কাগজের নৌকো। পর্ব ৬। ধারাবাহিক উপন্যাস। লিখছেন সায়ন্তন ঠাকুর

বৃদ্ধ পণ্ডিত ঐন্দ্রীর দিকে তাকিয়ে প্রসন্ন কণ্ঠে বললেন, ‘মা, কাশীখণ্ডে স্বয়ং দেবাদিদেব মহেশ্বর কহিয়াছেন, মোক্ষ-লক্ষ্মীবিলাস নামক আমার প্রাসাদের দক্ষিণে অবস্থিত মুক্তিমণ্ডপে আমি সতত অবস্থান করি উহাই আমার সভামণ্ডপ। এইস্থলে বসিয়া ক্ষণিকের জন্যও কেহ যদি স্থিরচিত্ত হইতে পারে তাহাকে আমি শত বর্ষব্যাপী যোগাভ্যাসের ফল প্রদান করিয়া থাকি, ইহাই জগতে নির্বাণ-মণ্ডপ নামে খ্যাত। নির্বাণ-মণ্ডপে যে একটি মাত্রও ঋক পাঠ করে, সে সমগ্র বেদপাঠের ফল প্রাপ্ত হয়। তদুপরি এইস্থানে ষড়াক্ষরমন্ত্র জপ কোটি রুদ্রজপের ফল লাভ নিশ্চিত করিয়া থাকে।’

রেওয়া ঘাটের উত্তরে তুলসী ঘাটের বামদিকে উত্তরবাহিনী সুরধুনীর বুকে একখানি বজরা পশ্চিমে বয়ে চলেছে, আষাঢ় সন্ধ্যা সমাসন্ন, অদূরে ঈষৎ মেঘাবৃত আকাশে কে যেন একখানি গেরুয়াবর্ণ উত্তরীয় বিছিয়ে দিয়েছে, ঘাটের পৈঠায় বসে কলমঞ্জিররঞ্জিনী স্রোতধারার পানে চেয়ে ঐন্দ্রীর সহসা মনে হল বিরজা হোমাগ্নির সুবাসাচ্ছন্ন বৈরাগ্য বর্ণে এই অনন্ত আকাশ আর কলকলনাদিনী গঙ্গাস্রোত আজ মগ্ন, যেন কোনও নারী সন্ন্যাস-দীক্ষান্তে ধীর পায়ে অস্তগামী সন্ধ্যা সবিতার দিকে হেঁটে চলেছে আর তারই কাষায় অঞ্চলছায়াবৃতা জগতের পারে ঐন্দ্রী একাকিনী নিঃসঙ্গ বসে রয়েছে, শুধু আজ নয় বহু শতকোটি বর্ষ ধরে সে প্রতীক্ষারতা, যদিও কার জন্য প্রতীক্ষা তা আর স্পষ্ট মনে পড়ে না, শুধু কর্ণকুহরে মৃদু দীপালোকের স্বরে কেউ নিরন্তর বলে চলে, দিন য়ামিন্য়ৌ সায়ং প্রাতঃ/শিশির বসন্তৌ পুনরায়াতঃ/কালঃ ক্রীডতি গচ্ছত্য়ায়ুঃ/তদপি ন মুঞ্চত্য়াশাবায়ুঃ।

 

বৃদ্ধ শূলপাণি আচার্য্যের দিকে মুখ ফিরিয়ে ঐন্দ্রী জিজ্ঞাসা করল, ‘এই ঘাটে বসেই তো তিনি লিখেছিলেন?’

মৃদু হাসলেন শূলপাণি, নির্জন সন্ধ্যায় গঙ্গা তীরবর্তী ঘাট সুললিত সুরঝঙ্কারে ভরে উঠল, ‘কহি ন জাই কছু নগর বিভূতী, জনু এতনিঅ বিরংচী করতূতী। সব বিধি সব পুরলোগ সুখারী। রামচংদ মুখ চংদু নিহারী।’, দু-এক মুহূর্ত পর ধীর স্বরে বললেন, ‘বালাজী পেশোয়া নির্মিত এই ঘাট পূর্বে অসি ঘাটের অংশরূপে পরিচিতি পাইয়াছিল, এইস্থলে কাশী প্রসিদ্ধ আদিত্যপীঠ লোলার্ককুণ্ড রহিয়াছে বলিয়া অনেকে ইহাকে লোলার্ক ঘাটও বলিয়া থাকেন।হাঁ, এইস্থলে মহাত্মা তুলসীদাস প্রভু অবস্থান করিতেন, ইহাই তাঁহার লীলাভূমি, অমরগ্রন্থ রামচরিতমানসের রচনাস্থল এই তুলসী ঘাটে বসিয়া তাঁহার দোঁহা শুনিলে আজও মন ভাবসমুদ্রে ভাসিয়া যায়।’

–এ এক আশ্চর্য জগৎ! আপনার কথা বাবার বন্ধু হরিদয়াল জ্যাঠার মুখে শুনেই স্থির করেছিলাম কোনওদিন বারাণসী এলে আপনার সঙ্গে আলাপ করব।

‘হরিদয়াল হৃদয়বান ধার্মিক, কত বৎসর পূর্বে তাহার সহিত পরিচয় হইয়াছিল!’, কথাগুলি বলার সময়েই শূলপাণির চোখে সুদূর কোন কালের চিহ্ন ফুটে উঠল,পরনে একখানি সাদা ধুতি, কাঞ্চনবর্ণ অনাবৃত দেহে উপবীত আর উত্তরীয় যেন প্রাচীন ভারতভূমির অলঙ্কার, কাঁধ অবধি নেমে এসেছে পলিত কেশরাজি, শ্মশ্রুগুম্ফ মুণ্ডিত চন্দ্রপ্রভার মতো উজ্জ্বল মুখমণ্ডলে ধীশক্তিসম্পন্ন তেজোদীপ্ত অথচ কোমল নয়নের দিকে তাকালে বোঝা যায় এই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সাধারণ কোনও মানুষ নন।

 

ঐন্দ্রী নম্র স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি তো বহুদিন আগে এখানে এসেছিলেন, বাড়ির কথা মনে পড়ে না?’

ওষ্ঠে ক্ষণিকের জন্য হাসির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল, ‘আসিয়াছিলাম একাদশ কি দ্বাদশ বৎসর বয়সে, গ্রামের পাঠশালায় মেধাবী ছাত্র বলিয়া খ্যাতি ছিল, গুরু মহাশয়ের পত্র লইয়া ন্যায়রত্ন শ্রী দিবাকর তর্কালঙ্কারের টোলে আসিয়া বুঝিলাম ন্যায়শাস্ত্র প্রায় কিছুই শিখিতে পারি নাই, মনপ্রাণ সমপর্ণ করিয়া বিদ্যাসমুদ্রে ভাসিয়া যাইলাম, তাহার পর একদিন চোখ মেলিয়া দেখিলাম যৌবন গত হইয়াছে, পিতা-মাতাকে এইস্থানে আসিবার পূর্বেই হারাইয়াছিলাম, গ্রামদেশে ফিরিয়া পুনরায় সংসারে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা হইল না, সেই হতে কাশীবাসী, টোলের গুরু হইলাম, কত ছাত্র পড়াইলাম তবে ইদানিং কেহ আর ন্যায়শাস্ত্র দেবভাষা শিখিতে চাহে না, পুরাতন পুথি লইয়া বসিয়া থাকি, সঙ্কটমোচন মঠে সকাল সন্ধ্যায় যাতায়াত রহিয়াছে, ইহা ব্যতীত প্রত্যহ বিশ্বনাথের দর্শন…আমি স্বপাক একাহারী, দিন একপ্রকার কাটিয়া যাইতেছে, গৃহ শব্দটিই মন হইতে বহুদিন পূর্বে মুছিয়া ফেলিয়াছি মা!’

কৃষ্ণসর্পের মতো বেণীটি আলগোছে হাতের আঙুলে জড়িয়ে সামান্য অন্যমনস্ক স্বরে ঐন্দ্রী শুধোল, ‘তাহলে সন্ন্যাস নিলেন না কেন?’

–প্রারদ্ধ মা, উহা না কাটিলে সন্ন্যাস হইবে কী প্রকারে! শারদা মঠে একবার সন্ন্যাস দীক্ষার জন্য যাইয়াছিলাম, মোহান্ত কহিলেন, সময় উপস্থিত হয় নাই। অভিমান হইয়াছিল, আজ বুঝিতে পারি মিথ্যা অভিমান, প্রকৃতপক্ষে সন্ন্যাস গ্রহণের বাসনাও একপ্রকারের স্বত্ত্বগুণের বাসনা, অন্নপূর্ণার নিকট প্রত্যহ প্রার্থনা জানাইয়া কহি, নির্বাসনা করো, তাঁহার ইচ্ছা হইলে প্রারদ্ধ ক্ষয় হইবে, আন্তরিক চেষ্টা করিতেছি।

 

সন্ধ্যা অলীক নূপুরে ঢেউ তুলে চরাচরে আসছেন, আষাঢ়ের মলিন আলোয় কান পাতলে শোনা যায় সেই অপরূপ রিণিঝিণি শব্দ, তুলসী ঘাটে লোকজন তেমন নাই, অদূরে হনুমান মন্দিরে এক রামাইত সাধু বসে রয়েছেন, কতগুলি দীপ জ্বলছে গণেশ মন্দিরে, পূর্বগামিনী বাতাস কোন বিরহীর ডাকে আপনমনে বয়ে চলেছে, সুরধুনীর স্রোতে কতগুলি ফুল দিনান্তের মৃত আলোর মতোই ভাসমান-ঘর সংসার আত্মীয় পরিজন কেউ নাই, হয়তো কোনও মন্দিরে দেবমূর্তির পদতলে তাদের সমপর্ণ করা হয়েছিল, সেই আনন্দে বিবাগী কুসুমদল ভেসে চলেছে।ঘাটের পশ্চিমে একটি জীর্ণ কোঠাবাড়ির দোতলায় কেউ সেতারে সুর বেঁধেছেন, করুণ কোনও রাগ,আষাঢ় মেঘে গৃহাভিমুখী শ্বেত হংসের মতো তার রূপ, সহসা মৃদু তালবাদ্যের মতো শোনা গেল শূলপাণির কণ্ঠস্বর, ‘হরিদয়ালের পত্রে জানিয়াছি তুমি উচ্চশিক্ষিতা, বর্তমান যুগের আধুনিকা হইয়াও নির্জন সন্ধ্যায় ঘাটে বসিয়া আমার মুখ হইতে প্রাচীনকালের পুরাণকথা,শাস্ত্রবাক্য শুনিতেছ-ইহা আমাকে কিঞ্চিৎ বিস্মিত করিয়াছে।’

সদ্য প্রস্ফুটিত অতসী পুষ্পের মতো মৃদু হাস্যে ভরে উঠল ঐন্দ্রীর মুখ, ‘পুরাতন ভারতবর্ষ আমাকে খুব টানে, এবার কাশী এসেই স্থির করেছি পায়ে হেঁটে মন্দির দেখব, পণ্ডিত মানুষের মুখে কাশীর ইতিহাস লোককথা শুনব আর ভাগ্যে থাকলে সাধুসঙ্গ, যদি হয়! কত প্রাচীন বিদ্যা চর্চার অভাবে আজ হারিয়ে গেছে, সে-সব কথাও শুনতে ভারি ইচ্ছে করে।’

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর শূলপাণি বললেন, ‘পূর্বসংস্কার টানিয়া আনিয়াছি নচেৎ এত বৎসর হইল তোমার ন্যায় একজনকেও দেখি নাই! তুমি বিনয়ী, শিক্ষিতা, নম্রভাষিণী, প্রভু বিশ্বনাথের কৃপায় নিশ্চয় মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইবে।’

 

ঐন্দ্রীর পরনে একখানি গহিন বর্ষা মেঘের মতো শাড়ি, সে শ্যামবর্ণা দীর্ঘাঙ্গী, অঙ্গে অলঙ্কার বলতে কর্ণমূলে একখানি ক্ষুদ্র হীরককুণ্ডল, নিরাভরণ কণ্ঠে যূথিকা কুসুমহার-বড়ো প্রিয় ফুল, নিবিড় অভিমানের মতো কৃষ্ণকেশরাজি শিথিল বেণীবন্ধনে সজ্জিত, তবে তার প্রকৃত সৌন্দর্য দুটি আনত নয়নে-দূর কোন কালের স্মৃতিচিহ্নের মতো নম্র অথচ সংকেতবাহিনী, প্রায়ান্ধকার ঘাটের শেষ পৈঠায় ক্রমাগত উথলে ওঠা জলস্রোতের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল, ‘আচার্য্য শঙ্করের কথা শুনতে বড়ো ইচ্ছে করছে।’

দু-এক মুহূর্ত কোনও কথা না বলে নীরব রইলেন শূলপাণি, তারপর কলকলনাদিনী গঙ্গার দিকে চেয়ে করজোড়ে প্রণাম করে বললেন, ‘কাশী তাঁর লীলাভূমি, কত বিচিত্র আখ্যান, একটি ঘটনার কথা কহিতেছি, একদিন আচার্য্য শঙ্কর সশিষ্য স্নানাভিপ্রায়ে উত্তরবাহিনী সুরধুনী যাইবার পথে দেখিলেন এক চণ্ডাল তাঁহার পথ রোধ করিয়া দাঁড়াইয়াছে, চারটি বিকটদর্শন সারমেয় চণ্ডালের সঙ্গী, ঈষৎ বিরক্ত হইয়া শঙ্কর কহিলেন, পথ ছাড়িয়া দাও, গঙ্গাস্নানে যাইতেছি, স্পর্শ করিও না।

চণ্ডাল মৃদু হাস্যে বলিল, শ্রুতিতে নির্ণীত অদ্বিতীয়, অসঙ্গ, সৎ, অখণ্ড, সুখরূপ যে পদার্থ তাহাতে তোমার ভেদ কল্পনা, আশ্চর্য! যতিবর! তুমি কী কহিতেছ? অন্নময় হতে অন্নময়কে, চৈতন্য হতে চৈতন্যকে, দূরীকৃত করিতে বাঞ্ছা করিয়াছ ? স্থুল শরীর সকল অন্নময়, আর জীব সকল চৈতন্য, সুতরাং অন্নময়কে অন্নময় হইতে এবং চৈতন্যকে চৈতন্য হইতে দূরীকরণ সম্ভব নহে। তুমি তাহা কীরূপে করিতে চাহ?

চণ্ডালের যুক্তি শঙ্করকে বিস্মিত করিল, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, চণ্ডাল এবং বিপ্রে ভেদ নাই ইহা বুঝিব কী প্রকারে?

পুনরায় ভীষণ দর্শন চণ্ডাল কহিল, গঙ্গা স্রোতে অথবা আমার ন্যায় চণ্ডালের গৃহাঙ্গনস্থ জলে প্রতিবিম্বিত সূর্যের এবং কাঞ্চন-ঘটে ও মৃৎ-কুম্ভে আকাশের কি অন্তর রহিয়াছে ? তোমা সদৃশ জ্ঞানশূন্য যে সকল দণ্ডি আপনাতে কৃত-পূজ্যাভিমান ও বেশধারী ভিক্ষু, তাহারা কেবল গৃহস্থগণকে বঞ্চনা করিতেছে। সুরনদী অর্থাৎ গঙ্গায় অথবা সুরায় সূৰ্য প্রতিবিম্বের কি ভেদ সম্ভব ? হে বিপ্র, এক্ষণে কহ, আমি দ্বিজ এবং সম্মুখস্থ ব্যক্তি চণ্ডাল-ইহা কি তোমার মিথ্যাজ্ঞান নহে?’

 

একটানা কথা বলে এক মুহূর্তের জন্য শূলপানি থামলে ঐন্দ্রী সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করল, ‘তারপর?’

বর্ষা মেঘের অন্তরালে পশ্চিমাকাশে চন্দ্রদেব উদিত হয়েছেন, চন্দ্রসভা আজ নিকটবর্তী, মেদুর জ্যোৎস্নায় জগত কোনও অস্পষ্ট স্বপ্নলোক বলে ভ্রম হয়, যেন এক রহস্যময়ী তাঁর অতিসূক্ষ্ম রেশমবস্ত্র দিয়ে এই মায়ালোক আচ্ছন্ন করে রেখেছেন, জনমানবশূন্য তুলসী ঘাটে দুইজন অসমবয়সী নারী ও পুরুষ হয়তো এই কালের কেউ নয়, তন্দ্রাচ্ছন্ন অতীত ভারতবর্ষ থেকে কালপ্রবাহ অতিক্রম করে তারা উঠে এসেছে সুরধুনীর এই সন্ধ্যাঘাটে, ঐন্দ্রীর কথায় মৃদু হেসে শূলপানি বললেন, ‘চণ্ডালের বাক্য শ্রবণ করিয়া বিস্ময়াভূত শঙ্কর কহিলেন, শ্রুতিবিদ পণ্ডিত জগতে বহু রহিয়াছেন, আজ বুঝিলাম তাঁহাদের মধ্যে বিশুদ্ধ জ্ঞানীরই শুধুমাত্র অভেদ-বুদ্ধি লাভ হইয়া থাকে। হে উদার, আপনি যাহা কহিলেন তাহা সর্বৈব সত্য, এক্ষণে আমি সকল ভেদবুদ্ধি পরিত্যাগ করিলাম।

এই বাক্য উচ্চারণ মাত্র শঙ্কর দেখিলেন, চণ্ডাল ও তাঁহার সঙ্গী সারমেয় চতুঃষ্টয় অদৃশ্য হইয়াছে এবং সেইস্থলে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন স্বয়ং দেবাদিদেব মহেশ্বর ও চর্তুবেদ।

তীক্ষ্ণধী শঙ্কর নিমেষে বুঝিলেন, সারমেয়গণ প্রকৃতপক্ষে চারটি শ্রুতি এবং চণ্ডাল স্বয়ং শিব।

করজোড়ে শঙ্কর স্তুতি আরম্ভ করিলেন, পাঁচটি অপরূপ স্তোত্রে দেবাদিদেবের বন্দনাই জগতে মণীষা পঞ্চকম রূপে প্রসিদ্ধ।’

অল্পক্ষণ কোনও কথা না বলে চুপ করে রইল ঐন্দ্রী, পূর্বগামিনী বাতাসের দোলায় মেঘ কোথায় যেন ভেসে গেছে, সুরধুনীর স্রোতে টলোমলো রাকা এবং তার সহস্র প্রতিবিম্ব গোপিনীদলের মতোই হাত ধরে অবিরল বয়ে চলা জলধারায় সুরহিল্লোল তুলেছে-সেই অপার্থিব মগ্ন সৌন্দর্য পানে চেয়ে মৃদু স্বরে ঐন্দ্রী বলল, ‘সেই স্তোত্রগুলি বলবেন না?’

‘আজ রাত্রি হইয়াছে মা, সন্ধ্যাহ্নিকের সময় সমাগত, আগামীকাল কহিব’, একমুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে শূলপানি পুনরায় বললেন, ‘আগামীকাল অপরাহ্নে প্রহ্লাদ ঘাটে আসিও, আরেকটি আশ্চর্য আখ্যান তোমাকে কহিব, তাহা তোমার জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’

নিজের জীবনের কথা শুনে বিস্মিত কণ্ঠে ঐন্দ্রী জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার জীবন?’

অলীক জ্যোৎস্নারাত্রির মৃদু সৌরভের মতো হাসিপ্রভায় শূলপাণির মুখমণ্ডল ভরে উঠল, ধীর স্বরে বললেন, ‘আগামীকাল কহিব।’

 

দশাশ্বমেধ ঘাট রোডে গোপাল রেস্টহাউসের সিঁড়িতে পা দিতেই সাত ঘোড়ায় টানা রথ ছুটিয়ে বৃষ্টি এল, রিসেপশনে বসে থাকা প্রৌঢ় শর্মাজী ঐন্দ্রিকে দেখে একমুখ হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপ ভিগ তো নেহি গ্যয়ি?’

এই রেস্টহাউসটিকে ঠিক হোটেল বলা যায় না, তিনতলা একখানি বাড়ি তবে ছিমছাম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ইন্টারনেটের সংযোগ, কলঘরে গরম জলের ব্যবস্থা সবই রয়েছে, খাবারও চলনসই-চাপাটি সবজি পুরী সাদা ভাত চানা ডাল-নিরামিষ আহার, স্বাদও মন্দ নয়। দিন পনেরো কি তারও বেশি সময়ের জন্য বারাণসী এসে এর থেকে বেশি দামী হোটেলে থাকার সামর্থ্য ঐন্দ্রীর নাই, এমনিও গত তিনবছর ধরে সে নিরামিশাষী, একবেলা অন্ন আর রাত্রে সামান্য দুধ-খই অথবা একমুঠি মুড়ি হলেই চলে যায় আর এখানে তো দুধের কোনও অভাব নাই, প্রতিদিন বাইরের দোকান থেকে রেস্টহাউসের ছেলেটি রাত্রে একভাঁড় টাটকা গরম সফেন ঘন দুধ এনে দেয় সঙ্গে অল্প খোয়া ক্ষীর, ছেলেটির নাম মনোজ-বছর বারো হবে বয়স, এই কয়েক দিনেই ঐন্দ্রীর ভারি আপন হয়ে উঠেছে।

মাথা থেকে শাড়ির আঁচল সরিয়ে ঐন্দ্রী বলল, ‘আরেকটু দেরী হলেই ভিজে একসা হতাম!একটু আগেই চাঁদ উঠেছিল, এখন আবার আকুল মেঘে বৃষ্টি!’

শর্মাজি বাংলা ভালোই বুঝতে পারেন, চাঁদ ওঠার কথা শুনে একটু আশ্চর্য হয়েই বললেন, ‘চান্দা কাঁহা, সাম চার বাজে সে তো আজ পুরা বাদল ছায়ি হ্যে!’

–কিন্তু ঘাটে বসে যে দেখলাম ফুটফুটে দুধ জোসনায় থইথই করছে আকাশ! ঘণ্টাখানেকও হয়নি!

–আপ কৌন সা ঘাট মে গ্যয়ি থ্যি?

চাবিটা নিয়ে তিনতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে ঐন্দ্রী বলল, ‘তুলসী ঘাট।’

স্থির দৃষ্টিতে ঐন্দ্রীর মুখের দিকে একমুহূর্ত তাকালেন শর্মাজি, ‘আপ আকেলি গ্যয়ি থি? সাম মে, ও ভি এইসি বারিষকা মৌসমমে তুল্‌সী ঘাট কোই নহি যাতা!’

শর্মাজির গলার সুরে কী যেন এক ইশারা ছিল, যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে ঐন্দ্রী জিজ্ঞাসা করল, ‘কিঁউ, কিঁউ নেহি যাতা? যানেসে কেয়া হোগা?’

মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে শর্মাজী হাসলেন, ‘নেহি, কুছ খাস বাত নহি, অ্যায়সেহি, উস ঘাটমে দেখনেকা চিজ হ্যে কঁহা! গাইডকা ইন্টারেস্ট নেহি ঔর টুরিস্টলোগভি নহি যাতে।’

ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে সামান্য হেসে ঐন্দ্রী বলল, ‘মনোজকে দিয়ে ঘরে একটু চা পাঠিয়ে দিন না!’, কথাক’টি শেষ করেই দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

 

ঘরে এসে দ্রুত শাড়ি বদলে সামান্য ভিজে বেণী খুলে একটা আলগা হাতখোঁপা করে বিছানায় ল্যাপটপ খুলে বসল, ঘরটি আয়তনে মাঝারি, একটি ছোট খাট, ড্রেসিং টেবিল, চেয়ার ও টেবিল ছাড়া আর কিছুই নাই, সামনের জানলাটি খুলে দিতেই অস্পষ্ট বৃষ্টি ঝরোখার মাঝে বিশ্বনাথ মন্দিরের আবছা আদল ফুটে উঠল, নিচে কাশীর বিখ্যাত অপ্রশস্ত গলি, দূর থেকে কাঁসর ও ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে, বারাণসী কখনও নীরব হয় না, প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করিয়ে ধরিয়ে ল্যাপটপে গতকাল তোলা ছবিগুলির দিকে তাকিয়ে রইল ঐন্দ্রী-কাজটি তাকে খুব টানছে, ছবি আর গল্প মিশিয়ে একসঙ্গে তৈরি করবে একটি বই, ইংরিজিতেই লিখবে, রূপা পাবলিশিঙের  ওম মেহেরা তাকে সত্যিই ভরসা দিয়েছে।

ছবিগুলি দেখার সময়েই স্থির করল আগামীকাল শূলপানি আচার্য্যের কতগুলি পোর্ট্রেট তুলবে, মেঘাবৃত অপরাহ্নে পঞ্চাশ মিলিমিটার ওয়ান পয়েন্ট ফোর ডি লেন্সে ওঁর মুখের চমৎকার ছবি ওঠার কথা, দীর্ঘদিন ধরেই ঐন্দ্রীর ছবি তোলার অভ্যাস রয়েছে, ফাইন আর্টস নিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর গত দু বছরে অন্তত পাঁচটি একক প্রদর্শনীও করেছে-আলোকচিত্র এবং ছবি দুটি মিশিয়ে এই অভিনব প্রদর্শনী সমালোচক এবং ক্রেতা মহলে অল্প ক’দিনেই তাকে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছে, ইদানিং ভারতীয় চিত্রকলার বাজারে ঐন্দ্রী চট্টোপাধ্যায় যথেষ্ট পরিচিত নাম। গত শীতে কলিকাতার অকাডেমি সেন্ট্রালে প্রদর্শনীর পর টাইমের প্রখ্যাত চিত্র-সমালোচক খান্ডেলকর তার সম্বন্ধে লিখেছিলেন, আ মিস্টিক পেন্টার!

অনেকেই ঐন্দ্রীর ছবিতে এক অতীব রহস্যময় জাদু নগরীর সন্ধান পান, কেউ কেউ তার ছবি দেখার অভিজ্ঞতাকে বলেন আ স্পিরিচুয়াল জার্নি।

ওই প্রদর্শনীটির নাম দিয়েছিল সুরনদী, রিভার অব মিউজিক-পশ্চিমবঙ্গের দশটি নদীর উপর কাজ, কুয়াশাচ্ছন্ন বৃষ্টি আলোয় কুসুম কুসুম চোখ ফোটা কুড়িটি পটচিত্র, জলরঙের স্পর্শ প্রাণ পেয়েছিল তরঙ্গমালা-যেন কোন্‌ দূর গন্ধর্বলোক হতে একদল কিন্নরী সখীর মতো পরস্পরের হাত ধরে চরাচরে নেমে এসেছে।

সবগুলির মধ্যে ‘মূর্তি’ নামক ছবিটি ছিল আশ্চর্য-সূক্ষ্ম রেশবস্ত্রের মতো কুয়াশাবৃতা ক্ষীণধারার পাশে একটি সম্বর হরিণী শুয়ে রয়েছে, দুটি পা রক্তাক্ত, কণ্ঠার কাছে শ্বাপদের তীক্ষ্ণ দাঁতের চিহ্ন অথচ চোখে এক আশ্চর্য নরম ভালোবাসা যেন এখনই মৃতা হরিণী নদীর বুকে বেহুলার মান্দাস হয়ে ভেসে যাবে, নদীটিও তার কাছে এগিয়ে এসেছে, শীর্ণা স্রোতধারার নূপুরধ্বনির মতো ছলাৎছল শব্দটি অবধি স্পষ্ট- শুধু কে যে কার আশ্রয়দাত্রী তখন তা আর বোঝা যাচ্ছে না!

ছবিটি দেখে ইমামি গ্রুপের চেয়ারম্যান, বৃদ্ধ মানুষটি ঐন্দ্রীকে বলেছিলেন, ‘নাউ আই ক্যান সি সাউন্ড অব দ্য রিভার!’

তাঁর এক লক্ষ দশ হাজার টাকার চেক প্রথম দিনেই ছবিটির মাথায় লাল টিপ পরিয়ে দিয়েছিল।

 

সহসা বজ্রপাতের শব্দে সংবিত ফিরল ঐন্দ্রীর, ল্যাপটপ বন্ধ করে জানলার কাছে যেতেই বুঝতে পারল ক্রুদ্ধা কালনাগিনীর বিষ নিঃশ্বাসে ভরে উঠেছে বাতাস, গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ আকাশে কুহকিনীর মায়াকাজল বিজুরি রেখার মতোই উজ্জ্বল, অন্তরীক্ষ হতে সহস্র অশ্বারোহী সৈন্যরূপে ছুটে আসছে বৃষ্টি-টলোমলো জগত, অপরূপ সুবাসে মাথা ভারী হয়ে আসছে ঐন্দ্রীর, ঘরের বিজলি বাতি এক ফুৎকারে কে যেন নিভিয়ে দিল…টেবিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে ফ্যাব্রিয়ানোর হাত-কাগজে তৈরি খাতাটি টেনে নিল নিজের দিকে, প্যালেট-জলের কাপ পাশেই ছিল, দশ নাম্বার ব্রাশে গাঢ় নীল রঙ তুলে একটি আঁচড় কাটল খাতায়…প্রায়ান্ধকার সন্ধ্যাঘাট, কলকলনাদিনী সুরধুনীর উপর ভাসমান একটি মাত্র ক্ষুদ্র পানসি, চরাচর জনমানবশূন্য, ঘাটের পৈঠায় বসে রয়েছেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ, দিনান্তের মলিনবসনা আলোয় তিনি স্রোতধারার দিকে মুখ করে বসে রয়েছেন, পানসির উপর তমসাবৃতা জগতে কে যেন একটি পাণ্ডুর দীপের আলো জ্বেলে দিল, তার আলুলায়িত কুন্তলরাজি জলদার্ন্তবর্তিনী সৌদামিনী মতো দীপালোক আচ্ছন্ন করে রেখেছে, কে এই নিশীথিনী?

 

হাত থেকে ব্রাশ নামিয়ে রেখে অসমাপ্ত চিত্রের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নটিই ঐন্দ্রীর মনে ভেসে উঠল। খর চোখে ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত, খসড়া মাত্র, আরও দিন দুয়েক বসলে এইটি থেকে বড়ো কাজ হবে, মাথা ভারী করা সুবাসও হারিয়ে গেছে কখন, এমনই হচ্ছে, গত তিনমাস এই গহিন স্বপ্নলোকে তার যাতায়াত, প্রতিটি ছবি জুড়েই ঘাট এবং নদী…সেজন্যই বারাণসী ছুটে আসা, ক্ষীণ আলোর মতো কাশী শব্দটি যেন একদিন শুনেছিল জাগ্রত তন্দ্রায়-মেঘগম্ভীর এক পুরুষকণ্ঠ অচেনা কারোর উদ্দেশ্যে বলছিল, ‘হে ঢুণ্ডিরাজ, তোমার সন্তোষ ব্যতিরেকে কেহই কাশীধামে প্রবেশ করিতে পারিবে না!’

সহসা কিছুক্ষণ পূর্বে তুলসী ঘাটে শূলপাণির মুখের কথাগুলি বিদ্যুতচমকের মতো ঐন্দ্রীর মনোকাশে বেজে উঠল, তার নিজের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত তন্দ্রাচ্ছন্ন এই অস্পষ্ট কুয়াশালোকের কথাই কি তাহলে আগামীকাল ওই বৃদ্ধ পণ্ডিত বলবেন?

মোমবাতির পীতবসনা আলোয় অসমাপ্ত চিত্রটির দিকে তাকিয়ে ঐন্দ্রীর মনে হল আগামীকাল প্রহ্লাদ ঘাটের অপরাহ্ন তার জন্যই যেন কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করে বসে রয়েছে।

(ক্রমশ)

সায়ন্তন ঠাকুর
লেখক | + posts

জন্ম পৌষ মাসে, রাঢ়বাংলার এক অখ্যাত মফস্সলে। সায়ন্তন মূলত মূলত গদ্য লেখেন। প্রকাশিত বইপত্তর-- নয়নপথগামী(উপন্যাস), শাকম্ভরী(উপন্যাস), বাসাংসি জীর্ণানি(গল্প সংকলন)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *