খড়কুটোর জীবন : হারিয়ে যাওয়া মুখগুলি । পর্ব ১৬ । লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

রাস্তার পাশেই মাটির দেওয়াল আর খড়ের ছাউনির দোকান। দোকানের মুখটা গুড়ের বা তেলের টিন কেটে বাঁশের কাঠামোর উপর পেরেক ঠুকে বানানো। পাশেই বাড়ির দিকে কাঠের দরজা। শিকল আর বালা লাগানো। দোকানের সামনেটা মাটি দিয়ে উঁচু করা। আমরা ছোটোরা ডিঙনু দিয়ে দোকানের ভিতরটা দেখার চেষ্টা করতাম। কেননা আমাদের লোভনীয় জিনিসগুলি তো ওর মধ্যেই বাঁশের আড়াতে ঝোলানো থাকতো। চানাচুর, বিস্কুট, লজেন্স, মুখ লাল – এসব থাকতো কাচের বয়ামে । বেলুন, আচার, গুড় বাদাম, কানমোড়া,লটারী সব টাঙানো থাকতো। দোকানের ভিতরে একদিকে লবণের বস্তা। অন্যদিকে বাঁশের মাচার উপর সরষের তেল বা নারকেল তেল মাপার ধাতব নানান মাপের পাত্র। সর্ষের তেলের আর নারকেল তেলের জন্য আলাদা আলাদা। টিন থেকে সর্ষের তেল নিয়ে সেই সব মাপনী দিয়ে খরিদ্দারের বোতলে কাগ লাগিয়ে ঢেলে দেওয়া হতো তেল। সামনের মাচার উপর ঝোলানো থাকতো দাড়িপাল্লা আর নানান মাপের বাটখারা। কচকরা বা ফের ভাঙার জন্য থাকতো তামার পয়সা বা পথরের টুকরো। এছাড়াও দোকানের মধ্যে চালের বা আলুর বস্তা থাকতো। মুগ, মুসুর, কলাই প্রভৃতি ডাল থাকতো মাটির হাঁড়িতে। লাল কার,কালো কার, চুল বাঁধার লাল, কালো ফিতে ঝোলানো থাকতো বাঁশের ছোটো ছোটো টুকরোতে জড়ানো অবস্থায়। একটা কৌটাতে থাকতো সেপ্টিপিন, ব্লেড, সূচ ইত্যাদি। গরম মশলার পাতা ঝোলানো দেওয়ালের পেরেকে। ছোটো ছোটো প্লাস্টিকের কৌটাতে হলুদ, জিড়ে, পাঁচফোড়ন। গোটা হলুদ, শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা, আদা, রসুন, ধনে, জোয়ান, সর্ষে এসবও মিলতো। আর থাকতো গুড় ভর্তি টিন। সাগু, বার্লি, আটা, সুজি, বেসন কৌটাতে বা অন্যান্য পাত্রে। আসন বানানোর চট,নানান রঙের উলের গোলা, কাঁথা সেলায়ের সুতো , শ্লেট-পেন্সিল, গোলাপি বর্ণপরিচয়, ধারাপাত এইসব উপাদান নিয়েই ফটিক বাবুর মুদি দোকান। দোকানের মধ্যে একটু উঁচুতে কাঠের পাটাতনের উপর লক্ষী-গণেশের আসন। কাঠের ক্যাশ বাক্সের উপর রাখা থাকতো ধার বাকির হিসেবের খাতা।
সবাই বলতো ফটিক বাবুর দোকান। আসল নাম ফটিকচন্দ্র সিংহ। গোয়ালা, বেণে,তিলি, তামুলি – এসবের মধ্য গ্রামের লোকেরা তাকে তামুলি বলতো। ফটিক বাবু গ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তি। প্রায় দুই বিঘা জমির উপর টিনের ছাউনি আর মাটির দেওয়ালের বিশাল আটচালা বাড়ি। নিজস্ব টিউবওয়েল, পাকা পায়খানা। পাশেই দশ বিঘার বিশালায়তন পুকুর। সবাই বলে বাবুর পুকুর। মাঠে প্রায় চল্লিশ বিঘা ভূসম্পত্তি। সংসারে স্ত্রী, এক পুত্র আর দুই কন্যা। গ্রামে তার স্বজাতির তিনিই একা। অন্যান্য শরিকেরা গত শতাব্দীর ষাটের দশকে চলে গেছেন হুগলীতে। তিনি একাই গ্রামে থাকতেন। ক্ষয়িষ্ণু এক জমিদার কাম মুদি দোকানদার। গত শতাব্দীর আটের দশকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি সংস্কার আইনের ফলে তার অধিকাংশ জমিই খাস হয়ে যায়। নব্বইয়ের দশকে যারা তার জমি ভাগ চাষ করতো একে একে জমি গুলি বর্গা করে দখল করে নেয়। তিনি নিজে জমি চাষ করতে পারতেন না। যারা ভাগে নিতো তারাও ভাগ থেকে তাকে বঞ্চিত করতো। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের  –‘ ধাত্রীদেবতা ‘ উপন্যাসে একটি সংলাপ আছে ‘ জমি বাপের নয়, জমি দাপের। ‘ তো ফটিক বাবুর দাপ না থাকার কারণে অসাধু লোকেরা তার খাস না হওয়া জমি গুলিও ক্রমশ গ্রাস করে নেয়। কেউ কেউ অল্প-স্বল্প দামে কিনে নিতো। তিনি এসবের মাঝেই দুই মেয়েকে শহরে পাত্রস্থ করেন। ছেলেকে পাঠিয়ে দেন হুগলীতে ভাইপোদের কাছে। সেখানেই সে ব্যবসা শুরু করে। বুড়ো -বুড়ি বসত ভিটা আর পুকুর আর বাকি কিছু মাঠান জমি নিয়ে গ্রামেই থেকে যান মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত।
এবার আসি ফটিক বাবুর দোকানের কথায়। চাপড়া থেকে তিনি দোকানের মালপত্র আনতে পারতেন না। যাদেরকে তিনি একাজে নিয়োজিত করতেন তারা তাকে প্রতারিত করতো। জেনে বুঝেও তিনি চুপ থাকতেন। অন্য উপায় ছিলো না। সরল, রাগি, দয়ালু, অভিজাত এই মানুষটি সারাজীবন গ্রামবাসীদের কাছে শুধু প্রতারিতই হয়েছেন। বিশ্বস্ত কয়েকজনকে বাড়ির জমি দান করেন। এমনকি বাড়ির কাজের মেয়েকে জমি দিয়ে বাড়ি করে দেন। বর্ষায় যখন লোকের কাজ থাকতো না ঘরে ঘরে অন্নাভাব দেখা দিতো তখন লোকেরা হত্যেদিয়ে পড়তো ফটিক বাবুর দোকানে। গ্রামের অন্য দোকানীরা ধার না দিলেও ফটিক বাবু ফেরাতেন না। আর সে ধার শুধু ফটিক বাবুর জাব্দা খাতাতেই রয়ে যাবে। গরীব মানুষ কেউ উলফো পয়সা পেয়ে তার দোকানে সিগারেট কিনতে গেলে তিনি গালি দিয়ে তাড়িয়ে দিতেন সিগারেট বিক্রি না করে। ছোটোদের কাছে তিনি কখনোই বিড়ি, সিগারেট বিক্রি করতেন না। জমি বেচে দোকানের মালপত্র নিয়ে এসে তিনি লোকেদের ধারেই খাওয়াতেন।

ফটিক বাবুর ধার ধারেনি গ্রামে এমন কেউ ছিলো না। সকলেই জানতো দুটো কথা শুনিয়ে ফটিক বাবু ঠিক অভাবটা মিটিয়ে দেবেন। আজো মনে পড়ে লম্বা, ফর্সা, ধুতি আর ফতুয়া পরিহিত ফটিক বাবু দোকানের পাশে আমতলায় বসে বসে হ্যারিকেনের কাচ মুচছেন । বা খরিদ্দার দেওয়ার পাশাপাশি কখনো নারকেল পাতার খিল তুলছেন বা ঝাঁটা বাঁধছেন। বাড়ির অসংখ্য নারকেল , সুপারি আর আম গাছের উপরে যেন গ্রামের সকলের অধিকার ছিলো। চাইলেই তিনি কাউকে ফেরাতেন না। বা নিজেই ডেকে ডেকে দিতেন। এভাবেই তিনি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন গ্রামের জন্য। কোনো অভিযোগ ছিলোনা তার নিজের প্রতি বা গ্রামের প্রতি বা ঈশ্বরের প্রতি। তার জীবনের প্রতি প্রসন্নতা ছিলো বিরল। সামান্য কিছু হারিয়ে আমরা যখন হায় হায় করি তখন মনে আসে ফটিক বাবুর কথা।

(ক্রমশ)

সুপ্রিয় ঘোষ
+ posts

নদীয়ার চাপড়া বড়ো-আন্দুলিয়া সংলগ্ন আলফা গ্রামে সুপ্রিয় ঘোষের জন্ম। অঞ্চলসংস্কৃতি উৎসাহী ও সন্ধিৎসু সুপ্রিয় আড়ালেই সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে তাঁর কাজ করে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বই 'নদীয়ার হাট-হদ্দ'।

1 thought on “খড়কুটোর জীবন : হারিয়ে যাওয়া মুখগুলি । পর্ব ১৬ । লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

  1. অসাধারণ।
    সাহিত্যের অঙ্গনে অবলুপ্ত সংস্কৃতির ধারা পথের অন্যতম বাহক আপনি। এই ভাবেই হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির অনুসন্ধান নিরন্তর আপনার কলমে বয়ে চলুক।🙏

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *