খড়কুটোর জীবন : খেতের ঢিল, খেতেই ভাঙে। পর্ব ২৭। লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

0

পাড়ায় চরণ কাকার মুদিখানা দোকান ছিলো। দোকানে  বর্ষার সময় এলেই বেলুন, জিভ লাল, আচার লটারী, খেলনা বন্দুক এসব আসতো। নগদ পয়সা বা পাট নিয়ে গিয়ে সে সব লোভনীয় জিনিস কিনতাম। মাঝে মাঝে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। দেখতাম আচারের লটারীতে কে কী পেলো। কেউ প্লাস্টিকের পুতুল, মাছ, বা বাঁশি পেতো। কেউ হনুমান বা বাঘের মুখোস পেতো। হনুমানের মুখোশ পেলে মুখে লাগিয়ে হুপ হুপ শব্দ করে আমোদ করতো। ছোটো ছোটো কালো রঙের বাঁশি গুলি পিঁ পিঁ করে বাজাতো। অদ্ভুত বাঁশি। ফুঁ দিলোও বাজতো আবার  বাঁশি মুখে শ্বাস ভিতরের দিকে টানলেও বাজতো। এতেই ঘটতো বিপত্তি। বাঁশি শ্বাসনালীতে গিয়ে আটকে যেতো। ধীরেন কাকার একবার এরূপ হয়েছিলো। তাতে প্রাণ যায় যায়। তারপর জোরে কাশি দিয়ে বাঁশির মুক্তি ঘটিয়ে কাকা আমার প্রাণ পাখিকে ধরে রাখেন। তো ঐ চরণ কাকার দোকানে ভাই পাপ্পা আসতো। হাতে কুড়ি বা পঞ্চাশ পয়সা। পঞ্চাশ পয়সারই চানাচুর নেওয়ার পর সে দোকানে দাঁড়িয়ে থাকতো। কেননা দোকানে অনেকে পয়সা ফেরৎ পায়, সে কেন পাবেনা। পয়সা তাকে ফেরৎ দিতেই হবে। চরণ কাকা যতই বলতো – ‘ তুই তো তোর আট আনারই চানাচুর নিয়েছিস, তাহলে ফেরৎ কীসের? ‘ পাপ্পা সেসব বুঝতো না। তার একটাই বুলি – ‘ পয়সা ফেরৎ দাও। ‘ চরণ কাকাও দিতো না। শেষমেশ পাপ্পার বাবা শশধর কাকা তাকে বাড়ি ধরে নিয়ে যেতো।

গ্রামে তুফানদা সদ্য পৃথগন্ন হয়েছে। মাটির দুটো ঘর আর উঠানে ছাপড়া দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা। গাই গরুটা আশ্রয় পেয়েছে নিজেদের থাকার ঘরের পাশের ঘরটিতে। সঙ্গে কয়েকটি ছাগল। নিজস্ব জমি জায়গা নেই বলে তুফানদা লোকের বিঘা খানেক জমি ভাগ চাষ করে। অভাবের সংসারে কিছু নগদ উপার্জনের জন্য বৌদির বানানো দই আর ঘোল বিক্রি করে দাদা। ভোরবেলা ছোটো একটা বাঁকে মাটির দুটি ভাঁড়ে দই আর ঘোল নিয়ে সে পাশের গ্রাম পাথুরিয়াতে যায়। সঙ্গে থাকে শালিমার নারকেল তেলের একটা খালি কৌটা যেটাতে দই বা ঘোল মাপা হয়। নগদ পয়সা আর চালের বিনিময়ে সে বিকিকিনি সারে। বেলা বাড়তেই হাঁড়ি খালি করে বাড়ি ফিরে আসে। তারপর গরু বাছুর এবং ছাগল গুলোকে খাইয়ে নিজে খেয়ে মাঠে নিজের কাজে অথবা জন খাটতে যায়। যাবার আগে বৌদির কাছে বাজার করার পয়সা দিয়ে যায়। তো একদিন একশ টাকার একটা নোট দিয়ে গেছে। বৌদি বড় আন্দুলিয়া বাজারে গিয়ে সমস্ত টাকারই চাল-ডাল-সবজি এবং দাদার একটা লাল পড়া গামছা কিনে নিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা বেলা বৌদি দাদাকে হিসাব দিতে গিয়ে কীসে কত খরচ হয়েছে সেটা বলছে। তুফানদার একটাই প্রশ্ন – ‘ ইতিউতি না হয় অত গেল আর পয়সা কই? ‘ বৌদি যতই বোঝানোর চেষ্টা করে যে সব খরচ হয়ে গেছে দাদার সেই একই কথা আর পয়সা কই। একেবারে পাপ্পার মতো অবস্থা। আসলে অভাবের সংসারে একদিনে একশ টাকা খরচ তার কাছে অবিশ্বাস্য । সে ভাবছে বৌদি পয়সা চুরি করেছে। এবং চোরকে পিটিয়ে শাস্তি দেওয়াকেই সে বিধেয় মনে করেছে। প্রতিবেশীরি বৌদিকে বাঁচাতে এসে সব জানতে পারে। তখন থেকেই দাদার সেই মহান উক্তি গ্রামে প্রবাদে পরিণত হলো – ‘ ইতি- উতি অত গেল, আর কই? ‘

আমাদের দাস পাড়ার অনেকেই বিল মাঠ থেকে কলমী শাক তুলে চাপড়া বা কৃষ্ণনগরে গিয়ে বিক্রি করে আসতো। তো অন্যান্যদের মতো দাস পাড়ার  নিরাপদ দাসের ছেলে দিলীপ বস্তা ভর্তি কলমী শাক নিয়ে বাজারে গিয়ে বসে বিক্রি করতো। এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থে সে রুই মাছ যাকে গ্রামে বলা হয় কাটা মাছ বা নউলা মাছ নিয়ে আসতো চাল-ডাল-সবজি প্রভৃতির সঙ্গে। নিরাপদ দাসের ভীষণ আনন্দ। প্রতিদিন ছেলে বাজার যাওয়ার আগে নিরাপদ মাছের কথা মনে করিয়ে দিতো। কিন্তু, সুখ বেশীদিন স্থায়ী হয়না। বর্ষা আসতেই বীল মাঠ জলে ভরে গেলো। থই থই জল। নদী বলে ভ্রম হয়। দিলীপের কলমী শাক বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলো। সে তখন পাট কাটা, পাট ছেলার কাজ করতে লাগলো গ্রামে। বর্ষায় প্রতিদিন জনের কাজও মেলে না। দিলীপ বাবার জন্য মহার্ঘ রুই মাছও কিনতে পারেনা। খাওয়া নিয়ে একদিন বাপ-ব্যাটাই কোন্দল উপস্থিত হলো। কেননা বাড়িতে তখন —
‘ এক বাটি আমানি
তলে টুকু ভাত রে
সেই দেখি ছানাবড়া
কাঁদে গোটা রাইত রে ‘ — এমন অবস্থা। কচু পাতা, সজনে শাক, গুগুলি এসব দিয়েই দিন চলে। নিরাপদ এসব দিয়েই ভাত খাচ্ছিলো আর ছেলের দিকে তাকাচ্ছিলো । ছেলে দিলীপ বাপের উদ্যেশ্যে ছুঁড়ে দেয় মোক্ষম বাক্যবাণ — ‘ খা নিরা, মাছ খা। এখন আতাড়ি-পাতাড়ি খাচ্ছিস কেন? ‘সেই উক্তি গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে গেলো। কেউ সুযোগ পেলেই এই উক্তি করে।

অভাবের সংসারে একটু সুরাহার জন্য গ্রামের অনেকের মতো বিলাসী ঠাকুমাও ছাগল পোষে। স্বামী এবং দুই জোয়ান ছেলে চাষাবাদ করে। বিলাসী ঠাকুমা ভীষণ মুখরা। সবাই তাকে এড়িয়ে চলে। কেউ তার সঙ্গে মুখ লাগাতে আসেনা পারতপক্ষে। তো একদিন স্কুল মাঠে তার খাসি ছাগলটা চড় ছিলো। পথের ধারেই। কেউ বে খেয়ালে তার খাসি টাকে সাইকেল চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। স্কুল মাঠের পাশে যাদের বাড়ি তাদের মধ্যে কেউ একজন এসে অবলা জীবটাকে একটু তেল-জল দিয়ে সুস্থ করে। বিলাসী ঠাকুমা খবর পেয়ে বাড়ি থেকে গাল পাড়তে পাড়তে ছোটে। অকুস্থল -এ পৌঁছে তার একটাই প্রশ্ন — ‘ আমার ছাগল কে মেরেছে বলতে হবেনা, তবে বল তেল-জলটা কে দিলো? ‘ আসলে কে চাপা দিয়ে গেছে কেউ দেখেনি। তাই সবাই মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে থাকলো। আর অবলা জীবের সেবা করেছে যে তার নাম বলে গালি খাওয়াতে কেউ রাজী নয়। বিলাসী ঠাকুমা প্রতিপক্ষ না পেয়ে ছাগলটাকেই গালি দিতে দিতে বাড়ি নিয়ে গেলো। সবাই চুপচাপ নিজেদের পথ দেখে নিলো। যেহেতু —
‘ শনির দৃষ্টি যদি ধরে, গণেশের মাথা খসে পড়ে। ‘

আমাদের প্রাথমিক স্কুলে উঁচু ক্লাসে এক কাকা পড়তো। তাকে দুষ্টু ছেলেরা ‘ দো-জেতে ‘ বলে ক্ষ্যেপাতো। যেহেতু তার বাবা হিন্দু আর মা মুসলমান ছিলো। জাত তুলে এই গালি দেওয়ার অশিষ্ট আচরণে বিরক্ত হয়ে সেই কাকা একদিন হেড স্যারের কাছে নালিশ জানালো – ‘ স্যার, ওরা আমার জাত তুলে কথা বলে। ‘ সদাহাস্য প্রধান শিক্ষকের জবাব — ‘ তোর জাত তুলেছে , নামনি তো। যা পালা। ‘ কাকা চলে যেতেই যারা এই অপকর্মটি করেছিলো তাদের অফিস ঘরে ডাক পড়লো। ধোলাই খেয়ে তারা সারা জীবনের মতো জাতের নামে বজ্জাতি ভুলে গিয়েছিলো। পরদিন থেকে কাকাকে কেউ আর ‘ দো-জেতে ‘ বলার সাহস দেখায়নি। স্যার সেদিন শিক্ষা দিয়েছিলেন — ‘ গঙ্গায় ময়লা ফেললে, গঙ্গার মাহাত্ম্য যায় না। সবার উপরে মানুষ সত্য। ‘

পিতা- মাতা পৃথক করে দিয়েছে। নতুন সংসারে খুব অভাব। রাতে ঘুমের ঘোরে সন্তোষ দাদু বকেন – ‘ টাকা কোথায় পাবো? ‘ অন্য দিকে আচেড় সেখ গ্রামে গ্রামে আলফার মাটির হাঁড়ি বিক্রি করেন। ভোর থাকতে ঝাঁকা বোঝাই হাঁড়ি- মালসা নিয়ে তিনি বার হন। তারও রাত্রিতে ঘুম আসে না। ঘুমের ঘোড়ে বকেন – ‘ হাঁড়ি বেচতে যাবো। ‘ তো গ্রামে এই দুজনের উক্তিও প্রবাদে পরিণত হয়েছিলো। লোকে দুটোকে মিলিয়ে বলতো — ‘ টাকা কোথায় পাবো, হাঁড়ি বেচতে যাবো। ‘ আজ ভাবি সহজ-সরল গ্রাম জীবনের এইসব নিগূঢ় সত্য কীভাবে প্রবাদ হয়ে উঠেছিলো। যা আজ গ্রাম জীবনের ধারক, বাহক ও প্রতিপালক । পাঠকবন্ধুরা  যাতে নিজেদের জীবনে এসব অনুভব করতে পারেন তাই এসবের অবতারণা। কথায় আছে না —
‘ পড়ে কথা সবার মাঝে, যার কথা তার প্রাণে বাজে। ‘

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *