মিহির সেনগুপ্ত লেখক না হলে সমকাল বঞ্চিত হতো। অলক চট্টোপাধ্যায়। মিহির সেনগুপ্ত-স্মরণে ‘সিদ্ধিগঞ্জের ভাটিকুমার’।

কখনো কখনো স্মরণে এমন ভিন্ন সুর বেজে ওঠে যা চিরকাল লগ্নচ্যুতির দুঃখকে ধরে রাখে। মিহির সেনগুপ্তর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পথচলায় যত বছর কেটেছে, তার মধ্যে তাঁর লেখালেখি নিয়েই কথা হয়েছে বেশি। ঠিক কী করে যেন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে গেলে সময়-সম্পাদনা ও আলোচ্য বিষয় নির্বাচনে মানুষের দক্ষতা বেড়ে যায়। অনেকদিনের অনেককথায় এই সত্য আবিষ্কার সম্ভব হয়েছিল যে মিহির সেনগুপ্ত একজন শিক্ষিত লেখক, যা অনেক খ্যাতিমান, জনপ্রিয় লেখক সম্পর্কে বলা সম্ভব নয়। সেই বিরল শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাভাষার নিজস্ব রূপ, ধ্বনি ও ঐশ্বর্য সম্পর্কে সচেতনতা সহজ লাবণ্যের মতো জড়ানো থাকতো মিহিরের লেখায়। মিহিরের লেখার রসিক পাঠকবৃন্দ অবিলম্বে এই সত্যের একাধিক উদাহরণ-গ্রন্থের উল্লেখ করতে পারবেন।

সুদূরে অন্বেষণের প্রয়োজন নেই। বাংলা সাহিত্যেই ধারালো সত্য উচ্চারণ করার মতো কিছু লেখক ছিলেন যাঁরা অনায়াসে ক্রমাগত সত্য উচ্চারণে অভ্যস্ত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একদা লিখেছিলেন– মানুষ মরে, মানবতার মৃত্যু নেই।

একই সত্য দীপ্যমান রসিক, রসবোধ ও রসিকতা সম্পর্কেও। এবং লিখিত এইসকল শব্দগুলির সঙ্গে সততা ও বোধবুদ্ধিরও সম্পর্ক আছে। একজন লেখক, তা তিনি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে যত ছোটো বা উচ্চ-প্রতিষ্ঠিতই হোন না কেন, তাঁর পক্ষে সবচেয়ে কঠিন কাজ নিজের সম্পর্কে পরিচিতি জ্ঞাপন করা এবং লেখালেখি সম্পর্কে উৎসাহের উৎস জানিয়ে দেওয়া। এই প্রকার সদর্থক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত, সেইসব প্রিয়জনরাই পেতে পারেন, যাঁরা কখনো প্রায় অকারণে নানাকথা আলোচনা করতে অভ্যস্ত ছিলেন। সুতরাং কোনো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের অংশস্থ তৃতীয় প্রচ্ছদে মুদ্রিত কয়েকটি বাক্য অট্টহাস্যের ভূমিকা পালন করেছিল–

ছিল মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মন। লেখক হবেন কোনোদিন ভাবেননি। কিন্তু তপন রায়চৌধুরীর রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তের পরচরিতচর্চা পড়ে তিনি লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত হন।

মিহির লেখক না হলে সমকালই বঞ্চিত হতো।

কথাটা সাহেবদের। কিন্তু সত্যি কথা তো, তাই অন্তরতর স্বীকৃতিতে সেইদিকেই ঢলে পড়তে হয়। শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় মনের সঙ্গী হওয়া, তাঁরাও নিজের পরোক্ষ পরিচয়– এই সত্য জেনে কেউ প্রিয়জন নির্বাচন করে না।করা সম্ভবও নয়। কারণ প্রিয়জন হওয়া তো পারস্পরিক সম্মানের স্বীকৃতি। মিহির নিজে রসিক ছিলেন বলেই তাঁর অরুণ নাগ মহাশয়ের সঙ্গে গভীর সখ্য ছিল এবং মাননীয় তপন রায়চৌধুরী তাঁকে প্রচুর ভালোবাসতেন। সকলেই নয়, কিন্তু কেউ কেউ দ্বিতীয় ঘটনাটির, অর্থাৎ সগৌরবে সাক্ষী আছেন।

কবি-র কবিয়াল যতই সখেদে বলুক না কেন– ‘জীবন এত ছোটো কেনে’, দিন গোনার হিসেবে জীবন খুব ছোটো নয়। চিরকাল মনে করে রেখে দেওয়ার মতো ঘটনাও এই এক জীবনে কম ঘটে না। মিহিরের ‘বিষাদবৃক্ষ’ আনন্দ পুরস্কার(২০০৫) পাওয়ার পর সমাদৃত বইটির দ্বিতীয় প্রচ্ছদে দুজন অবিস্মরণীয় বাঙালির মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল, তাঁরা ছিলেন– রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত ও তপন রায়চৌধুরী। তাঁরা সেখানে কী বলেছিলেন, তা উৎসাহী পাঠকবৃন্দ পড়ে নেবেন। এ প্রসঙ্গে বক্তব্য এই– এমন সৌভাগ্য সম্ভবত গত অর্ধশতাব্দীতে কোনো বাঙালি লেখকের ললাটপ্রদেশে জোটেনি।

দুজনেই খাঁটি বইরশাল্যা। সুতরাং কাজের কথার টানের সময়েও উভয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে ‘কাজের কথা’য় এক অন্য ধরনের বাস্তবিক, যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনা দীপ্ত চেহারায় প্রকাশিত হয়েছে। একটি দৈনিক পত্রিকায় রবিবাসর-এর চারপাতা জুড়ে প্রকাশিত হয়েছিল তপন রায়চৌধুরীর সেই সাক্ষাৎকার এবং সেখানে মিহির সেনগুপ্তর ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তা কেউ কেউ আজও বিস্মৃত না-ও হতে পারেন! হয়তো।

সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম নিয়েই কথা বলার কথা ছিল যেন। কিন্তু ওই গল্পের গরুদের মতো প্রসঙ্গরা একটা গাছের ডাল থেকে অনায়াস-লম্ফে অন্যত্র চলে যাচ্ছিল। যে গতিময়, প্রাণবন্ত ভাষায় মিহির সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম লিখেছিলেন, তার কোনো তুলনা ভবিষ্যতেও বাঙালি পাঠকবৃন্দ কখনো খুঁজে পাবেন কিনা, তা গবেষণার কোনো সুযোগ নেই। বলেই দেওয়া যায়– পাবেন না। সাধারণ পাঠকদের মধ্যে একটি প্রবণতা কাজ করে, স্মরণীয় রচনা সম্পর্কে অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের প্রতিক্রিয়া পাঠ করা। সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম-এর শোভন সংস্করণে সেই সুযোগ আছে। সেখানে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে একদা নন্দন পত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনাটি (অচেনা পিতৃভূমি, অজানা আত্মজন)। লেখকের নাম– তপন রায়চৌধুরী।

এক জীবনেই এত বৈচিত্র্য দেখার, জানার ও বোঝার সৌভাগ্য সকলের হয় না, যা মিহিরের হয়েছিল। একই সঙ্গে মানুষ ও প্রকৃতিকে দেখা, জানা ও ভালোবাসার প্রশ্নও এখানে জড়িত। লেখালেখির কথা তো আলোচনায় অফুরন্ত ছিল। কিন্তু সেখানে মাঝে মাঝেই উঁকি দিত, ‘মানবজনম আহা’। না পড়ে বঞ্চিত ছিলাম– এই সত্য জানাতে কোনো সংকোচ ছিল না। এমনকী টাঁড় পাহাড়ের পদাবলির সিনগি দৈ-এর সঙ্গে কোনো প্রকারের যোগাযোগ আছে কিনা, এমন প্রশ্নও করেছিলাম। এই কথাও আলোচনায় এসেছে একাধিকবার– নদীর বাংলা আর টাঁড়-টিলা-ঝাঁটি জঙ্গলের জীবন, দুই-ই একই জীবনে পাওয়ার সৌভাগ্য নিয়েও। জীবন দেখার জীবনদর্শন, একেবারে আক্ষরিক অর্থেই। দেখা-জানা আর বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি নিয়ে তা পাঠকদের জানানো একেবারেই সহজ কাজ নয়।

অবশ্য লেখক মিহির সেনগুপ্তর বোধহয় তেমন ফাঁকি দেওয়া সহজ-কাজে রুচি ছিল না। বিদুর, চক্ষুষ্মতী গান্ধারী-কে অনায়াস রচনার তালিকায় রাখা যাবে কী করে! ছাত্র হিসেবে মিহিরের মেধাবিত্ব লেখক মিহিরের সারাক্ষণের সঙ্গী ছিল। এ-সম্পর্কে যথোচিত গভীর ও বৈচিত্র্যময় আলোচনা করার অধিকার এই আলোচকের নেই। অন্য কেউ হয়তো কখনো কখনো সেই প্রয়োজনীয় কাজটা করতে পারবেন।

চরিত্রদের বৈচিত্র্য ও গভীরতার জন্য মহাভারত বহুকাল আগে থেকেই বাঙালি লেখক-লেখিকারা মহাভারত-এ আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সেই তালিকায় স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, রাজশেখর বসু, বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু সহ অনেকেই আছেন। সুতরাং মিহির সেনগুপ্তর পক্ষে বিদুর, যুদ্ধান্তে, অশ্বমেধ দত্তের আত্মকথা, কাহ্ন বাসুদেব বা চক্ষুষ্মতী গান্ধারী-তেও এমন অনেক যুক্তিগ্রাহ্য গভীর বিষয় আবিষ্কার করবেন, যা তাঁদের চিন্তিত করবে। ভাবনারা হয়তো লঘুচিত্তের মেঘের মতো উড়ে যেত, যদি মিহির হিড়িম্বা বা ঘটোৎকচকে প্রাধান্য দিয়ে কিছু লিখতেন। কিন্তু জনৈক ভাটিপুত্রের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না।

সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার প্রশ্নে এই দারুণ দুর্দিনে মিহির সেনগুপ্তর মতো সমাজ-সচেতন ব্যক্তিত্বের বিদায় বিস্মৃত হওয়া কঠিন কাজ হবে। কারণ মানুষের হৃদয়াভ্যন্তর প্রস্তরনির্মিত নয়।

+ posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed