গাসে। দক্ষিণ আফ্রিকার এমফোলোজি কমিউনিটি এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস অর্গানাইজেশন বা এম.সি.ই.জে.ও.-র অন্যতম একটি শাখার ভাইস-চেয়ারপার্সন ফিকিলে ৬৩ পেরোচ্ছিলেন। বয়স একেবারেই শাসাতে না পারা ফিকিলের মনে দাগ ফেলছিল তাঁর কোয়াজুলু নাটাল প্রভিন্সের সোমখেলা অঞ্চলের টেন্ডেলে কোল মাইনিং-এর দাপট। দক্ষিণ আফ্রিকা মহাদেশের বৃহত্তম অ্যানথ্রাসাইট কয়লা-উৎপাদক। আফ্রিকার প্রাচীনতম ন্যাচারাল রিজার্ভ লুলুয়ে ইমফোলোজি পার্কের কাছে টেন্ডেলের মাইনিং এক্সপ্যানশন প্রকল্প, যন্ত্রপাতির আসাযাওয়া, ক্রমশ শ্বাসজনিত সমস্যা বেড়েই চলেছিল স্থানীয় পুঙ্কিয়ানি আদিবাসী অঞ্চলের প্রায় দেড় লক্ষ গ্রামবাসীর ভেতর। মাইনিংয়ের নিয়মিত ব্লাস্টিংয়ে ঘরের দেওয়ালে ক্র্যাক। নিহত পরিবার-সদ্যদের কবর উঠিয়ে মাইনিংয়ের জন্য জমি বানাতে সরানো হয়েছিল অন্য কোথাও। ২০০৭ থেকে এইসমস্ত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে চলে এক বরিষ্ঠ সদস্য বলেছিলেন, কেউ যখন চলে যায় তার চেয়ে বেশি কষ্ট হয় তার প্রাচীন দেহাংশ উঠিয়ে আবার অন্য কোথাও সরাতে। কোন কবর কোন সদস্যের কোম্পানির তাড়াহুড়ো এবং অব্যবস্থায় বোঝা যায়নি কিছুই। পাশাপাশি কমে আসা বিপন্ন সাদা গন্ডারের পোচারদের প্রলোভনে ফেলছিল এইসমস্ত প্রোজেক্ট, সহজেই আদিবাসী রক্ষকদের এড়িয়ে অবৈধ শিকার সহজ হত। টেন্ডেলে এম.সি.ই.জে.ও.-র বেশ কয়েকজনকে জমি ছাড়তে রাজি করাল। বাকিরা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ফিকিলের। ভেতর থেকে, বাইরে থেকে এত লড়াই, এত বিশ্বাসহন্তার পরেও চুক্তিতে সই করেননি ফিকিলা। অতএব পুরস্কার। ২০২০-র ২২ আগস্ট কোয়াজুলুর ওফেনডোন্ডোয়েনি গ্রামে প্রস্তাবিত মাইনিং এক্সপ্যানশন থেকে ৫০০ মিটার দূরে নিজের বাড়িতে সন্ধে সাড়ে ছটার দিকে এগারো বছরের নাতি এবং আট ও বারো বছরের আরও দুই শিশুকে পাশে রেখে রাতের খাবারের জন্য পেঁয়াজ কাটছিলেন বৃদ্ধা। ঘরে ওরা কারা? বেশ কয়েকটি গানশট। ওই শিশুরা ট্রমা থেকে বেরোতে পারবে কোনওদিন? অথবা সেদেশের সিখোসিফি রাদাবের গল্প। ‘বাজুকা’ বলে পরিচিত তীব্র ভোকাল এই মানুষটি দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রভিন্সের জোলোবেনি অঞ্চলের সুপরিচিত আমাদিবা ক্রাইসিস কমিটি এ.সি.সি.-র চেয়ারপার্সন ছিলেন। ভারত মহাসাগর ঘেঁষা ওয়াইল্ড কোস্টের বাইশ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল টাইটেনিয়াম, ইলমেনাইট ও বেশ কিছু হেভি মেটালের ৩৪৬ মিলিয়ন টনের দুর্দান্ত রিজার্ভ। এবং নেকড়ের চোখ। অস্ট্রেলিয়ার মিনারেলস কমোডিটিস লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি ট্রান্সওয়ার্ল্ড এনার্জি মিনারেলস ওয়াইল্ড কোস্টকে বাছল মাইনিং সাইট হিসেবে। ৭০টি পরিবারের মোট ৬০০ জন ঘরছাড়া হতে পারতেন প্রোজেক্টে। বাজুকা এবং তাঁর এ.সি.সি. আন্দোলনে নামলেন। পাশাপাশি জোলোবেনিতেই প্রস্তাবিত টাইটেনিয়াম খনির সঙ্গে সম্ভবত সমঝোতা করে ভবিষ্যতের পরিবহণ সুবিধার জন্য এন-টু ওয়াইল্ড কোস্ট হাইওয়ে রোড বানানোর সরকারি প্রকল্প শুরু হল। এই যৌথ লড়াইয়ে শান্ত, অথচ তীব্র চিৎকার। হারা যাবে না, হারা যাবে না। সমষ্টিগত হারজিতের আগেই নক্ষত্রপতন। ২০১৬-র ২২ মার্চ ইস্টার্ন কেপের বিজানা অঞ্চলের লুরোলোয়েনিতে নিজের বাড়ির সামনে একটি হাইজ্যাক হওয়া গাড়িতে নেমেছিল পুলিশের পোশাকে দুজন গানম্যান। বাজুকার দিকে মারণ গানশট। একান্ন পেরোচ্ছিলেন এসিসির চেয়ারপার্সন। মাদাগাস্কারের মোরামাঙ্গা শহরের মাঞ্জাকান্দ্রিয়ানা ও আন্দ্রামাসিয়ানা জেলার ভেতর শেষ টিকে থাকা অরণ্যে কর্পোরেট শক্তির অবৈধ বৃক্ষচ্ছেদন এবং ২০২২-এর মে মাসে ভি.ও.আই. প্রতিবাদী সংস্থার তরফ থেকে জেনারেল অ্যাসেম্বলি করে দেশের পরিবেশ মন্ত্রকের ওপর অরণ্যের দায়িত্ব আরোপ করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবৈধ লগাররা ভালো চোখে নেয়নি। ২ জুন ভি.ও.আই.-এর আদিবাসী নেতা হেনরি রাকোতোয়ারিসোয়ার দুহাত বাঁধা ছুরিকাহত নিথর শরীর খুঁজে পাওয়া যায়। নিরস্ত্র হেনরি সত্তর ছুঁয়েছিলেন। অথবা হত্যা থেকে হত্যার চেষ্টা। ২০১৭-র সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব মাদাগাস্কারের ভোহিলাভা অঞ্চলে এটসাকা নদীতে ডাম্প টেলিং ফেলে দূষিত করা একটি গোল্ড মাইন প্রোজেক্টের পারমিট আছে কিনা জানতে স্থানীয় প্রতিবাদী কৃষক রালাভে উদ্যগী হয়েছিলেন। পরিণতিতে বিনা বিচারে এক মাসের জেল, আরও দুবছর জেলের বাড়তি কারাদণ্ডের রায়, যদিও তার আগেই হঠাৎ প্যারোলে মুক্তি। ১৯৯৯-এর ৮ জানুয়ারি নাইরোবির কারুরা পাবলিক ফরেস্টে রিয়েল এস্টেটের তান্ডব এবং প্রতিবাদে ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের নেতৃত্বে গ্রিনবেল্ট মুভমেন্টের বৃক্ষরোপণ মার্চে অকস্মাৎ দুষ্কৃতী তাণ্ডব। পুলিশি প্রোটেকশন চাইলেও একফোঁটাও সহায়তা ছিল না রাষ্ট্র বা পুলিশের। কোনওরকমে প্রাণটুকু টিকিয়ে ফিরে এলেও গাছ লাগিয়ে এসেছিলেন পরবর্তীকালের নোবেলজয়ী আফ্রিকান এবং তাঁর লড়াকু কমরেডরা।

পরিবেশকর্মী ফিকিলে সাঙ্গাসে (ছবিসূত্র – মোঙ্গাবে)

টেন্ডেলে কোল মাইনিং কোম্পানির বিরুদ্ধে কোয়াজুলু নাটালে প্রতিবাদ মিছিল (ছবিসূত্র – মোঙ্গাবে)

দক্ষিণ আফ্রিকায় আমাদিবা ক্রাইসিস কমিটির মাইনিং-বিরোধী আন্দোলন (ছবিসূত্র – লন্ডন মাইনিং নেটওয়ার্ক)

রক্তস্নানের পর এখনও টিকে থাকা লড়াইয়ের আফ্রিকা। আশার আলো চীনে সরকারের ২০১৮-য় আইভরি ব্যবসা নিষিদ্ধকরণের যুগান্তকারী ঘোষণা। অথবা এলিফ্যান্ট বা রাইনো পোচিং-য়ের সাম্প্রতিক নিম্নমুখী লেখচিত্র। কিংবা স্মরণীয় ২০১৫-র গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজজয়ী কেনিয়ার ‘ইস্ট আফ্রিকান এরিন ব্রোকোভিচ’ ফাইলিস ওমিডো বনাম কেনিয়ার মোম্বাসার উয়িনো উহুরু বস্তির কাছে একটি লেড স্মেল্টিং প্ল্যান্টের যুদ্ধ। অসম, তবু, যুদ্ধ। প্ল্যান্টের হয়ে কাজ করা কমিউনিটি অফিসার ফাইলিস লেডজনিত দূষণের জন্য ই.আই.এ. করলে বেশ কিছু অসঙ্গতি পান। নিজের দুছরের শিশুপুত্র সহ বেশ কিছু শিশুর অজানা জ্বর, পেটের সমস্যা, ক্রনিক অসুস্থতা। প্ল্যান্টের এক কর্মী লেড-টেস্ট করতে বললেন। করালেন ফাইলিস। পরিণতি বীভৎস। তাঁর নিজের সন্তানের শরীরে বিষ। উৎস ফাইলিসের স্তনদুগ্ধ। এক র‍্যান্ডম টেস্টে এক শিশুর রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে কুড়ি মাইক্রোগ্রাম অর্থাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে কুড়িগুণ বেশি লেড। কোম্পানি ফাইলিসের রিপোর্ট অস্বীকার করল। নিজেদের অর্থে সন্তানের চিকিৎসা করিয়ে অসঙ্গতি ঢেকে দিতে চেষ্টা করেছিল, তবু স্মেল্টিং বন্ধ করেনি। বিরক্ত ফাইলিস কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। ২০০৮-র তুলনায় কোম্পানির কাজ শুরুর বছর অর্থাৎ ২০০৯-এর শেষে দশ গুণ বেশি লেড পাওয়া গেল বস্তির সমস্ত জলাশয়, নদীতে। টানা আইনি আন্দোলন। একদিন ফাইলিসসহ সেন্টার ফর জাস্টিস, গভর্নেন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন-এর সতেরোজন আন্দোলনকর্মী গ্রেপ্তার, যদিও প্রমাণের ওভাবে বেকসুর খালাস। নির্ভীক ফাইলিসের ওপর কাওয়ার্ডলি মারণ আক্রমণ ২০১২-য়। কোনওক্রমে বেঁচে ফিরে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন ফাইলিস। ক্রমশ প্রত্যাঘাতে ২০১৪-য় লেড স্মেল্টিং কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছিল। কেনিয়া মেটাল রিফাইনারি এবং কারখানাকে অন্যায্য সুবিধে পাইয়ে দেওয়া বেশ কিছু সরকারি এজেন্সির বিরুদ্ধে একটি মামলায় ফাইলিসের হয়ে রায় দিয়েছিল কোর্ট। ২০১৫-র গোল্ডম্যানের পাশাপাশি ২০২৩-এ রাইট লাইভলিহুড পুরস্কার ফাইলিসের। ফাইলিস ওমিডো টিকে থাকলেও বাজুকা রাদাবের স্মৃতি নিয়ে এখনও লড়াই করা আমাদিবা ক্রাইসিস কমিটির হয়ে প্রিটোরিয়া হাইকোর্ট ট্রান্সওয়ার্ল্ড এনার্জি মিনারেলসের বিপক্ষে রায় দেয়, বলা হয় স্থানীয়দের মতামত ছাড়া ওয়াইল্ড কোস্ট শেষ করে দেওয়া আইনবিরুদ্ধ। চোরাগোপ্তা ডেথ-থ্রেটে এখনো অবিচল বাজুকা পরবর্তী এসিসির চেয়ারপার্সন নোনলে বুথুমা এবং সহকর্মী থেসা সিলাঙ্গে। প্রতিদিন সকালে উঠে ‘বেঁচে আছি তো?’ এই আশ্চর্যেই কাজে নামেন বুথুমা। কানে আসে তাঁদের উদ্দেশ্যে নিহত সতীর্থ বাজুকা-র শেষ সতর্ক উচ্চারণগুলো – ‘ঘরে ঢোকো, ঘরে ঢোকো, ওরা বাঁচতে দেবে না আমাদের’।

মৃত্যু পরোয়ানার পরেও এখনও নির্ভীক এসিসির চেয়ারপার্সন নোনলে বাথুমা

ছেলে কিংডেভিড জেরেমিয়ার সঙ্গে ফাইলিস ওমিডো (ছবিসূত্র – গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ)

 

ঋণস্বীকার

 

১. Anderson, Jon Lee. The war on wildlife and its protectors. May 2, 2017. The New Yorker.

২. Bassetti, Francesco. Kuki Gallmann, fighting for Kenya’s nature and her life. May 3, 2017. Lifegate.

৩. BBC News. Phyllis Omido: The woman who won $12m fighting lead battery poisoners. August 1, 2020.

৪. BBC News. South Africa: taking on a mining farm and winning. December 3, 2018.

৫. Carver, Edward. Madagaskar environmental activist convicted, sentenced – paroled. November 2, 2017. Mongabay.

৬. Ham, Anthony. Inside the effort to prevent the conflict between humans and elephants in Africa. September 11, 2023. Smithsonian Magazine.

৭. Higginbottom, Andy. Amadiba frontline community defenders face death threat. February 2, 2023. London Mining Network.

৮. Burke, Jason. Environment activists shot dead outside Nairobi home after death threats. July 16, 2021. The Guardian.

৯. Lukalo, Rose. I cry for my slain friend Joannah Stuchbury. July 21, 2021. Daily Nation.

১১. Kareithi, Amos. George Adamson: lion tamer who couldn’t tame poachers. June, 2023. Standard Media.

১২. Kockott, Fred & Hattingh, Matthew. South African activist killed as contentious coal mine seeks to expand. October 28, 2020. Mongabay.

১৩. Mbuthuma, Nonhle & Bezuidenhout, Maxine. Amadiba Crisis Committee will honour slain activist by defending the right to say no to extractivism. March 27, 2022. Daily Maverick.

১৪. Ngcukana, Lubabalo. ‘Bazooka’ died for SA not just for Xolobeni! April 3, 2016. News24.

১৫. Pikoli, Zukiswa. Remembering Fikile Ntshangashe, a fearless environmental activist. October 22, 2021. Daily Maverick.

১৬. Sole, Sam. Xolobeni – the mine, the murder and the DG. June 30, 2019. AmaBhungane.

১৭. Seal, Mark. A flowering evil. Vanity Fair. June 4, 2007.

১৮. Watts, Jonathan. ‘I thank God I am alive’: standing firm against mineral extraction in South Africa. July 21, 2018. The Guardian.

১৯. Watts, Jonathan. To the ends of the earth; the activists risking their lives to defend the environment. August 9, 2018. The Guardian.

 

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *