আমাজনের পথে। হেনরি ওয়াল্টার বেটস। পর্ব ৯। অনুবাদে সোমরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়
অ্যামাজন এবং সেই অর্থে সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার সব বানরই আরোহী প্রাণী। পুরনো দিনের বেবুনদের মতো মাটিতে বাস করে এমন কোনও বানরগোষ্ঠী এখানে নেই। এই অঞ্চলের গ্যালিনেশিয়াস পাখিদের, অর্থাৎ এশিয়া ও আফ্রিকার মুরগি ও তিতিরের সমতুল্য পাখিগুলির পায়ের আঙুলের গঠন এমন যে তারা গাছের ডালে বসবাস করতে পারে। আর তাদের শুধু গাছের উপর, অনেক উঁচুতে থাকতে দেখা যায়। ভালুকজাতীয় প্রাণীদের নিকট আত্মীয় প্ল্যান্টিগ্রেড মাংসাশী প্রাণীদের একটি গণ (Cercoleptes), যাদের কেবল অ্যামাজনের অরণ্যেই পাওয়া যায় – তারা পুরোপুরিভাবেই গাছে থাকে। এদের লম্বা ও নমনীয় লেজ অনেকটা বানরের লেজের মতো। এমন আরও বহু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে; তবে আমি কেবল Geodephaga বা মাংসাশী গুবরেপোকাদের কথাই উল্লেখ করব। এই বনাঞ্চলে বসবাসকারী তাদের বহু গণ ও প্রজাতির পায়ের গঠন এমন যে তারা কেবল গাছের শাখা ও পাতার উপরে বসবাসেরই উপযোগী।
গাছ থেকে ঝুলে থাকা বহু কাষ্ঠল লতা আদতে আরোহী উদ্ভিদ নয়। এগুলি উপরে গাছের শক্তপোক্ত ডালে আশ্রয় নেওয়া পরাশ্রয়ী উদ্ভিদের (Aroideæ) বায়বীয় শিকড়, যা ওলনদড়ির মতো সোজা নিচের দিকে ঝুলে থাকে। কোনওটি এককভাবে ঝোলে, কোনওটি আবার একজোটে নেমে আসে। কোনওটি মাটির অর্ধেক পথ পর্যন্ত পৌঁছয়। আবার কোনওটি মাটি ছুঁয়ে সেখানে নিজের ক্ষুদ্র শিকড়গুলি গেঁথে দেয়। বনের একটা অংশ গঠিত হয়েছিল উপরের বৃহৎ গাছগুলির একই প্রজাতির অপেক্ষাকৃত কমবয়সি গাছ দিয়ে; আর বাকি অংশে ছিল নানা প্রজাতির তালগাছ। কোনও কোনও তালগাছের উচ্চতা কুড়ি থেকে ত্রিশ ফুট। কোনওটা আবার ছোট ও কোমল, তাদের কাণ্ড আঙুলের চেয়ে বেশি মোটা নয়। এদের (Bactris-এর বিভিন্ন প্রজাতি) গায়ে আবার ছোট ছোট লাল-কালো ফল ধরেছিল যার রস অনেকটা আঙুরের মতোই মিষ্টি।
আরও কিছুটা এগোলে মাটি ক্রমশ বেশি জলা জমিতে ভরে উঠল। তাই পথ খুঁজে এগোনো আমাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ছিল। এখানে অনেক বুনো কলাগাছ (Urania Amazonica) চোখে পড়ল। ফলে সামনের দৃশ্য আবার বদলে যেতে লাগল। এই সুন্দর গাছের পাতাগুলি প্রশস্ত তরবারির ফলার মতো। প্রায় আট ফুট লম্বা এবং এক ফুট চওড়া। পাঁচ-ছয় ফুট উঁচু কাণ্ডের শীর্ষ থেকে পাতাগুলি সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে। মাটি এদের সমান দৈর্ঘ্যের কিন্তু অপেক্ষাকৃত ছোট পাতার নানা ধরনের গাছে ঢাকা ছিল। তাদের মধ্যে ছিল Marantaceæ পরিবারের বিভিন্ন প্রজাতি। কোনও কোনওটির পাতা ছিল চওড়া ও চকচকে। আর লম্বা পাতার ডাঁটাগুলি কাণ্ডের গাঁট থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এদের কাণ্ড জুড়ে ছেয়ে ছিল আরোহী ফার্ন এবং বড়সড়, হৃদয়াকৃতির পাতাযুক্ত পথোস গাছ। বাঁশ এবং অন্যান্য লম্বা ঘাস ও নলখাগড়ার মতো গাছে ঢেকে ছিল পথ। অরণ্যের এই অংশটির চেহারা ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত। ভাষায় তার যথার্থ রূপ তুলে ধরা সম্ভব নয়। পাঠক যদি কখনও কিউ উদ্যান (Kew) দেখে থাকেন, তবে এর একটি ধারণা পেতে পারেন। কল্পনা করুন, বড়সড় পাম-হাউসে যে ধরনের গাছপালা দেখা যায়, তা যেন বিস্তৃত এক জলাভূমিময় ভূখণ্ড জুড়ে ছড়িয়ে আছে। তবে তার সঙ্গে মিশে আছে আমাদের দেশের ওক ও এলমের মতো বৃহৎ দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ, যেগুলির শরীর লতানে ও পরাশ্রয়ী গাছ দিয়ে ঢাকা। আর কল্পনা করুন, মাটিজুড়ে পড়ে আছে পচতে থাকা গাছের কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ও পাতা। সমগ্র দৃশ্যটিতে মাথার উপর থেকে সূর্যের জোরালো আলো পড়ছে। আর চারপাশে কেমন একটা ভিজে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ।
অবশেষে আমরা অরণ্য থেকে বেরিয়ে উনা নদীর তীরে তার মোহনার কাছাকাছি এসে পৌঁছোলাম। সেখানে নদীটির প্রস্থ প্রায় একশো গজ। বিপরীত তীরে ছিল ডানিন সাহেবের বাড়ি। সাদা চুনকাম করা এবং লাল টালির ছাদে ঢাকা এই বিশাল বাড়িটি স্যাঁতস্যাঁতে জমির উপর কাঠের খুঁটির সাহায্যে উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছিল। বাড়ির দোতলায় পরিবারের লোকজন থাকেন। তার সামনের দিকে একটি খোলা বারান্দা, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে লোকজন নানা কাজে ব্যস্ত, আর নিচে কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক মাথায় করে মাটি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমরা একটি নৌকার জন্য হাঁক দিলাম, এবং তাদের একজন আমাদের আনতে নদী পার হয়ে এল। ডানিন সাহেব পর্তুগিজদের স্বভাবসিদ্ধ সৌজন্যের ভঙ্গিতে আমাদের স্বাগত জানালেন। তিনি খুব ভালো ইংরেজি বলতেন। আমাদের প্রয়োজনীয় কথাবার্তা মিটে যাওয়ার পরও আমরা তাঁর সঙ্গে এই দেশের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে লাগেলাম। এই প্রদেশের প্রায় সব নিয়োগকারীর মতো তাঁরও একটিই মূল অভিযোগ—শ্রমিকের অভাব।
তিনি জানালেন, শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক আনার জন্য তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। পর্তুগাল ও অন্যান্য দেশ থেকে চুক্তির মাধ্যমে কাজের জন্য বহু লোক এনেছিলেন; কিন্তু আসার অল্পদিনের মধ্যেই তারা একে একে তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। অব্যবহৃত জমির প্রাচুর্য, জীবনযাত্রার স্বাধীনতা, প্রায়-বন্য নৌকাজীবন এবং সামান্য পরিশ্রমেই কোনওমতে জীবিকা নির্বাহের সহজ সুযোগ—এই সবকিছুর কারণে এমনকি সদিচ্ছাসম্পন্ন মানুষও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কায়িক পরিশ্রমের জীবন থেকে অব্যাহতি পেতে চায়। আফ্রিকান দাসব্যবসা নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে দাসের মূল্য বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও তিনি অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন, আগে একজন দাস ১২০ ডলারে কেনা যেত, অথচ এখন ৪০০ ডলার দিয়েও তাদের পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডানিন সাহেব আমাদের জানালেন যে তিনি ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছেন এবং বর্তমানে তাঁর দুই ছেলে সেইসব দেশেই পড়াশুনো করছে। পরবর্তীকালে ডানিন সাহেবের মতো বহু উদ্যোগী মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। সে ব্রাজিলীয়ই হোক বা পর্তুগিজ। তাঁদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল ইউরোপ অথবা উত্তর আমেরিকা ভ্রমণ করা এবং নিজেদের ছেলেদের সেখানে পড়াশুনো করিয়ে শিক্ষিত করে তোলা। ডানিন জানালেন, তাঁর এই বাড়িটি যে জমির উপর নির্মিত, সেটি আসলে জলাভূমির উপর কৃত্রিম বাঁধ তুলে তৈরি করা হয়েছিল। বাড়িটির এক প্রান্ত নদীর দিকে বেরিয়ে থাকা একটি অংশের উপর নির্মিত, ফলে বসার ঘর থেকে শহর ও নদীতে নোঙর করা জাহাজগুলির দৃশ্য বড়ই সুন্দর লাগে।
আমরা জানতে পারলাম, একসময় এই জায়গায় একটি বেশ বড়সড় গবাদিপশুর খামার ছিল। আর চারপাশে ছিল পার্কের মতো খোলা ঘাসজমি। রবিবারগুলিতে চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের একটি দল স্থলপথে ও জলপথে, গাড়ি বা গ্যালিয়োটা নৌকায় এখানে আসত এবং অতিথিবৎসল মালিকের সান্নিধ্যে সারাদিন কাটিয়ে যেত। কিন্তু যে রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি, তার পর থেকে দেশের অধিকাংশ বড় প্রতিষ্ঠানের মতো এই জায়গাটিরও অবক্ষয় শুরু হয়। চাষের জমি বা সেখানে যাওয়ার পথ সবকিছুই তারপর থেকে সম্পূর্ণভাবে ঘন অরণ্যে ঢেকে গেছে। ফিরে আসার সময় হলে ডানিন সাহেব আমাদের শহরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি নৌকার ব্যবস্থা করলেন। আর সেইসঙ্গে দুজন কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকও দিলেন। সারাদিন ধরে এইসব নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সন্ধ্যায় আমরা আবার শহরে ফিরে এলাম। এর অল্পদিন পরেই আমরা আমাদের নতুন বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। বাড়িটা চৌকো মতো। ভেতরে চারটি সমান আকারের ঘর। টালির ছাদটি চারদিকে বেশ খানিকটা বেরিয়ে এসে একটি প্রশস্ত বারান্দা তৈরি করেছিল। বসে কাজ করা ও বিশ্রাম নেওয়ার পক্ষে জায়গাটি ছিল বেশ ঠান্ডা ও মনোরম। সামনের চাষ করা জমিটিকে দেখে মনে হতো যেন সদ্য বনজঙ্গল পরিষ্কার করে তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ফলের গাছ এবং ছোট ছোট কফি ও মান্ডিওকার চাষ হয়েছিল। একটি লোহার জালি-দরজা দিয়ে এই প্রাঙ্গণে ঢুকতে হত। দরজা খুললে সামনেই একটি ঘাসে ঢাকা চত্বর। সেই চত্বরের চারপাশে গ্রামের অল্প কয়েকটি বাড়ি ও তালপাতার ছাউনি-দেওয়া কুঁড়েঘরগুলি ছড়িয়ে ছিল।
(ক্রমশ)
