কাশীর অলি-গলি : ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতি। পর্ব ৫৬। শোভন সরকার
গত পর্বে: সারনাথে উদ্ধার হল কত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। সেই সঙ্গে বাবু জগৎ সিং বেনারসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠলেন।
সারনাথের ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকদের অবদান অস্বীকার করা যায় না। তবে ব্রিটিশ প্রশাসন আর বেনারসবাসীদের মধ্যে সম্পর্কের সমীকরণ সবসময় এক রেখায় চলেনি। ব্রিটিশ আমলের বেনারসে ১৮০৯ সালে লাট ভৈরবকে ঘিরে এক ভয়ঙ্কর দাঙ্গা বাঁধে। ধর্মীয় বিভেদ ও একে অন্যের প্রতি ঘৃণাভাব যে সামগ্রিকভাবে কতটা হানিকারক হতে পারে তা এই দাঙ্গার ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখেছি। যদিও বা কোনোমতে এই দাঙ্গা সমাপ্ত হল, মনের মধ্যে যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের বীজ সেদিন রোপিত হল, তার মূল বোধ করি এতদিনে অনেক গভীরে বিস্তৃত হয়ে গেছে।
আবার, নানা সময়ে ইংরেজদের স্বেচ্ছাচারিতা সমূলে উপড়ে ফেলার চেষ্টাও করেছে বেনারসবাসী। রাজা চেত সিংয়ের লড়াই কিংবা ওয়াজির আলীর যুদ্ধ ঘোষণায় আমরা সেই প্রবণতা খুঁজে পাই।
ইংরেজ-বিরোধিতার আরও এক উদাহরণ আমাদের সামনে আসে ১৮১০ সালের এক ঘটনায়। ইংরেজদের মতো বিশাল এক সংগঠিত শক্তির বিরুদ্ধে এমন ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ বেনারসের বুকে তখনও বিরল ছিল। প্রেক্ষাপটে ছিল ১৮০৯-এর দাঙ্গা এবং কর। দাঙ্গা-পরবর্তী সময়ে কোম্পানি সাধারণ বেনারসবাসীদের উপর অন্যান্য নানা বাধ্যবাধকতার সঙ্গে নতুন করে এক ‘গৃহকর’ চাপিয়ে দেয়। স্থানীয় ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কোম্পানিকে নিজেদের সমস্যার কথা জানালেও বিশেষ লাভ হয়নি। এরপর এর প্রতিবাদে শহরের মানুষ বসল আমরণ অনশনে। একজন, দু’জন নয় — প্রায় তিন লাখ বেনারসবাসী এক সাথে। সমস্ত রকম কাজ বন্ধ হল, স্তব্ধ হল ঘাটের আদান-প্রদান, শান্ত হল রান্নাঘর আর শ্মশানের আগুন। শেষ পর্যন্ত নানা কারণে এই বিক্ষোভের আগুন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে, তবে শীঘ্রই এক সময় ইংরেজ প্রশাসন এই গৃহকর উঠিয়ে নেয়। ডঃ মোতিচন্দ্র এই আন্দোলনকে বেনারসের ‘প্রথম সংগঠিত সত্যাগ্রহ’ বা ‘ধর্না’ বলে অভিহিত করছেন।
এরই বছর দশেকের মধ্যে ১৮১৯-২০ নাগাদ বেনারসে আসেন জেমস প্রিন্সেপ। বেনারসের টাঁকশালে ‘অ্যাসে-মাস্টার’ বা ধাতু-পরীক্ষক হিসেবে তিনি যোগদান করেন। তবে তাঁর পরিচয় এত সংকীর্ণ গণ্ডিতে কোনোদিনই আটকে রাখা যায় না। অসাধারণ প্রতিভাবান এই তরুণই সর্বপ্রথম ১৮২২ সালে বেনারসের মানচিত্র প্রকাশ করেন। বেনারসের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য জনগণনার কৃতিত্ব প্রাপ্য তাঁরই। সম্রাট অশোকের ব্রাহ্মী ও খরোষ্টি লিপির পাঠোদ্ধার তিনিই প্রথম করেন — সেই কারণেই সারনাথে অশোকের শিলালিপি আজ আমাদের কাছে অর্থবহ। তিনি বেনারস ও তার জীবন-যাপনকে কেন্দ্র করে আঁকেন বহু চিত্র। এগুলি আজও ঊনবিংশ শতাব্দীর বেনারসকে জানার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য উৎস। প্রিন্সেপ সাহেব সাহিত্য চর্চার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেনারস লিটারারি সোসাইটি’ ও এক ছাপাখানা। এ সমস্ত কিছুর হিসেব যদি বাদও দিই, তাঁকে ছাড়া এই শহরের আধুনিক নিকাশি-ব্যবস্থার আলোচনা একেবারেই সম্ভব নয়। তিনিই সর্বপ্রথম এক ব্রিটিশ আধিকারিক যিনি বেনারসের জলনিকাশির সমস্যা সমাধানের কার্যকরী উদ্যোগ নেন। তাঁর পরিকল্পনামাফিক মাটি ফেলে বেশ কিছু নালা ও জলাশয় বুজিয়ে ফেলা হয়, সেখানে গড়ে ওঠে রাস্তাঘাট, বাজার-বসতি। ভাবলে অবাক হই, বর্তমানে আমরা যে গোধুলিয়া মোড়ের ভিড়ে ঠাসা এলাকা বা দশাশ্বমেধ রোডের তীব্র যানজট দেখে অভ্যস্ত, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসবের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, বরং সেখানে ছিল গোদাবরী নালা ও কিছু ছোটোখাটো জলাশয়।
ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হয়ে বিংশ শতাব্দীতে এসে ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানের মতো বেনারসেও জাতীয়তাবাদী মনোভাব তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে বেনারসবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে উচ্চকণ্ঠে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করে। ১৮৫২ সালে এক রব উঠল যে ইংরেজদের জেলখানায় বন্দীদের নাকি জোর করে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। প্রতিবাদে ভোঁসলা ঘাট, নটী ইমলি, কামাচ্ছা প্রভৃতি এলাকায় লোকজন জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকে, কিছু স্থানে লড়াইও হয়। গ্রেপ্তার করা হয় বহু মানুষকে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের প্রভাবও এখানে এসে পৌঁছায়। যদুনাথ সর্বাধিকারীর ‘তীর্থভ্রমণ’ বইতে বেনারস ও আশেপাশের এলাকায় দেশীয় ও ‘গোরা’ সৈন্যদের মধ্যে বিক্ষিপ্ত যে কিছু লড়াই হয় তার বিস্তারিত বিবরণ পাই। জানা যায়, নানা বঞ্চনা ও অত্যাচারের কারণে ইংরেজদের উপর এদেশের মানুষের যে অসন্তোষ তারই হিংসাত্মক প্রতিফলন ঘটে এই লড়াইতে। বিবাদে গোলাগুলিতে দুই পক্ষের বেশ কিছু সৈন্য হতাহত হয়। সেই অশান্ত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কেমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল যদুনাথের লেখায় সে বিষয়েও একটা আন্দাজ পাওয়া যায়।
এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য ব্রিটিশ বাহিনী নিজেদের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
সিপাহী বিদ্রোহে ভারতীয়দের প্রতিবাদী কণ্ঠ চেপে দেওয়া হলেও ধীরে ধীরে আওয়াজ উঠতে থাকল ভারতেন্দু হরিশচন্দ্রের মতো লেখকের স্বরে। নিজের ভাষায় নিজের মানুষের কথা লিখলেন — হিন্দিকে দিলেন সুগঠিত আধুনিক সত্তা। স্বর শোনা গেল পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের। প্রতিষ্ঠিত হল কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়। মালব্যের প্রতিজ্ঞা, নিষ্ঠা, মর্যাদাবোধ আর পরিশ্রমের ফল হল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
১৯১৬ সালে যেদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হল, মঞ্চ থেকে সেদিন শোনা গেল আরও এক কণ্ঠস্বর। এক নাটকীয় পরিস্থিতিতে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামের এক আনকোরা ব্যক্তি নিজের অমায়িক কণ্ঠের দৃঢ়তায় ঘোষণা করলেন ইংরেজবিরোধী চেতনার আহ্বান।
তিনি মাইকের সামনে গিয়ে বললেন, ‘…এ ভীষণ অপমান ও লজ্জার বিষয় যে আমাকে আমার নিজের দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে বিদেশি এক ভাষায় ভাষণ দিতে হচ্ছে। কী হত যদি ধরুন গত পঞ্চাশ বছর ধরে আমরা আমাদের নিজেদের ভাষায় শিক্ষালাভ করতাম? … হয়তো এতদিনে আমাদের ভারত স্বাধীন হত, হয়তো নিজের দেশে নিজেরাই আর বিদেশি হয়ে থাকতাম না। … আবার তাকিয়ে দেখুন, মঞ্চে উপবিষ্ট কত বিশিষ্ট অতিথিবর্গ। … আমাদের সম্মানীয় মহারাজ সকলের সামনে আমাদের দেশের দারিদ্র্য নিয়ে কথা বললেন। অন্য অনেকেই তাঁর সাথে গলা মেলালেন। আমি এঁদের বহুমূল্য আভরণে ঢাকা সজ্জার সঙ্গে এদেশের লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের তুলনা করতে চাই। এই বিদগ্ধ ব্যক্তিদের বলতে চাই — মুক্তি নেই, আমাদের মুক্তি ততদিন নেই যতদিন না আপনারা ঐ সজ্জার ভার ঝেড়ে ফেলে দেশের মানুষের জন্য সমস্ত কিছু উৎসর্গ করে দেন। আমাদের মুক্তি ঐ আইনজীবী বা ডাক্তার বা ধনী জমিদারদের হাতে নেই, তার চাবিকাঠি রয়েছে আমাদের দেশের গরিব চাষার হাতে। … ভয় কেবল ভগবানকে, আর কাউকে নয় — কোনো রাজা-মহারাজাকে ভয় নয়, কোনো বড়লাটকে ভয় নয়, কোনো গোয়েন্দা-পুলিশকে ভয় নয়, এমনকি রাজা জর্জকেও নয়!’
এমন উত্তপ্ত ভাষণ শুনে ততক্ষণে জনতা উত্তেজিত। আওয়াজ উঠছে এদিক ওদিক থেকে। মঞ্চ ছেড়ে উঠে গেছেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অতিথি। অ্যানি বেসান্ত সভার সভাপতিকে বলছেন, ‘থামান ওঁকে!’
থামানো কি গেলো? রিচার্ড ল্যানয় এই প্রসঙ্গে তাঁর বইতে লিখছেন, ‘শত বছরের ঘুম ভাঙল এবার।’
ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯৩৬ সালে গান্ধীজি আবার এসেছিলেন বেনারসে। বেনারসের এক উদ্যোগপতি, স্বাধীনতা-সংগ্রামী ও দানবীর বাবু শিব প্রসাদ গুপ্তার প্রচেষ্টায় নির্মিত বহু মন্দিরের শহরে আরও একটি মন্দিরের উদ্বোধনে। তবে মন্দিরটিতে কোনো চিরাচরিত দেবদেবীর মূর্তি নেই, আছেন ভারতমাতা। আসমুদ্রহিমাচলশোভিত অখণ্ড ভারতের সুচিত্রিত মার্বেল পাথরে খচিত এক বিশালকায় মানচিত্র — স্বাধীনতার পূর্বে তিনিই হয়ে ওঠেন সমগ্র ভারতবাসীর আরাধ্যা।

আগের বার যখন বেনারসে পৌঁছালাম, চোখে পড়ল ইতিহাসের স্রোতধারায় আজও শহরটি সতেজ বহমান। কালের বাহনে শহরটি বিবর্তিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। শহরটিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ কখনোই কম পড়েনি, বরং আজ ভিড়ের মাঝে পা ফেলা দায়। এই জমাট ভিড় হয়তো ইতিহাস নিয়ে অতটা মাথা ঘামায় না, কিন্তু তারা যেন কিসের এক অনুভবে ছুটে আসে এই প্রাচীন শহরে। ঠিক যেমন আমিও বারবার ছুটে যাই, কে জানে কিসের টানে বাঁধা পড়ে গেছি।
এক ভোরের বেলায় আমার বরিষ্ঠ দুই সহকর্মী সুনীতা ম্যাম ও মধুসূদনন স্যার আর তাঁদের দুই ছেলের সাথে আমিও অটোতে বসে চলেছি কাশী বিশ্বনাথ মন্দির দর্শনে। বাইরে ঊষার অন্ধকার আর দক্ষিণের এই দম্পতির চোখে তখন বহু বছরের অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ হতে চলার আনন্দ। অটোচালকের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি নিজের থেকেই বিশ্বনাথ দর্শনের এটা সেটা আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। জিজ্ঞেস করে বসলাম আমি, ‘নতুন যে কাশী করিডোর তৈরি হল, সেটা দেখেছেন?’
‘না, কোথায় আর গেলাম।’
‘সে কী! অনেক বছর তো হল। ২০২১-এ তো উদ্বোধন। তার পর একবারও যাননি মন্দিরে?’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। এই যে আমরা দূর দূর থেকে বেনারসে ঘুরতে আসছি, আর ইনি বেনারসে থেকেও তার প্রতি এত উদাসীন!
অটোচালক পান খাওয়া মুখে স্বর টেনে বললেন, ‘না… সময় কোথায় পাই বলুন।’
সুনীতা ম্যাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘শেষ কবে গিয়েছিলেন, ভাইয়া?’
‘হবে প্রায়… বছর দশেক।’
‘দশ বছর!’
‘কেন? যাননি কেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘আগে যেতাম রোজ। এখন আর আগের মতো নেই। অনেক মানুষের ভিড় থাকে। লম্বা লাইন, পুলিশের কড়াকড়ি। কাজের চাপে সময় আর কোথায় পাই অত ঝক্কি নিতে। এই যে আপনাদের নিয়ে ঘোরাই, ওটাই আমার পুজো, ওটাই আমার বিশ্বনাথের পায়ে অর্ঘ্য।’
মানুষের ভিড় — এই কথাটাই কানে বাজল। কারা এই মানুষ? সবাই কি কাশীর, নাকি কাশী সবার? কাশী কার? উত্তর খুঁজি।
(ক্রমশ)
প্রথম অধ্যায় ‘কালভৈরবের সন্ধানে’ প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘ঘাটে ঘাটে’ প্রথম পর্ব
তৃতীয় অধ্যায় ‘ফিরে দেখতে যাওয়া’ প্রথম পর্ব
