লাল রঙের দেশ মারয়ুল । পর্ব ৫। ফুলের উৎসব চুলি মেন্তক । লিখছেন কৌশিক সর্বাধিকারী

দু বছর আগে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন টেরিটরি হয়ে ওঠার পর লাদাখ প্রশাসন ভ্রমণশিল্পের উন্নতি এবং প্রসারের জন্যে একটা আলাদা দপ্তরই চালু করে দিয়েছেন। এতদিন পর্যন্ত জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্ট কাশ্মীর উপত্যকাকে যতটা গুরুত্ব দিতেন তার তুলনায় লাদাখ কিছুটা ব্রাত্য হয়েই থাকত, আর তাই এর আগে লাদাখের পর্যটনে যে সমস্ত অগ্রগতি/উন্নতি হয়েছিল তার অধিকাংশই ছিল বেসরকারি সংগঠনগুলোর উদ্যোগ, সরকারি পৃষ্টপোষকতা সে অনুপাতে ছিল বেশ কম।

নবগঠিত ইউটি-র লাদাখ ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্ট তাঁদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি সামাজিক মাধ্যমে এখন খুবই দৃশ্যমান। এ-ছাড়াও কোভিডপরবর্তী প্রেক্ষাপটে নতুন করে পর্যটক আকর্ষণের জন্য  বিভিন্ন প্রাচীন উৎসবগুলিকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে কিছু নতুন উৎসব যেমন উইন্টার ট্যুরিজম কনক্লেভ, জানস্কার উইন্টার ফেস্টিভ্যাল, ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল ইত্যাদিও বেশ বড় মাপে শুরু করা হয়েছে। কোভিড লকডাউনের জন্য খানিক ধাক্কা খেলেও ২০২১ এর ফেব্রুয়ারী-মার্চে তিন দিনের উইন্টার কনক্লেভ এবং দশ দিনের উইন্টার ফেস্টিভ্যাল কোভিড বিধি মেনে পালন করাও হয়েছে, যদিও এর সবগুলোতেই পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল বেশ কম।

লাদাখের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফল অ্যাপ্রিকট। অবশ্য কেবল অর্থকরী বলাটা ভুল হবে, লাদাখের বিশেষ করে পশ্চিম সিন্ধু উপত্যকার জনজীবন এবং সংস্কৃতিতে এই ফল অপরিহার্য। এখানকার প্রায় সব বাড়ির চারপাশেই বেশ কয়েকটা অ্যাপ্রিকট গাছ আছে, অনেক পরিবারেরই আছে বড় বাগিচা। অ্যাপ্রিকটের টাটকা পাকা ফল আগস্ট সেপ্টেম্বরে মোটে মাসখানেকের জন্য থাকলেও রোদে শুকানো অ্যাপ্রিকট এখানকার মানুষের সারাবছরের খাবার। এছাড়া শুকনো অ্যাপ্রিকট ঘরে ঘরে মজুত রাখা হয়, যাতে দরকার মতো বাজারে বিক্রি করে হাতে দু’পয়সা আসে। সুপক্ক অ্যাপ্রিকট ফলের মাঝে থাকে শক্ত বীজ, আর তা ভাঙলে বেরিয়ে আসে ছোট সাইজের অ্যামণ্ডের মত দেখতে খুরমানি বীজ। এই বীজ পিষে যে তেল বেরোয় তা প্রাকৃতিক প্রসাধন ও ওষধি হিসেবে বেশ চড়া দামে বিক্রি হয়। এক্সক্লুসিভ হাই এন্ড স্কিন কেয়ার এবং আর্থারাইটিসের মালিশ হিসেবে এর খুবই কদর। এছাড়া কিছু কিছু চিরাচরিত লাদাখি রান্নায়ও ব্যবহার হয় এই তেল। লাদাখে আখ বা অন্য কোনরকম শর্করাজাতীয় খাবার উৎপন্ন হয় না বলে চিরাচরিত লাদাখি রান্না সম্পূর্ণভাবে মিষ্টদ্রব্য বর্জিত। কয়েকবছর আগেও যখন লাদাখে বাইরের জিনিসপত্র সুলভ ছিল না তখন মিষ্টখাদ্য বলতে লাদাখিরা শুধুমাত্র জানতো শুকনো অ্যাপ্রিকটের গুঁড়ো মেশানো পাহাড়ি গরু জো এর দুধ।

স্থানীয় উপকথা বলে অষ্টম শতাব্দীতে গুরু পদ্মসম্ভব পাকিস্তানের সোয়াত প্রদেশ থেকে পশ্চিম লাদাখের লাগোয়া বালতিস্তানের শিগরে আসার সময় একটি অ্যাপ্রিকট গাছের ডাল পাহাড়ি রাস্তায় চলনযষ্টি হিসেবে সঙ্গে নিয়েছিলেন। বসন্তের শুরুতে শিগরে সেই শুকনো ডালটি পুঁতে দিতেই নিমেষে বড় হল গাছ, ফুল হল, পাতা হল, ছায়া দিলো সাধনারত গুরু পদ্মসম্ভবকে, চারমাস সেই গাছের নীচে ধ্যানমগ্ন রইলেন তিনি। তারপরে পাকল সেই গাছের ফল। পাকা ফলের বীজ থেকে পরের বছর হল আরো অসংখ্য খুরমানি গাছ। এরপর ক্রমাগত ভ্রাম্যমাণ শ্রমণ আর ব্রোকপাদের সঙ্গে অ্যাপ্রিকটের ফল, বীজ আর গাছ সদ্ধর্মের সঙ্গে সঙ্গেই ছড়িয়ে পড়লো সারা লাদাখে।

লেহ জেলার পশ্চিম সিন্ধু উপত্যকায় টাকমাচিক, স্কারবুচান, আচিনাথাং, দা, বিয়ামা…. আর কারগিল জেলার গারকোন, দারচিক, কারকিচু, হারদাস, গ্যাগরদো, চুলিচান… এই সব গ্রামগুলিতে যত গাছ আছে, তার নব্বই শতাংশই অ্যাপ্রিকট গাছ। শীতের শুরুতে সব পাতা ঝরে গাছগুলো একেবারে নিষ্পত্র হয়ে যায়। বসন্তের শুরুতে প্রথমে আসে ফুল। সব ফুল ঝরে গেলে তবে আসে পাতার কুঁড়ি। এপ্রিলের দ্বিতীয়-তৃতীয় সপ্তাহে একসঙ্গে সব গাছগুলো চেরীফুলের মত গোলাপী-সাদা ফুলে ভরে উঠলে যে অলৌকিক  দৃশ্যের জন্ম হয়, তা অতিপ্রাচীন তুলোট কাগজে আঁকা চীনদেশের “পাখি-ফুল” ছবির সঙ্গেই তুলনীয়।

অয়মারম্ভ শুভায় ভবতু

এ বছর এপ্রিলের ছয় তারিখ থেকে লেহ এবং কারগিল এই দুটি জেলারই যে যে গ্রামে অ্যাপ্রিকট গাছের আধিক্য, সেই গ্রামগুলোতে সরকারি পর্যটন দপ্তরের উদ্যোগে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পালন করা হল ‘চুলি মেন্তক’ উৎসব। অ্যাপ্রিকটের লাদাখি নাম চুলি আর ফুল হল মেন্তক, অর্থাৎ প্রস্ফুটিত অ্যাপ্রিকটের ফুলের উৎসব।

একুশ বছর আগে প্রথম যখন লাদাখে এসেছিলাম প্রথম কয়েক সপ্তাহের জন্য আমার কাজের জায়গা ছিল আচিনাথাং গ্রামের কাছে। বেশ মনে আছে দু’হাজার সালের পনেরোই এপ্রিল প্রথম আসি এখানে। আসার পথে নিষ্পত্র অ্যাপ্রিকট গাছে গাছে প্রচুর লালচে গোলাপি কুঁড়ি দেখেছিলাম, আর তার তিনদিনের মধ্যে ফুল ফুটে গোটা উপত্যকা গোলাপী-সাদা হয়ে যেতে দেখে অবাক হয়েছিলাম। সে সময়ে সদ্য শেষ হয়েছে কারগিলের যুদ্ধ। তখনো এসব অঞ্চল খুবই দুর্গম, রাস্তা যা ছিল তা খুবই খারাপ, আর তার সঙ্গী যুদ্ধপরবর্তী থমথমে আবহাওয়া। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে সেইসময় কোনরকম যোগাযোগ প্রায় হতো না বললেই চলে। সেই জন্য, প্রাকৃতিক শোভা খুব উপভোগ করলেও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের সুযোগ একেবারেই হয়নি। তার উপরে কয়েক সপ্তাহ  পরেই চলে যেতে হয়েছিল গুলমার্গে, দা-হানু উপত্যকার আদিবাসিন্দা ব্রোকপা-দের সম্বন্ধে ওই সময় বিভিন্ন রকম চমকপ্রদ জনশ্রুতি শুনলেও সরাসরি মোলাকাত হবার সুযোগ ঘটেনি, সেই আফশোস এবার পুষিয়ে নেওয়ার যথাসম্ভব চেষ্টা করছি।

উৎসবের সাজে কিশোরী

অন্যান্য বছরের তুলনায় লাদাখে এ বছর ঠান্ডা সে রকম পড়েনি। শীতকালে বরফও পড়েছে খুব কম।  তবে প্রকৃতি তো হরে দরে পুষিয়ে নেবার চেষ্টাই করে, তাই এ-বার লাদাখে শীত আর বসন্তের লুকোচুরি বেশ অনেকদিন পর্যন্ত ছিল। মার্চের প্রথম থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত আকাশ রোজই ছিল মেঘলা। এপ্রিল মাসের প্রথম তিন সপ্তাহের মধ্যেই চারবার ভালরকম তুষারপাত হয়ে গেছিল, আর সেই জন্যই খুরমানি গাছের কুঁড়ি ফুটি ফুটি করেও ঠিক মন খুলে ফুটে উঠতে পারছিল না। তার উপরে করোনার সেকেন্ড ওয়েভের কিছু প্রভাব লাদাখেও এসে পড়তে শুরু করেছিল। ফার্স্ট ওয়েভের নিষেধাজ্ঞা আর বাণিজ্যের খরা কাটিয়ে পর্যটকের যে রকম ঢল নামবে ভাবা হয়েছিল, আদতে তেমন কিছু ঘটেনি। পর্যটকেরা সংখ্যায় ছিলেন খুব কম। তখনও শ্রীনগর বা মানালি, কোনও রাস্তাই খোলেনি, তাই শুধুমাত্র বায়ুপথই ছিল লাদাখে আসার একমাত্র পথ। এই সব কারণে প্রাথমিক ভাবে ১৮ এপ্রিল রবিবার চুলি মেন্তক উৎসবের শেষদিন বলে প্ল্যান করা হলেও পরে সবার সম্মতিক্রমে এবং পর্যটক বান্ধব ভাবমূর্তি বজায় রাখতে ২৬-শে এপ্রিল পর্যন্ত উৎসবের দিন বাড়ানো হয়েছিল। তবে এত সব সত্বেও সেকেন্ড ওয়েভের ভয়ের ছায়া সব জায়গাতেই ছিল। সারাক্ষণ ধরে মুখ ঢেকে কি আর খোলামনে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা যায়!

যাকগে, এ সব রোগের কথা ছেড়ে ফুলের উৎসবের গল্পে ফিরি। খবর পাওয়া গেল আঠেরো তারিখ রবিবার বিয়ামা গ্রামে বড় করে চুলি মেন্তক উৎসব হবে। ভোরে উঠে দেখি রাতে বরফ পড়ে চতুর্দিক সাদা হয়ে আছে। সকালে আলো ফোটার পরেও বেশ জোরে বরফ পড়েই যাচ্ছে। বাঁচোয়া একটাই, হাওয়া খুব একটা নেই। লেহ থেকে সকাল সাতটায় একটা ঝকঝকে নতুন ইনোভায় রওনা দিলাম, সঙ্গে আমার লাদাখি বন্ধু ফুর্তিবাজ সোনম, ওর বন্ধু জিগমেত আর জিগমেতের ক্লাস এইটে পড়া ছেলে। গোটা বছর স্কুল বন্ধ আর তার উপরে গোটা শীতকাল ঘরে বন্দী হয়ে থাকায় বেচারা বড়ই মনমরা হয়ে ছিল, তাই কাকু-দের ডে-আউটে ওকেও সঙ্গে নেওয়া। লেহ শহরে মধ্যে রাস্তার উপরে এক ইঞ্চি পুরু বরফ, শহর ছাড়াতেই জায়গায় জায়গায় সেটা দুই-আড়াই ইঞ্চি। তবে আমরা বেরনোর আগেও কিছু গাড়ি চলাচল করেছে, তাই চাকা রাস্তার যে অংশ ছুঁয়ে যাচ্ছে সেখানে কালো পীচ দৃশ্যমান, তাই বাঁচোয়া। এতে গাড়ির চাকায় স্নো-চেন লাগাবার সময় আর পরিশ্রমটা বেঁচে গেলো। হাইওয়ে ধরে একে একে পেরিয়ে গেলাম ফিয়াং, নিমু, বাসগো, সাসপোল, নুরলা। খালৎসিতে অমৃক সিংএর ধাবায় ফুলন্ত খুরমানি গাছের তলায় পাতা হল আমাদের ব্রেকফাস্টের দস্তরখান। বাদাম কাঠের আগুনে তন্দুরে সেঁকা গরম তপতান, উপরে এক খাবলা টাটকা মাখন, সঙ্গে পাহাড়িয়া ছাগলের মাংসের কিমাকষা, শুকনো অ্যাপ্রিকটের রায়তা, আচার আর নোনতা মাখন চা।

বাজনদারদের দল

বড় বড় ফুলন্ত অ্যাপ্রিকট গাছের নীচে আমরা বসে আছি, খেতে খেতে গল্পসল্প চলছে, হঠাৎ মাথার উপরে ঝটপট শব্দ, আর ঝরঝরিয়ে একরাশ গোলাপি সাদা ফুলের পাপড়ি পেঁজা বরফের মতো এসে পড়লো আমাদের দস্তরখানে। উপরে তাকিয়ে দেখি একজোড়া ইউরেশিয়ান ম্যাগপাই প্রণয়ক্রীড়ায় মত্ত। লাদাখে ঘুরতে ফিরতে এই ম্যাগপাই খুবই দেখা যায়। উজ্জ্বল সবজে-নীল ও সাদা রঙের পাখি, প্রায় পাতিকাকের মত সাইজ। দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বড় লেজ নিয়ে এদের ওড়াটা বেশ অগোছালো, তার উপর বসন্তকালীন প্রেম, প্রায় গাছ থেকে পড়ে যায় আর কী। নীচে তাকিয়ে দেখলাম অ্যাপ্রিকট রায়তায় অ্যাপ্রিকট ফুলের পাপড়ি। ব্যাপারটা বেশ ভালই লাগল, সাপটে সুপটে খেয়ে নিলাম।

ভরপেট এইসব সুস্বাদু খাওয়া দাওয়ার পর সকালের ঠাণ্ডা হাওয়ায় সোনমের চোখ লেগে আসছিল, কাল অনেক রাত অব্দি ছাং খেয়ে আজ আবার অনেক ভোরে উঠেছে। এবার তাই স্টিয়ারিং এল আমার হাতে। খালৎসি বাজার পেরোতেই বাঁ দিকে পুলিশ চেকপোস্ট, সেখানে পাস দেখিয়ে, নাম লিখিয়ে তবেই আরিয়ান ভ্যালিতে যাওয়া যাবে। এখান থেকে ন্যাশানাল হাইওয়ে বাঁদিকে সিন্ধুনদ পেরিয়ে ফোতু-লা’র দিকে চলে গেছে, আমরা গেলাম ডানদিকে, সিন্ধু নদের ডানধার ধরে। সাত-আট কিলোমিটার যাওয়ার পর বাঁদিকে ঝোলা ব্রীজ দিয়ে নদী পেরিয়ে দেখা যায় ছবির মতো গ্রাম টাকমাচিক, পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে নদী পর্যন্ত নেমে গেছে। টাকমাচিকে যেতে খুব ইচ্ছে করলেও আমাদের গন্তব্য সামনে।  আরো আট কিলোমিটার চলার পরে রাস্তার দুধারে পড়লো প্রাচীন প্রস্তরচিত্রের জন্য বিখ্যাত দামখার, এখানে টোকপোর উপরে নতুন ব্রীজ হচ্ছে, তাই নেপালী শ্রমিকে জায়গাটা ছয়লাপ। সোনমের মুখে মৃদু অনুযোগ, এই দলে দলে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গেই করোনা আরো ছড়িয়ে না পড়ে।

মেঘ পাহাড়ের কোলে ফুলের উৎসব

আরো বারো-তেরো কিলোমিটার  এগিয়ে যেতে এল স্কারবুচান, এই অঞ্চলের ব্লক হেডকোয়ার্টার। স্কারবুচানে নেটওয়ার্ক পেতেই আচিনাথাংএর মাস্টারজীকে ফোন করে দিলাম, উনি বিয়ামা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক এবং আজকে আমাদের পথপ্রদর্শক। আচিনাথাং এর পরে আসে হানুথাং গ্রাম। হানুথাং পেরিয়ে সিন্ধুনদের উপর সংযক ব্রীজ, ব্রীজ পেরোলেই কারগিল জেলা। বিয়ামা গ্রামে যেতে গেলে ব্রীজ না পেরিয়ে আরও ছ সাত কিলোমিটার এগিয়ে যেতে হবে। এটাই প্রথম ব্রোকপাদের গ্রাম। এর পরে আরও এগিয়ে গেলে পড়বে দা, তার পর গারকোন। বিয়ামা গ্রাম নদী বরাবর প্রধান রাস্তা থেকে অনেকটা উঁচুতে। খাড়াই ধুলোভরা পথে পরপর ছটা হেয়ারপিন বেন্ড পেরিয়ে তবে অ্যাপ্রিকট ফুলে ছাওয়া গ্রামে ঢুকবার পথ। একের পর এক সংকীর্ণ এবং খাড়াই হেয়ারপিন বেন্ড যে একবারেই উঠে গেলাম তাতে আমার হাতযশের থেকে টয়োটা কম্পানির প্রকৌশলের কৃতিত্ব যে অনেক বেশি, প্রতি বাঁকে তা বুঝতে পারছিলাম। এই রাস্তায় ওঠার সময় গাড়ির চাকার ধুলো নিয়ে সরু উপত্যকার পাগলা হাওয়া ঠিক আমাদের সামনে সামনে এক জোরালো ঘূর্ণি তৈরি করছিল, সে দেখতে যেন ঠিক একটা প্রেতমূর্তির অবয়ব। সোনম জানলো লাদাখীরা এই ঘূর্ণি হাওয়াকে অপদেবতা বলে মনে করে, গ্রামের মধ্যে এই ঘূর্ণি আসা অশুভ বলে মনে করা হয়, তাই গ্রামের বাইরে সারসার চোর্তেন বানানো হয়, টাঙানো হয় চেনফ্ল্যাগ তারচোক, পোলফ্ল্যাগ তারচেন আর লুংতা। এইসব চোর্তেন, তারচেন, তারচোক, লুংতা সবাই মিলে অপদেবতাকে গ্রাম থেকে দূরে রাখে।

এই অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের অধিবাসীরা লাদাখের বাকি অঞ্চলের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নৃ-গোষ্ঠী। এই দর্দ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা প্রাচীন বন ধর্ম আর হালে বৌদ্ধ ধধর্মাবলম্বী, তারা নিজেদের বলে ব্রোকপা। এরাই লাদাখের বিখ্যাত আরিয়ান রেস। এদের চেহারা, চোখের এবং চুলের রঙ, ভাষা, উপকথা, জীবনযাপনের ধরণ সবই আলাদা।

বাগিচায় প্রাতরাশ

গ্রামের সবথেকে উঁচুতে, একটা সমতল জায়গাতে বিয়ামা উচ্চ বিদ্যালয়। তার পাশে কাঠের কারুকাজ করা এক নয়নাভিরাম দোতলা বাড়ি। এই বাড়িটা কোনও উপাসনাস্থল বা গোম্ফা না হলেও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে খুবই পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষানুক্রমে ব্রোকপারা অগ্নিউপাসক ও প্রকৃতিপূজক হলেও কালের প্রভাবে কিছু গ্রাম বৌদ্ধধর্মানুসারী, কিছু গ্রাম ইসলামধর্মানুসারী। বিয়ামার লোকজন দলাই লামার অনুগামী। দলাই লামা যখন এই গ্রামে আসেন, তাঁর আবাসস্থল হয় ‘ফোটাং’ নামের এই বাড়িটি। ফোটাং এর সামনের রেলিং দেওয়া বাঁধানো চাতালটা বিয়ামা গ্রামের সবথেকে উঁচু ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে সরু উপত্যকার মধ্যে দিয়ে পান্না সবুজ জলরেখায় সিন্ধুনদের বয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে ময়ূরকূটের কথা মনে পড়ে। অবিকল সেই কল্পনার নাগনালার মত। স্কুলের সামনের খোলা চাতাল, সেখান থেকে খানিকটা নীচে তাকালেই দেখা যায় বিস্তীর্ণ অ্যাপ্রিকট বাগিচা। আলাদা আলাদা গাছে আলাদা আলাদা পর্যায়ে ফুল – কোথাও লাল কুঁড়ি, কোথাও সদ্য ফোটা গোলাপি ফুল, কোথাও পুরো ফোটা সাদা ফুল। গাছগুলোর তলা দিয়ে যাবার সময় কখনও যদি একটু জোরে হাওয়া দেয়, ছোট ছোট সাদা ফুলগুলো তুষারের মতো গায়ে-মাথায় ঝরে পড়ে। এই বাগানেরই মাঝখানে ছোট একটা ফাঁকা জায়গাতে বসেছে চুলি মেন্তকের আসর।

ফোটাং-এর সামনে গাড়ি রেখে একটু পায়ে হেঁটে বাগানের মধ্যে দিয়ে স্বচ্ছ জলের কয়েকটা ছোট ছোট পাহাড়ি নালা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম সেখানে। একপাশে সোফা পাতা, প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছেন লেহ-র জেলাশাসক, পর্যটন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত সচিব, খালৎসি থেকে মহকুমাশাসক ও অন্যান্যরা। উৎসব মূলতঃ নাচগানের। প্রায় কুড়িজন ব্রোকপা মেয়ে ও তৎসংখক পুরুষ তাদের চিরাচরিত পোষাকে, দুইদল বাজনদার ফুংসোক আর লামচুংদের বাজনার তালে তালে দলবদ্ধ ভাবে কখনো একজায়গায় দাঁড়িয়ে আর কখনও গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন রকমের নাচের মাধ্যমে চুলি মেন্তককে সংবর্ধনা জানালেন।

পাহাড়ি বাচ্চা পাহাড় চড়ে চড়েই বড় হয়

শিকার-কুড়ানির জীবন থেকে পশুপালকের জীবন পেরিয়ে কৃষিভিত্তিক জীবনে নোঙর ফেলা ব্রোকপাদের মধ্যে ফসলবোনা এবং ফসলকাটার উৎসব খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে হেমন্তে ফসলকাটার উৎসব বা বোনোনা-র গুরুত্বই বেশি। ব্রোকপা লোককথায় ব্রোকপাদের পূর্বপুরুষ আঙগুথার তিন সন্তান ডোলো, গালো আর মেলো গিলগিট থেকে পালিয়ে সিন্ধুতীরবর্তী পান্ডববর্জিত এই দেশে এসে বাস করেছিলেন। গালোর উত্তরপুরুষরা বসতি বানান গারকোনে, মেলোর সন্ততিদের গ্রাম হলো দা আর ডুলো-দের হলো গানোক, সেটা এখন পাকিস্তানে। আগে এই তিনটি গ্রামে পর্যায়ক্রমে বোনোনা উৎসব পালন করা হতো। বর্তমানে, গানোকের বদলে তৃতীয় বছরে দা বা গারকোনে পর্যায়ক্রমে এই ফসলকাটার উৎসবটি পালন করা হয়।

যে কোনও ফসলকাটার উৎসব নৃতাত্ত্বিকভাবে উর্বরতা পালনের উৎসব, তা জমি হোক ,বা মানবজাতির, বিশেষত প্রজননক্ষম নারী-পুরুষের। এখন আমাদের নাগরিক জীবনে উপকরণের প্রাচুর্যে উৎসবের উদ্দেশ্য হারিয়ে গেলেও ব্রোকপাদের হাজার হাজার বছরের প্রাচীন জীবনধারায় খুব একটা ম্লান হয়নি এই মূলসুর। অক্টোবর মাসের চোংগা অর্থাৎ পৌর্ণমাসীতে দা গ্রামে শুরু হয় এই উৎসব। পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতি স্মরণে গাওয়া হয় গান। এই সব গান আর মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে আছে  শিকারের গান ডারুকা, চারণগীতি পাজুলি, দেববন্দনা লাহ লু। এর পরে শুরু হয় তরজার পালা। একদিকে মেয়েরা, অন্যদিকে ছেলেরা, প্রথামাফিক এই তরজায় যৌনউত্তেজক সব ছড়া আর গান গাওয়া হয়, অনেকটা মুর্শিদাবাদের পঞ্চরসের ঢঙে।

ছবির গ্রাম টাকমাচিক

চুলি মেন্তকও উর্বরতা উদযাপনের উৎসব। নাচের দলের মেয়েদের হাতে থাকে ফুলন্ত অ্যাপ্রিকট শাখা। পুরুষদের গলায় লম্বা সাদা উত্তরীয়ও তারই প্রতীক। প্রস্ফুটিত অ্যাপ্রিকট, অ্যামণ্ড আর পীচ গাছ, পুরুষদের দীর্ঘ উত্তরীয় এবং টুপিতে লাগানো রঙিন ফুল, মেয়েদের হাতে সপুষ্প অ্যাপ্রিকট শাখা, এই সমস্তই শীতের শেষে বসন্তের আগমণে প্রকৃতি ও মানুষের উর্বরতার প্রস্তাবনা।

নাচের দলের কনিষ্ঠ সদস্যা আংমো জানালো প্রত্যেক মেয়ের পিঠে যে বড় ঢালের আকারের আস্ত ছাগচর্মের পৃষ্ঠাবরণ, তার নাম বাৎসী। ছাগচর্মের যেদিকে লোম, সেইটি গায়ের সঙ্গে লাগানো। গায়ে উলের কাফতান, তার স্থানীয় নাম কুর্তিনী। নিম্নাংগে পশমের তৈরি পাজামা, মাথায় রংবেরঙের ফুল আর রুপোর গহনা লাগানো টুপি, নাম খো। উর্ধাঙ্গে সারা শরীর জোড়া পুঁতি আর রূপোর গহনা টুমার। ভেড়ার চামড়ার সোল এবং পশমের আবরণ দেওয়া জুতো পিলা। পুরুষদের পরণে পশমের ঢোলা আলখাল্লা ও পাজামা, রংবেরঙের চওড়া কোমরবন্ধ, স্কেরাক্স। সবার মাথার রঙবেরঙের টুপিতে লাগানো কমলা রঙের শুকনো ফুল মুন্থুটো। পুরুষদের গলায় লম্বা উত্তরীয় পাট্টু, নাচের সময় দুহাতে তা ধরে বিভিন্ন মুদ্রায় আন্দোলিত করতে থাকে, ভঙ্গীতে জাপানি তেলের বিজ্ঞাপনের আভাস।

ব্রোকপাদের সমস্ত জামাকাপড়, পায়ের জুতো, গহনা সবই তাদের নিজেদের হাতেই বানানো। এই সমস্ত নাচের ও উৎসবের আচ্ছাদন ও আভরণ কার ব্যক্তিগত নয় ৷ বিভিন্ন মাপের এইসব পোষাক গ্রামপ্রধানের কাছে রাখা থাকে, বিভিন্ন জন দরকার মতো তা ব্যবহার করেন।

এক একটা নাচ প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিটের। নাচের ফাঁকে ফাঁকে নিষ্পত্র ফুলে ভরা অ্যাপ্রিকট গাছের নীচে চলছে টুকটাক আড্ডা। একটু পাশে সরে গিয়ে মাস্ক খুলে খাওয়া একপাত্র নুন-চা উষ্ণতা যোগাচ্ছে এপ্রিলের ঠান্ডা সকালে। ছোট ছোট বাচ্চারাও এসেছে মা বাবার সঙ্গে। চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে দেখছে নাচের দলের ভিতর মাকে সেজেগুজে কেমন চমৎকার দেখাচ্ছে। লেহ এবং কারগিল থেকে এসেছেন কিছু স্থানীয় মানুষ, তারা সবাই জ্যাকেট-জিন্স-স্নিকার-হ্যাট পরিহিত৷ গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা পরে আছেন ভেড়ার লোমের জোব্বা গোনছা। বিয়ামা গ্রামের মহিলারা নাচের মাঠের ধার ঘেঁষে স্টল দিয়েছেন। একপাশে একটা হাতে বানানো কাঠের তাঁতে পশমের সুতোর টানা দেওয়া, রংবেরঙের পাট্টু খানিকটা বুনে রাখা আছে। তারপাশেই ছাং হাতে উঠতিবয়েসী যুবকদের জটলা, কোন সদ্য যুবতী যে কার ব্যথা, কে যে কার দিকে একঝলক তাকালো, তাই নিয়েই গভীর উদাস আলোচনা। এক তরুণী সবার হাতে এক কাপ করে গরম নুন-মাখন চা ধরিয়ে দিয়ে গেলো। সকালের রোদের পর আকাশ আবার মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠছে। পরের স্টলে রয়েছে কিছু ফুলগাছ, প্রধানত গোলাপ আর ডায়ানথাস, তবে সেগুলো সবই দর্শনার্থে। পাওয়া যাচ্ছে ব্রোকপাদের নিজস্ব খাবার প্রপু। বাকহুইটের আটা মেখে তাই দিয়ে ছোট ছোট বড়ির মত পিঠে বানিয়ে নুনজলে সিদ্ধ করে অ্যামন্ড আর অ্যাপ্রিকট বাদাম বাটার ঘন ক্বাথের মধ্যে মিশিয়ে বানানো এই খাবার খুবই বলবর্ধক ও পৌষ্টিক। নুন ছাড়া এতে মশলা হিসেবে দেওয়া হয় শুধু কোসনিয়ৎ আর শুকনো ধনেপাতা। প্রপু রাখা আছে বড় কালো পাথরের হাঁড়ি দোলতোক-এ। পুরু দেওয়ালের পাথরের এই পাত্র গরম হতে সময় লাগে অনেক, তবে চট করে ঠান্ডাও হয় না। শীতের দেশে এই পাত্রই খাবার রান্না ও পরিবেশনের জন্যে অধিক উপযোগী। এখনও এই ধরনের পাত্র তুর্তুক অঞ্চলে তৈরি হয়, এমনকি পাথরের প্রেশার কুকার পর্যন্ত বানানো হয়, এমনটাই জানালেন সবাই। খাবার পরিবেশনের জন্যে ব্যবহার হয় জুনিপার কাঠের তৈরি ডাবুহাতা।

ফুলের ছায়ায় প্রস্তরশয্যা

পাশের স্টলে ছিল পুরনো দিনের তৈজসপত্রের প্রদর্শনী। যব আর বাকহুইট ঝেড়ে বেছে তোলার জন্যে মালচাং কাঠের লম্বা ট্রে, বিভিন্ন আকারের পাথরের সসপ্যান আর হাঁড়ি৷ শক্ত জুনিপার কাঠের একটা বিশাল হামানদিস্তা, যার পেষণদণ্ড একটি বড় লম্বা পাথর। এর পাশেই একটা দশ এগারো বছরের বাচ্চা মেয়ে মাটিভরা কয়েকটা পুরনো বালতিতে ফলন্ত চেরিটমেটোগাছ নিয়ে বসে আছে। টমেটো গাছগুলো কেন নিয়ে এসেছে জিজ্ঞেস করায়  সে বললে, এই গাছগুলো আমার নিজের হাতে লাগানো, তাই সবার দেখার জন্য নিয়ে এসেছি। কী সুন্দর টমেটো হয়েছে দেখো! সবার শেষে ছিল রঙবেরঙের পশমের উত্তরীয় ও কোমরবন্ধের প্রদর্শনী। ডিএম সাহেব তাই দেখে ঘোষণা করলেন এগুলো তিনি দিল্লিহাটে পাঠাবেন, যাতে লাদাখী বয়ন আরও পরিচিতি লাভ করে।

আরও দুইদফা নাচের পরে অল্প সময়ের দুয়েকটি সরকারি ভাষণ শেষে এগোলাম ফোটাং এর দিকে।অধিকাংশ খুরমানি গাছের মাঝে এক আধটা অ্যামণ্ড আর পীচ গাছ। ফোটাং এর একপাশে একটা ছোট আপেলবাগিচা। এক পাশে একটা বড় আখরোট গাছ বেষ্টন করে মোটা মোটা আঙুর লতা। গাছগুলোর তলায় ধাপে ধাপে চাষ করা জমিতে সপ্তাহ দুয়েক আগে যব বোনা হয়েছিল, তা থেকে ইঞ্চি দুয়েকের যব গাছ বেরিয়েছে।  বেলা প্রায় দুটো, মধ্যাহ্নভোজনের উপযুক্ত সময়। দুতলা সমান উঁচু পার্কিং স্পেসের লোহার রেলিং বেয়ে তিনটে ছসাত বছরের বাচ্চা অত্যন্ত স্বচ্ছন্দে ঝুঁকে পড়ে জনসমাগম দেখছে। আশেপাশে অভিভাবক কারও টিকিও নেই। পাহাড়ীবাচ্চারা ছোট থেকেই উচ্চতাকে ভয় পায় না। মনে পড়ে গেলো নাগরঙ নামে এক লাদাখী বন্ধু বলেছিল ছোটবেলায় ওর মা ওকে কেবল নদীর জল আর আগুন থেকে সাবধান থাকতে বলতেন। ডাকাবুকো ট্রেকিং গাইড, হিমালয়ান বাইকিং করা নাগরঙ তাই এখনও সিন্ধুনদের ধারে যায় না।

সিন্ধুহ্রদের ধারে কফি আর গল্প

ফোটাং এর পাশে বিয়ামা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মাল্টিপারপাস হলে ছিল একসঙ্গে বসে সবার খাবার ব্যবস্থা। সর্বভারতীয় সরকারি অতিথিদের কথা ভেবে ব্যুফে মেন্যুতে ছিল জম্মু থেকে আনা বাসমতী চালের ভাত, আর সুস্বাদু রাজমা। সঙ্গে স্থানীয় পালংশাক – সুইটকর্ণ, বড় বড় গাজরের টুকরো আর নিউট্রিলা মেশানো একটা সবজি আর হালকা ভাজা ডিমসিদ্ধ। অত্যন্ত সুস্বাদু ডিমের আকার দেখে মনে হয়েছিল সেগুলো পার্ট্রিজের ডিম, তবে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো তা মুরগিরই বটে। হলের বাইরে খোলা জায়গায় বিয়ামা টোকপোর উঁচু কোনো জায়গা থেকে জলের পাইপ লাগিয়ে কয়েকটি জলধারার ব্যবস্থা। ঝর্নার অবিরাম জলধারা বাতাসের মতই স্বাভাবিক। এখানে জলের অপচয়ের কোন ব্যাপার নেই, মাটি সরস করে অতিরিক্ত জল যাবে সেই সিন্ধুতে, তাই জলের নলগুলোতে কোনও কল নেই৷ ছোট থেকে ঝরণার অবিরাম জলপ্রবাহ দেখে অভ্যস্ত এই মানুষেরা জলকে বাঁধতে শেখেননি।

হাত ধোওয়ার পরে আঁজলা ভরা সুস্বাদু জলপান দেহমন জুড়িয়ে দেয়। সার বেঁধে বসে খাওয়ার পর যার যার থালা চামচ নিজেরাই ধুয়ে রেখে আসা হবে, সেইটাই দস্তুর৷ ডিএম সাহেব ও তার দেহরক্ষীকে পাশাপাশি থালা ধুতে দেখে পাহাড়ের কম্যুনিটি লাইফের প্রতি অতিরিক্ত শ্রদ্ধাবোধ হলো৷ স্থানীয় পরিচিত মানুষজন বললেন সরকারি অনুষ্ঠান শেষ হলেও নাচ শেষ হতে এখনও অনেক দেরী। আমার বন্ধুরা তাদের নবলব্ধ সঙ্গিনীদের সঙ্গে সময় কাটাবার জন্যে আবার নাচের মাঠে চলে গেলেন। ততক্ষণে বেশ গরম লাগতে শুরু করেছে,গাড়িতে টুপি আর স্কার্ফ রেখে দিয়ে চলে গেলাম নাচের মাঠ পেরিয়ে একটু দূরে, একটা ঘনসন্নিবিষ্ট খুরমানি গাছ ভরা জমিতে। তলায় সদ্যফোটা দুইইঞ্চি লম্বা যবের চারা আর ঝরে পড়া খুরমানি ফুলের গালিচা। গাছগুলো ফুলে ঠাসা, পেঁজা তুলোর মতো ফুল ছাড়া আর অন্য কিছুই দেখা যায় না৷ ইতস্তত ঘুরে বেরিয়ে একটা বিশাল কাছিমপেঠা পাথর দেখে তার উপরে ফুলের ছায়ায় শুয়ে থাকলাম খানিকক্ষণ। মাঝে মাঝেই হালকা হাওয়ায় সারা শরীরে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন ব্রোকপাদের প্রকৃতিদেবতার আশীর্বাদ। এটা সেটা ভাবতে ভাবতে ভরাপেটে পরম প্রশান্তিতে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না, খেয়াল হল বন্ধুদের ডাকে। ওরা আমাকে খুঁজে পাচ্ছিলো না, গাড়ির চাবিও আমার পকেটে। তবে বন্ধুরা স্মার্ট, থেফট অ্যালার্ম লাগানো গাড়ির বনেটে কয়েকটা ঘুঁষি মারতেই গাড়ি আর্তনাদ করে উঠে আমার ঘুম ভাঙালো।

আর কী, এবার ফেরার পালা। সারাদিনে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হলেও মন আর ভরে কই। ফেরার পথে সেই থামতে থামতে ছবি তুলতে তুলতে আসা। আচিনাথাং গ্রামের কাছে সিন্ধু নদ বেশ চওড়া আর ঢালান খুব কম, তাই জলও হ্রদের মতো স্থির। যাওয়া আসার পথে এটা আমাদের একটা বাঁধা স্টপওভার। সঙ্গে রাখা থার্মাস থেকে এক কাপ করে কালো কফি খাওয়া হল এখানে। মাস্টারজীর গাড়ি এখানেই রাখা ছিল রাস্তার ধারে, বিদায় জানিয়ে তিনি চলে গেলেন নিজের বাড়ির দিকে – আমরা স্কারবুচান, ডোমখার, টাকমাচিক হয়ে পৌঁছুলাম খালৎসিতে।

মুখ তুললেই নীলাকাশ

কিছু বন্ধুবান্ধবের ব্যবসাপাতি আছে এখানে, তাদের মধ্যে একজন আবার পাথর খোদাই করে ছবি আঁকে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না করে চলে যাওয়াটা গুনাহ্, তাই একদফা থামা হলো এখানেও। বাকি রাস্তাটা গান শুনতে শুনতে, গান গাইতে গাইতে, সূর্যাস্তের আগে পাহাড়ের নিসর্গ দেখতে দেখতে পেরিয়ে এলাম। ফেরার রাস্তায় উল্লেখযোগ্য ঘটনা দুটো। এক, শেষ বিকেলে নুরলা আর লিকিরের মাঝে একদল ভরালের সঙ্গে মোলাকাত – তারা পাহাড় থেকে নেমে রাস্তার ধারের নালায় জল খেতে এসেছিল। গাড়ি থামাতে দেখে অত্যন্ত অনিচ্ছুক ভাবে পাহাড়ে কিছুদূর উঠে যে ভাবে তাকালো, তাতে বোঝা গেলো ওদের তৃষ্ণা এখনও মেটেনি। তাই বেশি বিরক্ত না করে কয়েকটা ছবি তুলেই চলতে শুরু করলাম আবার।
দুই, সূর্যাস্তের পরে পাত্থরসাহেব গুরুদ্বওয়ারার কাছে এক লাজুক হিমালয়ান রেড ফক্স। চোখে হেডলাইটের আলো পড়তে তিনি ন যযৌ, ন তস্থৌ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, আশ মিটিয়ে দেখে ক্যামেরা নিয়ে যেই গাড়ি থেকে নামতে গেছি, তিনি চোখের পলকে পাথরের পাঁজার পিছনে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

লেহ পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় রাত নটা। ফেরার সময় আধোঘুম আধো জাগরণে ভাবছিলাম ব্রোকপাদের কথা। পুর্বজন্ম-পরজন্ম বিশ্বাস করার কোন যুক্তি দেখি না, কিন্তু আবছায়ায় নিজেকে যেন গালো মেলো ডুলের দলেই দেখলাম, পাহাড় থেকে পাহাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে তীর-ধনুক দিয়ে আইবেক্স শিকার করছি। যে সময়ে জন্মেছি, বাস্তবে তো আর হবে না, স্বপ্নেই সই।

(ক্রমশ)

কৌশিক সর্বাধিকারী
লেখক | + posts

কৌশিক সর্বাধিকারী। পেশায় মিলিটারি ডাক্তার, বেশ কিছুকাল কর্মসূত্রে রয়েছেন লাদাখে। সেখানকার নিসর্গ, মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর নিরন্তর সন্ধিৎসার সঙ্গে পাঠকর সাক্ষাৎ ঘটবে এই কলামে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *