খড়কুটোর জীবন : গাঁয়ের রাখাল । পর্ব ২৩। লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

শীতের সন্ধ্যাতেই  পথ নির্জন হয়ে যেতো।কুয়াশা আর গরুর গোয়াল থেকে ভেসে আসা ধোঁয়ায় কুলকুণ্ডলিনীর মতো হয়ে উঠতো গ্রাম। ঘরে থেকে শুনতে পেতাম দাস পাড়ার ছোটন ভয়ার্ত কণ্ঠে ‘ হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ ‘ করতে করতে গোয়াল পাড়ার গেরস্থের বাড়ির গরু-মোষ গোয়ালস্থ করে বাড়ি চলেছে। মনিবের ঘরেই রাতের খাওয়া সেরেছে । সে বাসু ঘোষের বাড়ির পেট ভাতার রাখাল। প্রতিদিন তিন থালা পান্তা-গরম-করকরা ভাত ,শীতে চাদর,বছরে দুটো গামছা,পূজায় জামা আর হাফপ্যান্ট — এই তার পাওনা। ভোরবেলা বাড়ি থেকে এসে সে প্রতিদিন গরু-মোষ গোয়াল থেকে বার করে নাদায় বেঁধে দিয়ে জল-সানি দেয় । তারপর নুন-লঙ্কা সহযোগে পান্তা খেয়ে মাঠে ঘাস আনতে যায়। মাঠে যাওয়ার আগে তার অ্যালুমিনিয়ামের কানা উঁচু থালা আর জলখাবার মগটা ধুয়ে মাটিতে উপুর করে রেখে যায়। মাঠ থেকে ঘাস নিয়ে এসে সে বসে ছানি চুড়াতে । গাদা থেকে বিচালি টেনে এনে গোয়াল ঘরের পাশে পাটকাঠির ছাউনির নীচে ঘাসের বস্তার পাশে রাখে। তারপর বেলিট আর বালি নিয়ে এসে হেঁসোতে ধার তোলে। কাঠের বেলিটের উপর বালি দেয় আর হেঁসো ঘষে। হাত দিয়ে হেঁসোর ধার পরীক্ষা করে বটনিতে লাগিয়ে ছানি চুরানো শুরু হয়। প্রায় ষোলো গুণ্ডা বিচালি আর এক বস্তা ঘাস কেটে মিশিয়ে সে চলে স্নানে। গৃহিণীর কাছ থেকে ছোট্ট শিশিতে চেয়ে নিয়ে যায় মাখার জন্য সর্ষের তেল। সাবান কখনো তার জোটে না। আমরাও স্কুলে যাবার আগে নতুন পুকুরে স্নান করতে যেতাম। সেখানেই দেখা হয়ে যেতো ছোটনের সঙ্গে। একসঙ্গে পুকুরের জল কাঁপিয়ে চলতো ডুবসাঁতার, চিৎসাঁতার, মরা ভাসা, ডিমপাড়াপাড়ি আরো কতো খেলা। চোখ লাল করে বাড়ি ফিরে আমরা আসতাম স্কুলে আর ছোটন গ্রামের অন্য রাখালদের সঙ্গে গরু-মোষ নিয়ে আসতো স্কুল মাঠে। আমাদের স্কুলের এগারোটার ঘণ্টা বাজতেই ছোটনরা গরু নিয়ে যেতো মাঠের দিকে। কানাডাঙা,অন্না গাড়ী পেরিয়ে বিল মাঠে। মাঠে গরু ছেড়ে দিয়ে রাখালের দল বসতো কোনো আলের উপর বা গাছের নীচে। গ্রীষ্ম বা বর্ষায় সবার মাথায় থাকতো লাঠি ছাতা বা তাল পাতার বিশাল ছাতা অথবা মাথালি । ছোটনের মতো বয়সে ছোটো রাখালরা বর্ষীয়ান রাখালদের নির্দেশে গরু ঘোড়ানো, গাভীন গরুর নজর রাখা, এঁড়ে বা বলদ গুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মোটকথা গোপালন বিদ্যা শিখে নিতো। বাছুর যাতে দুধ না খায় তাই গাভীর বাঁটে গোবর লাগিয়ে দেওয়া, বলদের পায়ে ফাল লাগলে ক্ষতস্থানে বনৌষধী লাগিয়ে দেওয়া, গাভীর বাঁটকানা রোগ বা ঠুনকো রোগ, বাদলা খোঁড়া রোগ, পেট ছাড়া রোগ — এসব সম্পর্কে জ্ঞাত হতো নবীন রাখালেরা। তন্ত্র-মন্ত্রও ছিলো তাদের শিখন সূচিতে। এসবের বাইরে গরু নাঙলা করা, কল দেওয়া, বকনাগরুর পাল পাওয়ার ডাক চেনা, ষাঁড় দেখানো, গরু দোহানো শিখলে তবে কেউ হতে পারতো পরিপূর্ণ রাখাল। বাড়িতে যতই বলা হোক না কেন — ‘ পড়াশুনা না করলে গরুর রাখাল হবি। ‘ আমার মনে হতো রাখালির থেকে পড়াশুনা অনেক সহজ। দোহনের আগে বাছুর লেগে গেলে তো মার খেতে হয়না।
যে রাখালের যেদিন দুপুরের ভাত নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব থাকতো সেদিন সে সকালে পালের সঙ্গে নিজের গরুগুলি পাঠিয়ে দিতো। তারপর একটার দিকে দলের অন্যান্য রাখালদের বাড়ি থেকে গামছায় কলাপাতা মোড়া ভাত বেঁধে লাটিতে ঝুলিয়ে চলতো মাঠের দিকে সঙ্গে মাথায় জলের কলসী আর গ্লাস । রাখালেরা সেই ভাত গোল হয়ে বসে খেতো । সবুজ মাঠের গো রাখালদের বাড়ি ফেরার সময় হতো সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তো। গোধূলি রঙ ছড়িয়ে যেতো বিলের জলে। আবীর রঙে স্নাত হয়ে গাঁয়ের পথে ফিরে আসতো তারা। ছোটনও ফিরে এসে গরু গুলোকে নাদায় বেঁধে দিতো। ছানি দিতো। মশা বা ডাঁশ তাড়াতে সাঁজাল জ্বাল তো। তারপর দুটো ভাত খেয়ে ফিরে যেতো বিধবা মায়ের ছেঁড়া কাঁথার আশ্রয়ে। কয়েক বছরের মধ্যে ছোটনের মাসিক একশ টাকা বেতন হলো। তারপর দুশো টাকা। তারপর তিনশো টাকা। তারপর ছোটন আর রাখাল না। ততদিনে সে শিখে নিয়েছে লাঙ্গল চষা, ধান কাটা, ধান লাগানো –চাষের নানাবিধ কাজ। সে তখন একজন কিষাণ বা জনমজুর।

একটা মজার ঘটনা বলি। কালী ঘোষের বাড়ি রাখালি করতো শঙ্কর দাস। কালী ঘোষেরা দুই ভাই। বাপ-মা নেই। বিয়ে হয়নি। রান্নাবান্না দুই ভাইয়ে মিলে করে। সিদ্ধ ভাত আর দুধ তাদের নিত্যদিনের মেনু। রাখাল শঙ্করও প্রতিদিন দুধ ভাত খায়। তরকারি মাঝেসাঝে হয়। শঙ্করের প্রতিদিন দুধ ভাত ভালো লাগেনা। বাড়ি গিয়ে সে মায়ের কাছে নিত্য অভিযোগ জানায় – ‘ঘোষেরা তরকারি দেয়না।ওদের বাড়িতে আর রাখালি করবো না।’ মা সে কথা শুনে কিলী ঘোষকে জানায়। কালী ঘোষ রাগী লোক। তো একদিন সে নানাবিধ তরকারি রেঁধে শঙ্করকে খেতে দিয়ে পাঁচন নিয়ে বসেছে। অত আয়োজন নিঃশেষ করা শঙ্করের পক্ষে শেষ করা সম্ভব নয়। গলা পর্যন্ত খাওয়া হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কালীর পাঁচন থেকে বাঁচতে গেলে তাকে সব শেষ করতে হবে। তো সে আর খেতে না পেরে এক দৌড় বাড়ির দিকে। গ্রামে এখনো মুখে মুখে ফেরে সে গো রাখালের কথকতা। আজ আর গ্রামে গরুর পাল নেই। গোচারণ এর ভূমি নেই। নেই রাখালের দল। এখন সব ইতিহাস।

সুপ্রিয় ঘোষ
+ posts

নদীয়ার চাপড়া বড়ো-আন্দুলিয়া সংলগ্ন আলফা গ্রামে সুপ্রিয় ঘোষের জন্ম। অঞ্চলসংস্কৃতি উৎসাহী ও সন্ধিৎসু সুপ্রিয় আড়ালেই সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে তাঁর কাজ করে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বই 'নদীয়ার হাট-হদ্দ'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *