খড়কুটোর জীবন : পুকুরঘাটের কথা । পর্ব ৬ । লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

0

ঘাট বলতে আমরা সাধারণত বুঝি পুকুর নদী প্রভৃতি জলাধারে অবতরণ স্থান।তবে আমি যে ঘাটের কথা বলবো তা দিল্লীর রাজঘাট বা বারাণসীর মণিকর্ণিকা ঘাট বা কলকাতার বাবু ঘাটের কথা নয়। গ্রামের নানান পুকুর ঘাটের কথা একটু ঘটা করে বলবো। বৃদ্ধ লোকেরা বলেন – ‘এটা কলিযুগ। এখন – আঘাটে ঘাট হবে, অপথ পথ হবে, ভাড়ানির ব্যাটা মোড়ল হবে। ‘
গ্রামে পুকুরের চতুর্দিকে প্রায় ঘাট। যে যেখান দিয়ে পারে আঘাটকেও  ঘাট করে নেয়। অনামী সেই ঘাট নিয়ে কত ঘটাপটা।
আমাদের বাড়ির পাশেই ছিলো বাঙালদের পুকুর ঘাট। ভোর থেকেই পাড়ার লোকেদের বাড়ির উঠান দিয়ে ঘাটে আনাগোনা শুরু হয়ে যেতো। মেয়েরা যেতো বাসি কাপড় কাচতে । কেউ যেতো বাসনের ঝুড়ি নিয়ে বাসন মাজতে। পুরুষরা এসময় বিশেষ যেতো না। বাসন মাজতে মাজতে শুরু হয়ে যেতো তাদের মেয়েলি গল্প। সে গল্পের সারমর্ম ‘ তাইলো দিদি তাই / তোর যা আমারো তাই। ‘ কেউ বললো – ‘ শাশুড়িটা মরলে বাঁচি। হাড়-মাঁস জ্বালিয়ে দিলো। ‘ সমব্যথী অন্য বউটি জবাব দেয় — ‘ কী হলো লো আজ আবার?’
‘ ভোর বেলা উঠে ধান কুটে, উঠোন ঝাঁট দিয়ে, গোবর ছড়া, মেরুলি দিয়ে বাসন নিয়ে ঘাটে আসবো আর ওনার মুখ ঝামটা – একটা কাজ করতে এত বেলা ভাত কখন হবে শুনি। ‘
—‘ হ্যাঁ, আমাদের গতর তো নুঙায় বানানো। মেসিন আমরা। সারারাত ভাতারের সেবা করো আর উঠেই হুমনির ব্যাগার ঠেলো । ‘
— ‘ দিদি, এসব কথা যেন ডাকিনীটা না শোনে । ‘
— ‘ নারে, আমার পেট থেকে কোনো কথা বেরোবে না। ‘
— ‘ হ্যাঁ দিদি, শুনেছো নাকি পদা পালের মেয়েটা কটা বাড়ির মেজ ছেলেটির সঙ্গে ভাব করেছে। ‘
— ‘ তাই? ‘
— ‘ তবে আর বলছি কী – আমাদের উনি শুনে এসে রাতে বলছিলো। ‘
— ‘ মরবে! ঐ ডাকাত বাড়ির ছেলের সঙ্গে ভাব। রাবণ ঘোষ ঐ মেয়েটাকে হেঁসো দিয়ে কোপাবে। ‘
— ‘ মরুক গে। কুটকুটানি হয়েছে মরবে।চলো আবার ভাত চাপাতে হবে। ‘
দুজনে বাড়ির পথ ধরতে আবার কেউ এসে হাজির পুকুর ঘাটে।

অনেক কিছুর মতোই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের পুকুর ঘাট। তাইতো কবি লেখেন —
‘কোথায় পাবে পুকুর ঘাটে শান বাধানো ঘাট!
হরেক রকম সদাই নিয়ে গ্রাম্য বাজার হাট,
বটবৃক্ষের ছায়ায় বসা রাখাল ছেলের বাঁশি,
পুকুর ঘাটে কলসী কাঁখে রাঙা বঁধুর হাসি। ‘

একটা সময় এই বাঙাল পুকুর ঘাট ছিলো অপূর্ব সৌন্দর্যময়। টলটলে পুকুরের জলে চারি দিক থেকে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকতো নানান বৃক্ষরাজি। ঘাটে নামার পথে একদিকে একটা জীবন গাছ আর একদিকে বিশাল কুল গাছ। আর চারিদিকে খেজুর, নোনা, নারকেল, বাবলা, আশশ্যাওড়া, বুঁইচি, লাল ভেরেন্ডা, অচা, চিটে নানা ছোটো-বড়ো গাছের ভিড়। নানা রকম ঝোঁপ-ঝাঁড় ভরে পুকুর পাড়।তা দেখে ‘সহজ পাঠের ‘সেই ছেলেটির মতো আমার বলতে ইচ্ছে করতো –
‘ ঐখানে মা পুকুর-পাড়ে
জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে
হোথায় হব বনবাসী,
কেউ কোথ্থাও নেই। ‘
জলের ধারে ধারে কলমী আর হেলেঞ্চা। কলমী ঝাঁড়ের মধ্যে হেঁটে বেড়াতো ডাহুক-ডাহুকী। পানকৌড়ি আর সাদা বক ইতিউতি ঘোড়া ঘুড়ি করতো। মাছরাঙা এসে ঝুপ করে পড়তো জলে। পুকুরের পাড়ের খেজুর গাছে কাঠঠোকরার ঠকঠক শব্দ কাঁপিয়ে দিতো শান্ত পুকুরের জল।পাতি হাঁস আর রাজ হাঁসের দল সারাদিন পুকুর জুড়ে চৈ চৈ। রাতে জোনাকি পোকার মিটি মিটি আলোয় ভরে থাকতো পুকুর পাড়ের জঙ্গল। ভাট ফুলের গন্ধ বয়ে আনতো বাতাস। চাঁদ আর জোছনার আলোয় পুকুরের জল করতো ঝিলমিল। গরমের সময় পুকুর পাড়ে গিয়ে বসলে ঠাণ্ডা বাতাসে শরীর শীতল হয়ে যেতো। এ যেন রবী ঠাকুরের শিলায়দহের কুঠি বাড়ির পুকুরের বকুলতলা ঘাট।

এই পুকুর ঘাটেই আমার আট বছরের দিদিকে দেখতাম পুণ্যিপুকুর ব্রত করতে। পূজার সামগ্রী একটা সাজিতে করে নিয়ে গিয়ে ঘাটের পারে রেখে দিদি জলে নামতো। তারপর ডুবদিয়ে উঠে এসে বসতো পূজা করতে। প্রথমে একটা গর্ত কাটতো ছোট্ট পুকুর স্বরূপ। তারপর সেই পুকুরের চার দিকে দুটি করে কড়ি রাখতো। মাঝখানে পুঁতে দিতো তুলসী বা বেলের ডাল। পাশেই রাখা থাকতো ডুব দেবার সময় তুলে আনা পিতলের ঘটির একঘটি জল। সবকিছুতে চন্দন লাগানোর পর দিদি মন্ত্রোচ্চারণ করতো –
‘ পুণ্যিপুকুর পুষ্পমালা
কে পুজেরে দুপুর বেলা
আমি সতী লীলাবতী
সাত ভাইয়ের বোন চম্পাবতী
হবে পুত্র মরবে না
দুনিয়াতে ধরবে না। ‘ – মন্ত্রোচ্চারণের পর দিদি সাজি থেকে সাদা ফুলগুলো নিয়ে ঘটির জল সহযোগে অঞ্জলি দিতো। সবশেষে গল বস্ত্র হয়ে প্রণাম। চৈত্র মাসের সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ মাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত দিদি প্রতি দিন সকালে এই ব্রত করতো। এই ব্রত করে কী হয় জানতে চেয়েছিলাম ঠাকুমার কাছে। তিনি বলেছিলেন -‘ এই ব্রত কুমারী মেয়েরা করে। এটা করলে পুকুরের জল শুকায় না, ভালো বৃষ্টি হয়, নারীরা সন্তান লাভ করে। ‘
দুপুরে মাঠ থেকে ফিরে পুরুষেরা আসতো স্নানে। ছোট্ট শিশিতে সর্ষের তেল, O. K সাবান বা পিস সাবান নিয়ে। কাঁধে গামছা। অনেকে সাবানের বদলে মাথায় মাখতেন উঁইয়ের মাটি বা কুমোড় দের চাকের পেলব মাটি। জলে নেমে প্রথমে হাত-পা-গা ধুয়ে, গামছা দিয়ে পিঠ রোগরে উঠে এসে সাবান মাখা তারপর তেল মাখা। তার পর ক্ষুধার পেটে ভুস ভুস করে কয়েকটি ডুব দিয়ে গা- মাথা মুছতে মুছতে বাড়ির পথে যাত্রা। বুড়ি ঠাকুমা দের দেখতাম পুকুর থেকে স্নান সেরে এক ঘটি জল নিয়ে গিয়ে তুলসী গাছে ঢেলে প্রণাম করতেন। অনেকে স্নানের সময় সূর্যের দিকে তাকিয়ে টুককরে প্রণাম করে নিতেন – ঔঁ জবা কুসুম ইত্যাদি বলে। চারু ঠাকুমার ছিলো ছুঁইছুঁই বাতিক। স্নান করে উঠছেন এমন সময় কেউ হয়তো লাফিয়ে পড়লো জলে। জল ছিটকে ঠাকুমার গায়ে। আর পায় কে – অপশব্দে চতুর্দশ পুরুষের নাম ভুলিয়ে ছেড়ে পুনরায় ডুব দিয়ে ঘাট ছাড়তেন তিনি।
পুকুরঘাটে প্রেম হবে না তা হয়। কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার দৌলতপুরের খাঁ পুকুরের ঘাটে বসে বাঁশি বাজাতেন নার্গিস আসার খানমের জন্য তেমনি ঘাটে বসে প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করতে দেখতাম অনেক যুবা প্রেমিককে। অনেকে অপেক্ষা করতে করতে গোটা সাবান ঘষে শেষ করে ফেলতো। পুকুরঘাট সাদা ফেনায় ভরে যেতো। তবু রাধার দেখা মিলতো না। যাদের দেখা হতো তাদের আক্ষেপ ‘ ভালো করি পেখন না গেল ‘। তবে অনেক ঘাটের প্রেম ঘরে পৌঁছে যেতো। অনেক প্রেমের সলিল সমাধি ঘটত ঘাটের জলে।
আমরা ছেলের দল শুধু বাঙাল পুকুর নয় গ্রামের অন্যান্য পুকুরেও হানা দিতাম। গ্রীষ্মের দিনে হাজির হতাম মাঠের মধ্যে নির্জন ময়রা পুকুরে। অন্য পুকুরে জল না থাকলেও ময়রা পুকুরে থাকতো টলটলে জল। কাঁচা আম খেতে খেতে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম তার বুকে। গামছা দিয়ে ঘাটের কোলে ধরতাম চিংড়ি, বেলে, পুঁটি নানান ধরনের মাছ। যারা মাঠে কাজ করতে আসতো বা গরু নিয়ে আসা রাখালেরা আমাদের সঙ্গে তেল চেয়ে নিয়ে স্নান সেরে নিতো।

বিকেলে গরু-মহিষের গা ধোয়ানো হতো নতুন পুকুরের ঘাটে। চৈত্র মাসে গাজনের সন্ন্যাসীরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্নান করতে যেতো এই ঘাটে। শিবলিঙ্গ আর পাট-বাণ নিয়ে হতো সেই স্নান। গুরু ঠাকুর এসে মন্ত্র দিতেন শিষ্যের কানে এই পুকুর ঘাটের জলে দাঁড়িয়ে। প্রতীমা নিরঞ্জনও হতো এই ঘাটে। মৃন্ময়ী মূর্তী কয়েক জন মিলে ধরে ঘাটের কিনারে সাত পাক দিয়ে ‘আসছে বছর আবার হবে ‘ বলে ভাসিয়ে দিতো জলে। তারপর ঘটে জল ভরে নিয়ে ফিরতো বাড়ির দিকে।

মুসলিম পাড়ার সোনা ঘোষের পুকুরঘাটে দেখতাম মসজিদে নামাজ পড়ার আগে অনেকেই ওজু করছেন পুকুরের জলে। হাত- পা-মুখ-কান বারবার ধুয়ে নিয়ে নিজেদের পবিত্র করে নিচ্ছেন। জুম্মা বারে ভিড় হতো সব থেকে বেশি। এই পুকুরের পশ্চিম পাড়ে আমাদের গ্রামের কবরখানা। অনেকে বলে গোরস্থান। মুর্দা দাফনের পর সকলে নামতো পুকুরে। হিন্দু পাড়ার কেউ মারা গেলে মৃতের আত্মার স্বরূপ পুকুর ঘাটের এক কোণে পোঁতা হতো ব্যাণা ঘাস।যারা কাছা পড়তো তারা অশৌচের দিনগুলিতে স্নান সেরে ঐ ব্যানা গাছে জল দিতো। ক্ষৌরকার্যের দিন পুকুর পাড়ে বসে পুরুষদের মাথা মুণ্ডন আর মহিলাদের নখ খুঁটে দিতো নন্দ নাপিত। তার পর সকলে আত্মীয়দের নিয়ে আসা নতুন পোশাক পড়ে বাড়ি যেতো। গ্রামীণেরা আত্মীয়দের এই পোশাক গুলিকে বলেন ঘাটকামানি।
আজো কানাপুকুর, হেরোমপাল , কাঁসারি পুকুর, খোকা ঘোষের পুকুর, খোরসেদের পুকুর, ফটিক বাবুর পুকুরের ঘাট গুলো আছে। শুধু কমেছে মানুষের আনাগোনা। এখন আর কেউ বাসন মাজতে ঘাটে যান না। কাউকে দেখিনা সোডা দিয়ে কাপড় সিদ্ধ করে পুকুর ঘাটে কাঠের পাটার উপর মাজা দুলিয়ে দুলিয়ে কাপড়ে আছাড় মেরে মেরে কাচতে। মহিলা জীবনের সুখ-দুঃখের কথায় আর মুখরিত হয়না ঘাট।এখন আর নববধূর পিতাকে কাছে পেয়ে শাশুড়ি মাতা শোনান না —
‘ বিয়াই মশাই বসেন তো
দুটি কথা শোনেন তো
আপনার মেয়ে নাইতি যায়
লোকের সাথে কথা কয়
আমি যদি বলতে যায়
তাল ঠোকাঠুক বাধিয়ে দেয়। ‘
আসলে কবেই আমাদের অগোচরে ঘাটের কথারা হারিয়ে গেছে জলের গভীরে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *