জৈন প্রত্নস্থল পাকবিড়রা। লিখছেন রামামৃত সিংহ মহাপাত্র 

মানভূম তথা দক্ষিণ-পশ্চিম রাঢ়ের গুরুত্বপূর্ণ জৈন প্রত্নক্ষেত্র পাকবিড়রা।পুরুলিয়া জেলার পুঞ্চা ব্লক,মানবাজার, লাখড়া অঞ্চল  সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের অন্তর্গত, পুরুলিয়া সদর শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জৈন প্রত্নক্ষেত্র। একদা এখানে যে একটি উন্নত জৈন ধর্ম প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্র গড়ে উঠেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় অবস্থিত জৈন দেউল এবং প্রাপ্ত জৈন দিগম্বর মূর্তি, জৈন আয়োগপট্ট এবং জৈন যক্ষ ও যক্ষিণী মূর্তিগুলি থেকে।

পণ্ডিতদের ধারণা খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে দ্বাদশ শতক হলো বাংলায় জৈন ধর্মের কাল।হিউয়েন সাঙ সপ্তম শতকে পুণ্ড্রবর্ধনে,সমতটে প্রচুর নির্গ্রন্থ জৈন দেখেছিলেন। বৈশালীতে সাঙ বৌদ্ধর চেয়ে জৈনদের সংখ্যা বেশি দেখেছিলেন। ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন,”প্রথম শতাব্দী হইতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত জৈন ধর্ম এখানকার প্রধান ধর্ম ছিল।এই কারণে বাঁকুড়া, মানভূম, পশ্চিম-মেদিনীপুর এবং ময়ূরভঞ্জের উত্তর ভাগে বৌদ্ধ কিংবা হিন্দু মূর্তি অপেক্ষা জৈন মূর্তিই বেশি দেখা যায়। ”

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রতিবাদী আন্দোলন এবং ৬৩ টি নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটে।এর অন্যতম হলো জৈন ধর্ম। এই জৈনরা প্রথম দিকে কোন মূর্তি পূজা করতো না। কারণ তারা বিশ্বাস করতো,মূর্তিতে নয় প্রকৃত দেবতা উপস্থিত রয়েছেন প্রকৃতির মধ্যে। তাই প্রকৃতি ছিল তাদের প্রধান উপাস্য।পরবর্তীতে চব্বিশজন তীর্থঙ্করের মূর্তি তৈরী করে।তবে মূর্তি তৈরী করলেও অনুষঙ্গে প্রকৃতি থেকে যায়। এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া যাবে তীর্থঙ্করদের লাঞ্ছন চিহ্ণ গুলো দেখলেই।ক্রমশ এই ধর্মের প্রভাব জনমানসে যত বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে, ততবেশি মূর্তি পূজার দিকে ঝুঁকেছে জৈন ধর্ম। চব্বিশ জন তীর্থঙ্করের পাশাপাশি তারা তৈরি করেছে তাদের যক্ষ-যক্ষিণী ও নিজস্ব দেবতা মণ্ডল। প্রথম দিকের জৈন মূর্তিগুলির সঙ্গে পরব্তীকালের জৈন মূর্তিগুলির পার্থক্য লক্ষণীয়। প্রাচীন মূর্তি একখানি পাথরের পট্ট,ইঁহার উপরে কতকগুলো চিহ্ণ আঁকা থাকতো।তার নাম আর্যপট্ট বা আয়োগপট্ট।পরবর্তীকালে জৈনরা তীর্থঙ্কর ও মূর্তি পূজা শুর করেছিলো। ঐতিহাসিকদের অনুমান কুশান আমলে সর্বপ্রথম চব্বিশজন তীর্থঙ্করের মূর্তি নির্মাণের প্রথাগত শৈলী গড়ে উঠেছিল।

দক্ষিণ পশ্চিম রাঢ়ের অন্তর্গত পুরুলিয়া জেলায় প্রায় ২১ টি জায়গায় জৈন পুরাতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে।এর অন্যতম পাকবিড়রা।

বর্তমানে এখানে তিনটি দেউল রয়েছে, যার দুটি উত্তর মুখী ও একটি পূর্বমুখী। তবে অতীতে এখানে চব্বিশ জন তীর্থঙ্করের চব্বিশটি পৃথক দেউল ছিল।এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় জে ডি বেগলারের রির্পোট থেকে।এ এস আই এর ব্রিটিশ অধিকর্তা ১৮৭২-৭৩ সালে এই অঞ্চলে পরিভ্রমণ করেন।তাঁর রিপোর্ট থেকে জানা যায় সেইসময় ওখানে ২১ টি দেউল ছিল।এর মধ্যে ১৯ টি পাথরের এবং দুটি ইঁটের।

এছাড়াও গাছতলায়, বর্তমান সীমানা প্রাচীরের মধ্যে এবং সীমানা প্রাচীরের বাইরে পূর্বদিকে গাছতলায় পড়ে থাকা প্রচুর প্রস্তরখণ্ড ও আমলক শিলা এ তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করে। পাকবিড়রায় প্রাপ্ত পুরাতাত্বিক নিদর্শন গুলির মধ্যে রয়েছে-তীর্থঙ্কর মূর্তি, যক্ষ যক্ষিণী মূর্তি,জৈন আয়োগপট্ট এবং জৈন চৌমুখা।

দেউল:-মোট তিনটে দেউল বর্তমান রয়েছে।প্রথম দেউলটি উত্তর মুখী।দেউলটিতে সাড়ে চারফুট উচ্চ ও দুই ফুট প্রস্থের পদ্মের  উপর কায়োৎসর্গ মুদ্রায় দণ্ডায়মান হরিণ লাঞ্ছন চিহ্ণ যুক্ত তীর্থঙ্কর শান্তিনাথের মূর্তি বর্তমান। দেউলের ভেতরে পাথরের উপর খোদিত একটি লিপি বর্তমান।

দ্বিতীয় দেউলটিতে রয়েছে বৃষ লাঞ্ছন চিহ্ণ যুক্ত আদিনাথ তথা ঋষভনাথের মূর্তি।

মূর্তিবিহীন তৃতীয় দেউলটির উচ্চতা মোটামুটি ২৫ ফুট।

তীর্থঙ্কর মূর্তি:-মোট আটটি তীর্থঙ্কর মূর্তি পাওয়া গেছে। মূর্তি গুলি কালো ক্লোরাইড পাথরে নির্মিত।প্রাপ্ত মূর্তি গুলি হলো-পদ্মপ্রভু,পার্শ্বনাথ, মহাবীর, ঋষভনাথ, সম্ভবনাথ,চন্দ্রজীপ্রভু,শান্তিনাথ ও শীতলনাথ।

পদ্মপ্রভু:- প্রাপ্ত সর্বাপেক্ষা বৃহৎ মূর্তিটি পদ্মপ্রভু তথা পদ্মপ্রভনাথের।এটি উচ্চতায় আট ফুট। স্থানীয় মানুষেরা এই মূর্তিটিকে কালভৈরব হিসাবে উপাসনা করেন।এই নামেই গ্রামের নাম ভৈরবস্থান।এই মূর্তির বৃহৎ আকৃতি দেখে অনুমিত হয় এখানে একটি বৃহৎ দেউল ছিল এই মূর্তিটির সৌজন্যে।বর্তমানে সেটি অবলুপ্ত। যতদূর জানা যায় ষষ্ঠ জৈন তীর্থঙ্কর পদ্মপ্রভনাথের জন্ম হয়েছিল কৌশাম্বীতে।পিতা কৌশাম্বীর রাজা শ্রীধর ও মাতা রানী সুমীসা।লাঞ্ছন চিহ্ণ পদ্ম।সিদ্ধিলাভ করেছিলেন পিপুল গাছের তলায়। নির্বান সমেত শিখর বা পরেশনাথ পাহাড়।এই মূর্তি প্রমাণ করে এই অঞ্চলে পদ্মপ্রভনাথের ভালো প্রভাব ছিল।

শীতল নাথ:-প্রাপ্ত শীতলনাথের মূর্তিটি প্রায় ৭.৫ ফুট উচ্চতা যুক্ত। লাঞ্ছন চিহ্ণ বটগাছ। প্রসঙ্গত এটি দীগম্বর মূর্তি। দশম তীর্থঙ্কর শীতলনাথের শ্বেতাম্বর মতে লাঞ্ছন চিহ্ণ শ্রীবৎস।ইনি ছিলেন ভদ্রিকাপুরীর রাজা দৃঢ়রথ ও রাণী সুগন্ধার পুত্র।

পার্শ্বনাথ:-পাকবিড়রায় প্রাপ্ত তীর্থঙ্কর মূর্তি গুলির মধ্যে অন্যতম হলো পার্শ্বনাথ মূর্তি।তেইশতম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের লাঞ্ছন চিহ্ণ সাপ এবং যক্ষিণী পদ্মাবতী।শেষ জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের জন্মের প্রায় ৩৩২ বছর আগে ইনি জন্মে ছিলেন।জন্মস্থান বারাণসী। পিতা রাজা অশ্বসেন এবং মাতা বামাদেবী।অশোক গাছের নীচে তিনি সিদ্ধি লাভ করেন।

মহাবীর:- আচারঙ্গসূত্র থেকে জানা যায়  চব্বিশতম জৈন তীর্থঙ্কর তাঁর জীবদ্দশায় রাঢ়ের কিয়দংশ পরিভ্রমণ করেন।তাই বাঁকুড়া পুরুলিয়া জেলায় সিংহ লাঞ্ছন চিহ্ণ  মহাবীরের আধিক্য বেশি দেখা যায়। পাকবিড়রাতেও পাওয়া গেছে মহাবীরের মূর্তি। মহাবীর শাল বৃক্ষের তলায় সিদ্ধি লাভ করেন।বর্তমান বিহার তাঁর জন্মস্থান। বাবা সিদ্ধার্থ এবং মা ত্রিশলা।

ঋষভনাথ:-প্রাপ্ত ঋষভনাথ মূর্তিটি বৃষ লাঞ্ছন চিহ্ণ যুক্ত। সিদ্ধি লাভ করেন বট বৃক্ষ তলে।নির্বাণ অষ্টাপদ বা কৈলাশ শিখর।ঋষভনাথের পিতা ছিলেন শেষ কুলকর।জৈন ধর্মে কুলকরদের পরেই তীর্থঙ্করদের স্থান।

চন্দ্রপ্রভনাথ:-রাঢ় দেশে চন্দ্রপ্রভনাথের মূর্তি খুব বেশি নেই।এর অন্যতম পাকবিড়রায় প্রাপ্ত মূর্তিটি।

লাঞ্ছন চিহ্ণ চন্দ্র। অষ্টম তীর্থঙ্কর চন্দ্রপ্রভনাথ জন্মগ্রহণ করেন চন্দ্রপুরীতে।পিতা রাজা মহাসেন এবং মা রাণী লক্ষণা।

শান্তিনাথ:-ষষ্ঠ দশ জৈন তীর্থঙ্কর শান্তিনাথের লাঞ্ছন চিহ্ণ হরিণ।সিদ্ধিলাভ করেন বটগাছের তলায়। পিতা হস্তিনাপুরের রাজা বিশ্বসেন এবং মাতা রাণী অধিরা।

সম্ভবনাথ:- তৃতীয় জৈন তীর্থঙ্কর সম্ভবনাথ।বাবা শ্রাবস্তীর রাজা জিতারি,মা সেনা।লাঞ্ছন অশ্ব।সিদ্ধিলাভ করেন শিমুল গাছের তলায়।

জৈন যক্ষ-যক্ষিণী:-এর মধ্যে পাওয়া গেছে দেবী অম্বিকা ও চক্রেশ্বরীর মূর্তি।

অম্বিকার বর্ণনা দিতে গিয়ে জৈন প্রতিষ্ঠা সারসংগ্রহ গ্রন্থে বলা হয়েছে “দ্বি-ভূজা সিংহমারূঢ়া আম্রাদেবী হরিৎপ্রিয়া।”অম্বিকা দ্বাবিংশতিতম জৈন তীর্থঙ্কর নেমিনাথের শাসন যক্ষিণী। দুইপুত্র শুভংকর ও প্রিয়ংকর সহ সফলা আম্রবৃক্ষের নীচে দন্ডায়মান।মোটামুটি ভাবে তিনফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার।

গরুড়ের উপর উপবিষ্টা অষ্টভুজা দেবী মূর্তিটি গবেষকদের মতে চক্রেশ্বরীর।

এছাড়াও ধ্বংস প্রাপ্ত বা প্রায় ধ্বংস প্রাপ্ত দেব দেবীর মূর্তি রয়েছে অনেক।যেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

জৈন আয়োগ পট্ট:-নিকটবর্তী প্রত্নস্থল গুলির মধ্যে এধরনের আয়োগপট্ট আর কোথাও পাওয়া যায়নি।বর্তমানে এটি পাকবিড়রা জৈন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।

২৪ টি সারি ও ১৪ টি স্তম্ভে খোদাইকরা তীর্থঙ্করের মূর্তি ও উপরের দুটি সারির মাঝখানে বসা আদিনাথের মূর্তি। প্রাপ্ত জৈন আয়োগ পট্টের বাম দিকের উপরের অংশের কিছুটা ভাঙ্গা।

চৈত্য:-এই চৈত্যগুলো জৈন ধর্মাবলম্বীরা তাদের তীর্থস্থান নিবেদন করতো।তাই নিবেদন দেউল ও বলা হয়।প্রাপ্ত চৈত্য বা নিবেদন দেউল প্রমান করে একসময় পাকবিড়রা উৎকৃষ্ট জৈন তীর্থস্থান ছিল।বর্তমানে চারটি নিবেদন দেউল রয়েছে।উচ্চতা আড়াই থেকে তিন ফুটের।প্রতিটি নিবেদন দেউলের চারদিকে চারজন তীর্থঙ্করের মূর্তি ও তাদের লাঞ্ছন চিহ্ণ বর্তমান।

প্রাপ্ত নিদর্শন গুলি প্রমাণ করে পাকবিড়রা দক্ষিণ পশ্চিম রাঢ়ের সর্ববৃহৎ জৈন ধর্মস্থল ছিল।জৈন ধর্ম প্রচার ও প্রসারের স্বার্থে গড়ে উঠেছিল জৈনসংঘারাম।সেখানে নিয়মিত চর্চা হতো জৈন ধর্মশাস্ত্রের এবং চিকিৎসাবিদ্যার।বর্তমান বিহার, ঝাড়খন্ড ও উড়িষ্যা থেকে শিল্পিরা আসতেন মূর্তি নির্মানের স্বার্থে। এই অঞ্চলে জৈন ধর্ম প্রসারের সময়সীমা ছিল মোটামুটি ভাবে একাদশ থেকে এয়োদশ শতাব্দী।

+ posts

2 thoughts on “জৈন প্রত্নস্থল পাকবিড়রা। লিখছেন রামামৃত সিংহ মহাপাত্র 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *